পৃথিবী বিখ্যাত মোমের জাদুঘর মাদাম তুসো সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই জাদুঘর একসময় ছিল ভ্রাম্যমান। পৃথিবীর বিখ্যাত মানুসগুলির পাশাপাশি ‘ডেথ মাস্ক’, ‘চেম্বার অব হরর’, গিলোটিন, রাণী এলিজাবেথ আর যুদ্ধের মুরতিগুলি দেখলে রক্ত হিম হয়ে যায়। একবার একজন রেডিও জকি বাজী রেখে মাদাম তুসো’র চেম্বার অব হররে’ থাকার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তিনি প্রাণভয়ে পালিয়ে আসেন। শিল্প এতো নিখুঁত কীভাবে হয় ভাবলে সত্যিই আশ্চর্য লাগে। তাই পৃথিবীর একমাত্র মোমের এই জাদুঘরের মাদাম তুসো সংগ্রহশালা পৃথিবীর এক আশ্চর্য কীর্তি। কে এই মাদাম তুসো? এই ধরনের এক সংগ্রহশালার পরিকল্পনা প্রথম এসেছিল মেরি তুসো নামে অষ্টাদশ শতকের এক ফরাসি মহিলার মাথায়। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল মেরি তুসোর। সংসারে কাজের ফাঁকে মোমের পুতুল বানানো ছিল তুসোর নেশা। প্রথমে প্যারিসে, তারপর লন্ডনের বেকার স্ট্রিটে সাময়িকভাবে তাঁর গড়া পুতুলদের নিয়ে শুরু হল এক প্রদর্শনী। প্রচুর দর্শক সমাগম হওয়ায় তুসোর বংশধরেরা স্থায়ীভাবে খুলে বসলেন এক সংগ্রহশালা। বার্নাড তুসো ঐ জাদুঘরের প্রধান শিল্পী ও ম্যানেজার। তিনি মেরি তুসোরই বংশধর। মাদাম তুসোর জন্ম ১৭৬১ সালে প্যারিসে। ছোটবেলায় কাকা বার্নাড তুসোর কাছে মোমের মূর্তি গড়া শেখেন মাদাম তুসো। তুসো একসময় রাজা ষোড়শ লুইয়ের বোন এলিজাবেথকেও মোমের মূর্তি তৈরি করা শিখিয়েছিলেন। কাকার বার্নাড তুসো’র মৃত্যুর পর উনারই হাতের তৈরি সবগুলো মোমের মূর্তি উত্তরাধিকারসূত্রে মেরি তুসোর হাতে আসে। মোট তিরিশটি মূর্তি নিয়ে মেরি তুসো ফ্রান্স ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে ইংল্যান্ডে চলে আসেন। ৪১ বছর বয়স থেকে ৭৪ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি এক শহর থেকে আরেক শহরে মোমের মূর্তির প্রদর্শনী করে বেড়াতেন। আর সময় পেলেই চলত নতুন মূর্তি গড়ার কাজ। মূর্তির উপযোগী পোশাক, উপযুক্ত পরিবেশ নির্মাণ এবং সঠিক আলো নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন তিনি। যে-গিলোটিনে ফ্রান্সের রাজার গর্দান কাটা গিয়েছিল, সেই গিলোটিনের ব্লেড এবং ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ জর্জ যে-পোশাক পরে সিংহাসনে বসেছিলেন সে-পোশাক যোগাড় করার জন্যেও মাদাম তুসো অনেক অর্থ ব্যয় করেছিলেন। শেষে ১৮৩৫ সালে বেকার স্ট্রিটে সাময়িকভাবে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করলেন মাদাম তুসো। ১৮৫০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। মাদাম তুসো জাদুঘর মাদাম তুসো বা মোম জাদুঘরটি, লন্ডনের মেরিলিবোন স্ট্রিটের অবস্থিত। মাদাম তুসোর সংগ্রহশালার মতো আরেকটি সংগ্রহশালা সারা দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি আর নেই। এই জাদুঘরের প্রতিটি ঘরে সাজানো আছে অতীত এবং বর্তমানের অসংখ্য মানুষের আশ্চর্য জীবন্ত সব প্রতিমূর্তি! কে নেই সেখানে! এই মূর্তিগুলোর সবই মোম দিয়ে তৈরি। তাদের মধ্যে কেউ বিখ্যাত, কেউ বা কুখ্যাত, কেউ ইতিহাসপ্রসিদ্ধ, আবার কেউবা বর্তমান শতকের সেরা রাষ্ট্রনেতা, লেখক, শিল্পী, পর্যটক, খেলোয়াড় বা অভিনেতা। 