এক সময়ে রাণীরা জলে মুখ দেখে শৃঙ্গার করতেন। সেই সময়ে আয়না ছিলনা। কিন্তু কাচ ছিল প্রকৃতিতে। কিন্তু সেই কাচ তৈরির প্রক্রিয়া জানতেন না মানুষ। এখন কাচ ছাড়া আমাদের চলেই না। আয়না ছাড়া এই পৃথিবী কল্পনা করা যায়! শুধু আয়না নয়, কাচের বাসন, কাচের আসবাব কতনা ব্যবহার এই কাচের। প্রতিদিন আমরা প্রতি সেকেন্ডে কাচের সামনে দাড়াই। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন ঠিক কি কারনে আয়নার সামনে দাড়ালে আমাদের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে! আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা জানবো, কিভাবে কাচ তৈরী করা হয়? এর উপাদান গুলি কি? এছাড়াও এ সম্পর্কিত যাবতিয় খুটি নাটি বিষয়। ইতিহাসে প্রথম কাচ ইতিহাসে প্রথম কাচ তৈরির উল্লেখ পাওয়া যায় ৩৬০০ খ্রিস্টপূর্বে মেসোপটেমিয়ায়, তবে ভিন্নমতে কেউ কেউ দাবি করেন যে তারা মিশরের কাচের জিনিসপত্রের অনুলিপি তৈরি করেছিল মাত্র। অন্যান্য প্রত্নতাত্বিক প্রমাণ অনুসারে প্রথম কাচ উৎপাদন হয় সম্ভবত উত্তর সিরিয়ার উপকূলে, মেসোপটেমিয়া অথবা মিশরে। কাচের তৈরী প্রাচীনতম পরিচিত বস্তুর মধ্যে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ শতকের পুতির সন্ধান পাওয়া গেছে যা সম্ভবত ধাতব মল (বা স্লাগ) অথবা ফাইয়েন্স (একধরনের প্রাক-কাচ উপাদান) উৎপাদনের সময় দুর্ঘটনাজনিত উপপণ্য হিসাবে পাওয়া যায়। প্রথম প্রথম কাচের তৈরী পণ্য ছিল বিলাসবহুল,যতক্ষণ না ব্রোঞ্জ যুগের শেষের দিকের বিপর্যয় কাচ উৎপাদনে বিপুল ঘাটতির উদ্রেক করে। ভারতে কাচ প্রযুক্তির বিকাশ সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ১৭৩০ সালে শুরু হয়েছিল। প্রাচীন চিনে সিরামিক এবং ধাতুর তুলনায় কাচ প্রস্তুতি অনেক দেরিতে শুরু হয়। প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের প্রত্নস্থল থেকে পুরাতাত্বিকেরা কাচের এমন অনেক বস্তুর খোঁজ পেয়েছেন যা গৃহকার্যে, বিভিন্ন শিল্পকর্মে ব্যবহার হত। ইংল্যান্ডে বিভিন্ন স্থানে পূরাতাত্বিক উৎখনন-এর সময়, প্রাচীন জনবসতি অঞ্চল এবং পুরাতন কবরস্থান থেকে এংলো-স্যাক্সন কাচের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই বিশেষ ধরনের এংলো-স্যাক্সন কাচ, কাচের পাত্র তৈরী, পুতি তৈরী এবং জানলার কাচ থেকে শুরু করে বিবিধ ক্ষেত্রে, এমনকি অলংকার প্রস্তুতিতেও ব্যবহার হত। কাচ কি? কাচ হচ্ছে একটি স্বচ্ছ পদার্থ যার রাসায়নিক সংকেত হচ্ছে ‘সিলিকন ডাই অক্সাইড’ বা (Sio 2)। মূলতঃ কোয়ার্টজ বা সিলিকা সোডা, এবং চুনকে যখন মিশ্রণ করে ১২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়, তখন এগুলি গলতে শুরু করে এবং তৎক্ষণাৎ যদি সেটিকে ঠাণ্ডা করা যায় তাহলে তখন সেই রাসায়নিক গুলি কাঁচে রুপান্তরীত হয়।আমাদের বিশ্বের সব থেকে পরিচিত কাচ মিশ্রনটি হচ্ছে ৭৫% সিলিকন ডাই অক্সাইডের সাথে বাকি অন্যান্য পদার্থ মেশানো। এ ক্ষেত্রে কাচের ভিন্নতা গঠন এবং কাঠামোর উপর ভিত্তি করে এর সাথে নতুন কিছু রাসায়নিক পদার্থ যোগ করা হয়ে থাকে । কঠিন পদার্থের পরমানু গুলি খুবই মজবুত ভাবে একে অন্যের সাথে যুক্ত থাকে যার ফলে কঠিন পদার্থ খুব সহজেই ভেঙ্গে যায়না। আবার তরল পদার্থের অনু গুলি হালকা ভাবে একে অন্যের সাথে লেগে থাকে আর গ্যাসিও পদার্থের ক্ষেত্রে অনুগুলি থাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে । অন্যদিকে