কৃষ্ণগহ্বর বা কৃষ্ণ বিবর যা ব্ল্যাক হোল নামেও পরিচিত, এক কথায় মহাকাশের এক রাক্ষুসে এবং ভয়ংকর অন্ধকূপ। সব কিছুকে গিলে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এমনকি আলোকেও গিলে ফেলে এই ব্ল্যাক হোল। ‘ব্ল্যাক হোল’ বা ‘কৃষ্ণগহ্বর’ হচ্ছে মহাকাশের এমন একটি অংশ যার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এতই প্রখর যে তার হাত থেকে কোন কিছুই - পালাতে পারে না, এমনকি আলোর রশ্মিও। এর নাম গহ্বর বলা হলেও আসলে এটা ফাঁকা নয়। বরং এর ভেতরে খুব ছোট একটি জায়গায় বিপুল পরিমাণ পদার্থ জমাট বেঁধে আছে। তার ফলেই এর মহাকর্ষ শক্তি এত জোরালো। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি বৃত্তাকার কালো আভার চারদিকে এক উজ্জ্বল আগুনের বলয়। এ্যান্টার্কটিকা, স্পেন ও চিলির মতো পৃথিবীর নানা প্রান্তে বসানো আটটি রেডিও টেলিস্কোপের এক নেটওয়ার্ক দিয়ে এই ছবি তোলা সম্ভব হয়। প্রকৃতপক্ষে এই স্থানে সাধারণ মহাকর্ষীয় বলের মান এত বেশি হয়ে যায় যে এটি মহাবিশ্বের অন্য সকল বলকে অতিক্রম করে। ফলে এ থেকে কোন কিছুই পালাতে পারে না। অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রথম তৎকালীন মহাকর্ষের ধারণার ভিত্তিতে কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বের বিষয়টি উত্থাপিত হয়। কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের এমন একটি বস্তু যা এত ঘন সন্নিবিষ্ট বা অতি ক্ষুদ্র আয়তনে এর ভর এত বেশি যে এর মহাকর্ষীয় শক্তি কোন কিছুকেই তার ভেতর থেকে বের হতে দেয়না। এমনকি তড়িৎ চুম্বকীয় বিকিরণকেও যেমন আলোকেও গিলে ফেলে। কৃষ্ণগহ্বর আসলে কি? সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারে, কৃষ্ণগহ্বর মহাকাশের এমন একটি বিশেষ স্থান যেখান থেকে কোন কিছু, এমনকি আলো পর্যন্ত বের হয়ে আসতে পারে না। এটা তৈরি হয় খুবই বেশি পরিমাণ ঘনত্ব বিশিষ্ট ভর থেকে। কোন অল্প স্থানে যদি খুব বেশি পরিমাণ ভর একত্র হয় সেটা আর স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে পারে না। আমরা মহাবিশ্বকে একটি সমতল পৃষ্ঠে কল্পনা করি। মহাবিশ্বকে চিন্তা করা যাক একটি বিশাল কাপড়ের টুকরো হিসেবে এবং তারপর যদি সেই কাপড়ের উপর কোন কোন স্থানে কিছু ভারী বস্তু রাখা হয় তাহলে দেখা যায় যেইসব স্থানে ভারি বস্তু রয়েছে সেইসব স্থানের কাপড় একটু নিচু হয়ে গিয়েছে। এই একই বাপারটি ঘটে মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে। যেসব স্থানে ভর অচিন্তনিয় পরিমাণ বেশি সেইসব স্থানে গর্ত হয়ে আছে। এই অসামাণ্য ভর এক স্থানে কুন্ডলিত হয়ে স্থান-কাল বক্রতার সৃষ্টি করে। প্রতিটি গালাক্সির স্থানে স্থানে কম-বেশি কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিতের কথা জানা যায়। সাধারণত বেশীরভাগ গ্যালাক্সিই তার মধ্যস্থ কৃষ্ণগহ্বরকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণয়মান। কৃষ্ণগহ্বর শব্দের অর্থ কৃষ্ণগহ্বর শব্দের অর্থ কালো গর্ত। একে এই নামকরণ করার পেছনে কারণ হল এর নিজের দিকে আসা সকল আলোক রশ্মিকে শুষে নেয়। কৃষ্ণগহ্বর থেকে কোন