বসন্ত মানেই মানুষের শ্রেষ্ঠ রঙের উত্সব দোল বা হোলি। প্রায় পাঁচ হাজার বছরেরও প্রাচীন এই দোল উৎসব। ভারতের বিভিন্ন ইতিহাস আর ধর্মগ্রন্থ গুলিতে দেখা যায় পৃথিবীর প্রাচীন একটি উৎসবের মধ্যে দোল বা হোলি উৎসব অন্যতম। মহাভারতের যুগে শ্রীকৃষ্ণা-রাধার দোল উৎসব সবচেয়ে প্রাচীন। তবে হোলিও কিন্তু সমধিক প্রাচীন। পরবর্তী সময়ে শ্রীচৈতন্য দেবের দোল উৎসবের ইতিহাসও প্রায় পাঁচশ বছর বা তারও বেশী প্রাচীন। আধুনিক দোল উৎসব বা বাসন্তী পূর্ণিমার শুরু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র সমীন্দ্রনাথের হাত ধরে। এরপর রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং শান্তিনিকেতনে এই উৎসবের প্রচলন করেন। বাংলায় এই উৎসব ‘দোলযাত্রা’ বা ‘দোল পূর্ণিমা’ বা ‘দোল উত্সব’ নামে পরিচিত। তবে ভারতের বেশির ভাগ রাজ্যেই রঙের উত্সবকে হোলি উত্সব বলা হয়। কিন্তু, এই দোল আর হোলির উৎসবের মধ্যে একদিনের পার্থক্য থাকে। বাঙালিরা যেদিন দোল খেলেন তার পরের দিন হোলি পালিত হয়। দুটি আলাদা আলাদা দিনে একই উৎসব পালন করা হয় দেশজুড়ে। দোল আর হোলির ইতিহাস দোলযাত্রা বা দোল পূর্ণিমা পালিত হয় রাধা-কৃষ্ণের প্রেম কাহিনির ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে, হোলি পালন করা হয় নৃসিংহ অবতারের হাতে হিরণ্যকশিপু বধ হওয়ার যে পৌরাণিক কাহিনি, তার ওপর ভিত্তি করে। এই উৎসব শুরুর আগের দিন অর্থাৎ ‘ন্যাড়া পোড়া’ বা ‘হোলিকা দহন’ হয়ে থাকে। অর্থাৎ, ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা রাতের পর দিন দোল উত্সব পালন করা হয়। মনে করা হয় এদিনই রাধা আর তাঁর সখীরা দল বেঁধে আনন্দে রং খেলায় মেতে উঠেছিলেন। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মুখটি সুগন্ধি ফুলের কুড়ির রঙ দিয়ে রাঙিয়ে নিলেন আর গন্ধযুক্ত করলেন। সেদিনই শ্রীকৃষ্ণ, রাধাকে নিজের প্রেম নিবেদন করেছিলেন। পুরাণে বলা হয়েছে, হোলি উৎসব হল ভগবান বিষ্ণু আর উনার ভক্ত প্রহ্লাদকে কেন্দ্র করে। তিনি ছিলেন রাক্ষস রাজা হিরণ্যকশীপুর ধর্মপ্রাণ পুত্র। রাক্ষস রাজা হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন পরম বিষ্ণুভক্ত। সেকারণেই, প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে আগুনে নিক্ষেপ করার পরিকল্পনা করেন। বিষ্ণুর কৃপায় সেই আগুন প্রহ্লাদকে স্পর্শ করতে না পারলেও সেই আগুনে পুড়ে মারা যান হোলিকা। এরপর থেকেই অশুভের উপরে শুভ শক্তির জয় উদযাপনের জন্য সারা বিশ্বে এই হোলি পালিত হয়। আর এই কারণেই হোলির আগের দিন রাতে পালিত হয় হোলিকা দহন যা বাংলায় বুড়িঘর বা ন্যাড়াপোড়া নামে পরিচিত। শ্রীকৃষ্ণ-প্রহ্লাদের গল্প ধর্ম ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও উৎসবের আনন্দে মানবতার বাণীকেই ধারণ করে আছে যুগ যুগ ধরে। বারো মাসে তেরো পার্বণের ন্যায় হিন্দুধর্মে লেগে আছে ঋতুভিত্তিক উৎসব। এই সকল উৎসব ধর্মের গণ্ডী অতিক্রম করে সার্বজনীন এবং উদার দার্শনিক তত্ত্বে ঋদ্ধ। প্রাচীন ঋষিরা তাই হিন্দু ধর্মকে ক্ষুদ্র গণ্ডীতে আবদ্ধ করে রাখতে চাননি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর ইতিহাস হিন্দু ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোত জড়িত। হোলিও তেমনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির উত্থানের এক ইতিহাস। বসন্ত পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন। কোথাও কোথাও অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর তার রক্ত ছিটিয়ে সকলে আনন্দ করেছিল সেদিন। এই অন্যায় শক্তিকে ধ্বংসের আনন্দই মহোৎসবে পরিণত হয়। পুরাণে উল্লেখ রয়েছে আরেকটি গল্পেরও। ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকিশপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে প্রহ্লাদের কোনো ক্ষতি হয় না কিন্তু হোলিকা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বিষ্ণু ভক্ত প্রহ্লাদের এই জয় ছিল সত্যের জয়। তাই এই ঘটনাই আনন্দ উৎসবে পরিণত হয়। এই দহনকে হোলিকা দহন বলা হয়। হোলিকা দহন বা ন্যাড়া পোড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হোলির রীতি ও বিশ্বাস আলাদা আলাদা। সমগ্র বাংলাদেশে বৈষ্ণব প্রাধান্য রীতি প্রচলিত। অবিভক্ত শ্রীহট্ট জেলায় বসবাস করতেন শ্রীচৈতন্য দেবের পূর্বপুরুষ। শ্রীচৈতন্য দেবও দোল আর হোলি উৎসবে সামিল হতেন। রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি অনেক আগে থেকেই সংগ্রহ করে একসাথে জড়ো করে তাতে অগ্নি সংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয়। পরের দিন হয় রঙ খেলা। বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম। একে বাংলাদেশে বলা হয় ‘চাঁচর’। এই চাঁচরেরও অন্যরকম ব্যাখ্যাও আছে। দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব। পাতাঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন ‘চাঁচর’ উদযাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়। অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উৎসবের আলাদা আলাদা রীতি থাকলেও উদযাপনের রীতি একই রকম। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন। যুগে যুগে এর অনুষ্ঠান এবং রীতি পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন। যুগে যুগে দোল উৎসব দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও ‘জৈমিনি মীমাংসা’য় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। ৭ম শতাব্দীর এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক ‘হোলিকোৎসব’ পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। হর্ষবর্ধনের নাটক ‘রত্মাবলী’তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে। এমনকি আল বেরুনীর বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সামিল হতেন। মধ্যযুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পগুলোর অন্যতম প্রধান বিষয় রাধা-কৃষ্ণের রঙ উৎসব। শ্রীকৃষ্ণের ঝুলন থেকে দোল কথার উদ্ভব। বাঙালি তথা হিন্দু সমাজের অন্যতম মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যের জন্মতিথি হচ্ছে এই পূর্ণিমা তিথি তথা হোলি তিথি। এই মহান পুরুষের জন্ম এই উৎসবকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ধর্মীয় গণ্ডী ছাড়িয়ে হোলি উৎসব আজ সার্বজনীন। অন্যায়কে পরাজিত করে আনন্দে আর সবার মন রাঙিয়ে উঠুক এটাই চেয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাই উনার গানেই দোলের মর্মার্থ খুঁজবো আমরা, ‘ওরে গৃহবাসী খোল, দ্বার খোল, লাগলো যে দোল, স্থলে জলে বনতলে লাগলো যে দোল। দ্বার খোল, দ্বার খোল। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ সনাতন ধর্ম জিজ্ঞাসা, সঞ্জয় সরকার, সম্পদ দাশ, গ্রন্থকুটির প্রকাশনী।