আয়নার অনু গুলি একে অন্যের সাথে দৃড় ভাবে লেগে না থাকায় এটি খুব সহজেই ভেঙ্গে যায়। কাচের ব্যাবহার উনিশ শতকের শুরুতে কাচের ব্যাবহার বহুল ভাবে শুরু হলেও এই শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় কাচের ব্যাবহার লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে গাড়ি বা যানবাহনের জানালা কিংবা বসত বাড়িতেও এর ব্যাবহার অধিক হারে বেড়ে চলেছে। কাচ হচ্ছে স্বচ্ছ পদার্থ আর স্বচ্ছ পদার্থ বলতে আমরা জানি কোন বস্তু যদি আলোর প্রতিফলন করে বা শোষন না করে তাহলেই ঐ বস্তুটি স্বচ্ছ হয়ে থাকে। উদাহরন হিসেবে বলা যেতে পারে আপনি যদি দেয়ালে কোন টর্চ লাইট ধরেন তাহলে শোষন হয়ে যাবে অর্থাৎ সেই আলোটি উক্ত দেয়ালকে ভেদ করবেনা। আবার যদি একটি কাচের দিকে লক্ষ্য করে টর্চ ধরা হয়, তাহলে টর্চের সেই আলো ঐ কাচকে ভেদ করে বাইরে চলে যাবে। তার মানে এটি স্বচ্ছ পদার্থ। কাচের এক পাশে যখন অন্য কোন বস্তু বা পদার্থ রাখা হয় যেটি স্বচ্ছ নয় তখনি কাচের মধ্যে দিয়ে আলো ভেদ করতে পারেনা আর একারনেই আমরা আয়নায় নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখতে পাই। আয়নাকে যখন তৈরী করা হয় তখন তার পেছনে পারদ বা রুপার প্রলেপ দেয়া হয় একারনেই তখন আলো সেই আয়নাকে ভেদ না করে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে।এছাড়াও আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন আয়নার সামনে যখন কোন কিছুর প্রতিফলিত হয় তখন সেটি উলটো হয়ে ফিরে আসে যেমন আমরা যদি একটি সমতল আয়নার দিকে দাড়াই তখন আমাদের ডান হাতকে আয়নাতে বাম হাত হিসেবে দেখোবে। অথবা আমরা যদি কোন লেখা আয়নার দিকে তাক করে ধরি তাহলে দেখা যাবে সেই লেখাটি উলটে রয়েছে। মূলত কাচের এই বিষয়টিকে বলা হয় “লিটারেল ইনভার্সন’। মূলতঃ আমরা যখন কোন আয়নাতে তাকাই তখন সেখানে আলো ইনভার্স হয়ে ফিরে আসে কারন আয়নাতে তাকানোর ফলে সে সময় আলো আয়নাতে বিক্ষিপ্ত ভাবে ফিরে আসে যার ফলে আমরা কোন কিছুর উলটোটি আয়নাতে দেখতে পাই। হয়তোবা আপনারা ইতি মধ্যে খেয়াল করেছেন বিভিন্ন এম্বুলেন্সের সামনে উলটো করে এম্বুলেন্স লেখাটি লেখা হয় যার কারন হচ্ছে এটিও লিটারেল ইনভার্সনে যেন ঠিক ভাবে দেখা যায়। এম্বুলেন্সের সামনে থাকা গাড়ির ড্রাইভার যেন তার লুকিং গ্লাসে পেছনের এমবুলেন্স লেখাটি ঠিক ভাবে দেখে বুঝতে পারে সেটি এমবুলেন্স একারনেই এম্বুলেন্স লেখাটি উলটো করে লেখা হয়। বুলেট প্রুফ (Bullet-Proof) কাচ আমাদের বিশ্বে ইতিমধ্যে বিভিন্ন দামি গাড়ি কিংবা অনেক ভবনেই বুলেট প্রুফ গ্লাস (Bullet-Proof)ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। এই বুলেট প্রুফ গ্লাস তৈরীর জন্য দুটি গ্লাসের মাঝে একটি পলিকার্বনেট লেয়ার দেয়া হয়। এই পলি কার্বনেট হচ্ছে খুবই পাতলা। কিন্তু অনেক শক্ত এবং স্বচ্ছ প্লাস্টিক এটি। এর পরে সেই লেয়ার সহ গ্লাস গুলোকে হিট দেয়া হয় যাকে স্তরায়ণ (Lamination) বলা হয়। সেক্ষেত্রে সম্পুর্ন জিনিস গুলিকে একটি কাচের মতই দেখায় যাকে আমরা পরবর্তিতে বুলেট প্রুফ গ্লাস বলে থাকি। উল্লেখ্য এই বুলেট প্রুফ গ্লাসে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একের অধিক পলিকার্বনেট দেয়া হয়ে থাকে। যার ফলে এই সকল গ্লাসের ঘনত্ব স্বাভাবিক ভাবে ৭ মিলিমিটার থেকে ৭৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া, যুগান্তর