ভোজন রসিক বাঙালি নিয়ে অনেক গল্প আছে। কিন্তু বিখ্যাত কিছু মানুষের অজানা কিছু তথ্য নিয়েই এই প্রতিবেদন। আঠারো-উনিশ শতকেও বাঙালি সোনারূপো খেতেন। ভোজনরসিক বাঙালির ইতিহাস কিন্তু তাই বলছে। মান্না দে ১৯৬৯ সালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তনুজা অভিনীত বাঙালির প্রিয় ছবি ‘প্রথম কদম ফুলে’ মান্না দের কণ্ঠে ‘আমি শ্রি শ্রি ভজহরি মান্না, ইস্তাম্বুল গিয়ে, জাপান কাবুল গিয়ে শিখেছি সহজেই রান্না’ গানটি শুনলেই অনেকটা ধারনা করা যায় বাঙালির রসনা সম্পর্কে। মান্না দে প্রায় সময়েই দারুন সব রান্না করে বন্ধুবান্ধবদের খাওয়াতেন। বিবেকানন্দ বিবেকানন্দ এবং উনার ভাই মহেন্দ্র নাথ দত্ত প্রতিদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মটর শুটি আর দশ পনেরোটি পাঁঠার মাথা সেদ্ধ করে বিশেষ ধরনের তরকারি দিয়ে খান ষোল সতেরটা রুটি খেতেন। শুধু তাই নয়, বিবেকানন্দ বিদেশে যাওয়ার সময় নিজের তৈরি বিশেষ ধরনের মশলা সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। বিদেশীরা বিবেকানন্দের রান্না ভারতীয় খাওয়ার খেয়ে মুগ্ধ হয়ে যেতেন। বেলুড় মঠে, দক্ষিণেশ্বরেও তিনি নিয়মিত রান্না করতেন। বেলুড়ে উনি যেদিন দেহ রাখবেন সেদিনই গঙ্গায় উঠেছিল প্রথম ইলিশ। সেই ইলিশ মাছ দিয়েই পাত পেড়ে সেরেছিলেন সেদিনের দুপুরের খাওয়ার সবার সঙ্গে বসে। সিস্টার নিবেদিতাকে এর ঠিক তিনদিন পূর্বে বেলুড়ে ডেকে নিজের হাতে রান্না করে খাইয়েছিলেন। রবীন্দ্র নাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী সরলা ঘোষাল সহ আরও অনেককেই বিবেকনন্দ নিজের হাতের রান্না খাইয়েছেন। সবাই মুগ্ধ হয়ে যেতো সেই রান্না খেয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সময়ে কলকাতার আরেক সম্ভ্রান্ত পরিবার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। রবীন্দ্রনাথ এবং ঠাকুর পরিবারের বিভিন্ন তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায় পরিবারের প্রায় সকলেই ছিলেন খাদ্য রসিক। রবীন্দ্র নাথ প্রায়শই নতুন নতুন মেনু খুঁজে বেড় করতেন আর স্ত্রী মৃণালিনী দেবী সেই মেনু তৈরি করে খাওয়াতেন রবীন্দ্রনাথকে। শুধু তাই নয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে প্রায়ই বসতো বিদ্বজন সমাগম বা খামখেয়ালি সভা। সেই সভায় পরিবেশিত হতো সব মুখরোচক খাওয়ার। কবি পত্নী মৃণালিনী দেবী নিজে হাতে সেইসব রান্না বান্না করতেন। রবীন্দ্রনাথ আর মৃণালিনী দেবীর তৈরি দইয়ের মালপো, মানকচুর জিলাপির মতো অদ্ভুত খাবার খেয়ে নাকি অনেকেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো রাশভারী মানুষও নাকি খাদ্য রসিক ছিলেন। তিনি কয়েকজন অন্তরঙ্গ বন্ধুকে নিয়ে ‘ভোজন সভা’ নামে একটি সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। সংস্থায় জনা দশেক বন্ধু ছিলেন। এই সংস্থার বন্ধুরা হঠাৎ করেই দল বেঁধে কাউকে কিছু না জানিয়ে উপস্থিত হতেন আত্মীয় পরিজনদের বাড়িতে। এই ভোজন সভা’র নাম ছড়িয়ে পড়েছিল ঘনিষ্ঠ মহলে। তাই প্রত্যেকেই ভয়ে ভয়ে থাকতেন কখন এসে হাজির হয় বিদ্যাসাগর এবং উনার ভোজন সভার সদস্যরা। কাজী নজরুল এবং সাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তী প্রখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তী পুরোদমে স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে গেলেন। তিনি এতো রোগা-প্যাটকা ছিলেন যে, পুলিশের বিশ্বাসই হতোনা তিনি স্বদেশী। যদিও নিজেই শেষে আত্মসমর্পণ করেন। জেলে গিয়ে