পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে থাকা চাঁদ কি লুকিয়ে থাকে? হ্যাঁ আমরা চাঁদের সবটা দেখতে পারিনা। আর এই রহস্য প্রথম আবিস্কার করেছিলেন কোন বিজ্ঞানী নয়, একজন শিল্পী। এই শিল্পীই এঁকেছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম ‘মোনালিসা’। শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিই হলেন প্রথম কোন ব্যক্তি যিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে চাঁদ আসলে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হচ্ছে না, বরং এর কিছু অংশ লুকানো থাকে। এই পৃথিবীর সবকিছুই আসলে অতীত। এই পৃথিবীতে সূর্যালোক এসে পৌঁছুতে সময় নেয় ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড। এই যে সূর্যকে আমরা দেখছি তাও আট মিনিট আগেকার তাই এই পৃথিবীতে সবকিছুই অতীত। বর্তমান বলে কিছুই নেই। আর আছে ভবিষৎ। চাঁদও রহস্যময়। ছোটবেলায় সব শিশুরাই কল্পনা করে চাঁদে বসে আছে এক বুড়ি, সেই বুড়ি সুতো কাটছে চরকায়। আবার চাঁদের পাহাড়ও বিখ্যাত। এই সবই কল্পনা। এখনও হাজারো রহস্য চাঁদকে নিয়ে। সূর্যের আলোকেই উজ্জ্বল চাঁদ। তাই সূর্যের কারণে কিন্তু অনেক সময় চাঁদের তাপমাত্রাও কমে যায়। একটু একটু করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে চাঁদ। এখনও নিরন্তর গবেষণা চলছে চাঁদকে নিয়ে। এই প্রতিবেদনে চাঁদের কিছু অজানা তথ্য আমরা জেনে নেবো। চাঁদের জন্ম প্রচলিত তত্ব অনুসারে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর পূর্বে সোলার সিস্টেম গঠিত হয়। এর কিছুকাল পরেই অনেকটা মঙ্গল গ্রহের মত আকৃতির একটি শিলাভূ-ত্বকের কঠিন অংশ পৃথিবীর সাথে সজোড়ে সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষেই ফলেই চাঁদের সৃষ্টি হয়। চাঁদের আকৃতি খালি চোখে আমরা যখন চাঁদকে দেখি তখন মনে হয় গোলাকৃতির এবং চ্যাপ্টা। আসলে কিন্তু তা নয়। চাঁদের আকৃতি আসলে ডিমের মতো। পৃথিবী থেকে আমরা সবসময়ই চাঁদের একই চেহারা দেখে থাকি। যদিও পৃথিবী ও চাঁদ উভয়ই নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরছে, তবুও চাঁদ (যতটুকুই দেখা যায়) সর্বদা একই রকম, কেননা অনেক আগেই পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব চাঁদের নিজস্ব কক্ষপথের ঘূর্ণনকে ধীরগতির করে দিয়েছে। তাই এর অরবিটাল পিরিয়ড ও রোটেশন পৃথিবীর সাথে মোটামুটি মিলে যাওয়ায় চাঁদের ‘ছবি’(অমাবস্যা পূর্ণিমার ব্যাপার ভিন্ন) আর পরিবর্তিত হয়না। আমরা যখন চাঁদের দিকে তাকাই তখন কিন্তু এর ছোট দুই প্রান্তের কোন একটিকে দেখতে পাই। চাঁদের ভরের কেন্দ্র ঠিক এর জ্যামিতিক কেন্দ্রে অবস্থিত নয়। এটি জ্যামিতিক কেন্দ্র থেকে ১ দশমিক ২ মাইল দূরে। আমরা যখন চাঁদের দিকে তাকাই তখন এর ৫৯ শতাংশ মাত্র আমরা দেখতে পাই। পৃথিবী থেকে চাঁদের বাকি ৪১ শতাংশ কখনোই দেখা যায় না। চাঁদের লুকিয়ে থাকা ওই ৪১ শতাংশের উপরে গিয়ে দাঁড়ালে কিন্তু সেখান থেকে এই পৃথিবীকে দেখতে পাওয়া যাবে না। দুর্যোগপূর্ণ চাঁদে কি জনবসতি সম্ভব? আজকাল প্রায়ই শোনা যায় অনেকেই চাঁদে মাটি কিনে রাখছে। হয়তো মানুষ একদিন চাঁদে বসতিও গড়বে। কিন্তু চাঁদের প্রকৃতি কিন্তু যথেষ্ট দুর্যোগপূর্ণ। চাঁদে মাঝে মাঝেই ভূমিকম্প হয়। এগুলো ‘মুনকোয়াক’ নামে পরিচিত। লুনার নাইট সিজনে চন্দ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা -১৮০ ডিগ্রী সেলসিয়াস ( যা অত্যন্ত শীতল) পর্যন্ত নেমে যায়। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ যখন পৃথিবীর ছায়ার ভেতরে চলে যায় তখন চন্দ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দেড় ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ৫০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটও কমে যেতে পারে। আবার কখনো কখনো এর আবহাওয়া বেশ উত্তপ্তও হয়ে ওঠে। বলাই বাহুল্য, মানুষের বসবাসের জন্য চাঁদ উপযোগী নয়। তবে বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টা জারী রয়েছে। একদিন হয়তো মানুষ সত্যিই চাঁদে বসতি গড়বে। চাঁদের উজ্জ্বলতা এবং গতি সূর্য একটি পূর্ণ চাঁদের চেয়েও ১৪ গুণ মাত্রায় বেশি উজ্জ্বল। সূর্যের মতো সমান উজ্জ্বলতায় জ্বলতে হলে প্রায় চার লাখ পূর্ণ চাঁদের প্রয়োজন। চাঁদের কারণে পৃথিবীর গতি ধীর হয়। চাঁদ যখন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে চলে আসে, তখন জোয়ারের সৃষ্টি হয়। নতুন কিম্বা ফুল মুনের পরপরই এরকম হয়ে থাকে। ব্লু মুন বা নীল চাঁদ ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্নুৎপাতের পর ১৮৮৩ সালে 'ব্লু মুন' বা নীল চাঁদের পরিভাষার উৎপত্তি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সেই সময় অগ্নুৎপাতের ফলে বায়ুমণ্ডলে এতো বেশি ধুলো এবং ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছিল যে মানুষ যখন পৃথিবী থেকে চাঁদের দিকে তাকিয়েছিল তখন চাঁদকে দেখতে নীল মনে হয়েছিল। আর এ থেকেই তৈরি হয়েছে 'ওয়ান্স ইন এ ব্লু মুন' কথাটি। বিরল কোন ঘটনা বলতে আজকাল প্রায়ই এই বাক্যটি ব্যবহার করা হয়। এ স্টাডি অফ লুনার রিসার্চ ফ্লাইটস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একবার সত্যিই সত্যিই চাঁদের উপর পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণের ভাবনা চিন্তা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করা। বিশেষ করে পৃথিবীর ক্ষমতাধর দেশগুলিকে ভয় দেখানো। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অত্যন্ত গোপনীয় এই পরিকল্পনার নাম ছিল 'এ স্টাডি অফ লুনার রিসার্চ ফ্লাইটস' অথবা 'প্রজেক্ট এ-১১৯।' চাঁদ পনিরের খনি রহস্যময় চাঁদকে নিয়ে নানা রূপকথা আছে। মানুষের বিশ্বাস, ধর্ম, শিল্পে চাঁদের অনেক প্রভাব। চাঁদের আরও অনেক কিছুই আছে যা এখনও আমাদের অজানা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ১৯৮৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় এনিয়ে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। তাতে দেখা গেছে সেই সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৩ শতাংশই বিশ্বাস করেন যে চাঁদ পনির দিয়ে তৈরি। মুন-ট্রি বা চাঁদের গাছ পৃথিবীর বুকে থাকা ৪০০’র বেশি গাছ এসেছে চাঁদের মাটি থেকে! আসলে ব্যাপারটি হচ্ছে, ১৯৭১ সালে অ্যাপোলো ১৪ মিশনে নভোচারী স্টুয়ার্ট রোসা প্রায় ৫০০’র মত উদ্ভিদের বীজ সাথে করে চাঁদে নিয়ে যান এবং লুনার সার্ফেসে রোপণ করেন। পরে সেগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে অঙ্কুরিত করা হয়। গাছগুলো এখনো বেঁচে আছে। এগুলো ‘মুন ট্রি’ নামে পরিচিত। চন্দ্রগ্রহণ কিম্বা সূর্যগ্রহণ সূর্য এবং পৃথিবীর মাঝে চাঁদ এসে পড়লে অথবা সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে চাঁদ এসে দাঁড়ালে তখন সূর্য বা চাঁদের আলো সাময়িকভাবে ম্লান হয়ে যায়। একে বলা হয় চন্দ্রগ্রহণ কিম্বা সূর্যগ্রহণ। চাঁদ-ই পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ আমরা অনেকেই হয়ত ভেবে থাকি যে, চাঁদ হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ (ন্যাচারাল স্যাটেলাইট); কিন্তু ১৯৯৯ সালে বিজ্ঞানীরা একটি ৫ কিলোমিটার প্রশস্ত গ্রহাণু আবিষ্কার করেন যেটি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণে ধৃত হয়ে আরেকটি ‘চাঁদে’ রূপ নিতে পারে। পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে চাঁদ প্রতিবছর পৃথিবী থেকে কিছুটা রোটেশনাল এনার্জি নিয়ে নেয় চাঁদ। ফলে নিজস্ব কক্ষপথে বছরে ৩ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার উপরে চলে যাচ্ছে চাঁদ। গবেষকরা জানিয়েছেন, সৃষ্টিলগ্নে পৃথিবী থেকে ২২ হাজার ৫৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল চাঁদ। কিন্তু এটি এখন ৪ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার দূরে চলে গেছে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ সমসাময়িক সাইন্স জার্নাল এবং উইকিপিডিয়া।