এ বার আমরা আবার ফিরে যাই ‘বিগ ব্যাং’-এর পরে কী ভাবে সাধারণ পদার্থের প্রকাশ ঘটল আমাদের বিশ্বে, সেই আলোচনায়। ‘বিগ ব্যাং’-এর ১০-৬ সেকেন্ড থেকে ১ সেকেন্ডের মধ্যে ঐ প্লাসমা ঠান্ডা হতে শুরু করে। ঐ সময়কার মহাবিশ্ব তখন নিউট্রন, প্রোটন, ইলেকট্রন, পসিট্রন, নিউট্রিনো এবং আলোর কণা ফোটন দিয়ে তৈরি একটা অতি উত্তপ্ত স্যুপের মতো। সূর্যের কেন্দ্রে যেমন মুক্ত প্রোটন ও নিউট্রনের মধ্যে নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটে তৈরি হয় হিলিয়াম কেন্দ্রক, মহাবিশ্বের শুরুর ঐ চরম তাপমাত্রাতেও একই ঘটনা ঘটে মূলত তৈরি হয়েছিল হিলিয়াম কেন্দ্রক (He3 ও He4), কিছু পরিমাণে ডয়টেরিয়াম (হাইড্রোজেনের একটি আইসোটোপ) ও লিথিয়াম। যদিও এই বিক্রিয়ার সময় সূর্যের অভ্যন্তরে ঘটে চলা বিক্রিয়ার সময়ের মতো দীর্ঘ নয়, কারণ ব্রহ্মাণ্ডের উষ্ণতা ক্রমশই কমতে থাকছিল আর তার ফলে নিউক্লিয়ার ফিউশন হওয়া সম্ভবপর ছিল না। হাল্কা মৌল তৈরি হওয়ার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘বিগ ব্যাং’ নিউক্লিওসিন্থেসিস। লিথিয়ামের চেয়ে ভারী সমস্ত মৌলই তৈরি হয়েছিল নক্ষত্রের মধ্যে। একটি তারার বিবর্তনের শেষ ধাপে তারার জ্বালানি হিলিয়াম জ্বলে তৈরি হয় কার্বন, অক্সিজেন, সিলিকন, সালফার ও লোহা। লোহার চেয়ে ভারী মৌল তৈরি হওয়ার আবার দু’টি উপায় আছে। এগুলি মূলত তৈরি হয় একটি দৈত্যাকার নক্ষত্রের বাইরের দিকে অথবা কোনও সুপারনোভার বিস্ফোরণের সময়। কী ভাবে জানা গেল যে ‘বিগ ব্যাং’-এর প্রথম ধাপে কেবল মাত্র হাল্কা মৌলেরই আধিক্য ছিল এবং সমস্ত ভারী মৌল সংশ্লেষ হয়েছে অনেক পরে, নক্ষত্রের অভ্যন্তরে ? বিজ্ঞানী জর্জ গ্যামো ১৯৪৮ সালে ধারণা করেছিলেন যে সমস্ত মৌলই ‘বিগ ব্যাং’-এর ঐ উত্তপ্ত ও ঘন অবস্থায় কিছু সময়ের মধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তিনি এই ধারণা প্রমাণ করার ভার দিলেন তাঁর পিএইচডি-র ছাত্র রালফ আলফারকে। এ ছাড়াও ঐ প্রজেক্টটিতে ছিলেন রবার্ট হারমান। গণনা করতে গিয়ে হারমান ও আলফার দু’জনেই দেখলেন যে গ্যামোর ধারণা ভুল, শিশু মহাবিশ্বে কোনও ভারী মৌলই ‘বিগ ব্যাং’’-এর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তৈরি হওয়া সম্ভবই নয়। কেন ? সমস্যাটা হয়েছিল নিউট্রনকে নিয়ে। নিউট্রনের ক্ষয় বা decay করার জন্য সময় লাগে ১০ মিনিট এবং তাদের ঘনত্বও কমে আসছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে। তার ফলে ঐ আদি অবস্থাতেও সমস্ত নিউট্রন শেষ হয়ে যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত সময় ছিল না ভারী মৌল তৈরি হওয়ার মতো। ভারী মৌল সমস্তই তৈরি হয়েছে অনেক পরে, নক্ষত্রের অভ্যন্তরে। গ্যামো, আলফার ও হারমানের নিউক্লিওসিন্থেসিস সংক্রান্ত এই কাজটিই কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের প্রথম তাত্ত্বিক গণনা, যার পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষ প্রমাণ মেলে আরো অনেক পরে ১৯৬৫ সাল নাগাদ। সূত্র : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংসদ ও দফতর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার