শোনা যায় রাইট ভ্রাতৃদ্বয় খেলতে খেলতেই একদিন আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর সেই থেকেই মানুষের আকাশে ভেসে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখা শুরু। এরপর কেটে গেছে বহু বছর। এখন সত্যিই মানুষ পাখীর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে এখন মানুষ অনায়াসে চলে যেতে পারে বিমানে বসেই। খেলার বিষয় যখন বিজ্ঞানের আশীর্বাদ হয়ে ওঠে তখন সত্যিই তা মানুষের কল্যাণেই হয়। ঠিক তেমনি একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে বসে আমাদের অতিপরিচিত খেলনার আদলে এমন এক যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন, যেটি পৃথিবীর অনেক অনুন্নত দেশের অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রফেসর মনু প্রকাশ এবং খেলনা পেপারফিউজ মনু প্রকাশ একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী। তিনি বায়োঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের। মনু প্রকাশ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভারতের মিরাটে। তিনি তার জন্য সর্বাধিক পরিচিত ফোল্ডস্কোপ এবং পেপারফিউজ আবিস্কারের জন্য। তিনি এবং তাঁর দল স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ওয়াটার ড্রপলেট ভিত্তিক কম্পিউটারে কাজ করছেন। তাঁর কাজ মূলত পৃথিবীর গরীব মানুষদের জন্য। উনার উদ্ভাবনী যা ওষুধ, কম্পিউটিং এবং মাইক্রোস্কোপিটিকে সারা বিশ্ব জুড়ে আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছন যায়। ভারতীয় বিজ্ঞানী মনু প্রকাশ 'প্রকাশ সায়েন্স ল্যাব' পরিচালনা করেন। ভারতের উত্তর প্রদেশের মীরাটে উনার পরিবারের প্রধান পেশা ছিল আখ উৎপাদন। কানপুরের আইআইটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সের উপর বি.টেক ডিগ্রি অর্জনের পর উচ্চশিক্ষার্থে চলে যান আমেরিকায়। সেখানে এমআইটি থেকে এম.এস. এবং পিএইচডি সম্পন্ন করেন। এরপর শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে যোগদান করেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফোল্ডস্কোপ ফোল্ডস্কোপ একটি অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপ যা কাগজের শীট এবং সাধারণ কিছু উপাদানগুলিকে একত্রিত করে তৈরি হতে পারে একটি লেন্স। বিজ্ঞানের ব্যবহারের জন্য সস্তায় সরঞ্জাম তৈরির উদ্দেশ্যেই তৈরি। পেপারফিউজের ধারণা প্রফেসর মনু প্রকাশের মাথায় পেপারফিউজের ধারণা এসেছিল হাজার বছরের পুরোনো একটি খেলনা থেকে। গোলাকৃতির কাগজ কিংবা প্লাস্টিককে সুতার মাধ্যমে খুব দ্রুত ঘোরানো যায় এই ধরনের খেলনার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। অনেক সময় শিশুদের চিপসের প্যাকেটের সাথে এই ধরনের খেলনা পাওয়া যায় ফ্রি তে। সেন্ট্রিফিউজের বিকল্প তৈরির জন্য মনু প্রকাশ এবং ওনার সহকর্মীদের এমন কিছুর দরকার ছিল, যেগুলো খুব সহজেই অল্প শক্তি ব্যয়েই অনেক দ্রুত ঘোরানো যায়। প্রথমেই বিজ্ঞানীদের মাথায় আসে সুতা, শক্ত কাগজ কিংবা প্লাস্টিকের তৈরি এই খেলনার কথা। তাদের ধারণা ছিল, যদি দ্রুত ঘূর্ণায়মান প্লাস্টিকের ভেতর রক্তের নমুনা রাখা যায়, তাহলে অতি দ্রুত ঘূর্ণনের জন্য একসময় রক্তের উপাদানগুলো একটি আরেকটি থেকে আলাদা হয়ে যাবে। এভাবে রক্তের নমুনায় যদি ভাইরাস থাকে, সেটিও নির্ণয় করা সম্ভব হবে। এই ধারণা থেকে তারা গবেষণা পরিচালনা করেন এবং সফল হন। শেষপর্যন্ত তারা দেখেন, এর মাধ্যমে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বনের পরিপ্রেক্ষতে সত্যিই রক্তের নমুনা থেকে ভাইরাস চিহ্নিত করা যাচ্ছে। আফ্রিকা এবং এশিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য পেপারফিউজ হতে পারে রোগ নির্ণয়ের একটি স্বল্প খরচের আদর্শ সমাধান। আগেই বলা হয়েছে, আফ্রিকার অনেক দেশের পরিবহন ব্যবস্থা ভালো নয়, বিদ্যুতশক্তিও সহজলভ্য হয়নি। এসব অঞ্চলে পেপারফিউজ খুব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মাত্র দেড় মিনিটেই এই যন্ত্রের সাহায্যে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। এর খরচ এতটাই কম যে নিম্নবিত্ত পরিবারের কোনো সদস্যও অনায়াসে নিজের বাড়িতেই বেশ কয়েকটি পেপারফিউজ রাখতে পারবে, যেগুলো প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা যাবে। মনু প্রকাশ ও তার সহকর্মীদের গবেষণা পরিচালিত হয় মূলত সাধারণ মানুষের উপকারের জন্য। পেপারফিউজের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে পৃথিবীর পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর মানুষেরা উপকৃত হবে। সেন্ট্রিফিউজ কি? আমরা ছোটবেলায় অনেক ধরনের খেলনা দিয়েই খেলেছি। প্রতিটি খেলনার পেছনেই ছিল বিজ্ঞানের বিভিন্ন নিয়ম ও সূত্রের কারসাজি। অবশ্য ছোটবেলায় খেলার সময় খেলনাগুলোর পেছনের বিজ্ঞান নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয়নি। কিন্তু খেলনার আদলেই তৈরি কোনো সাধারণ যন্ত্রের মাধ্যমে যদি হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়, তাহলে কিন্তু বিষয়টি দারুণ হয়। খেলনা তখন হয়ে উঠছে গবেষণার বিষয়। সাধারণত গবেষণাগারে রক্ত পরীক্ষার জন্য 'সেন্ট্রিফিউজ' নামে একটি যন্ত্র থাকে। এই যন্ত্রে ঘূর্ণনের মাধ্যমে কোনো তরল পদার্থের বিভিন্ন উপাদান আলাদা করা হয়। একটি তরলে ভিন্ন ভিন্ন ঘনত্বের বিভিন্ন উপাদান থাকতে পারে। সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রে বিদ্যুৎশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উচ্চগতিসম্পন্ন মোটরের মাধ্যমে কোনো তরল পদার্থকে ঘোরানো হয়। এরপর তরলের বেশি ঘনত্বের উপাদান অল্প ঘনত্বের উপাদান থেকে আলাদা হয়ে যায়। সাধারণত, রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সেন্ট্রিফিউজের মাধ্যমে রক্তের বিভিন্ন উপাদান আলাদা করেন। গবেষণাগারে রক্তের অন্যান্য উপাদান থেকে বিভিন্ন ভাইরাস আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্য সেন্ট্রিফিউজ পুরো বিশ্বজুড়েই বহুল ব্যবহৃত একটি যন্ত্র। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ News standford edu Image courtesy: News standford edu