সে অনেকদিন আগের কথা, বিনা টিকিটে ভ্রমণ করতে গিয়ে মেলা থেকে ফিরতে বন্ধু বান্ধব সহ ধরা পরে রেলের জেলে আটক। আশ্চর্য সেই জেল থেকে ছাড়াও পেয়েছিলেন গান শুনিয়েই। একবার তুলোর ব্যাবসাও শুরু করেছিলেন এই জগৎবিখ্যাত শিল্পী। কিন্তু ব্যাবসার শুরুতেই হোঁচট খেয়েছিলেন। গচ্ছা যায় হাজার টাকা। রাজপুত্র শচীন দেববর্মণ ত্রিপুর রাজবংশের ১৮০তম মহারাজা ঈশানচন্দ্র মানিক্যের মৃত্যুর পর পুত্র নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মণ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন। কিন্তু পিতৃব্য বীরচন্দ্র দেববর্মণের সঙ্গে তাঁর আইনি লড়াই বেঁধে যায়। সেই লড়াই বিলেতের প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত গড়ায়। প্রিভি কাউন্সিল বীরচন্দ্র দেববর্মণের পক্ষে রায় দেয়। সেই থেকে ত্রিপুর রাজ বংশের ১৮১ তম রাজা হয়ে বীরচন্দ্র মাণিক্য রাজত্ব শুরু করেন। এর পরেই নবদ্বীপচন্দ্র ত্রিপুরা ছেড়ে ব্রিটিশ ত্রিপুরা (অধুনা বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলা) জেলার কুমিল্লায় বসবাস শুরু করেন। তিনি সেখানকার জমিদারী চাকলা-রোশনাবাদের মাসিক বৃত্তি পেতেন। নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মণ যদি রাজ শাসন পেতেন তাহলে উনার সুযোগ্য কনিষ্ঠ পুত্র শচীন দেববর্মণ হতেন রাজপুত্র। শচীনকর্তার জন্মভিটে চাকলা- রোশনাবাদ ছিল মেঘনা পূর্ব পাড় থেকে ত্রিপুরা জেলার দুটি ব্লক এবং নোয়াখালী জেলার একটি ব্লক, সেই সাথে সিলিটের দশটি সমৃদ্ধ থানা নিয়ে একটি প্রায় রাজ্যের মতো একটি জমিদারী ‘এস্টেট’। আবহমানকাল থেকে সেই বৃহৎ অঞ্চলে ত্রিপুরার রাজাদের আধিপত্য বজায় ছিল। কিন্তু তাতে মোঘল সম্রাটের পক্ষ থেকে লিখিত কিছু ছিলনা। ব্রিটিশ সরকার এই অঞ্চলটি ত্রিপুরার রাজাদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিল। তার বিনিময়ে ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে কুমিল্লাস্থিত ইংরেজ রেসিডেন্ট কমিশনার চাকলা-রোশনাবাদ অঞ্চলটি ত্রিপুরার রাজাদের হাতে জমিদারী স্বরূপ তুলে দেয়। সেই থেকেই অধুনা কুমিল্লা জেলাকে বলা হতো ব্রিটিশ ত্রিপুরা। তিপ্রা জেলা (Tippera District) ত্রিপুরার রাজাদের প্রত্যক্ষ শাসনাধীন ত্রিপুরাকে বলা হতো পার্বত্য ত্রিপুরা। লোক মুখে পার্বত্য ত্রিপুরাকে স্বাধীন ত্রিপুরাও বলা হতো। নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মণের কুমিল্লার চরথা নামক স্থানের বাড়িতে ১৯০৬ সালে (মতান্তরে ১৯০৩ সালে) জন্মগ্রহণ করেন পুত্র শচীন দেববর্মণ। পাঁচ ভাই, চার বোনের মধ্যে শচীন দেববর্মণ ছিলেন সবার ছোট। উনার মা নিরুপমা দেবী ছিলেন অভিজাত মণিপুরি পরিবারের কন্যা। সবার ছোট ছেলে শচীন ছিল মায়ের খুব আদরের। ছোটবেলা থেকেই ছেলের মধুর কণ্ঠের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতেন মা নিরুপমা দেবী বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মণ। শচীন দেববর্মণের শিক্ষারম্ভ কিছুকাল পরে মহারাজা বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্যের আমন্ত্রণে নবদ্বীপচন্দ্র ত্রিপুরার রাজ মন্ত্রীসভায় যোগদান করেন রাজমন্ত্রীরুপে। শচীন দেববর্মণের শিক্ষা জীবন শুরু হয় আগরতলায় কুমার বোর্ডিং থেকে। এরপর তিনি চলে যান কুমিল্লার ইউসুফ স্কুলে। কুমিল্লারই জেলা স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশান পরীক্ষায় পাশ করে তিনি ভিক্টোরিয়া কলেজে আই-এ তে ভর্তি হন। এবং সেখান থেকেই স্নাতক হন। শচীন দেববর্মণ খুব ভালো রেফারিং করতেন এবং ফুটবল খেলতেন। কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি ছিল উনার অমোঘ টান। কলকাতার ফুটবল মাঠে উনার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। সঙ্গীত শিক্ষার শুরু একদিন স্কুলের সরস্বতি পুজোর অনুষ্ঠানে গান গেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন শচীন কর্তা। এই নামেই তিনি অধিক পরিচিত। বাবা কুমার শচীনের মধ্যে সঙ্গীত প্রতিভার আঁচ পেলেন। বাবা চাইলেন ছেলে ভালো উস্তাদের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নিক। কিন্তু বাংলার মেঠো সুর তখন প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে রেখেছে কুমার শচীনকে। মাঝি-মল্লারদের কাছ থেকে ছোট বেলা থেকেই গান আহরণ করে চলেছেন কিশোর শচীন। কখনও বা বাঁশের বাঁশী নিয়ে বসে থাকেন তিনি নদীর ধারে অথবা কোনও গহীন বনে। কুমার শচীন তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। কুমিল্লার দশ মাইল দূরে অধুনা ত্রিপুরার কমলাসাগর। সেখানে কালীমন্দির প্রাঙ্গণে পুজা আর মেলা চলছে। বাবার অনুমতি না নিয়েই কুমার শচীন বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে মেলায় গেছেন। মেলা থেকে ফিরে আসতে দেরী হয়ে যায়। ট্রেন স্টেশানে এসে দেখেন ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। আর কই দৌড়ে গিয়ে ট্রেন ধরেছেন কোনমতে। টিকিট আর কাটতে পারেননি। কিন্তু বিপত্তি বাধল পথেই। টিকিট চেকার এসে ধরলেন। বিনা টিকিটে ভ্রমণ করার অপরাধে কুমিল্লা রেল স্টেশানে একটি গুদাম ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হলো শচীন কর্তা সহ উনার বন্ধুবান্ধবদেরও। সবাই কান্নাকাটি করছেন। কিন্তু কারও মন গলছেনা। শেষে এক বন্ধু পরামর্শ দিলেন শচীন কর্তাকে। স্টেশান মাস্টারের ‘মা’ গান খুব পছন্দ করেন। বিপদ থেকে রক্ষা পেতে অবসন্ন মনেই গান ধরলেন শচীন কর্তা। এই গান যেন ম্যাজিকের মতো কাজ করলো। স্টেশান মাস্টারের মা সেই গান শুনে এলেন সেই গুদাম ঘরের কাছে। ছেলেপুলে গুলিকে দেখে অনেক কষ্ট হোল স্টেশান মাস্টারের মায়ের। তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে আরও দু-চারটে গান শুনে মিষ্টি খাইয়ে বাড়ি পৌঁছে দিলেন। কুমিল্লাতে পড়াশোনার পাশাপাশি গানের সাধনাও চলতে থাকলো। কুমিল্লাতেই পরিচিত হোন কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। নজরুল শচীন কর্তার জন্যে গানও রচনা করেছিলেন। গানের সুবাদেই অনেক অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছিলেন এই দুই বিখ্যাত মানুষ। এরপরেই চলে এলেন কলকাতায়। সঙ্গীতের তালিম কুমিল্লার পাঠ চুকিয়ে তিনি এলেন কলকাতায়। কলকাতায় এসেই তিনি সঙ্গীতের প্রতি অমোঘ টানের কারনে, একদিন গিয়ে হাজির হলেন দৃষ্টিহীন সঙ্গীত শিল্পী কৃষ্ণ চন্দ্র দে-এর কাছে (মান্না দে’র কাকা) । সেই সাথে তিনি কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গীতগুরু ওস্তাদ বাদল খাঁ এবং ভীস্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও রাগ সঙ্গীতের তালিম নিতে শুরু করলেন। এছাড়াও ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁ, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ এবং ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ- এর আশীর্বাদ ছিল শচীন কর্তার সঙ্গীত জীবনে। সেই সঙ্গে কলকাতার বিভিন্ন অভিজাত সঙ্গীতের আসরে উপস্থিত থাকতে শুরু করলেন তিনি। কলকাতায় এসেছিলেন আইন পড়তে। বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র এটাই চেয়েছিলেন। কিন্তু সঙ্গীতের কারনে আইন পড়া আর হোল না। এমনি করেই একদিন বেতারে গাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলেন তিনি। সেই প্রথম বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি পনেরো মিনিট গান গাইলেন। পারিশ্রমিক পেলেন ১০ টাকা। তিনি উনার জীবন কথায় এপ্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘ আমার নিজের সুর সংযোজনার দুটি গান গাইলাম। পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা। আমার জীবনের প্রথম উপার্জন। লক্ষ টাকার থেকেও বেশী মনে হয়েছিল’। বেতারে সঙ্গীত সম্প্রচারের পরে উনার গান পৌঁছে যায় বৃহত্তর শ্রোতার কাছে। আর সেই সাথে তিনি সেই সময়কার বহু বিখ্যাত শিল্পীদের নজরে চলে আসেন। সঙ্গীত শিক্ষার প্রতি শচীন কর্তার নিষ্ঠা দেখে উনার সঙ্গীত গুরুরাও মুগ্ধ হয়ে যেতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই নিষ্ঠার সাথেই তিনি সঙ্গীত সাধনা করে গেছেন। শুরু হল বিখ্যাত সব সঙ্গীতের আসর থেকে উনার আমন্ত্রণ। ধীরে ধীরে নাম-যশও হতে থাকলো। এরই মধ্যে ঘটে গেলো এক দুর্যোগ। উনার পিতা নবদ্বীপ চন্দ্রের অকস্মাৎ মৃত্যু হলো ১৯৩১ সালে। মাথার উপর যেন ছাঁদ ভেঙ্গে পড়লো। অর্থের সংস্থান হবে কোথা থেকে। ব্যয় বহুল ত্রিপুরা প্যালেস ছেড়ে উঠে এলেন এক ভাড়া বাড়িতে। মাঝে মাঝে রেডিও বা সঙ্গীত অনুষ্ঠান থেকে ডাক পেলেও অর্থ সঙ্কট এতে তো আর মিটে না। শচীন কর্তা গ্র্যাজুয়েট। আগরতলায় ফিরে এসে রাজকার্যে যোগ দেয়ার প্রস্তাবও ছিল। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে কলকাতাতেই থেকে গেলেন এবং সঙ্গীতেই মনোনিবেশ করলেন। কিছু গানের টিউশানও শুরু করলেন। আর সেই সুবাদেই পরিচয় ছাত্রী মীরা দেবীর সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেম শেষে পরিণয়। ১৯৩৮ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি বিয়ে করলেন ঢাকার বাসিন্দা মীরা দেবীকে। মীরা দেবীও ছিলেন একজন সত্যিকারের সঙ্গীত শিল্পী এবং সঙ্গীত বোধ্যা। শচীন কর্তার বহু গানের রচয়িতা ছিলেন মীরা দেবী। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ জানা অজানা শচীন কর্তা, তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর। ছবি সৌজন্যে - আলোকিত রাঙামাটি