আমরা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে দারুণ উৎসাহিত হয়েছি, সক্রিয় ভাবে কেউ কেউ হয়তো ঝাঁপিয়েও পড়েছি, কিন্তু ডা. নরেন্দ্র অচ্যুত দাভোলকরের কুসংস্কার-বিরোধী কাজের ঢেউ আমাদের কাছে পৌঁছয়নি। তিনি মহারাষ্ট্রে ‘অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’ গড়ে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তার খোঁজখবর রাখিনি। তাঁর পাশে দাঁড়াইনি। তাঁর পাশে দাঁড়ালে হয়তো তাঁকে এ ভাবে প্রাণ দিতে হত না। অথচ আমাদের সংবিধান অনুসারে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিজের বিশ্বাস ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা যেমন আমাদের মৌলিক অধিকার, তেমনই বিজ্ঞানচেতনা গড়ে তোলা, মানবিকতা ও জ্ঞানের চর্চাকে উৎসাহিত করা আর হিংসাকে প্রতিরোধ করাও প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। আমরা কিন্তু কুসংস্কার বিরোধিতাকে আমাদের সংস্কৃতি করে তুলতে পারিনি। জ্যোতিষী-ফকির-সাধুসন্তের পাল্লায় পড়ে মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে, খুনও হয়ে যাচ্ছে। সেই সব দেখে শুনেও আমরা চুপ করে থাকি। এ সবের বিরুদ্ধে কিছু বলি না। আমরা সচেতন হইনি। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো দূরস্থান, বিজ্ঞানীরাই কি বিজ্ঞানমনস্ক ? তাঁদের সকলের মধ্যে কি বিজ্ঞানচেতনা আছে ? থাকলে কেন ভারতরত্ন বিজ্ঞানী সি এন আর রাওকে বলতে হয়, উপগ্রহ ক্ষেপণের আগে পাঁজিতে শুভক্ষণ বিচার করা বা ভগবানের আশীর্বাদ চাওয়া স্রেফ কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়। এই কথাটা স্পষ্ট ভাবে বলার জন্য ওঁকে ধন্যবাদ। কিন্তু এই উদাহরণটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানচেতনাও শুধু পড়াশোনা বা কাজকর্মেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বিজ্ঞানচেতনা যে শুধু কিছু তত্ত্ব, ছবি আর চিহ্নমাত্র নয়, আসলে একটা সংস্কৃতি— যা জীবনের সর্বত্রই বজায় রেখে চলতে হয়, যা কোনও অযৌক্তিক ধারণাকেই প্রশ্রয় দেওয়ার বিরোধী, এই বোধটাই গড়ে ওঠেনি। এটা আমাদের জীবনে সত্যি হয়ে ওঠেনি সে ভাবে। তেমনই বিজ্ঞান দিবস মানেও যে এক দিন সচেতন হয়ে উঠে বাকি দিনগুলোতে চোখ বুজে থাকা নয়, বরং এই কাজটাকেও জীবনে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা, সেটা বুঝতে আরও কতগুলো নরেন্দ্র দাভোলকরকে লাগবে, কে জানে! সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩ মার্চ, ২০১৫