‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগলো যে দোল…’ রবীন্দ্রনাথের এই গানটা শুনলেই মনে পড়ে যায় বসন্ত এসে গিয়েছে। বসন্ত মানেই কোকিলের ডাক, দোলযাত্রা, রঙের উৎসব। দোলযাত্রা আর হোলি মানেই সারা দেশের মানুষ আবারও সব দ্বিধা ভুলে মনে প্রাণে রঙিন হয়ে উঠতে চাইবে। আর বসন্ত উৎসব মানেই বাঙালি ভিড় করবে রবীন্দ্রনাথের পুণ্যভুমি শান্তিনিকেতনে। হোলি হল ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব। বাঙালির কাছে দোলযাত্রা মানেই শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব। ভোরের আকাশে লাল-হলুদ-সবুজ-গোলাপি আবিরের খেলা। নাচ গান আড্ডা সঙ্গে খাওয়া দাওয়া। বিশ্বভারতীর বসন্ত উৎসব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব হয়ে আসছে। শান্তিনিকেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে দোলযাত্রা পালন হত। নাচগান, আবৃত্তি ও নাট্যাভিনয় করা হত। সন্ধ্যায় গৌরপ্রাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক অভিনীত হয়। ক্রমে সেই উৎসব সার্বজনীন হয়ে উঠল। ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল’ গানটির সাথে আবির মেখে নৃত্যের তালে পা মেলায়নি এমন বাঙালি খুব কমই আছে। বসন্ত উৎসবের সময় প্রচুর মানুষ প্রতি বছরই শান্তিনিকেতনে আসেন বসন্তোৎসবে। বিশ্বভারতীর বসন্ত উৎসব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব হয়ে আসছে। শান্তিনিকেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে দোলযাত্রা পালন হত। নাচগান, আবৃত্তি ও নাট্যাভিনয় করা হত। সন্ধ্যায় গৌরপ্রাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক অভিনীত হয়। ক্রমে সেই উৎসব সার্বজনীন হয়ে উঠল। ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল’ গানটির সাথে আবির মেখে নৃত্যের তালে পা মেলায়নি এমন বাঙালি খুব কমই আছে। বসন্ত উৎসবের সময় প্রচুর মানুষ প্রতি বছরই শান্তিনিকেতনে আসেন বসন্তোৎসবে। শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের ইতিহাস শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব অসুন্দরের মোকাবিলার উৎসব একথা সবার জানা, শান্তিনিকেতনে দোলের দিন যে ঋতু-উৎসবটি উদ্যাপিত হয়, তার সঙ্গে দোল বা হোলির ধর্মীয় অনুষঙ্গের কোনও যোগ নেই। এ হল নিতান্তই ঋতুর উৎসব। সবার রঙে রং মিশিয়ে দেয়ার এক পরম আনন্দ বা উপলক্ষ। শান্তিনিকেতনের দখিনা বাতাসে বসন্ত এলেই সবুজের সমারোহ আর কোকিলের ডাকে আশ্রমিকদের মনে গুনগুনিয়ে উঠত ‘বসন্ত এসে গেছে’। যদিও অপেক্ষা ছিল ফাল্গুনী পূর্ণিমার। বসন্ত উৎসবের সুচনা রবীন্দ্রনাথের বালকপুত্র শমীন্দ্রনাথ ১৯০৭ সালে খেলাচ্ছলে যে ঋতু-উৎসবের সূচনা করেছিলেন, পাঁজি-পুঁথির হিসেব কষলে দেখা যায়, তা অন্তত দোলের দিন অনুষ্ঠিত হয়নি। তারপর বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তিথিতে বসন্ত উদ্যাপন হয়েছে আশ্রমে। বছরের বাঁধা একটা দিনের উৎসবেই তৃপ্ত হত না সে সময়ের আশ্রম। ১৯২৩ সাল। সে বার মাঘী পূর্ণিমায় শান্তিনিকেতনে বসন্তের গানের আসর বসেছিল। আর ফাল্গুনী পূর্ণিমায় আশ্রম-সম্মিলনীর অধিবেশনে আবারও আয়োজন করা হয়েছিল বসন্ত-বন্দনার। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, সে বার শ্রীপঞ্চমীর দিনও আম্রকুঞ্জের সভায় বসেছিল ‘ফাল্গুনী’র গানের আসর। ১৯২৩ সালের আগে আসর বেঁধে বসন্ত উদ্যাপনের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। আজকের ‘বসন্তোৎসব’ সেই দিক থেকে বিশ্বভারতীরই পার্বণ। কেমন ছিল সেই সময়ের বসন্ত উৎসব! বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্র প্রমথনাথ বিশীর ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ স্মৃতি-আলেখ্যে উল্লেখ আছে, ‘উৎসবরাজ দিনু ঠাকুরের নেতৃত্বে খোল-করতাল সহযোগে বসন্তের গান গাইতে গাইতে আশ্রম পরিক্রমা চলতো। আশ্রমিকদের