রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা সচরাচর জানলেও চিকিৎসক রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমরা অনেকেই প্রায় জানিনা বললেই চলে। সাম্প্রতিক মহামারীকালে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। উঠে আসছে বিভিন্ন তথ্য। গত শতকে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর রুপ নিয়েছিল। বিভিন্ন তথ্য এবং চিঠিপত্র ঘেঁটে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকরা সম্প্রতি জানতে পারেন বিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মহামারি সারিয়েছিলেন ‘পঞ্চতিক্ত পাঁচন’ দিয়ে। একবিংশ শতাব্দীর কোভিড অতিমারি প্রতিরোধেও রবীন্দ্রনাথের এই কবিরাজি ফর্মুলার কথা কিন্তু বারবার উঠে এসেছে বিশেষজ্ঞদের মাথায়। বর্তমান অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক এবং আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরাও কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই ‘পঞ্চতিক্ত পাচন’ যে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে যথেষ্ট কার্যকর এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সক্ষম তা স্বীকার করে নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের পঞ্চতিক্ত পাঁচন তখনকার ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘যুদ্ধজ্বর’ নামে পরিচিত হয়েছিল। বহু জায়গায় মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল। শান্তিনিকেতনও রেহাই পায়নি। রবীন্দ্রনাথ নির্দিষ্ট পরিমাণে তেউরি, নিম, গুলঞ্চ, নিশিন্দা এবং থানকুনি বেটে একসঙ্গে সবটা মিলিয়ে তৈরি করলেন এই পাঁচন। রবীন্দ্রনাথ এই পাঁচন তৈরি করে প্রত্যেক শান্তিনিকেতনের আশ্রমবাসীকে নিয়ম করে খাওয়াতেন। সেই সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মহামারি দেখা দিয়েছিল। তিনি সেই মহামারীকে আটকে দিয়েছিলেন এই পাঁচন খাইয়ে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে সীতা দেবীর ‘পুণ্য স্মৃতি’ থেকে জানা যায়, ‘সেই সময়ে দেশে জ্বরের মহামারির ছোঁয়া আশ্রমের বহু ছাত্রছাত্রীর উপর এসে পড়ে। তারা অসুস্থ হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ নিজে রোজ ঘুরে ঘুরে প্রত্যেক অসুস্থ ছাত্রছাত্রীকে দেখতে যেতেন। তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতেন। এমনকি চিকিৎসাও করতেন’। সীতা দেবী আরও লিখছেন, ‘সে বার তিনি একটি ভেষজ প্রতিষেধক তৈরি করলেন। সেই প্রতিষেধকটির নাম ‘পঞ্চতিক্ত পাঁচন’। রবীন্দ্রনাথ চিকিৎসক দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্রকে ১৯১৮-র ২৯ ডিসেম্বর একটি চিঠিতে লিখছেন, ‘ছাত্ররা সৌভাগ্যক্রমে সকলেই ভাল আছে। তাদের সকলকেই রোজ পঞ্চতিক্ত পাঁচন খাওয়াই। আমার বিশ্বাস সেই জন্য তাদের মধ্যে একটি কেস (Case) ও হয়নি, অথচ তারা অধিকাংশই সংক্রামকের কেন্দ্র থেকে এবং রোগগ্রস্ত পরিবার থেকে এসেচে।’ অন্য আরেকটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ রাণুকে এক চিঠিতে লিখলেন, ‘আমাদের ইস্কুলেও সেই জ্বর এসে পড়েচে। কিন্তু অন্য জায়গার মতো তেমন প্রবল নয়। অনেক ছেলেই এখন হাঁসপাতালে গেছে।’ পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞরা রবীন্দ্রনাথের এই পঞ্চতিক্ত পাঁচনের উপাদানগুলি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখেন, তেউরি, নিম, নিসিন্দা— এই তিন উপাদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শরীরের জন্য। কারণ তা শ্বাসজনিত রোগ আর ম্যালেরিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে পারে। রবীন্দ্রনাথের এই পাঁচন যে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভাইরাসের সঙ্গে লড়েছিল তার বহু প্রমান রয়েছে। বিজ্ঞানী বন্ধু জগদীশ চন্দ্র বসু কে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি। চিকিৎসক রবীন্দ্রনাথ কিশোরবেলা থেকেই চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে রবির ছিল গভীর অনুসন্ধিৎসা। যৌবনে শান্তিনিকেতনে স্কুল প্রতিষ্ঠার পর কালীমোহন ঘোষকে আশ্রমে আসার আমন্ত্রণ জানান কবি। রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখেছেন, ‘আমার এখানে চিকিৎসক বলিতে আমি ও ক্ষিতিমোহনবাবু’। বাধ্য হয়েই বাড়তে থাকা আশ্রমবাসীদের চিকিৎসার ভার নিজের হাতে নেন রবীন্দ্রনাথ। কবিকে এই কাজে সাহায্য করতেন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের দাদামশায়, আয়ুর্বেদজ্ঞ ক্ষিতিমোহন সেন। আশ্রম দিনে দিনে বড় হচ্ছিল, তারসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল আশ্রমিকদের রোগ ব্যধি। অগত্যা রোগীদের চিকিৎসার প্রাথমিক দায়িত্ব হাতে তুলে নিতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকেই। এই সময়ের আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা রবীন্দ্রনাথের পঞ্চতিক্ত পাঁচনকে ‘পঞ্চঘৃত পাঁচন’ হিসেবে চিকিৎসার কাজে লাগান। ঘিয়ের মধ্যেও এই পাঁচন তৈরি করা হয়, আবার ট্যাবলেট হিসেবেও পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ যে গুলঞ্চ ব্যবহার করেছিলেন তা শুধু করোনা নয়, যে কোনও রোগ প্রতিরোধে খুব উপকারী। এই পাঁচন দেহে অ্যান্টি ভাইরাল জোন তৈরি করে যা করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে অত্যন্ত জরুরি। তবে এই পাঁচন খেলেই যে করোনা সেরে যাবে এটা বলা যাচ্ছে না। ১৯১৯ সালের ১লা জানুয়ারি, বিজ্ঞানী বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসুকে সে সময়ের ইনফ্লুয়েঞ্জার কথা উল্লেখ করে এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘আমার এখানে প্রায় দুশো লোক, অথচ হাঁসপাতাল প্রায়ই শূন্য পড়ে আছে। এমন কখনও হয় না। তাই মনে মনে ভাবচি এটা নিশ্চয়ই পাঁচনের গুণে হয়েচে।’ ছাত্রদের নিয়ে খানিক নিশ্চিত হলেও তিনি পরিবারের মানুষদের নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। চিঠিতে যেমন লিখছেন,'বউমার খুব কঠিন রকম ন্যুমোনিয়া হয়েছিল। অনেক দিন লড়াই করে কাল থেকে ভাল বোধ হচ্ছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে বোধ হয় অনেক দিন লাগবে। হেমলতা এবং সুকেশী এখনো ভুগচেন। তার মধ্যে হেমলতা প্রায় সেরে উঠেচেন। কিন্তু সুকেশীর জন্য ভাবনার কারণ আছে। কিন্তু ছেলেদের মধ্যে একটিরও ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়নি। আমার বিশ্বাস, তার কারণ, আমি ওদের বরাবর পঞ্চতিক্ত পাঁচন খাইয়ে আস্চি।" কৃমির চিকিৎসায় রবীন্দ্রনাথ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের স্ত্রী রানি খুব অসুস্থ। প্রশান্তচন্দ্রের মেজ মামা ডাক্তার নীলরতন সরকার, ডাক্তার সত্যসখা মৈত্র রানির জ্যাঠতুতো দাদা। দুজনেই রানিকে পরীক্ষা করে জানালেন রোগের মূলে এক ধরনের কৃমি। দুই চিকিৎসকের চিকিৎসা ছাড়িয়ে কাজ হল শেষে রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসায়। রানিকে লিখলেন তিনি, ‘কৃমির উপদ্রব পুরো ধ্বংস হলে আরাম পাবে। কৃমি ধংসের ভালো ওষুধ কাঁচা পেঁপের আঠা, অল্প একটু দুধের সঙ্গে মিশিয়ে বারবার খেলে উপকার পাবে বলে মনে করি।’ এ ভাবেই সহজ উপায়ে চিকিৎসা করতেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ পবিত্র সরকারের কথায়, ‘‘রবীন্দ্রনাথ নিয়মিত নিমপাতার রস খেতেন। ঠাকুরবাড়িতেও ত্বক থেকে শরীরের যত্নে নানা পথ্য ব্যবহার করা হত। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে মহলে বরাবর রূপের কদর ছিল।’’ সেই সূত্র ধরে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতি সুবীরেন্দ্রনাথের মেয়ে সুপূর্ণা চৌধুরী বলেন, “নিয়মিত নিমপাতা আর কাঁচা হলুদ খেতাম। আর স্নানের সময় হলুদ ও মঞ্জিষ্ঠা দিয়ে স্নান করতাম। বলা হত, সব রোগ দূরে থাকবে, ত্বক সুন্দর হবে।” রবীন্দ্রনাথের পঞ্চতিক্ত পাচন ভাইরাসের সাথে লড়াইয়ে সক্ষম! আয়ুর্বেদ এবং অ্যালোপ্যাথ বিশেষজ্ঞ দের কথায়, কোভিড-১৯ মহামারীকালে বা করোনাভাইরাস প্রতিরোধকারী সরাসরি কোনও মেডিসিন এখনও নেই। কোনও অ্যান্টিডোটও নেই। তাই চিকিৎসার মাধ্যমে আমরা শরীরে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছি যাতে এই ভাইরাস বেশি ক্ষণ টিকে থাকতে না পারে। এ ক্ষেত্রে অ্যালোপ্যাথি মেডিসিন যে ভাবে কাজ করছে ঠিক সেই রকম ভাবে শতবর্ষ প্রাচীন আয়ুর্বেদের ভূমিকাকেও অস্বীকার করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের যে পঞ্চতিক্ত পাঁচন তার অনেক গুণ আছে। নিম যেমন অ্যান্টি ইনফেক্টিভ। নিম খাই, লাগাই। এগুলো সরাসরি অ্যান্টি ভাইরাল না হলেও ভাইরাস যে পরিবেশ পছন্দ করে সেগুলো নষ্ট করে দেওয়ার জন্য এগুলোর অবদান অনস্বীকার্য।’’ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট পাঁচনকে এভাবেই কিন্তু মান্যতা দিচ্ছেন এই সময়ের অ্যালোপ্যাথ চিকিৎসকরাও। রবীন্দ্রনাথ হোমিওপ্যাথির চিকিৎসায় বেশ পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু পাচনের আবিস্কার কিন্তু সত্যিই অভাবনীয়। বৈশাখ উপলক্ষে চৈত্র সংক্রান্তি অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিন সব ধরনের সবজি দিয়ে একটি বিশেষ নিরামিষ তরকারি রান্না করা হয় বাংলার ঘরে ঘরে। আঞ্চলিক ভাষায় একে ‘পাচন’ বলা হয়। বাঙালি এবং নৃতাত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই পাচন খাওয়ার রেওয়াজ বেশ পুরোনো। পাহাড়ের আদি বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে চলে পাচন খাওয়ার উৎসব। সমতলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আগে পাচন খাওয়ার প্রচলন থাকলেও এখন ধীরে ধীরে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষ সবার ঘরেই রান্না হচ্ছে পাচন। প্রচলিত রয়েছে ১০৮ ধরনের সবজি দিয়ে এই পাচন রান্না করা হয়। আঞ্চলিক ভাষায় একে ‘আঠোরা’ও বলা হয়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সব সময়ে থাকতো একটি কবিরাজি বাক্স। সেই বাক্সে থাকতো নানা ধরনের হোমিওপ্যথি এবং আয়ুর্বেদিক জড়িবুটি। বাড়ীর অন্দরে, শান্তিনিকেতন তো বটেই দূর দুরান্তের গ্রামের মানুষের কাছেও চিকিৎসক রবীন্দ্রনাথের অনেক নাম ডাক ছিল। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)।তথ্য সুত্রঃ বিশ্বভারতী এবং সমসাময়িক পত্র পত্রিকা।ছবি সৌজন্যেঃ আনন্দবাজার পত্রিকা।