‘আমি সুভাষ বলছি’– গোটা দেশের স্বাধীনতার জন্যে উন্মুখ ভারতবাসীর আশা–আকাঙ্খাকে জাগিয়ে এই রেডিওতেই প্রথম ভেসে এসেছিল সেই বার্তা। নেতাজীর সেই বার্তায় আজও আন্দোলিত হয় দেশ। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মত একজন ব্যাক্তিকে ভারতবর্ষ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বৃটিশরা দীর্ঘদিন আটকে রেখেছিল। কিন্তু নিজের দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্যে তিনি এই রেডিও ব্যবহার করেছিলেন। রেডিওতে দৃপ্ত কন্ঠে বলে উঠেছিলেন 'আমি সুভাষ বলছি'। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রতি বছরের মতো পালিত হচ্ছে বিশ্ব রেডিও দিবস। রেডিওকে শিক্ষা, সংবাদ, সংস্কৃতি পরিবহণের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরতে প্রতি বছর এই দিনটি পালন করা হয়। ২০২১–এর রেডিও দিবসের থিম ছিল, অর্থাৎ ‘নতুন পৃথিবী, নতুন রেডিও’। আর এবছরের বিশ্ব রেডিও দিবসের থিম ছিল, 'বেতার ও আস্থা'। ‘বিশ্ব রেডিও দিবস’ পালনের ইতিহাস ‘বিশ্ব রেডিও দিবস’ পালনের প্রস্তাব দিয়েছিল ইউনেস্কো। এই দিবস পালনের জন্য ২০১০ সালে স্পেনের ‘রেডিও অকাদেমি’, ইউনেস্কোর কার্যনির্বাহী পর্ষদের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। তারপর বহু আলোচনার পর রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্থাগুলি, এনজিও, ইউনেস্কোর স্থায়ী প্রতিনিধিদলগুলির দ্বারা ইউনেস্কোর ৩৬ তম জেনারেল কনফারেন্সে ১৩ ফেব্রুয়ারি দিনটিতে বিশ্ব বেতার দিবস উদযাপনের জন্য নির্ধারিত হয়। বিশ্বে যোগাযোগ স্থাপনের প্রাচীন ও বহুল ব্যবহৃত এই মাধ্যম ও গণতান্ত্রিক আলোচনার বৈচিত্রময় এই মঞ্চের প্রতি মর্যাদা জানাতে বিশ্ব বেতার দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব বেতার দিবস হিসেবে পালিত হয়। এক সময় দেশ-বিদেশের খবর জানার একমাত্র মাধ্যমই ছিল রেডিও। কারও বাড়িতে একটি রেডিও থাকলে তার আলাদা খাতির করা হত। অনেকে আবার বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকেও যৌতুক হিসেবে রেডিও নিত। কারও বাড়িতে রেডিও থাকলে গ্রামের মানুষ দল বেঁধে জড়ো হত খবর শুনতে। তবে কালের বিবর্তনে এখন রেডিও শোনার মানুষের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে সেটা বলা কিন্তু একদম বোকামি। বরং রেডিও’র শ্রোতা প্রতিদিন বাড়ছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন বাজারে চলে এসেছে টেলিভিশন। দৈনিক সংবাদপত্রও পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামে–গঞ্জে। কিন্তু বিলুপ্ত হয়নি রেডিও। ডিজিটাল যুগে রেডিও ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে জীবনধারা মিশে অন্যান্য খাতের মতো রেডিওর ক্ষেত্রেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। অনুষ্ঠানের মান, বিষয়বস্তুর প্রাসঙ্গিকতা, উপস্থাপনার ঢং ও প্রযুক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহারের ফলে রেডিও গণমাধ্যমের প্রতিযোগিতায় নিজেকে নতুন করে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। শুধু প্রান্তিক এলাকায়ই নয়, ব্যস্ত নাগরিক জীবনেও রেডিও হয়ে উঠেছে তথ্য ও বিনোদনের এক নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। একজন ব্যস্ত নাগরিক পথে বসেই জানতে পারছেন দেশের হালহকিকত। যাঁরা ভাবছেন, স্যাটেলাইটের দাপটে রেডিও পিছু হটছে, তাঁদের ধারণা যে নিতান্ত অমূলক, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এদিকে, কম্যুউনিটি রেডিও পিছিয়ে নেই। শুধু মাত্র ভারতবর্ষেই প্রায় সাড়ে তিনশ কমিউনিটি রেডিও কাজ করে চলেছে নিরন্তর। সবে মিলিয়ে রেডিও প্রেমীরা কিন্তু ভোলেননি বেতার দিবসের কথা। বিশ্ব বেতার দিবসের থিম, 'বেতার ও আস্থা', দিনটির ইতিহাস ও তাৎপর্য বিশ্বে যোগাযোগ স্থাপনের প্রাচীন ও বহুল ব্যবহৃত এই মাধ্যম ও গণতান্ত্রিক আলোচনার বৈচিত্রময় এই মঞ্চের প্রতি মর্যাদা জানাতে বিশ্ব বেতার দিবস পালনের সিদ্ধান্ত। ১) বিশ্ব বেতার দিবস ২০২২-থিম এ বছরের বিশ্ব বেতার দিবসের থিম বেতার ও আস্থা (Radio and