আলোক বিন্দুই ফিরে আসতে পারে না ঠিক থার্মোডায়নামিক্সের কৃষ্ণ বস্তুর মতো। অনেকদিন পর্যন্ত কৃষ্ণগহ্বরের কোন প্রত্যক্ষ খোঁজ বা ছবি, তথ্য ইত্যাদি পাওয়া যায়নি। কারণ এর থেকে আলোক রশ্মি বিচ্ছুরিত হতে পারে না। যেকারণে একে দেখা সম্ভব নয়। কিন্ত ব্ল্যাক হোলের উপস্থিতির প্রমাণ আমরা পরোক্ষভাবে পেয়েছিলাম। কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিতের প্রমাণ কোন স্থানের তারা নক্ষত্রের গতি এবং দিক দেখে পাওয়া যায়। মহাকাশ নিয়ে গবেষণা শেষে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা ১৬ বছর ধরে আশে-পাশের তারামন্ডলীর গতি-বিধি পর্যবেক্ষণ করে গত ২০০৮ সালে প্রমাণ পেয়েছেন অতিমাত্রার ভর বিশিষ্ট একটি কৃষ্ণগহ্বরের যার ভর আমাদের সূর্য থেকে ৪ মিলিয়ন গুন বেশি এবং এটি আমাদের আকাশগঙ্গার মাঝখানে অবস্থিত। প্রথম ব্ল্যাক হোল ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সালে লাইগো সংগঠন মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রথম ব্ল্যাক হোল এর ঘোষণা দেয়। যা ছিল দুটি ব্ল্যাক হোলের একসাথে মিশে যাওয়ার ঘটনা। এরও তিন বছর পরে দীর্ঘ বিশ্লেষণ শেষে ১০ এপ্রিল ২০১৯ সালে প্রথমবার একটি ব্ল্যাক হোলের এবং তার আশপাশের ছবি জনসমক্ষে নিয়ে আসেন বিজ্ঞানীরা। এমএইটসেভেন নামে একটি বহুদূরবর্তী গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের মধ্যে এটি পাওয়া গেছে। পৃথিবী থেকে এই ব্ল্যাক হোল ৫০ কোটি ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে, এবং এটার ভর (এর মধ্যেকার পদার্থের পরিমাণ) সূর্যের চাইতে ৬৫০ কোটি গুণ বেশি। ব্ল্যাক হোলটি এতই বড় যে এটাকে একটা ‘দানব’ বলে বর্ণনা করছেন বিজ্ঞানীরা। এর উজ্জ্বলতা ওই ছায়াপথের সব তারা মিলে যত ঔজ্জ্বল্য হবে তার চাইতেও বেশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দানবাকৃতির এই ব্ল্যাক হোল পৃথিবী যে সৌরজগতের অংশ, তার চাইতেও বড়। এ মাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত এর আয়তন ৪ হাজার কোটি কিলোমিটার। যা পৃথিবীর চাইতে ৩০ লক্ষ গুণ বড়। ‘এ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’-এ এই আবিষ্কারের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে। আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ১৯১৫ সালে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব জন সমক্ষে নিয়ে আসেন। যদিও এর আগেই আলোর গতিকে মধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রভাবিত করতে পারার ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়েছিল। কয়েক মাস পরে কার্ল শোয়ার্জসচাইল্ড, ‘আইনস্টাইন ফিল্ড ইকুয়েশনের’ একটি সমাধান বের করেন যেটি বিন্দু ভর এবং গোলীয় ভরের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বর্ণনা করে। এরপর বিজ্ঞানী হেন্ডরিক লরেঞ্জের ছাত্র জোহাননেস ড্রোস্ট স্বাধীনভাবে বিন্দু ভরের ক্ষেত্রে একই সমাধান প্রদান করেন এবং এর ধর্ম এবং লক্ষণ গুলি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত প্রকাশ করেন। এই সমাধানের