শিশুটি বুদ্ধিদীপ্ত হবে কিনা অথবা শিশুটির বুদ্ধিমত্তার নেপথ্যে কার অবদান মা না বাবার এনিয়ে তর্ক কিন্তু চলছেই। কারও মতে বাবার, কারও মতে মায়ের, কেউ কেউ বলেন, মা-বাবা দুজনেরই উপর নির্ভর করে। কিন্তু সম্প্রতি আসল সত্যিটা বেড়িয়ে এসেছে। গবেষণা বলেছে, একজন শিশুর বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে শিশুটির মায়ের জিনের উপর। সেখানে বাবার জিনের কোনও ভূমিকা নেই। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শিশুর ইন্টালিজেন্স কোশেন্ট (আইকিউ) কতটা উন্নত হবে তা নির্ভর করে কন্ডিশনিং জিনের উপর, যা একজন শিশু তাঁর মায়ের থেকেই পায়। কিন্তু তার আগে জেনে নেয়া দরকার জিন কি? জিন বা Gene জিন (Gene), আরএনএ (RNA) এবং ডিএনএ (DNA) এবং ক্রমোজমের গঠন এবং প্রকৃতি নিয়ে আধুনিক জীব বিজ্ঞানী এবং জেনেটিক বিজ্ঞানীদের গবেষণা নিরন্তর চলছে। তাঁদের পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকে জানা গেছে যে, প্রতিটি মোজমের মধ্যে অসংখ্য জিন (Gene) রয়েছে। জিন গুলি দেখতে গুটির মতো এবং এগুলি মালার মতো সাজানো থাকে। প্রতিটি ক্রমোজম ১০০০টি জিন নিয়ে গঠিত হয়। এই জিনগুলিই মানুষ এবং অন্যান্য প্রানীর বংশগতির প্রকৃত বাহক। ব্যাক্তির দৈহিক বৈশিষ্টগুলি এই জিনের উপরেই নির্ভরশীল। এই জিনগুলিতে দুই ধরনের রাসায়নিক যৌগ (molecules) রয়েছে। জিনের নিউক্লিয়াস DNA (Deoxyribonucleic Acid) দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে এবং বাইরের দিকে থাকে RNA (Ribonucleic Acid) । DNA যৌগ চিনি, ফসফেট ইত্যাদি দ্বারা তৈরি এবং এটি নাইট্রোজেন বেসের (Nitrogen Base) সাথে সংযুক্ত থাকে। এই DNA আকারে লম্বা এবং দেখতে প্যাঁচানো সিঁড়ির মতো। একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করার জন্যে সব ধরনের রাসায়নিক নির্দেশ বহন করে এই DNA। এছাড়া একটি ব্যাক্তির বৈশিষ্টগুলি হিসেবে চোখের রং, বুদ্ধি উচ্চতা ইত্যাদি নিরূপণ করে DNA। এটি অনেকটা নীলনক্সার মত। এই নীলনক্সা থেকে একজন সম্পূর্ণ মানব শরীর তৈরি করার জন্য DNA এর মধ্যেকার রাসায়নিক তথ্য RNA -এ রূপান্তরিত (transcribed) করা হয়। DNA হতে তথ্য সংগ্রহ করে RNA কোষের সাইটোপ্লাজমে নেয়। এই সাইটোপ্লাজমে রয়েছে প্রোটিন তৈরির কাঁচামাল বা রসদ। RNA-এর নির্দেশ অনুযায়ী এই প্রোটিন হতেই প্রতিটি মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এবং ক্ষমতা বিকাশ লাভ করে। শিশুর বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে শিশুটির মায়ের জিনের উপর বাচ্চারা তাঁদের মায়ের কাছ থেকেই বুদ্ধিমত্তার গুণ গ্রহণ করে থাকে, বাবার কাছ থেকে নয়।এই দাবির পিছনে রয়েছে একাধিক বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা। শিশু সন্তানটি তাঁর মা-বাবার কাছ থেকে ইন্টালিজেন্স কোশেন্ট (IQ) স্তর-সহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও সমান ভাবে অর্জন করে থাকে এটি মেনে নেওয়া যায়। তবে একটি জেনেটিক স্টাডিতে প্রমাণিত যে, বিশেষ ভাবে বুদ্ধিমত্তার গুণাগুণ সে পেয়ে থাকে তার মায়ের কাছ থেকেই। ‘সাইকোলজি স্পট’ নামক জার্নালে এ বিষয়ে সম্প্রতি একটি সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছ। ১৯৯৪ সালে একটি স্যাম্পেল সার্ভে করা হয়েছিল। ১ থেকে ২২ বছর বয়সি ১২,৬৮৬ জনের ওপর চালানো হয়েছিল এই সমীক্ষা। জাতি, শিক্ষার স্তর, আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল। আবার