সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কলকাতার ঢাকুরিয়াতে ৪ অক্টোবর ১৯৩১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন, রেলের কর্মকর্তা নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং মা গৃহিণী হেমপ্রভা দেবী। তিনি ছয় ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। সঙ্গীত শিক্ষা পণ্ডিত সন্তোষ কুমার বসু, অধ্যাপক এ টি ক্যানন এবং অধ্যাপক চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে তিনি প্রথম সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ নেন। তবে তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আয়ত্ত করেছিলেন উস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খান ও তার পুত্র উস্তাদ মুনাওয়ার আলী খানের কাছে। একজন শাস্ত্রীয় গায়ক হিসাবে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ভীষণ জনপ্রিয় গায়িকা। স্বাধীনতায়, ভালোবাসায়, শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় যদিও তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রশিক্ষিত, তবুও উনার বেশিরভাগ কাজ বাংলা আধুনিক গান নিয়ে। ১৯৫০ সালে ‘তারানা’ চলচ্চিত্রে একটি গান দিয়ে তিনি মুম্বাইয়ে প্রথম হিন্দি গান গাইতে শুরু করেন। অনিল বিশ্বাসের সুরে এই ‘তারানা’ ছবিতে গান গাইতে গিয়েই লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে পরিচয় হল। গানটা ছিল লতার সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে— ‘বোল পাপিহে বোল রে, তু বোল পাপিহে বোল’। অভিনেত্রী মধুবালার লিপে লতার কণ্ঠ। আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান ছিল শ্যামার লিপে। অনিল বিশ্বাসের সুরে পরে ‘ফরেব’ ছবিতেও গান গেয়েছেন সন্ধ্যা। দুই বন্ধু লতা-সন্ধ্যা ‘তারানা’ ছবির রেকর্ডিঙয়েই বন্ধুত্ব দুই কিংবদন্তী শিল্পীর। স্টুডিয়োতে পরিচয়ের কিছু দিনের মধ্যেই লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়ে যায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের। লতা মঙ্গেশকর প্রায়ই চলে আসতেন এভারগ্রিন হোটেলে সন্ধ্যার কাছে। তিনি তখন সেখানেই থাকতেন। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সাধারণ বেশভূষা, আন্তরিক ব্যবহার, লতা মঙ্গেশকরও এই সাদাসিধে লাইফস্টাইলেই অভ্যস্থ। লতাকে খুব ভালো লাগল সন্ধ্যার। লতা একলাই আসতেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কাছে। কখনও থাকতেন সুরকার রোশন, সি রামচন্দ্রের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে গান নিয়ে নানা আলোচনা হত। তখন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নামী শিল্পী রোশেনারা বেগম, হীরাবাই বরোদেকর, কেশরবাই বরোদেকর। রোশেনারার গান সবচেয়ে পছন্দ করতেন লতা। লতা মঙ্গেশকর আবার খুব ভালো অন্যের গলা নকল করতে পারতেন। সে সময়কার হিন্দি ছবির মহিলা শিল্পীদের গলা নকল করে শোনাতেন লতা মঙ্গেশকর বান্ধবী সন্ধ্যাকে। দুই বান্ধবীকে রান্না করে খাওয়াতেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মা হেমপ্রভা । হেমপ্রভা নিজেই রান্না করতেন। হোটেলের খাবার খেতেন না লতা- সন্ধ্যা। লতা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মা হেমপ্রভা’র হাতের রান্না দারুণ পছন্দ করতেন। লতা এসে মা’কে বলতেন— ‘মাইজি, আজ থোড়াসা চাউল লেঙ্গে।’ সন্ধ্যার মা লতাকে রেঁধে খাওয়াতেন নানা তরকারি, কোনও দিন আবার পায়েস। লতা মঙ্গেশকর খুব তৃপ্তি করে খেতেন সেই সব রান্না। তিনি ১৭টি হিন্দি চলচ্চিত্রে নেপথ্য গায়িকা হিসেবে গান গেয়েছেন। ব্যক্তিগত কারণে ১৯৫২ সালে তিনি মুম্বাই ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৬ সালে তিনি জনপ্রিয় কবি শ্যামল গুপ্তকে বিয়ে করেন। শ্যামল গুপ্ত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অনেক গানের জন্য লিরিক্স লিখে দিয়েছেন। ১৯৭০/৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুদের জন্যে অর্থ সংগ্রহের জন্যে ভারতের অন্যান্য শিল্পীদের সাথে গণ আন্দোলনে যোগ দেন এবং অর্থ সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে উনার ভুমিকা এখনও মানুষ ইতিহাস। উনি উনার গান দিয়েই সাহায্য করেছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্থপতি সংগীতশিল্পী সমর দাস কে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মুক্তি উপলক্ষে উনার গাওয়া 'বঙ্গবন্ধু তুমি ফিরে এলে' গানটি ভীষণ জনপ্রিয় হয় সেই সময়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে। ১৯৭১ সালের ২১-এ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের ঢাকার পল্টন ময়দানে উনার অনুষ্ঠান আজও ইতিহাসের পাতায় লেখা রয়েছে। জনপ্রিয় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা ১৯৪৫-এর অগস্ট মাসে এক চোদ্দ বছর বয়সের কিশোরীর প্রথম রেকর্ড বেরলো কলম্বিয়া থেকে। আধুনিক গান— গিরীন চক্রবর্তীর কথায় ও সুরে ‘তুমি ফিরায়ে দিয়াছ’ ও ‘তোমার আকাশে ঝিলমিল করে’। এর বছর দু’য়েকের মধ্যেই দু’টি বাংলা ছবিতেও নেপথ্যে গাইবার সুযোগ হয়ে গেল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের। রাইচাঁদ বড়ালের সঙ্গীত পরিচালনায় ‘অঞ্জনগড়’ এবং রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনায় ‘সমাপিকা’ ছবিতে গান গাইলেন। শুধু তাই নয় ওই একই বছরে অর্থাৎ ১৯৪৮-এ তিনটি আধুনিক গানের রেকর্ড করলেন তিনি। ১৯৪৫-১৯৪৮ সাল, এই তিন বছরের জনপ্রিয়তাই উনাকে এনে দিল চূড়ান্ত খ্যাতি। তিনি আজ জীবন্ত কিংবদন্তি, গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, বাংলা ছায়াছবির গান, বেসিক আধুনিক গানের সম্রাজ্ঞী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এখনও মানুষের হৃদয়ে। তবে জনপ্রিয় জুটি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সবচেয়ে বেশী হিট জুটি সঙ্গীত জগতে। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে অনেক বাঙলা চলচ্চিত্রের জন্য নেপথ্য গায়িকা হিসাবে তিনি প্রচুর গান গেয়েছেন। হেমন্ত ও সন্ধ্যা বাংলার মহানায়ক উত্তম কুমার এবং তার অসংখ্য নায়িকাদের জন্যে (প্লে-ব্যক সিঙ্গার) নেপথ্যে গান গেয়ে জনপ্রিয় গায়িকা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। প্রয়াত মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের কণ্ঠে প্রচুর বাংলা গান এতোটাই জনপ্রিয় যে আজ তা প্রায় ইতিহাস। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ছাড়াও নচিকেতা ঘোষ ও রবিন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি অনেক গান গেয়েছেন। পুরষ্কার সম্মান ১৯৭১ সালে 'জয় জয়ন্তী' এবং 'নিশিপদ্ম' ছবিতে গান গেয়ে শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। গান দুটি হল, ‘আমাদের ছুটি ছুটি’ এবং ‘ওরে সকল সোনা মলিন হল’। এছাড়াও ২০১১ সালে তিনি 'বঙ্গবিভূষণ' উপাধিতে সম্মানিত। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে ‘পদ্মশ্রী পুরস্কার’ হিসেবে ভারত সরকার উনার নাম ঘোষণা করে। লেখকঃ রাজীব দত্ত(প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ সমসাময়িক সংবাদপত্র/ সন্ধ্যা মুখপাধ্যায়র সাক্ষাৎকার।