খৃস্টের জন্মের পূর্বেই জ্যামিতির ধারনা ছিল পৃথিবীতে। তবে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দে গ্রীক পণ্ডিত ইউক্লিড জ্যামিতির ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সূত্রগুলোকে বিধিবদ্ধভাবে সুবিন্যস্ত করে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ’ইলিমেন্টস’ রচনা করেন। এখনও পর্যন্ত তেরো খন্ডের এই বইটিই জ্যামিতির এনসাইক্লোপিডিয়া হিসেবে গণিতজ্ঞদের কাছে পরিচিত। জ্যামিতি মূলত ভুমি-পরিমাপের গণিত হলেও মহাকাশ বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সমুদ্রেও প্রয়োজন হয় জ্যামিতির। শুধু তাই নয় মার্কিনীদের স্বাধীনতা পত্রেও ব্যবহার হয়েছিল জ্যমিতির। জ্যামিতির জনক গ্রিক পন্ডিত ইউক্লিডকে বলা হয় জ্যামিতি শাস্ত্রের জনক। তিনি মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে গ্রীক পন্ডিত থেলস ও পীথাগোরাস জ্যামিতি শাস্ত্রকে পূর্নতা দেন। ইউক্লিড জ্যামিতি, সংখ্যাতত্ত্বের উপরে প্রায় ১৩ টি বই লিখেছিলেন। গ্রিকরা গণিতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই বইগুলো থেকে বিভিন্ন তথ্য এবং সুত্র ব্যবহার করেছিল। ইউক্লিড যথেষ্ট প্রভাবশালী একজন অধ্যাপক ছিলেন। জ্যামিতি বা গণিত ছাড়াও অনেক বেশি আরও বেশ কিছু ক্ষেত্রে উনার প্রচুর অবদান রয়েছে। তিনি যেভাবে যুক্তি ব্যবহার করতেন এবং প্রতিটি যুক্তির পক্ষে যেভাবে তিনি যুক্তিযুক্ত ভাবে নিজের প্রমাণ উপস্থিত করতেন তা এখনও পর্যন্ত পশ্চিমী দার্শনিকদের গবেষণাকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছে। স্যর আইজাক নিউটনের মত দার্শনিক এবং গণিতবিদরা ইউক্লিডের তথ্য এবং যুক্তিকে ব্যবহার করে তাদের রচনাগুলি উপস্থাপন করতেন। এমনকি আব্রাহাম লিংকন ছিলেন ইউক্লিডের একজন ভক্ত। শুধু তাই নয়, আব্রাহাম লিংকন মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ইউক্লিড এর অ্যাক্টিওমেটিক সিস্টেমকে ব্যবহার করেছিলেন। এছাড়াও ইউক্লিড জ্যোতির্বিদ্যা, আয়না, দৃষ্টিভঙ্গি, অপটিকস ইত্যাদি সম্পর্কেও বহু রচনা লিখে রেখে গেছেন যা সত্যিই অভাবনীয়। যদিও সেগুলোর অনেক কিছুই বর্তমানে হারিয়ে গেছে। মূলত এসব কারণেই ইউক্লিড কে জ্যামিতির জনক বলা হয়। বিভিন্ন গণিতবিদ জ্যামিতির বিভিন্ন তত্ত্ব এবং উপপাদ্য কে বিভিন্নভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। এসব তত্ত্ব গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ইতস্তত। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এইসব তত্ত্ব ও উপপাদ্যকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করেছিলেন ইউক্লিড। ইউক্লিড তাঁর এই গ্রন্থটির নাম দেন ‘দ্য এলিমেন্টস’ (C300 বিসিই)। এলিমেন্টস গ্রন্থটিতে ইউক্লিড যা লিখেছিলেন সাধারণ মানুষ এই সম্পর্কে আগে থেকে অনেক কিছুই জানতো। তবুও এই গ্রন্থটি কে জ্যামিতিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নথী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এই গ্রন্থটি সমস্ত তত্ত্ব এবং তথ্যকে একত্রিত করে। বিভিন্ন তত্ত্ব ও উপপাদ্যগুলো কিভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তা এলিমেন্টস গ্রন্থের মাধ্যমে প্রথম তুলে ধরেন ইউক্লিড। এছাড়া জ্যামিতির অগ্রগতিতে যাদের অবদান স্বীকার না করলেই নয় তারা হচ্ছেন, ফরাসি দার্শনিক ও গণিতবিদ রনে দেকার্ত, ফরাসি প্রকৌশলী জেরার দ্যজার্গ, গাসপার মোঁজ প্রমুখ। জ্যামিতির ইতিহাস জ্যামিতির ইতিহাস বহু প্রাচীন। ধারণা করা হয় যিশুখ্রিস্টেরও জন্মের আগে জ্যামিতির উদ্ভব। যিশু খ্রিস্টের জন্মের বহু আগে মেসোপটেমিয়া ও ইজিপ্টে জ্যামিতির উদ্ভব হয়েছিল বলে গবেষকদের দাবী। যদিও মেসোপটেমিয়া বা ইজিপ্টের মানুষ জ্যামিতির বাস্তবিক তেমন কোনো ব্যবহার করতে পারেনি। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে গ্রিক পন্ডিত মিলেতুসের থালেস প্রথম জ্যামিতির ব্যবহারিক প্রয়োগ করতে সক্ষম হন। মিলেতুসের থালেস জ্যামিতি তত্ত্বের সাহায্যে পিরামিডের উচ্চতা বা সমুদ্রের তীর থেকে জাহাজের দূরত্ব বের করতে সক্ষম হন প্রথমে। জ্যামিতি অঙ্কশাস্ত্রের একটি প্রাচীন শাখা । একে রেখা গণিত বলা হয়ে থাকে। জ্যামিতি কি? জ্যামিতি বা 'Geometry' গণিত শাস্ত্রের একটি প্রাচীন শাখা। একে রেখা গণিতও বলা হয়ে থাকে। Geometry' শব্দটি গ্রীক Geo অর্থাৎ ভূমি (earth) ও metrein অর্থাৎ পরিমাপ বা (measure) শব্দের সমন্বয়ে তৈরি। তাই ’জ্যামিতি’ শব্দের অর্থ ’ভূমি পরিমাপ’। যদিও ব্যুৎপত্তিগতভাবে ‘জ্যামিতি’ শব্দের অর্থ ভূমির পরিমাপ তথাপি জ্যামিতি প্রকৃত পক্ষে স্থান বিষয়ক বিজ্ঞান। এক কথায় ‘Geometry is the science concerned with space’। জ্যামিতি বা Geometry শব্দের ‘ জ্যা ’ এর অর্থ ভূমি এবং “ মিতি ’ এর অর্থ পরিমাপ অর্থাৎ ‘ ভূমির পরিমাপ '। ভূমি পরিমাপের জন্য জ্যামিতির উদ্ভব হলেও বর্তমানে জ্যামিতি কেবল ভূমি পরিমাপের জন্যই ব্যবহৃত হয় না। বরং বহু জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধানে জ্যামিতিক জ্ঞান অপরিহার্য। জ্যামিতিক জ্ঞান আমাদের জীবনের সমস্যা সমাধানেরও ইঙ্গিত দেয়, চিন্তা শক্তির উন্মেষ ও মননশীলতার উৎকর্ষ সাধন করে। গ্রীক গণিতজ্ঞ থেলিসকে প্রথম জ্যামিতিক প্রমাণের কৃতিত্ব দেয়া হয়। তিনি যুক্তি দিয়ে প্রমাণ দেন যে, ব্যাস দ্বারা বৃত্ত সমানভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়। থেলিসের শিষ্য পিথাগোরাস জ্যামিতিক তত্ত্বের উন্মেষ ঘটান। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দে গ্রীক পণ্ডিত ইউক্লিড জ্যামিতির ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সূত্রগুলোকে বিধিবদ্ধভাবে সুবিন্যস্ত করে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ’ইলিমেন্টস’ রচনা করেন। তেরো খণ্ডে সম্পূর্ণ কালোত্তীর্ণ এই ’ইলিমেন্টস’ গ্রন্থটিই আধুনিক জ্যামিতির ভিত্তি। আধুনিক কালে জ্যামিতিতে নিত্য নতুন অনেক তথ্য এবং তত্ত্ব সংযোজিত হয়েছে। গণিতশাস্ত্রের যে শাখায় বিন্দু থেকে বৃত্ত পর্যন্ত যাবতীয় ক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্য ধর্ম এবং ক্ষেত্রের পরিমাপ সম্বন্ধে আলোচিত হয় তারই নাম জ্যামিতি । জ্যামিতির ব্যবহার সম্প্রতি সংবাদ সংস্থা বিবিসি একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নালের উদৃতি দিয়ে জানাচ্ছে, জ্যামিতির প্রথম ব্যবহার হয়েছিল ব্যবিলনে। উনবিংশ শতকে কিছু মাটির ফলক উদ্ধার করে গবেষকরা। এইসব মাটির ফলক দেখে গবেষকরা জানতে পারেন জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন প্রাচীন ব্যাবিলনের মানুষ। তাঁরা আকাশে যা দেখতেন তা মাটির ফ্লকে লিখে রাখতেন। প্রায় এক শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে তারা এই নোট লিখে রাখতেন। গবেষকদের দাবী ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই জ্যামিতির ব্যবহার শুরু করেন ব্যাবিলনের মানুষ। পরে মিশরের মানুষ এই জ্যামিতিকে আরও বেশী সময়োপযোগী করে তুলেন। বর্তমান ইরাক ও সিরিয়া অঞ্চলেই ছিল ব্যাবিলনীয়দের বসবাস। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্যসূত্রঃ বিবিসি, উইকিপিডিয়া