একটি বিচিত্র আচরণ ছিল। সাধারণ আপেক্ষিকতার মতে বলা যায় "প্রত্যাবর্তনের শেষ বিন্দু" যেখানে মধ্যাকর্ষন টান এতই শক্তিশালী হয় যে, কোন কণার পক্ষে আর দূরে যাওয়া সম্ভব হয় না। কৃষ্ণগহ্বরের গঠন স্বাভাবিকভাবে কোনো একটি নক্ষত্র চুপসে গেলে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়। তবে নক্ষত্রগুলোর ভর হয় অনেক। আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সূর্যের বিস্তৃতি প্রায় 1.3×10⁹ km এবং এর ভর প্রায় 2×10³⁰ kg এর কাছাকাছি। নক্ষত্রগুলোর অস্বাভাবিক ভরের জন্য এদের মধ্যাকর্ষণও অনেক। কেননা আমরা জানি মধ্যাকর্ষনের সাথে ভরের একটি অনন্য সম্পর্ক রয়েছে। যখন নক্ষত্রের বাইরের তাপমাত্রার চাপে ভেতরের মধ্যাকর্ষন বাড়তে থাকে, তখন সেই বলের কারণে নক্ষত্র চুপসে যেতে শুরু করে। সব ভর একটি বিন্দুতে পতিত হতে শুরু করে। এটি ধীরে ধীরে ছোট এবং অধিক ঘনত্বে আসতে শুরু করে এবং এক সময় সমস্ত ভর একটি ছোট্ট বিন্দুতে ভিড় করে যার নাম সিঙ্গুলারিটি। সব চুপসে পড়া নক্ষত্রই কিন্তু কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়না। কৃষ্ণগহ্বর হবে কিনা তা নির্ভর করে তার ভরের উপর। ব্ল্যাক হোলের প্রকারভেদ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তিন ধরনের কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোলকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন।সেগুলো হলোঃ স্টিলার ব্ল্যাক হোল(Stellar black holes), সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল(Supermassive black holes) এবং ইন্টারমিডিয়েট ব্ল্যাক হোল(Intermediate black holes)। ১. স্টিলার ব্ল্যাক হোল(Supermassive black holes)- যখন একটি বড় তারার ধ্বংস হয় তখন স্টিলার ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হয়।স্টিলার ব্ল্যাক হোল তার চারপাশে থাকা যেকোন পদার্থ, গ্যাস এবং গ্যালাক্সি-কে নিজের দিকে টেনে নেয়, এরফলে এটি ধীরে ধীরে আরও বড় হতে থাকে। ২. সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল(Supermassive black holes)- সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল হলো একসাথে অনেকগুলো ছোট ছোট ব্ল্যাক হোলের সমষ্টি।এর জন্য গ্যাসের মেঘ অনেকাংশে দায়ী।এটির বৃহৎ অংশ অন্ধকার পদার্থ (Dark Matter) দিয়ে তৈরি। ৩. ইন্টারমিডিয়েট ব্ল্যাক হোল(Intermediate black holes)- বিজ্ঞানীরা ভাবতো ব্ল্যাক হোল হয়তো বড় হবে না হলে ছোট। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য থেকে এই ধারণা পাওয়া গেছে যে, মাঝারি সাইজের ব্ল্যাক হোলও হতে পারে, যাকে ইন্টারমিডিয়েট বলা হয়। যদি চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে কোনো ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হয় তাহলে সেটা হবে ইন্টারমিডিয়েট ব্ল্যাক হোল। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ বিবিসি, উইকিপিডিয়া, ‘এ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’। ছবি সৌজন্যেঃ ‘এ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’