দার্জিলিঙের সৌন্দর্য নিয়ে কোনও কথাই বোধহয় যথেষ্ট নয়। তুষারময় শৃঙ্গ থেকে সবুজ পাহাড়ের প্রশান্তি, এ এক সুন্দরের সাম্রাজ্য। দার্জিলিং পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শৈলশহর। এর সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য অঢেল। লাল রডোডেনড্রন, সাদা ম্যাগনোলিয়া, পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষে সবুজ চা গাছের বাহার, বনাঞ্চল, ঘরে এসে পড়া মেঘরাজি -- সব মিলিয়ে দার্জিলিং-কে পাহাড়ের রানি করে তুলেছে। ভোরের কাঞ্চনজঙ্ঘা এই রানির মাথার মুকুট। ধুলোধোঁয়া মাখা নগরের বাসিন্দাদের কাছে দার্জিলিং একটি প্রিয় বিশ্রামের স্থান। ভ্রমণ প্রিয় মানুষ, ট্রেকার, পক্ষিবিজ্ঞানী, চিত্রগ্রাহক, উদ্ভিদবিজ্ঞানী কিংবা শিল্পী -- সকলের কাছেই দার্জিলিং এমন একটা বেড়ানোর জায়গা, যা তাদের স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে থাকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬৭১০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত দার্জিলিঙের ম্যাল থেকে তুষারধবল কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য বিস্মিত করে। রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে সক্কাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দৃশ্যমান থাকে সপরিবার কাঞ্চনজঙ্ঘা। দার্জিলিং অঞ্চলের শীর্ষতম স্থান (৮৪৮২ ফুট), শহর থেকে ১১ কিমি দূরে টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয়ের স্মৃতি ভোলার নয়। উদীয়মান সূর্যের প্রথম রশ্মি পড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘায়। টাইগার হিল হল সেই বিরলতম স্থান যেখান থেকে এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘা এক সঙ্গে দেখা যায়। দার্জিলিঙের আরও এক আকর্ষণ ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’-এর শিরোপা পাওয়া দার্জিলিং হিমালয়ান রেল তথা টয় ট্রেন। দার্জিলিং শহর থেকে বাতাসিয়া লুপ পর্যন্ত রোজ ২ ঘণ্টার ‘জয়রাইড’-এ যায় টয় ট্রেন। দার্জিলিং রোপওয়ে তথা রঙ্গিত ভ্যালি প্যাসেঞ্জার কেবল কারে চড়ে উপত্যকার দৃশ্য দেখাও এক বেনজির অভিজ্ঞতা। এ ছাড়াও দার্জিলিং শহরের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো হল হিমালয়্যান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টটিউট, অবজারভেটরি হিল ও মহাকাল মন্দির, রক গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্মৃতিধন্য ‘স্টেপ অ্যাসাইড’, পদ্মজা নায়ডু জুলজিক্যাল পার্ক ইত্যাদি। রয় ভিলা ‘রয় ভিলা’ দার্জিলিঙের লেবং কার্ট রোডের ওপর একটি বাড়ি। এখানে ভগিনী নিবেদিতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। ‘নৌকো ডুবে যাচ্ছে, কিন্তু আমি সূর্যোদয় দেখতে পাচ্ছি’- এটাই ছিল তাঁর শেষ কথা। তাঁর মৃত্যুর সময় ডঃ নীলরতন সরকার, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, তাঁর স্ত্রী লেডি অবলা বসু, বিজ্ঞানী বশীশ্বর সেন এই বাড়িতেই ছিলেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত এই বাড়িতেই হিমালয়্যান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টটিউটের দফতর ছিল। ২০১৩ সালের ১৬ মে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য্য় রয় ভিলা রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে তুলে দেন। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী গৌতম দেব এই বাড়ির চাবি মিশনের হাতে তুলে দেন ২০১৪ সালের ১০ জুলাই। বর্তমানে মিশন সেখানে গরিব শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের একটি প্রকল্প চালাচ্ছে। এছাড়াও এখান থেকে দুঃস্থ বৃ্দ্ধ-বৃদ্ধা ও স্থানীয় গরিবদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়, গরিব মেধাবী শিশুদের বৃত্তিও প্রদান করা হয়ে থাকে।