সাদামাটা জীবন যাপন। রঙিন সব পোশাক এড়িয়ে চলতেন। শখ ছিল শুধু গাড়ীর। আজীবন তিনি শাড়িতে অনন্যা। তিনি লতা মঙ্গেশকর। তিনশ কোটির উপর সম্পদ রেখে গত ৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২২ সকালে তিনি চলে গেলেন অমরলোকে। সারা দেশ এখনও এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু আজ থেকে ৬৬ বছর আগেই তিনি ‘ভ্যোগ’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে। সাদা ভূষণে তিনি অনন্যা ‘‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’ লতা মঙ্গেশকর। কেন সাদা জমিনের শাড়ি পড়তেন? এতো রঙিন জীবনে তিনি একজন সেলিব্রিটি হয়েও কেন রঙ এড়িয়ে চলতেন? এর পেছনে রয়েছে এক অন্য গল্প। তবে এই রঙচঙে বলিউডি দুনিয়াকে পাশ কাটিয়ে তিনি নব্বই বছর ধরে একটি বিশিষ্ট আইকনিক লুকে সপ্রতিভ ছিলেন। তাই তিনি লতা মঙ্গেশকর। শীতকালে তাঁর গায়ের পশমি শালগুলোও ছিল হালকা সাদা। রঙিন সাজপোশাক এড়িয়ে চলার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে ২০১৩ সালে ‘বলিউড হাঙ্গামা’র সঙ্গে একটি সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, রঙিন শাড়ি পরায় একবার উনার কোরাস শিল্পীরা বেদম হাসি ঠাট্টা করেছিলেন। তিনি রেগে গিয়ে শপথ করেছিলেন, অত রংচঙের কিছু পরবেন না। তবে সাদায় তাঁর শান্ত, স্নিগ্ধ আর খাঁটি রূপটি ফুটে ওঠে। আর এটি তাঁর শিল্পীসত্তার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়, তাই সাদাতেই তিনি অনন্যা। সাদায় অনন্যা লতা মঙ্গেশকর একেবারে তরুণকাল থেকেই তিনি সাদা, অফ-হোয়াইট ও বেজ রঙের জমিনের শাড়ি পরে আসছেন। সবুজ পাড়ের সাদা জমিন শাড়ি ছিল উনার ভীষণ প্রিয়। আঁচল ঘুরিয়ে আরেক কাঁধও ঢেকে রাখতেন সব সময়। সুতি বা রেশমি যা–ই হোক, ছোট বা মাঝারি পাড়ের শাড়িগুলো সব সময়ই প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে তৈরি। সঙ্গে হালকা গয়না। এটাই বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীর স্টাইল স্টেটমেন্ট। হীরার-মুক্তার ছটায় আলোকিত লতা মঙ্গেশকর কখনো তাকে কোনো ভারী গয়না পরতে দেখা যায়নি। কিন্তু হীরার প্রতি ছিল লতা মঙ্গেশকরের ভীষণ আকর্ষণ। ২০০৫ সালে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’–এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ নিয়ে জানিয়েছিলেন, তাঁর প্রথম রোজগার থেকে মাকে কিনে দিয়েছিলেন স্বর্ণালংকার। আর নিজের জন্য গড়িয়েছিলেন বিশেষ নকশাখচিত হীরা আর রুবির আংটি, তাতে খোদাই করা ছিল নিজের নামের আদ্যাক্ষর। ১৯৪৭ সালে ৭০০ টাকায় কেনা সেই আংটি সযত্নে রাখা ছিল আমৃতু কাছে। গানের পরেই হীরা ছিল তাঁর ভালোবাসার জায়গা। উনার ছিল হীরার আংটি আর অলঙ্কারের রেয়ার কালেকশান। মুক্তার প্রতিও ছিল লতার অসম্ভব আকর্ষণ। রুপালি রুপে তিনি অনন্যা বছর আটেক আগে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’–এর সঙ্গে এক আন্তরিক আলাপচারিতায় লতা মঙ্গেশকর বলছিলেন তাঁদের অতি রক্ষণশীল মারাঠি পরিবারের কঠিন অনুশাসনের কথা। তিনি বা তাঁর বোনদের সাজসজ্জার প্রবণতাকে কখনো প্রশ্রয় দিতেন না তাঁর বাবা। ছোটবেলায় হালফ্যাশনের ঘটিহাতা জামা পরে একবার বাবার রোষানলে পড়েছিলেন। আর এমনিতেও লতা