আমাদের অর্ধেক আকাশ নারীদের। কিন্তু আজ সেই ভাবনা অনেকটাই সেকেলে। এখন মহাকাশ থেকে, সমুদ্র, যুদ্ধ থেকে, আন্দোলন, সঙ্গীত থেকে খেলাধুলো এমনকি বিজ্ঞান থেকে সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি সর্বত্রই মেয়েদের জয়জয়কার। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে এই দিনটিকে বিশেষ ভাবে পালন করা হয়। ভারতেও এই দিনটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে পালন করা হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন রাষ্ট্রে নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁদের কাজের প্রশংসা এবং ভালোবাসা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে মহিলাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সাফল্য অর্জনের উৎসব হিসেবেই পালন করা হয়। নারী দিবসের ইতিহাস প্রথম ১৯০৯ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। ওই বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আমেরিকায় নারী দিবস উদযাপন করা হয়েছিল। আমেরিকার নিউ ইয়র্কে ১৯০৮ সালে মহিলা বস্ত্রশ্রমিকরা তাঁদের কাজের সম্মান আদায়ের লক্ষ্যে ধর্মঘট শুরু করেন। নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী কাজ আর সম মানের বেতনের দাবিতে চলে হরতাল। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনের উদ্যোগের পর, ১৯ মার্চ অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি এবং সুইৎজারল্যান্ডে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন হয়েছিল। নারীদের কাজের অধিকার, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং কাজের বৈষম্যের অবসানের জন্য প্রতিবাদ করেন লক্ষ মানুষ। একই সঙ্গে রাশিয়ান মহিলারাও প্রথমবার ২৮ ফেব্রুয়ারি 'রুটি ও শান্তি'র দাবিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। ইউরোপের নারীরা ৮ মার্চ শান্তির পক্ষে সাওয়াল করে বিশাল মিছিলে নামেন। ১৯১৩-১৯১৪ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিবাদ জানানোর একটি প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে। আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালের ৮ মার্চ দিনটিকে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সদস্য রাষ্ট্রদের, নারী অধিকার ও বিশ্ব শান্তি রক্ষার জন্য জাতিসংঘ দিবস হিসাবে ৮ মার্চকে ঘোষণা করার আহ্বান জানায়। নারীরা কেমন আছে! ১৯৯৬ সাল থেকে থিম বা বিষয় ভিত্তিক আলোচনা শুরু হয় নারীর উন্নয়নের জন্যে। অতীত উদযাপন এবং ভবিষৎ পরিকল্পনা, নারী এবং শান্তি, মানবাধিকার, নারীর প্রতি সহিংসতা, নারীর অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ের পর থেকে ২০০৫ সালে লিঙ্গ সমতার সমতার বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে কাজ শুরুর পরিকল্পনা হয়। লিঙ্গ সমতার কথা বারবার উঠে আসছে কারন বৈষম্য যথেষ্ট বেশী। আর এই বৈষম্যের মুলে রয়েছে ক্ষমতা। সমাজ থেকে শুরু করে পরিবারে পুরুষতন্ত্রের আস্ফালন। নারীরা প্রায় কুক্ষিগত। পারিবারিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে নারীদের প্রান প্রায় ওষ্ঠাগত। এরপর গত প্রায় দুই আড়াই দশক ধরে চলে পুরুশ-নারীর একযোগে প্রতিবাদ। তাই আজকের নারীরা কিন্তু অনেকটাই স্বাবলম্বী। কিন্তু অতি মহামারীর সময়কার তথ্য এবং বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে মেয়েদের সঙ্গে ডোমেস্টিক ভায়লেন্স, ক্রাইম এগেইনস্ট ওমেন, চাইল্ড ম্যারেজ সহ বিভিন্ন আক্রমণ এবং অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। ২০২১ সালে ইউনাটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে জানা গেছে, ৪৩.৫ কোটি মহিলা দিনে ১৩৫ টাকার কম রোজগার করে। অতিমারির সময় ৪.৭ কোটি মহিলা নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। পুরুষের তুলনায় মহিলাদের চাকরী ১৯ শতাংশ ঝুঁকির মুখে। ভারতে জাতীয় আয়ের মাত্র ১৮ শতাংশ নারীদের ভাগ্যে। সমগ্র এশিয়াতে মাত্র ২১ শতাংশ নারীদের গড় আয়। ২০০৫ সালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ৩৫ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা কমে হয় ২৬ শতাংশ। অথচ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে ভারতে নারীর কর্মসংস্থান বাড়ালে ২৭ শতাংশ বেশী লাভবান হতো দেশ। আমাদের দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে, মেয়েরা যতটা শিক্ষিত হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে কিন্তু মেয়েদের উপস্থিতি ততটা বাড়েনি। সংসদে এখনও ৩৩ শতাংশ আসন নির্ধারিত হয়নি নারীদের জন্যে। বর্তমানে ভারতের ৫৪৩ টি আসনের মধ্যে ৭৮ জন মহিলা সাংসদ রয়েছেন মাত্র। সারা বিশ্বে মাত্র ২৪ শতাংশ মহিলা সাংসদ আছেন। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতে মাত্র ১৮ শতাংশ মহিলা সংসদে রয়েছেন। সারা বিশ্বজুড়েই তাই চলছে নারীদের নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্যে এই লড়াই এবং আন্দোলন। নারী দিবসের গুরুত্ব বিশ্বজুড়ে লিঙ্গ সাম্যের উদ্দেশ্যে কাজের জন্য এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয়। কারন সমতার বৈষম্য নারী পুরুষ কারও জন্যেই কাম্য নয়। আর এই বৈষম্য নারীপুরুষ উভয়ের লড়াইয়ের যৌথ লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই অবসান হবে। প্রকৃতি নিজের খেয়ালেই নারী বা পুরুষ সৃষ্টি করেছেন। এই মার্চ মাস পলাশের মাস, আগুনের মাস। তাই আগুনের মাসে সমতা, ন্যায়, অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক নারীপুরুষ উভয়েরই। শুধু একটি দিন নয়, সারা বছরকেই নারীদের জন্যে উৎসর্গ করা হোক, উদযাপন হোক। তাহলেই বোধহয় সার্থকতা পাবে এই বিশেষ দিনটি। নারীরা সুন্দর বলেই আজ পৃথিবীটা এতো সুন্দর। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সহায়তাঃ উইকিপিডিয়া এবং সমসাময়িক পত্রপত্রিকা।