অঙ্কশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র, ইতিহাস, বিজ্ঞান, ভূগোল এমনকি সাহিত্যেও, খেলাধুলোয় সবেতেই শূন্য। আজ শাস্ত্রে শূন্য ছাড়া সব অচল। অনেক একটি শূন্যই কিন্তু ঘটিয়ে দেয় মিরাক্কেল। ইতিহাসবিদদের মতে কয়েকশ বছর আগেই শূন্য এবং দশমিকের ব্যবহার শুরু করে ভারতবর্ষ। ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন শাস্ত্রে এই শূন্যের উল্লেখ রয়েছে। শূন্য এখন অসীম। আমাদের প্রাত্যহিক জীবন থেকে শুরু করে বিচিত্র মহাকাশের রহস্যেও শূন্যই শেষ কথা। চীনের মতো, ভারত অনেক আগে থেকেই "দশমিক" ব্যবহারের সুবিধা খুঁজে পায়। এবং তারা তৃতীয় শতক থেকে এই দশমিক ব্যবহার করে আসছে। চীনারা কীভাবে দশমিক পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছে সেটা জানা যায়নি। তবে জানা গেছে যে তারা এই পদ্ধতিটিতে অনেক পরিমার্জন করেছেন এবং নিখুঁত করে তুলেছেন দিনে দিনে। তাদের দেখানো নিয়মে আমরা এখনও সংখ্যার অবস্থান বুঝতে একক, দশক, শতক, সহস্র পদ্ধতি ব্যবহার করি। এছাড়া বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত এক থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যার ভিত্তি স্থাপন এবং নতুন একটি সংখ্যা, শূন্য-এর উদ্ভাবন হয়েছে ভারত থেকেই। ছবিঃ প্রাচীন মন্দিরের প্রাচীর থেকে উদ্ধার শূন্য। শূন্যের রহস্য ভারতীয় গণিতজ্ঞরাই এই শূন্যকে প্রথম একটি সংখ্যার রূপ দেয়। এবং তাদের এই ধারণা গণিতে বিপ্লব ঘটায়। এরপর থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য খুব সফলভাবে সঠিক সংখ্যা গঠন করা সম্ভব হয়ে ওঠে। কাগজে কলমে নবম শতক থেকে শূন্য ব্যবহারের কথা বলা হলেও শূন্য তারও কয়েকশ বছর আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে ধারণা গবেষকদের। মধ্য ভারতের গোয়ালিয়র দুর্গের ভেতরের একটি ছোট মন্দিরের দেয়ালের ওপর এই ‘শূন্য’ সংখ্যাটি খোঁদাই করা ছিল। শূন্য সংখ্যাটি এই দুর্গে আবিস্কার হওয়ার পর থেকেই এই গোয়ালিয়র এখন সারা পৃথিবীর গণিতজ্ঞদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অথচ, ভারতে ইতিপূর্বে এই সংখ্যাটির কোন অস্তিত্বই ছিল না। প্রাচীন মিশরে, মেসোপটেমিয়ান সভ্যতা এবং চীনে, শূন্যের অস্তিত্ব থাকলেও সেটি ব্যবহৃত হতো শুধু সংকেত হিসাবে। শূন্য অর্থাৎ একটি খালি স্থান বোঝাতে। শূন্যের আবিষ্কার শূন্য কিভাবে এসেছে তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় যে শূন্য সংখ্যাটি লেখার ক্ষেত্রে গোলাকৃতির যে প্রতীক ব্যবহার করা হয় সেটা এসেছে মাটিতে গণনা করার জন্য ব্যবহৃত পাথর খণ্ড থেকে। এই সংখ্যা আবিষ্কারের পেছনে সাংস্কৃতিক কারণ থাকতে পারে বলেও ধারণা বিশেষজ্ঞদের। শূন্যতা ও অবিনশ্বর এই ধারণাগুলোর প্রাচীন ভারতীয়দের বিশ্বাসের একটি অংশ ছিল। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও হিন্দু ধর্মের মানুষেরা ধর্ম চিরস্থায়ী বা অবিনশ্বর এই ধারণাটিকে লালন করে। সেখান থেকেই এসেছে এই শূন্যের ধারণা। ভারতীয়রা শূন্য শব্দটি খালি বা ফাঁকা বোঝাতে ব্যবহার করে থাকে সাধারণত। শূন্য থেকেই ইনফিনিটি ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত সপ্তম শতকে শূন্যের কিছু প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছিলেন। শূন্যকে ঘিরে গণনার জন্য তার মৌলিক নিয়ম এখনও সারা বিশ্বের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য। যেমনঃ ১+০ = ১ ১-০ = ১ ১ x ০= ০ শূন্য দিয়ে কোন সংখ্যা গুণ করলে ফলাফল এক হবে? এমন একটি প্রশ্নের সমাধান বের করতে গিয়ে উদ্ভব হয় ইনফিনিটি বা অসীম নামের গাণিতিক ধারণাটির। এবং এই ধারণাটিও এনেছিলেন একজন ভারতীয় গণিতবিদ ভাস্কর। গণিতজ্ঞ ভাস্কর, ১২ শতকে বিষয়টিকে সবার সামনে আনেন। কীভাবে এলো এই ইনফিনিটির ধারনা, দেখে নেয়া যাক একটি উদাহরণের মধ্যে দিয়ে। যদি একটি ফলকে অর্ধেক কাটা হয় তাহলে দুটি টুকরো পাওয়া যাবে। যদি ফলটাকে তিন ভাগ কাটা হয় তাহলে তিনটি টুকরো পাওয়া যাবে। এভাবে ভাগ করতে