পৃথিবী থেকে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪ শত ২ কিলোমিটার দূরে চাঁদের অবস্থান। চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র স্থায়ী প্রাকৃতিক স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ। চাঁদ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল এ নিয়ে অনেক মতবাদ আছে। প্রায় ৪ দশমিক দুই বিলিয়ন বছর পূর্বে যখন পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহের সংঘর্ষ হয়েছিল তখন সংঘর্ষের ধংসাবশেষ থেকে চাঁদের উৎপত্তি ঘটে। চাঁদের উৎপত্তি সম্পর্কে এই মতবাদই সবচেয়ে বেশি গৃহীত। চাঁদ প্রায় ২৮ দিনে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিন করে। এজন্যই পৃথিবীর প্রায় সকল প্রান্তেই ১৪ দিন জোছনা থাকে বাকি দিনগুলো থাকে অমাবস্যা। চাঁদের এই সুন্দর আলো যদিও চাঁদের নয় বরং চাঁদ সূর্যের আলো প্রতিফলন করে। যদি চাঁদ না থাকত? যদি চাঁদ না থাকত তবে আমাদের পৃথিবী রাতের বেলায় পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যেত। এ কারণে ঘুমের অভ্যাসেও কিছুটা পরিবর্তন আসত। অনেক ছোট ছোট নিশাচর প্রাণী পথ হারাতো। অভিযোজনে অক্ষম হয়ে এইসব নিশাচর ছোট প্রাণীদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যেত। সামুদ্রিক বড় ঢেউ সৃষ্টির পিছনে পৃথিবীর উপর চাঁদের অভিকর্ষ কাজ করে। এই অভিকর্ষের কারণে সমুদ্রের কিছু অংশের জল ফুলে উঠে যা পরবর্তীতে বাতাসের প্রভাবে বড় ঢেউ এ রূপান্তরিত হয়। এই ঢেউ থেকেই সাগরের জল প্রবাহিত হয়। সৃষ্টি হয় জোয়ার ভাঁটার। চাঁদ না থাকলে বাতাসের প্রভাবে ঢেউ এর সৃষ্টি হলেও তা বর্তমানের ঢেউয়ের আকৃতির থেকে অনেক ছোট হত। ফলে সমুদ্রের জলের প্রবাহ কমে যেত। যে কারণে সামুদ্রিক প্রাণীদের খাদ্যের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যেত। ফলে অস্ত্বিত্ব থাকত না অনেক সামুদ্রিক প্রাণীরই। সমুদ্রের ইকোসিস্টেম পুরোপুরি ভিন্ন হত। যে কারণে আমাদের খাদ্য সমস্যায় পড়তে হত। তাছাড়াও জাহাজ করে সমুদ্র ভ্রমন কিংবা সমুদ্রের সাহায্যে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পরিবহন প্রায় অসম্ভব হত। সম্ভব হলেও তা হত অনেক ধীর গতিতে। ঢেউ না থাকলে তার প্রভাব সামুদ্রিক আবহাওয়াই পরিবর্তন দেখা যেত। মেরু অঞ্চলের জল পুরোপুরি বরফ হয়ে যেত। ফলে মেরু তীরবর্তী অঞ্চলগুলোর তাপমাত্রা আরো কম হত। যা কোনো প্রাণীর টিকে থাকার জন্য প্রায় অসম্ভব হত। ফলে পরিবর্তন হত পৃথিবীর আবহাওয়া। মেরু তীরবর্তী অঞ্চলে অতিরিক্ত শীত ও পৃথিবীর অক্ষরেখার মধ্যভাগের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া পরিবর্তিত হয়ে প্রচন্ড উষ্ণতে রূপান্তরিত হত। এ কারণে চাঁদ না থাকলে ঋতু পরিবর্তন বন্ধ হত এবং অবস্থান অনুযায়ী পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ঋতুই সারা বছর ধরে চলত। