মানুষ ঠিক কবে থেকে আধুনিক পোশাক পড়তে শুরু করেছিল সেই সম্পর্কিত কোন নির্দিষ্ট তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে প্রাচীন মূর্তি এবং বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থে বস্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। তারও আগে মানুষ খুব সম্ভবত গাছের ছাল, পাতা, পশুর চামড়া ইত্যাদি দিয়ে নিজের শরীর বাঁচাত প্রচণ্ড শীতের মধ্যে তবে প্রাচীন যুগের পর্বত গাত্রে যে সমস্ত গুহা চিত্র রয়েছে সেগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক মানুষ পোশাক সেলাই করার কৌশল এমনকি সূচ বা ঐজাতীয় সরঞ্জাম তারা আবিস্কার করেছিল। তবে আধুনিক এই সিল্ক, সূতি, পলেস্টার, লিনেন, জিন্স ইত্যাদি আবিস্কার হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে এই পোশাক শিল্পেও এসেছে অনেক উন্নতি। প্রকৃতি দিয়েছে পোশাক তৈরীর নানা উপাদান। এসব উপাদানের মধ্যে সিল্ককে অন্যতম একটি উপাদান হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। সিল্কের তৈরী কাপড় বা অন্যান্য বস্তু আদিতেও যেমন নিজের গৌরব নিয়ে মাথা উঁচু করে থাকতো, আধুনিক সময়েও তার সেই গৌরব অক্ষতই আছে। সিল্কের উৎপত্তি সিল্কই প্রকৃতি প্রদত্ত একমাত্র সুতা, খুব সূক্ষ্মভাবে বলতে গেলে ফাইবার বা আঁশ যা অবিচ্ছিন্ন। সাধারণত তুলা বা কটন (Cotton), হেম্প (Hemp), লিনেন (Linen) বা ঊল (Wool) যে ফাইবারের কথাই বলি না কেন, সকলেরই একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য আছে যা তুলনায় অনেক ছোট। পাঁট থেকে প্রাপ্ত ফাইবারও কিছুটা দীর্ঘ হয়ে থাকে, কিন্তু সেটাও সিল্কের তুলনায় কিছুই নয়। ঔজ্জ্বল্যের দিক থেকেও সিল্কের খ্যাতি আছে অনেক। ফলে প্রকৃতি প্রদত্ত ফাইবারসমূহের মধ্যে সিল্ক এখনও অন্যতম এবং আকর্ষণীয়। সিল্কের আবির্ভাব সিল্কের উৎপত্তিস্থল হিসেবে চীনের কথাই ইতিহাসে বলা আছে। তাও প্রায় নব্য প্রস্তর যুগের (New Stone Age) শেষের দিকে। সিল্কের প্রাচীনতম নিদর্শন থেকে ধারণা করা হয় যে এটি পাওয়া যেত আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৪,০০০ অব্দে চীনের ইয়াংশাও সংস্কৃতির সময়ে। একই সময়ে প্রিমিটিভ লুমের ভগ্নাবশেষও পাওয়া গিয়েছিলো। এখন পর্যন্ত পাওয়া সিল্কের প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে পাওয়া গিয়েছে সিল্কের তৈরী কাপড় যা দিয়ে শিশুকে জড়িয়ে রাখা হত। কার্বং ডেটিং অনুসারে এর সময় পাওয়া গিয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৬৩০ অব্দের দিকে। পরবর্তীতে শ্যাং রাজবংশের বিভিন্ন রাজা রানীদের কবর খুঁড়ে সিল্কের আরো বহু নিদর্শন পাওয়া যায়। সিল্কের দেবী স্ম্রাজ্ঞী সাই লিং শি চীনের বিখ্যাত দার্শনিক কনফুসিয়াস এর রচনা থেকে এবং চীনের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় যে, চীনের সম্রাট হুয়াং তাই যিনি