আজকের বিশ্বের সর্ব বৃহৎ শক্তি যুক্তরাষ্ট্রও এক দিন ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্তর্গত ছিল। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে উত্তর আমেরিকার ১৩টি প্রদেশ এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে ‘ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা’ গঠন করে, ইতিহাসের পাতায় যেটি আমেরিকান বিপ্লব নামে পরিচিত। এই বিপ্লবী যুদ্ধ শুরু হয় ব্রিটিশ বাহিনী ও উপনিবেশের স্থানীয় সশস্ত্র বাসিন্দাদের মধ্যে একটি ছোট খণ্ডযুদ্ধের মাধ্যমে। এই খণ্ডযুদ্ধটি হয় ১৭৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল। এই যুদ্ধের ফলে অন্যান্য স্থানেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে এবং ২৫০ জনের বেশি ব্রিটিশ সৈন্য হতাহত হয়, আর আমেরিকানরা হারায় ৯৩ জন বিপ্লবীকে। বস্টনের আশপাশে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতে থাকে। এর মধ্যে উপনিবেশের প্রতিনিধিরা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে ফিলাডেলফিয়ায় ছুটে যান। অধিকাংশই ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। তাঁরা উপনিবেশের মিলিশিয়াদের কন্টিনেন্টাল আর্মিতে রূপান্তর করতে সম্মত হন এবং ভার্জিনিয়ার জর্জ ওয়াশিংটনকে কমান্ডার ইন চিফ মনোনীত করেন। একই সময় দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস একটি শান্তি প্রস্তাবনা গ্রহণ করে রাজা তৃতীয় জর্জকে আরও সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানান। কিন্তু রাজা এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে ২৩ আগস্ট ঘোষণা করেন যে, আমেরিকান উপনিবেশগুলো বিদ্রোহে লিপ্ত। পরবর্তী মাসগুলোতে স্বাধীনতার ডাক আরও জোরদার হল। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক টমাস পেইন বিচ্ছিন্নতাবাদের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে সাহায্য করেন। ‘কমন সেন্স’ নামের একটি পুস্তিকাতে তিনি উত্তরাধিকারভিত্তিক রাজতন্ত্রের ধারণার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি আমেরিকার জন্য দু'টি বিকল্প উপস্থাপন করেন – স্বৈরাচারী রাজা ও প্রাচীন শাসন ব্যবস্থার অধীনে অব্যাহত অধস্তনতা, অথবা স্বাধীন, স্বনির্ভর প্রজাতন্ত্রে স্বাধীনতা ও সুখ উপভোগ করা। দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস ভার্জিনিয়ার টমাস জেফারসনের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। এর ওপর দায়িত্ব বর্তায় রাজার বিরুদ্ধে উপনিবেশগুলোর ক্ষোভ এবং আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করে একটি নথি তৈরি করা। স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র গৃহীত হয় ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই। সেই থেকে ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই আমেরিকানরা স্বাধীন হয়ে যায়নি। ব্রিটিশ বাহিনী কন্টিনেন্টাল বাহিনীকে নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে সম্পূর্ণ রূপে পরাভূত করে। তারা পেনসিলভ্যানিয়ার ব্রান্ডিউইনে আমেরিকানদের পরাজিত করে। তারা ফিলাডেলফিয়া দখল করে নেয় এবং কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসকে পালাতে বাধ্য করে। আমেরিকান বাহিনী নিউ ইয়র্কের সারাটোগা এবং নিউ জার্সির ট্রেন্টন ও প্রিন্সটনে বিজয়ী হয়। তার পরও জর্জ ওয়াশিংটন অতি প্রয়োজনীয় লোকবল ও রসদ সংগ্রহে ক্রমাগত লড়াই করে যান। বড় ধরনের সাহায্য আসে ১৭৭৮ সালে যখন ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। ম্যাসাচুসেটসের লেক্সিংটনে শুরু হওয়া লড়াই আট বছর ধরে চলে। যুদ্ধ সংঘটিত হয় উত্তরে কানাডার মন্ট্রিল থেকে শুরু করে দক্ষিণে জর্জিয়ার সাভানাহ পর্যন্ত। ১৭৮১ সালে ভার্জিনিয়ার ইয়র্কটাউনে বিপুল সংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু এর পরও আরও দু’ বছর ধরে যুদ্ধ চলে। অবশেষে ১৭৮৩ সালের ১৫ এপ্রিল শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্যারিস চুক্তি ১৩টি সাবেক আমেরিকান উপনিবেশের, বর্তমানে অঙ্গরাজ্যের, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মুক্তির স্বীকৃতি দেয়। সূত্র: ittefaq.com.bd