দেখা কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। ব্যাস আর যায় কোথায়! দুজনে মিলে আড্ডা, গান, কবিতায় মাতিয়ে রাখলেন পুরো জেল। সেই সময় জেলখানায় রাজবন্দীদের নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতেন নজরুল। নজরুলের হাতের মোঘলাই, বিরিয়ানি, পোলাও, কোর্মা, নানা রকমের কাবাব, কাটলেট, মাংসের চপ খেয়ে সব দুঃখ ভুলে চাঙ্গা হয়ে উঠতেন বন্দীরা। কাজীর খাবার খেয়ে নাকি পেল্লায় চেহারা হয়ে গিয়েছিল সাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তীর। তবে ভাতই বাঙালির সর্বাধিক প্রিয় খাবার ছিল। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর প্রিয় খাবার ছিল ডাল আর আলুসেদ্ধ। তবে তিনিও ছিলেন ভোজন রসিক। সোনা রুপো খাওয়া বাঙালি কিন্তু তাই বলে সোনা রুপা! বিদেশীরা উনিশ শতকের বিখ্যাত কুস্তিগীর যতীন্দ্রচরণ গুহ ওরফে গোবর গুহকে ‘গোল্ডইটার’ বলে ডাকতেন। সত্যিই সোনা খেতেন এই বিখ্যাত কুস্তীগির। গোহ। শৈশবে মসজিদবাড়ি স্ট্রিটের কুস্তির আখড়ায় কুস্তির মহড়া দিতে আসতেন বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে, স্বামী বিবেকানন্দ সহ আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। এই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কুস্তীগির, রাত তিনটেয় ঘুম থেকে উঠে পড়তেন। হাতমুখ ধুয়ে আড়াই হাজার বৈঠক দিতেন। সঙ্গে পাঁচশো ডন। ঘণ্টাখানেক শারীরিক কসরত। তার পর আখড়ায় নেমে মল্লবীরদের সঙ্গে কুস্তির মহড়া। মহড়ার শেষে গলায় নাল (নিরেট পাথরের একটা চাকা) ঝুলিয়ে ছোটাছুটি। কিছুটা বিশ্রামের পর দু’মনেরও বেশি এক জোড়া মুগুর ভাঁজা। বিকেল তিনটেয় আবার আখড়ায় গিয়ে ১৮০০ ডন। ডনের পর ডাম্বেল ভাঁজা, তার পর ২৫ সের ওজনের কোদাল দিয়ে মাটি কোপানো। পেল্লায় চেহারার, সুদর্শন, দীর্ঘকায়, বলশালী এই মল্লবীরের খাদ্যতালিকা শুনেই এখনকার যে কোনও বাঙালি চৈতন্য হারাতে পারেন। সকালে এক তাল বেনারসি আমলকির মোরব্বা, বাতাসা ও বেদানার গ্লাসভর্তি শরবত। তার পর সের দুই বাদামবাটার শরবত। দুপুরে দু’মুঠো ভাতের সঙ্গে দু’টুকরো মাছ। তার পর আধসের দুধের ক্ষীর। সন্ধে ও রাতের ফাঁকে ফাঁকে তিন সের খাঁটি গোদুগ্ধ। বিদেশিরা গোবর গোহকে চিনত ‘গোল্ডইটার’ নামে। বাস্তবিকই গোবর সোনা খেতেন। সোনা পিষে পাতলা ফিনফিনে পাতের মতো করে তবক বানিয়ে মুখে পুরতেন। এক ভরিতে চলত প্রায় এক মাস। রাত্তিরে শুধু খেতেন আখনি (ঘি, বাদাম, মাংস দিয়ে তৈরি এক ধরনের খাবার)। কয়েক সের মুরগি বা খাসির মাংস, দেড় সের বাদামবাটা, এক সের খাঁটি ঘি, কয়েকটা এলাচ এক সঙ্গে মিশিয়ে একটা হাঁড়িতে করে কাঠের উনুনে চাপানো হত সকাল সাড়ে সাতটায়। গুমো আঁচে মাংস গলানো হত বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। সন্ধে সাড়ে ছ’টায় এই খাবারই ছিল ডিনার। রাত্রি সাড়ে আটটায় শুতে যেতেন। খরচও হতো বিপুল পরিমাণে। এই গোবর গুহ’ই আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে প্রথম এশিয় হিসেবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের শিরোপা এনে দিয়েছিলেন। শুধু গোবর গুহ’ই নন। মল্লবীরেরা সেই সময়ে সোনা, রুপো ডাস্ট করে খেতেন। এখনও এ দেশের আন্তর্জাতিক মানের মল্লবীররা দৈনিক আট থেকে দশ কিলো দুধ খান। সঙ্গে ৫০০ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত ঘি প্রতি দিন। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ ভারতের কুস্তির ইতিহাস/ ঠাকুরবাড়ির রান্না/ সমসাময়িক পত্র পত্রিকা।