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে প্রায় ৩৬৫ দিনে এক বার প্রদক্ষিন করে। এই সময়কেই আমরা বছর হিসেবে ধরে থাকি। পৃথিবীর এই ঘূর্ণন বা অবস্থান পরিবর্তনের সময় পৃথিবীতে চাঁদের অভিকর্ষও কাজ করে। ফলে পৃথিবীকে নিজের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের অভিকর্ষও বহন করে প্রদক্ষিন করতে হয়। যে কারণে পৃথিবীর প্রদক্ষিনের সময়ও বেড়ে যায়। যদি চাঁদ না থাকত তবে পৃথিবীর ঘূর্ননের হার তথা প্রদক্ষিনের সময় কমে আসত। ফলে পরিবর্তিত হত পৃথিবীর সময়। দিনের স্থায়ীত্ব হত ৬ থেকে ৭ ঘন্টা এবং রাতগুলো দীর্ঘ হত। এ কারণে মানুষের কাজ করার সময় ও কমে আসত। তাছাড়াও কমে আসত এক বছরের স্থায়ীত্ব। একই সঙ্গে পৃথিবীর ঘূর্ণন বেড়ে গেলে পৃথিবীতে বাতাস এর গতিও বেড়ে প্রায় সব সময়ই টর্নেডোর গতির সমান হত। বাতাসের ঐ গতিতে বিলুপ্ত হত সব পাখি। মানুষ থেকে শুরু করে অন্যান্য জীবজন্তুর টিকে থাকাও প্রায় অসম্ভব হয়ে যেত। শুধুমাত্র বড় গাছপালাই টিকে থাকতে পারত। এভাবেই চাঁদ না থাকলে পৃথিবীতে প্রানের অস্তিত্বই প্রায় অসম্ভব হয়ে যেত। চাঁদের খনিজ কক্ষপথ থেকে গৃহীত চিত্র অনুযায়ী অঙ্কিত ভূরাসায়নিক মানচিত্র ইঙ্গিত করে চাঁদের ভূত্বক প্রধানত অ্যানর্থোসাইটিক উপাদানে গঠিত। চাদের ভূত্বকের প্রধান মৌলগুলি হল, অক্সিজেন, সিলিকন, ম্যগনেসিয়াম, লোহা, ক্যালসিয়াম ও অ্যালুমিনিয়াম। এছাড়াও টাইটানিয়াম, ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, পটাসিয়াম এবং হাইড্রোজেনও পাওয়া যায়। ভুপদার্থ বিজ্ঞানীদের মতে চাঁদের ভুপৃষ্ঠ গড়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পুরু বলে অনুমান করা হয়। চাঁদের বায়ু মণ্ডল কুবি পাতলা, হাইড্রোজেন, নিয়ন এবং আরগনের একটি পাতলা স্তর। তবে এই স্তরে অক্সিজেন টিকে থাকার মতো বায়বীয় অবস্থায় নেই। চাঁদে অক্সিজেনের পরিমাণ কিন্তু নেহাত কম নয়। তবে এই অক্সিজেন বায়বীয় অবস্থায় নেই। চাঁদের পৃষ্ঠে পাথর এবং ধুলোর মধ্যে চাপা পড়ে আছে এই অক্সিজেন। চাঁদের ভূত্বকের আংশিক গলনের ফলে চন্দ্রপৃষ্ঠে মেয়ার ব্যাসাল্টের উদ্গীরণ ঘটেছে। এই ব্যাসাল্টের বিশ্লেষণের ফল ইঙ্গিত করে যে, চাঁদের ভূত্বক প্রধানত খনিজ অলিভাইন, অর্থোপাইরক্সিন ও ক্লাইনোপাইরক্সিন দ্বারা গঠিত। এবং পৃথিবীর ভূত্বকের তুলনায় অনেক বেশী লৌহ সমৃদ্ধ। চন্দ্রপৃষ্ঠের থেকে ১০০০ কিলোমিটার ভূত্বকের গভীরে চন্দ্রকম্পের ঘটনা ঘটে। এর সঙ্গে পৃথিবীতে জোয়ারভাটার সম্পর্ক রয়েছে। এই ঘটনা প্রতি মাসেই ঘটে থাকে। সবকিছু মিলিয়ে চাদ এখনও রহস্যে ভরা। বিজ্ঞানীরা এখনও প্রতিনিয়ত পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন চাদের রহস্য উন্মচনে। চাঁদের অক্সিজেনে ৮০০ কোটি মানুষের ১ লক্ষ বছর কেটে যাবে! শুধু মহাকাশের অজানা রহস্যের অনুসন্ধানই নয়, বর্তমানে মহাকাশযাত্রার আরও একটি দিক ক্রমশ ফুটে উঠছে। আর কিছু নয়, এই বিষাক্ত পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোথাও যদি মানুষের বসতি গড়ে তোলা যায়! তবে তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন অক্সিজেন (Oxygen)। আর পৃথিবীর বাইরে এই একটি জিনিসেরই বিশেষ অভাব। তবে একটা কথা প্রায় বলাই হয় না, আমাদের উপগ্রহ চাঁদের বুকেই কিন্তু রয়েছে অক্সিজেনের বিরাট সম্ভার। আর সেই অক্সিজেনে অন্তত ৮০০ কোটি মানুষের ১ লক্ষ বছর চলে যাবে। তবে এই অক্সিজেন ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটু সমস্যা আছে। আর সেই সমস্যার সমাধানের রাস্তা খুঁজতেই এবার জোট বেঁধেছে নাসা এবং অস্ট্রেলিয়ান স্পেস এজেন্সি। চাঁদের বায়ুমণ্ডলে যে অক্সিজেন নেই, এ-কথা তো সকলেরই জানা। সেখানে মূলত হাইড্রোজেন রয়েছে। আর আছে আর্গন, ক্রিপ্টন, জেননের মতো কিছু গ্যাস। তবে গ্যাসীয় অবস্থায় না থাকলেও বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন রয়েছে চাঁদে। আর তা রয়েছে চাঁদের পাথরে বিভিন্ন ধাতুর সঙ্গে যৌগবদ্ধ অবস্থায়। চাঁদের পাথর এবং ধুলোর মূল উপাদানই হল অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকা এবং ম্যাগনেশিয়ামের বিভিন্ন অক্সাইড। ঠিক পৃথিবীর মাটিতেও যেমন দেখা যায়। তবে আমাদের এই অক্সিজেনের জন্য নির্ভর করতে হয় না। খনি থেকে অ্যালুমিনিয়ামের অক্সাইড তোলার পর ইলেক্ট্রোলাইসিস প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধ অ্যালুমিনিয়াম নিষ্কাশন করা হয়। এই সময় গ্যাসীয় অক্সিজেন বেরিয়ে আসে। তবে আমাদের কাছে এতদিন অ্যালুমিনিয়ামই ছিল মূল পদার্থ। অক্সিজেন ছিল বাই-প্রোডাক্ট। চাঁদের মাটিতে বিষয়টা উলটে যেতে পারে। তবে একটি সমস্যা থেকেই যায়। ইলেক্ট্রোলাইসিস প্রক্রিয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন। নানা ধরনের ভারী যন্ত্রপাতিরও প্রয়োজন। চাঁদের বুকে সেইসব যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া একটি সমস্যা। তার চেয়েও বড়ো সমস্যা, এই অক্সিজেনকে ধরে রাখার মতো অভিকর্ষ শক্তি চাঁদের নেই। আর সবসময় মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরে ঘুরে বেড়ানো তো সম্ভব নয়। তবে আজকের রকেট সায়েন্সের যুগে এসব নেহাৎই মামুলি সমস্যা। বিভিন্ন দেশের স্পেস এজেন্সি আর নাসার যৌথ চেষ্টায় এবার তার সমাধান হয়ে যায় কিনা, সেটাই এখন দেখার। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ সমসাময়িক সাইন্স জার্নাল এবং উইকিপিডিয়া।