হালফেশানে গা ভাসিয়ে দিতে চাননি কোনদিন। ভারী মেক-আপেও কোনো দিনই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি তিনি। তাই তিনি এক অন্যরকম স্টাইল আইকন। স্মিত হাসি, পরিমিত অলংকার, নির্লিপ্ত চোখ, হালকা জমিনের শাড়ি, লাল টিপ আর দুই বেনি। এভাবেই রুপালি রুপে তিনি অনন্যা। ভ্যোগ ম্যগাজিনের প্রচ্ছদে লতা ‘ভ্যোগ’ ম্যাগাজিনের ইতিহাস প্রায় ১৩০ বছরের। এখনও ‘ভ্যোগ’ ম্যাগাজিন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব দের নিয়ে প্রচ্ছদ করে। এত বছরে পৃথিবীর বহু দেশের বহু শিল্পীকে প্রচ্ছদে তুলে এনেছে এই ম্যাগাজিনটি। ১৯৫৬ সালের মার্চ সংখ্যায় ‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’ লতা মঙ্গেশকরকে নিয়ে প্রচ্ছদ করেছিল ভোগ। পরিচিত সাজেই দেখা গিয়েছিল তাঁকে। কপালে ছোট টিপ আর চুলের সেই চিরচেনা দুই বেণি। ‘ভ্যোগ’ এর এই প্রচ্ছদে লতাকে দেখা গেছে এমব্রয়ডারি করা খুব সাদামাটা শাড়িতে। গলায় ছিল হালকা মালা ও কানে হিরার ছোট দুল। হাতে হালকা চুড়ি। আত্মবিশ্বাসী লতা মঙ্গেশকরের এমন ছবির সঙ্গে ‘ভ্যোগ’ ম্যাগাজিনের শিরোনাম ছিল ‘লতা মঙ্গেশকর—দ্য ওম্যান উইথ “মা সরস্বতী, ইন হার থ্রোট’। কেন বিয়ে করেন নি লতা আজীবন কুমারী থেকেছেন লতা। বিয়ে করেননি। কেন? সাংবাদিক খালিদ মহম্মদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘একমাত্র আমার মা আমার বিয়ে নিয়ে জোরাজুরি করতেন, একসময় তিনিও হাল ছেড়ে দেন। আমার কাছে আমার পরিবার বিয়ের চেয়ে বেশি জরুরি ছিল। কিন্তু এমনটা অস্বীকার করব না যে আমাকে কোনওদিন একাকীত্ব ঘিরে ধরেনি, তাহলে তো আমি মানুষই হতাম না। বিবাহিত হোন কিংবা সিঙ্গেল, একাকীত্ব সবার জীবনে আছে। কখনও কখনও এই একাকীত্ব ক্ষতিকারক হয়। তবে আমি বলব আমি খুব সৌভাগ্যবান যে ভালোবাসার মানুষরা আমার আশেপাশে সবসময় থেকেছে’। অন্য একটি সাক্ষাতকারে তিনি জানিয়েছেন, “বাড়ির সব সদস্যের দায়িত্ব আমার ওপর। এই অবস্থায় বহুবার বিয়ের কথা ভাবলেও তা সম্ভব ছিলনা। আমি খুব অল্প বয়সে কাজ শুরু করি। আমার অনেক কাজ ছিল।" প্রসঙ্গত মাত্র ১৩ বছর বয়সের তখন লতা মঙ্গেশকরের মাথায় সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে, কারণ সেই সময় তিনি তাঁর বাবাকে হারান। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস জানিয়েছে, ‘রাজ সিং, যিনি লতা মঙ্গেশকরের খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। লতা মঙ্গেশকর এবং রাজ সিং দুঙ্গারপুর দুজনেই বিয়ে করতে চাইছিলেন, কিন্তু রাজ সিং তার বাবা-মাকে এই বিষয়ে জানালে, তার বাবা মহারাওয়াল লক্ষ্মণ সিংজি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কারন রাজ সিং দুঙ্গারপুর ছিলেন একজন রাজবংশীয়। আর রাজার ছেলের সাথে গায়িকার বিয়ে অসম্ভব। যদিও লতা মঙ্গেশকর কখনোই এই কারণ নিশ্চিত করেননি, তবে বাড়ির দায়িত্বকেই কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন। পরিবারের জন্যই আজীবন সিঙ্গল থেকেছেন লতা মঙ্গেশকর। তবে আছেন সবার হৃদয়ে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ হিন্দুস্তান টাইমস/দ্য টেলিগ্রাফ/ ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস এবং সমসাময়িক পত্র পত্রিকা।