সেই একই প্রশ্ন করা হয়েছিল মায়েদের। ডেটা বিশ্লেষণের সময় দেখা যায় যে, বুদ্ধিমত্তার জিনটি X ক্রোমোজোমের সঙ্গে জড়িত। এটি আবার প্রধান ফিমেল ক্রোমোজোম। ১৯৯৪ সালেই এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আর একটি সমীক্ষায় পাওয়া যায় যে, যেহেতু মহিলাদের মধ্যে X ক্রোমোজোমের সংখ্যা দ্বিগুণ, তাই সন্তানের মধ্যে সেই ইন্টেলিজেন্স জিন সরবরাহ করে দেওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। শিশুটি কতটা বুদ্ধিমান ও চালাক হবে, তা ও নির্ধারণ করে থাকে মায়ের জেনেটিকই। অন্য দিকে বাবার জিনগুলি সন্তানের বুদ্ধিমত্তায় সামান্য প্রভাব ফেলে বা একেবারেই প্রভাব ফেলে না। একদল ইঁদুরের উপর প্রথম পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখতে পায়, সদ্যোজাত ইঁদুরেরা যারা মায়ের জিন বেশি পেয়েছে তাদের মাথাটা বড়, দেহটা ছোট এবং তারা বেশি বুদ্ধিমান। অন্যদিকে এমন ইঁদুর ছানা যাদের শরীরে পুরুষ জিন বেশি, তাদের মাথাটা ছোট, দেহ বড়, তারা অপেক্ষাকৃত কম বুদ্ধিমান। 'আন্ডারস্ট্যান্ডিং মাদারস জেনেটিকস' নামের এই সমীক্ষায় এও দেখা যায়, মায়ের সঙ্গ, ছোঁয়া, আবেগও শিশুর আইকিউ উন্নত করে। দেখা যায়, যে সন্তানেরা মায়ের বেশি ঘনিষ্ঠ, মায়ের সঙ্গে বেশি সময় কাটায় তারা মাত্র দু'বছর বয়সেই, বয়সের তুলনায় কঠিন ও জটিল কোনও খেলা যেমন 'পাজল'-এর সমাধান খুব সহজেই করে ফেলছে। বিজ্ঞানও সমর্থন জানিয়েছে যে বুদ্ধিমত্তা এক ধরণের ‘শর্তসাপেক্ষ’ জিন, যা সাধারণত মায়ের মাধ্যমে তাদের মধ্যে প্রেরিত হলে তা দারুন কাজ করে। আবার বাবার তরফ থেকে এলে শর্তসাপেক্ষ ও অন্যান্য জ্ঞান ভিত্তিক জিনগুলি বশীভূত বা নিষ্ক্রিয় থাকে। আবার বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মায়েরাই সন্তানের দেখাশোনা ও লালন পালনে মুখ্য এবং প্রাথমিক ভূমিকা গ্রহণ করেন। এর ফলে বাচ্চাদের উন্নয়নের জটিল পর্যায় তাদের ওপর মায়ের প্রভাবই সবথেকে বেশি পড়ে। মায়ের প্রভাবেই প্রভাবিত হয়ে তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে। মায়ের ঘনিষ্ঠ শিশুরা কম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে বুদ্ধিমত্তা একটি ব্যাপক ও বিস্তৃত ধারণা এবং সামগ্রিক ভাবে নানান বিষয় একে প্রভাবিত করতে পারে। বিজ্ঞান অনুযায়ী, ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বুদ্ধিমত্তা অবশ্যই বংশপরম্পরায় লাভ করা যায়। কিন্তু অবশিষ্ট হার নির্ধারিত হয় কিছু পারিপার্শ্বিক বিষয়ের কারণে। সন্তান তাঁর মা বাবার সঙ্গে কতটা ইমোশনালি যুক্ত, এই বিষয়টিও তাঁদের বুদ্ধিমত্তা নির্ধারণ করে। সক্রিয় অভিভাবক সন্তানকে আবেগপ্রবণ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, সে বিষয় কোনও সন্দেহ নেই। বিজ্ঞান অনুযায়ী আবেগপ্রবণ মা ও তার উপস্থিতি বাচ্চাদের মধ্যে বুদ্ধিমত্তার হারকে তাৎপর্যপুর্ণ ভাবে বাড়িয়ে দেয়। আবেগের দিক দিয়ে সক্রিয় অভিভাবকের প্রভাবে বাচ্চাদের বুদ্ধি, জ্ঞানভিত্তিক বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব এবং যুক্তিপূর্ণ চিন্তাভাবনা প্রভাবিত হয়। অভিভাবকের সঙ্গে স্থায়ী ও আবেগঘন সম্পর্কে থাকা খুবই ভালো। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা শিশুর মস্তিষ্ক উন্নত করে। পাশাপাশি মায়ের ঘনিষ্ঠ শিশুরা কম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্যসূত্রঃ জিন বিজ্ঞান এবং সমসাময়িক পত্র পত্রিকা।