'হল অব ফেম' ‘হল অব ফেম’ নামে একটি বিশাল কক্ষে রাখা আছে পৃথিবী বিখ্যাত সব মানুষের মূর্তি। এছাড়া বিশ্ব ইতিহাসের নানা স্মরণীয় ঘটনাকে ট্যাবলোর মতো করে রাখা হয়েছে। এই মূর্তির মধ্যে অধিকাংশই বিখ্যাত মানুষ এবং আমাদের পূর্বপরিচিত। তাদের বসা বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি, মুখের ভাব, গায়ের রঙ, সাজপোশাক ইত্যাদি দেখে মনেই হবে না যে তারা নিষ্প্রাণ বা মোমের পুতুল। বরং মনে হবে এই বুঝি তারা নড়ে উঠল বা হাটতে শুরু করলো বা কথা বলবে। এই জাদুঘর দেখা তাই এক আশ্চর্য এবং অপূর্ব অভিজ্ঞতা। তুসোর সদ্য কাটা মুণ্ডগুলি থেকেই তৈরি করতেন মূর্তি তুসোর সংগ্রহশালায় ঢোকবার মুখে এখনো সাজানো আছে বৃদ্ধা মেরি তুসোর এক জীবন্ত মূর্তি। শোনা যায় বৃদ্ধবয়সে নিজের হাতেই নিজের মুখের ছাঁচ তুলে রেখেছিলেন তিনি। পরে সেই ছাঁচ থেকেই। গড়া হয়েছে এই মূর্তিটি। শুধু এই মূর্তিটি নয়, আরও প্রায় পঞ্চাশটি মূর্তি গড়া হয়েছে এই পদ্ধতিতে। ভলটেয়ার, স্যার ওয়ালটার স্কট, বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন প্রমুখ খ্যাতনামাদের মৃতদেহ থেকে সরাসরি তুলে নেওয়া হয়েছিল প্লাস্টারের ছাঁচ। সেই ছাঁচে মোম ঢেলেই পরে গড়ে নেওয়া হয় তাঁদের প্রতিমূর্তি। এই মূর্তিগুলির থেকেও চমকপ্রদ হচ্ছে মেরির নিজের হাতের বানানো কতকগুলি মরণ-মুখোশ বা ডেথমাস্ক। ফরাসি বিপ্লবের সময় রাজপরিবারের অনেকেই প্রাণ দিয়েছিলেন গিলোটিনে। সেই ষোড়শ লুই, মেরি আঁতোয়ানেৎ প্রমুখের সদ্য-কাটা ছিন্নমুণ্ড থেকে সরাসরি বানানো হয়েছে ওই মুখোশের ছাঁচগুলি। আসলে ওই কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন মাদাম তুসো। কারণ রাজপরিবারের বন্ধু হিসেবে তিনিও তখন কারাগারে বন্দি। নেহাত মূর্তিগড়ার অপূর্ব প্রতিভা ছিল বলেই অন্ধকার কারাকক্ষের মধ্যে সে রক্তাক্ত মুণ্ডগুলি থেকে তাঁকে তুলতে হয়েছিল মুখোশের ছাঁচ। ওই দিনগুলো কোনোদিনই জীবনে ভুলতে পারেননি মেরি। তাই আলাদা একটা ঘরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ওই ডেথ-মাস্কগুলি। একবার এক রেডিও জকি, বাজি রেখে রাত কাটাতে গিয়েছিলেন ওই বিভীষিকাগৃহে। কিন্তু কিছুক্ষণ থেকেই প্রাণভয়ে পালিয়ে আসেন তিনি। কারণ প্রতি মুহূর্তেই তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি আক্রমণ করে বসলো কোনো আততায়ী! এই সংগ্রহশালায় রয়েছে ভারতেরও কয়েকজন বিখ্যাত ব্যাক্তিতের মূর্তি। এই মূর্তি গুলি সত্যিই অনবদ্য। প্রতি বছর পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ দেখতে যায় এই অপূর্ব কীর্তি। এই মূর্তি গুলি তৈরি করতেও বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। আর রয়েছে অসম্ভব মেধাবী কিছু শিল্পীর অক্লান্ত পরিশ্রম। তাই গত আড়াইশ বছরেরও বেশী সময় ধরে রহস্যে মোড়া এই মূর্তিগুলি বিশ্বের বিস্ময়। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া