বাড়িতে বাড়িতে তখন আম্রপল্লবের পত্রলেখায় পৌঁছে যেত বসন্তের আমন্ত্রণলিপি। এই আমন্ত্রণ-প্রকরণের মধ্যেও ছিল একটা স্নিগ্ধ আন্তরিকতার স্পর্শ’। সে কালে এই উৎসব হত আশ্রমিকদের ইচ্ছে এবং পরিকল্পনায়। আশ্রমগুরু রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সব সময় উৎসব রচনা করে দিতেন এমনটা কিন্তু নয়। বসন্ত-উৎসব ঠিক রবীন্দ্রনাথের একক ‘রচনা’ নয়। বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের পছন্দ বা ইচ্ছের কথা মাথায় রেখেই আশ্রমের আবাসিকরাই রচনা করতেন উৎসবের গান, নৃত্য ইত্যাদি। আসর শেষে আশ্রমিকেরা যেতেন তাঁদের গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করতে। শান্তিদেব ঘোষ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ১৯৩১ সালের এক আসরে বসন্তের গানের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত নেচে ওঠেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন কলাভবনের ছাত্র বনবিহারী ঘোষ। তাঁদের সেই নাচের সুখ্যাতি গিয়ে পৌঁছয় রবীন্দ্রনাথের কানে। এর কয়েক বছর পর থেকেই আম্রকুঞ্জের সকালের অনুষ্ঠানে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ শুরু হয় আশ্রমগুরু রবীন্দ্রনাথের। আর সেই সময় থেকেই, শান্তিদেব ঘোষের বয়ান অনুযায়ী, শান্তিনিকেতনের ‘দোলের উৎসব’ নতুন মাত্রা পেয়ে হয়ে ওঠে ‘বসন্তোৎসব’। দোলের উৎসবকে নান্দনিক করে গড়ে তোলার প্রয়োজন উপলব্ধি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শান্তিদেব ঘোষ বলেছিলেন, “আগের দোল-উৎসব যেটা হত, সেটাকে গুরুদেব আরও বেশি উৎসাহ দিলেন না কারণ ওই সময় নানা রকম নোংরামি হত। নোংরামি মানে, কাদা দিয়ে দিল এ ওর গায়ে, বা ছেলেরা হয়তো দুষ্টুমি করে কালি দিয়ে দিল, এ রকম এলোমেলো ভাব। রবীন্দ্রনাথ ভাবলেন, এটাকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে বেঁধে দিতে হবে। উনি সকালে ‘বসন্তোৎসব’ বলে একটা বিধিবদ্ধ উৎসব করা ঠিক করলেন। তখন থেকেই আরম্ভ হল সকালবেলার অনুষ্ঠান। তাতে গান হবে, কিছু নাচ হবে। ছেলেমেয়েরা নাচবে, গুরুদেব আবৃত্তি করবেন। তখন থেকেই ‘ওরে গৃহবাসী’ গানটার সঙ্গে নানা রকম অর্ঘ্য সাজিয়ে নিয়ে মেয়েরা আসত এই উৎসবে। ১৯৩৪ সাল থেকে ‘নবীন’ নাটকের জন্য লেখা ওই গানের সঙ্গে শোভাযাত্রায় জুড়ে গেল নাচ। সেই নাচের পরিকল্পনা ছিল শান্তিদেব ঘোষেরই। মণিপুরী নৃত্য শৈলীর একটা সিম্পল স্টেপে সবাই নাচল। শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু তালপাতা দিয়ে বানিয়ে দিতে থাকলেন শোভাযাত্রিকদের হাতের ডালি। তার কোনওটিতে থাকত ফুল, কোনওটিতে আবির। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা যত বাড়তে থাকল, নাচের দলেও এল নানা বৈচিত্র। যুক্ত হল কাঠির নাচ, মন্দিরার নাচ, হাতের তালির নাচ। রবীন্দ্রনাথের বসন্ত ভাবনা রবীন্দ্রনাথের বসন্ত-ভাবনায় উল্লাস-উন্মাদনা নেই, আছে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার এক সুন্দর আকুলতা। জগতের দিকে ব্যাকুল ভাবে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গির সঙ্গে, জগতকে সবটুকু আপন করে না পাওয়ার সূক্ষ্ম একটা বেদনাবোধও জড়িয়ে থাকে রবীন্দ্রনাথের বসন্ত-ভাবনায়। ১৯৮২ সালে ‘বসন্তোৎসব’ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তৎকালীন উপাচার্য অম্লান দত্ত। ‘হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড’ এবং ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র প্রতিবেদনসূত্রে অবশ্য জানা যাচ্ছে, সে বছরও নিয়মরক্ষার বসন্তোৎসব পালিত হয়েছিল শান্তিনিকেতনে। তার পর বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে হয়ে আসছে শান্তিনিকেতনের ‘বসন্তোৎসব’চ। যদিও কোভিড অতিমহামারি থাবা বসিয়েছে এই উৎসবেও। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ বিশ্বভারতী, আনন্দবাজার পত্রিকা।