করতে ছোট ছোট ভগ্নাংশের সৃষ্টি হবে। সবশেষে, পাওয়া যাবে অসীম টুকরো। গণিতজ্ঞ ভাস্করের মতে, একের সঙ্গে শূন্য ভাগ করলে ফলাফল হবে অসীম। কিন্তু গণনার ক্ষেত্রে শূন্যের ব্যবহার আরও অসীম। একসময় সমান সমান সংখ্যার বিয়োগফল, যেমন তিন বিয়োগ তিনের ফলাফল হিসেবে শূন্যকে গ্রহণ করা হয়েছিল। তারপর প্রশ্ন ওঠে তিন বিয়োগ চারের ফলাফল তাহলে কি হবে। এখানেও তো ফলাফল শূন্য হওয়ার কথা। এমন অবস্থায় নতুন ধরণের শূন্য বা নেগেটিভ নাম্বার অর্থাৎ ঋণাত্মক সংখ্যার উদ্ভব হয়। ভারতীয় গণিতজ্ঞরা ঋণাত্মক সংখ্যা এবং শূন্যের ধারণা পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল কারণ তারা সেগুলোকে বিমূর্ত সত্ত্বা হিসেবে মনে করে। সংখ্যা যে শুধুমাত্র গণনা বা পরিমাপ করার জন্য ব্যবহার হয় এমনটা নয়। সংখ্যারও জীবন আছে। যেটা কিনা বাস্তব জগতের সঙ্গে সংযুক্ত। এবং চিন্তার এই রেখা সব ধরণের গাণিতিক ধারনার সৃষ্টি করেছে। ছবিঃ গোয়ালিয়র দুর্গের ভেতরে একটি ছোট মন্দিরের দেয়ালে শূন্য সংখ্যা ব্যবহারের প্রথম নিদর্শন। এক্স এবং ওয়াই চতুর্ভুজ সমীকরণ সমাধান করার ক্ষেত্রেও ভারতীয় গণিতজ্ঞরা একটি নতুন পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছিল। ঋণাত্মক সংখ্যা নিয়ে ব্রহ্মগুপ্তের উপলব্ধি তাকে চতুর্ভুজ সমীকরণ সমাধানে সহায়তা করে। যেখানে ফলাফল দুটি আসে, তারমধ্যে একটি ফলাফল ঋণাত্মক হতে পারে। তিনি দুটি ভেরিয়েবল বা অসম সমীকরণ (এক্স এবং ওয়াই) সমাধানের ক্ষেত্রেও অনেক এগিয়ে যান। অথচ পশ্চিমে গণিতের এই পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছিল ১৬৫৭ সালে ফরাসি গণিতবিদ পিয়ের ডি ফেরমাত তার এই সংক্রান্ত সমাধানগুলো উপস্থাপন করেছিলেন। অথচ ভারতীয়রা হাজার বছর আগেই সেগুলো সামনে এনেছিল। ভারতীয় পণ্ডিত ব্রহ্মগুপ্ত এসব সমীকরণের সমাধান প্রকাশ করতে নতুন একটি ভাষাও গড়ে তুলেছিলেন। তিনি নিজের এসব গণনা উপস্থাপন করতে বিভিন্ন উপায় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। ভেরিয়েবল উপস্থাপন করতে তিনি দুটি অক্ষর ব্যবহার করেন। এক্স এবং ওয়াই। যেটা এখনও ব্যবহার হচ্ছে। ত্রিকোণমিতির আবিস্কারেও ভারতই পথ প্রদর্শক ত্রিকোণমিতির আবিষ্কারের পেছনেও রয়েছেন ভারতীয় গণিতবিদরা। এটা সত্য যে গ্রিকরা প্রথম ডিকশনারি বা অভিধানের বিকাশ করেছিল যা জ্যামিতিকে সংখ্যায় অনুদিত করে। কিন্তু ভারতীয় পণ্ডিতরাই এই ধারণাটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে চারপাশের বিশ্বকে অধ্যয়ন করার পদ্ধতির আবিষ্কারও হয় ভারতেই। সমুদ্রের চলাচল থেকে শুরু করে মহাকাশে একটি নক্ষত্র থেকে আরেকটি নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপে এই ত্রিকোণমিতির সাহায্য নেয়া হয়। পৃথিবীর পরিধি ৩৯,৯৬৮ কিলোমিটার ভারতীয় গণিতজ্ঞরা গণিতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা 'পাই' এর রহস্যের সমাধান করেছে। 'পাই' হল একটি বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাতের সংখ্যাগত মান। এটি এমন একটি সংখ্যা যেটা সব ধরণের গণনায় ব্যবহার হয়। তবে এর সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় প্রকৌশল এবং স্থাপত্যবিদ্যায়। কেননা, যেকোনো বক্ররেখা পরিমাপের জন্য 'পাই' এর প্রয়োজন হয়। কয়েকশ বছর ধরে, গণিতজ্ঞরা পাই-এর সুনির্দিষ্ট মান বের করার চেষ্টা করেছেন। পরে ষষ্ঠ শতকে ভারতীয় গণিতবিদ আর্যভট্ট এই নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা দেন। আর সেটা হল ৩.১৪১৬। পৃথিবীর পরিধি পরিমাপের জন্য তিনি এই সংখ্যা ব্যবহার করেছিলেন। তার গণনা অনুযায়ী পৃথিবীর পরিধি ৩৯,৯৬৮ কিলোমিটার। যেটা কিনা সর্বশেষ পরিমাপের (৪০,০৭৫ কিলোমিটার) সবচেয়ে কাছাকাছি মান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে বিভিন্ন ভগ্নাংশ যোগ এবং বিয়োগ করে পাই এর জন্য সঠিক সূত্র নির্ধারণ করা সম্ভব। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ বিবিসি এবং উইকিপিডিয়া ছবিঃ গ্যাটি ইমেজ