Trust) । সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে অন্যতম সর্বাধিক বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম বেতার। এ কথা মাথায় রেখেই এই থিম বেছে নেওয়া হয়েছে। এই দিনটির জন্য তিনটি সাব-থিম বেছে নেওয়া হয়েছে- ১) বেতার সাংবাদিকতার প্রতি আস্থা২) আস্থা ও সহজলভ্যতা৩) রেডিও স্টেশনগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা ২) বিশ্ব বেতার দিবস-ইতিহাস ২০১২ তে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় এই দিনটি আন্তর্জাতিক দিবসের স্বীকৃতি লাভ করে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছনো এবং তাদের উদ্বেগ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা সম্ভব, এমন একটি মাধ্যম হিসেহে বেতারের গুরত্ব তুলে ধরার জন্য এই দিন পালনের সুপারিশ করা হয়েছিল। টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের আগে বেতারই ছিল সবচেয়ে বড়সড় আবিষ্কার। এখনও যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বেতার। বিশ্ব রেডিও দিবস-তাৎপর্য সারা বিশ্বজুড়েই শ্রোতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মাধ্যম বেতার। এখনও বেতারই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের কন্ঠস্বর তুলে ধরে গণতন্ত্রগুলির সুদৃঢ়করণের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাধ্যম। এই দিনটিতে রেডিওর গুরুত্ব তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় জরুরি যোগাযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেতারের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়। এভাবে যোগাযোগের এই গুরুত্বপূর্ণ ও সহজলভ্য মাধ্যমের গুরুত্ব উপলব্ধির ক্ষেত্রে এই দিবস উদযাপনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ৬০-৭০ দশকেরও আগে রেডিও গণ যোগাযোগের এমন একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে অসংখ্য লোকের কাছে বার্তা প্রেরণ করার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে গণ্য হতো। শহর,গ্রাম এবং প্রত্যন্ত গ্রাম্য অঞ্চলে বাস করা লোকেদের যেখানে যোগাযোগের অন্য কোনও মাধ্যমে পৌঁছনো সহজ নয়। সেখানে রেডিও ছিল একমাত্র বিনোদনের উপায়। বিশ্ব বেতার দিবস উদযাপিত হয় ব্যক্তি মতামতের স্বাধীনতা, জন বিতর্ক ও শিক্ষার প্রসারে রেডিওর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করার লক্ষ্যে। প্রতি বছর ইউনেস্কো সারা বিশ্বের সম্প্রচারক, সংস্থা এবং সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় রেডিও দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এছাড়াও এই দিনে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে রেডিওর গুরুত্ব আলোচনা করা হয় এবং সচেতনতা ছড়িয়ে পড়ে। এটি আরও অবহিত করা হয় যে রেডিও এমন একটি পরিষেবা যার মাধ্যমে কেবল রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিই বলা যায় না। বরং, দুর্যোগের সময় যোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যমগুলি ব্যাহত হলে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিদেরও সহায়তা করা যেতে পারে। রেডিও সম্প্রচারের ইতিহাস ২৪ ডিসেম্বর ১৯০৬ সালে রেডিও বিজ্ঞানী রেজিনাল্ড ফেনসডেন রেডিও সম্প্রচার শুরু করেছিলেন। ১৯১৮ সালে, লি দ্য ফরেস্ট নিউইয়র্কের হাইব্রিজ অঞ্চলে বিশ্বের প্রথম রেডিও স্টেশন শুরু করে। তবে পুলিশ এটিকে অবৈধ বলেছিল এবং এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ভারতের কথা বলতে গেলে ১৯৩৬ সালে ভারতে অফিসিয়াল 'ইম্পেরিয়াল রেডিও' শুরু হয়েছিল। যা স্বাধীনতার পরে অল ইন্ডিয়া রেডিও নামে পরিণতি পায়। আজ রেডিও এর তার পরসর বৃদ্ধি করেছে। বেতার সম্প্রসারণে ভারতীয় বিজ্ঞানী ডঃ জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি রেডিও এবং মাইক্রো ওয়েভসের অপটিক্সে কাজ করেছিলেন। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ ফ্রেন্ডস কমিউনিটি রেডিও ৯০.৪, ত্রিপুরা, ইউনেস্কো, কমিউনিটি রেডিও এসোসিয়েশান, নিউ দিল্লী।