ইয়েলো এম্পেরর নামেও পরিচিত ছিলেন, উনার সময়েই সিল্কের আবিস্কার। সম্রাটের স্ত্রী সম্রাজ্ঞী সাই লিং শি-র হাতেই সর্বপ্রথম আশ্চর্যজনকভাবে এবং অজান্তেই সিল্কের আবিষ্কার হয়। গল্পটা জেনে নেয়া যাক। একদিন সম্রাজ্ঞী লিং শি বাগানে বেড়ে ওঠা তুঁত গাছের নিচে বসে নিরিবিলি চা পান করছিলেন। এমন সময় গাছ হতে রেশম পোকার কোকুন এসে পড়ে তার গরম চায়ে। যখন কোকুনটি তিনি তুলতে চেষ্টা করেন তখনই ঘটে আসল ঘটনা। সম্রাজ্ঞী অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে, আস্তে আস্তে কোকুনের পাক খুলতে শুরু করেছে এবং তিনি এক সময় অবাক হয়ে দেখেন যে, কোকুন থেকে দ্যুতিময়ী সুতা সদৃশ পদার্থ বেরিয়ে আসছে। ছবিঃ তুঁত পাতা ভক্ষণরত রেশম মথ ও কোকুন। যদিও তিনি প্রথমে জানতেন না যে, সেগুলো কিভাবে এলো। তিনি এর রহস্য খুঁজতে শুরু করলেন তুঁত গাছে এবং আবিষ্কার করলেন এই কোকুনের রহস্য। তুঁত গাছে বাসা বেঁধেছিলো অসংখ্য রেশমপোকা, যার বৈজ্ঞানিক নাম Bombyx mori । তাদের তৈরী কোকুন থেকেই রাণী সর্বপ্রথম খোঁজ পেলেন সিল্ক নামক সুতার এবং তিনিই প্রথম শুরু করলেন রেশম চাষ যাকে কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় এখন বলা হয়ে থাকে সেরিকালচার (Sericulture)। এভাবেই সম্রাজ্ঞী লিং শি এর হাত ধরে সিল্কের যাত্রা শুরু হল। এইজন্যে সম্রাজ্ঞী সাই লিং শি কে চীন পুরাণে সিল্কের দেবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। এই কাহিনী বাস্তব না অবাস্তব সেটা নিয়ে গবেষকদের মতবিরোধ আছে। কিন্তু তাঁরা এটা নিশ্চিত করেছেন যে, সিল্কের উৎপত্তি চীনেই হয়েছে এবং চীন প্রায় ৩ সহস্রাব্দ পর্যন্ত সিল্ক তৈরির এই তথ্যকে গোপন করে রেখেছিলো এবং সিল্ক ব্যবসাকে বাইরের দেশে প্রকাশ করে নি। অনেকটা একচেটিয়াভাবেই তারা সিল্ক উৎপাদন করতো। সিল্কের ব্যবহার প্রথমদিকে সিল্কের তৈরী কাপড় ছিলো আভিজাত্যের প্রতীক। কারণ তখন কেবল সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজনই সিল্কের কাপড় ব্যবহার করতো। রাজপরিবারে সিল্কের কাপড় পরিধানের ব্যবস্থা ছিলো রঙের ভিত্তিতে। অর্থাৎ রাজা বা সম্রাট পরতেন সাদা সিল্কের কাপড়, কিন্তু রানী বা সম্রাজ্ঞী এবং তাদের ছেলেমেয়েরা পরতো হলুদ সিল্ক কাপড়। তবে সিল্ক কেবল কাপড় হিসেবেই ব্যবহৃত হত না। এর উপর লেখার প্রচলনও ছিলো তখন। সিল্ক থেকে তৈরী কাগজ ছিলো সব থেকে দামী কাগজ যা রাজকার্যেই ব্যবহার হত। আস্তে আস্তে সিল্ক আভিজাত্যের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে যা চীনের ভৌগলিক ও সামাজিক সমৃদ্ধিতে সেই সময়ে যথেষ্ট অবদান রেখেছিলো। একসময় এই গণ্ডি চীনের বাইরে প্রায় এশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সিল্কের ঔজ্জ্বল্য ও বিশেষ গঠনবিন্যাস এর কারণে খুব শীঘ্রই যেসব দেশে বা অঞ্চলে চীনদেশীয় বণিকেরা বাণিজ্য করতে যেত, সেসব অঞ্চলে এটি হয়ে উঠতে