ছবি তুলে কেউ মানসিক অবসাদে ভোগে দিনের পর দিন এবং একদিন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় কারন ছবির সাবজেক্ট কে বাঁচাতে পারলো না বলে। কেউ হয়তো জুতো পালিশ করছিল কিন্তু সেই মানুষটিই হয়তো হয়ে গেলো ইতিহাস। মেয়েদের একটি গানের দলের ছবি হয়ে গেল ইন্টারনেটে আপলোড করা প্রথম ছবি। সেই ছবির বয়েস হয়ে গেলো প্রায় ত্রিশ বছর। এমনই হাজারো গল্প ইতিহাস রয়েছে ফটোগ্রাফি নিয়ে। ১৯ আগস্ট বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস। আঠারোশ শতক থেকে ফটোগ্রাফির এই যাত্রা এখনও চলছে। আজ আমাদের সবার হাতেই মোবাইল ক্যামেরা, ডি এস এল আর বা আরও অত্যাধুনিক ক্যামেরা রয়েছে। চাইলেই কেউ ফটোগ্রাফি করতে পারেন। কিন্তু এর ইতিহাস প্রায় দুইশ বছরের। বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ফটোগ্রাফির এই দুইশ বছর ধরে যে সকল মানুষ নিরলস কাজ করে গেছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই দিনটি পালন করা হয় । সারা বিশ্বে ১৭০ টির ও বেশি দেশে এই দিবসটি পালন করা হয়। ১৮৩৯ সালের ৯ জানুয়ারি "ফ্রেন্স একাডেমি অফ সায়েন্স" আলোকচিত্রের এক উপায় আবিস্কার করেন। এই উপায়ের নাম হলো ‘ড্যাগুইররিও টাইপ’। নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে এই প্রক্রিয়া কে কয়েক মাস পর জনসাধারণের সামনে আনা হয়। ১৯৩৯ সালের ১৯ সে আগস্ট "ফ্রেন্স একাডেমি অফ সায়েন্স" প্যারিসে একটি জনসভার আয়োজন করেন। এবং সেখানে এই উপায় কি ভাবে ছবি তোলা হয়, সেটি সবাই কে দেখানো হয়। বিজ্ঞানী লুইস ড্যাগুইর সর্বপ্রথম ছবি তোলার ব্যাবহারিক দিকটির উপর গুরুত্ব দেন এবং উপায় আবিস্কার করেন। তাঁর নাম অনুসারে ছবি তোলার এই উপায় এর নাম দেওয়া হয় "ড্যাগুইর টাইপ " ফটোগ্রাফি। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই "ড্যাগুইররিও টাইপ" ফটোগ্রাফির জনপ্রিয়তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। "ড্যাগুইররিও টাইপ" ফটোগ্রাফি মুক্তি পাওয়ার সেই দিনটিকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ১৯ সে আগস্ট বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে এই ফটোগ্রাফি দিবস পালন করা হয়। ইন্টারনেটে আপলোড হওয়া প্রথম ছবি সুইজারল্যাণ্ডের জেনেভায় অবস্থিত ইউরোপীয় আণবিক গবেষণা সংস্থা (CERN)-এ কর্মরত বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার টিম বার্নার্স লি ১৯৯২ সালে ইন্টারনেটভিত্তিক ‘World Wide ওয়েব ’উদ্ভাবন করেন। সার্নে কর্মরত মেয়েদের একটি প্যারোডি গানের দল হচ্ছে ‘Les Horrible's Cernettes’ বা ‘The Horrible CERN Girls’। ১৯৯২ সালে স্যার 'টিম বার্নার্স লি' এই গানের দলের সাথে সংশ্লিষ্ট তাঁর এক সহকর্মীকে দলটির কয়েকটি ছবি স্ক্যান করে দিতে বলেন। মেয়েদের এই গানের দলের প্রথম ছবি ইন্টারনেটে বিশ্বের প্রথম ওয়েব সাইট ‘info.cern.ch’-এ আপলোড করা হয়েছিল। এই ছবির বয়েস হয়ে গেলো প্রায় ত্রিশ বছর। ফটোগ্রাফির ইতিহাসে মর্মান্তিক ঘটনা ১৯৯৪ সালে সুদানের দুর্ভিক্ষের সময় তোলা একটি ছবির বিষয় ছিল, একটি মেয়ে শিশু খাবারের খোঁজে ১ কি.মি. দূরে অবস্থিত জাতিসংঘের ক্যাম্পের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছে। শিশুটি এতটাই দূর্বল ছিল যে হেঁটে যাওয়া তো দূরে থাক, তার দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না। পিছনে একটি শকুন বাচ্চাটির মৃত্যুর অপেক্ষা করছিল। যাতে বাচ্চাটি মারা যাওয়ার সাথে সাথেই শকুনটি নিজের খাবারের চাহিদা মেটাতে পারে। খাবার সংগ্রহের এই যুদ্ধে কে জয়ী হয়েছিল, শকুন না শিশু কন্যাটি তা আর জানা যায়নি। ছবিটি ক্যামেরাবন্দী করছিলেন ফটোগ্রাফার কেভিন কার্টার। কেভিন কার্টার এই ছবিটি তোলার পর পরই ঐ স্থানটি ত্যাগ করেন। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, ছবিটি তোলার মাত্র তিন মাসের মাথায় কেভিন কার্টার চরম হতাশায় ভুগে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এবং আত্মহত্যা করার আগে তিনি একটি সুইসাইড নোট লিখে যান। যাতে কেভিন পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করেন যে, "ঐ দুর্ভিক্ষ কবলিত শিশুটিকে কেন সেদিন আমি উদ্ধার করে নিয়ে এলাম না এবং কেন তাকে কোন সাহায্য করলাম না, সেই আত্মগ্লানিতে আমি দগ্ধ। তাই আজ আমি নিজেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিলাম।" এই ঘটনা হতবাক করে দিয়েছিল ফটোগ্রাফির ইতিহাসকে। পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক ঘটনাই আছে, যা প্রথমবারের মতো ঘটে। বর্তমান সভ্যতায় যেগুলো ছাড়া আধুনিক জীবনযাত্রা একেবারেই অকল্পনীয়। যেমন, কম্পিউটার, মোবাইল, ক্যামেরা ইত্যাদি যখন প্রথমবারের মতো আবিষ্কৃত হয়েছিল ঠিক তখনকার মানুষের কাছে এগুলোই ছিল ইতিহাসের প্রথম এবং অত্যন্ত কৌতূহলের বিষয়। যা এখন আমাদের কাছে খুবই সাধারণ ব্যাপার মাত্র। কিন্তু এখনো মাঝে মাঝে অনেকের মনেই কৌতূহল জাগে যে, এই সব জিনিস গুলো প্রথম কিভাবে এলো? কিভাবেই বা এই সব অত্যাবশ্যকিয় জিনিস গুলো আবিষ্কারের চিন্তা মানুষের মাথায় আসলো ইত্যাদী। মানুষের আবিষ্কৃত জিনিস গুলোর মধ্যে একটি অন্যতম আবিষ্কার হলো ফটোগ্রাফ। ফটোগ্রাফির জগতেও এমন অনেক কিছুই আছে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মত ঘটেছিল। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ পৃথিবীর ফটোগ্রাফির ইতিহাস এবং উইকিপিডিয়া