লাগলো জনপ্রিয় প্রসাধনের সামগ্রী। চীনা বণিকেরা প্রায় ৩০টি দেশে তখন ব্যবসা করতে পাড়ি জমালেও কোনো দেশই সিল্ক উৎপাদনের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারে নি। রেশম ও সিল্কের গোপনীয়তার স্বার্থে দেশটির সীমান্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত রক্ষীরা বাণিজ্যে যাওয়া বণিকদের তল্লাশী করে দেখত যেন কেউ রেশমপোকা, রেশমপোকার ডিম বা কোকুন পাচার করতে না পারে। যদি কেউ ধরা পড়ে যেত, তখন তার একমাত্র শাস্তি ছিলো মৃত্যুদণ্ড। ফলে শাস্তির ভয়ে কেউ অবৈধভাবে পাচার করতে সাহস করতো না। এভাবেই চীন প্রায় ৩ হাজার বছর সিল্ককে একচেটিয়া করে রেখেছিলো। সিল্ক রোড উন্মুক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত সিল্ক কেবল চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। যদিও চীন পুরাণ অনযায়ী চীন থেকে সিল্কের এই গোপনীয়তা গণ্ডিবদ্ধ থাকে না কোনো এক রাজকন্যার কারণে। রাজকন্যা খোটান রাজ্যের (টাকলা মাকান মরুভুমির একটি অঞ্চল) যুবরাজের সাথে প্রণয়াবদ্ধ ছিলো। রাজকন্যার বিয়ের পর সে তার প্রিয় সিল্কের কাপড় ছাড়া যেতে নারাজ হওয়ায় তাকে বাধ্য হয়ে সিল্কের কাপড় নিয়ে যেতে দেয়া হয়। ফলে চীনের গণ্ডি থেকে সিল্ক আদতে বেরিয়ে পড়ে এবং সিল্ক রপ্তানির উপর রাজকীয় নিষেধাজ্ঞার কোনো অস্ত্বিত্ব থাকে না। তবে সিল্কের কাপড় চীনের গণ্ডির বাইরে গেলেও সেরিকালচার গুপ্তই ছিলো হাজার বছর। সিল্ক রোড চীনের বাইরে বিদেশী এই ফেব্রিকের চাহিদা দিন দিন বাড়তেই থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে বণিকদের লাভ। একসময় চীন হতে এত সিল্কের কাপড় রপ্তানি হতে লাগলো যে, চীন থেকে যে পথ দিয়ে সিল্ক নিয়ে যাওয়া হতো সেই পথের নাম হয়ে গেলো সিল্ক রোড। এই রাস্তা দিয়েই পশ্চিমা দেশসমূহে সিল্ক নিয়ে যাওয়া হত এবং সেসব দেশ থেকে সিল্কের বিনিময়ে সোনা, রূপা, হাতির দাঁত, ঘোড়া এবং ঊল নিয়ে আসা হতো। মজার বিষয় হচ্ছে, সেই সময় সোনার থেকেও সিল্ককে মূল্যবান হিসেবে বাণিজ্য করা হতো। তবে ব্যবসা যতই লাভজনক হোক না কেন, এই পথ অতিক্রম করাই ছিলো যেন অত্যন্ত কঠিন কাজ। পশ্চিম চীন থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাস্তার দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় ৪০০০ মাইল। চীনের বিখ্যাত গ্রেট ওয়াল পার হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে যাওয়ার পর এবং টাকলা মাকান মরুভূমি পার হয়ে পথে পড়ে পামির পর্বতমালা। পামির পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে সামনে বর্তমান আফগানিস্তান। আফগানিস্তানের পূর্বদিকে গিয়ে দামেস্ক অঞ্চল। এই অঞ্চল পার হলেই ভূমধ্যসাগর। বণিকেরা এই সাগরপথেই বাণিজ্যে যাওয়ার জন্য জাহাজ ভাসাতো। তাদের মূল বাণিজ্য হতো রোম সাম্রাজ্যে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)।