খেলনা আমরা সবাই পছন্দ করি। আমাদের দেশের মেয়েরা সাধারণত পুতুল বা রান্নাবাটির খেলা দিয়েই জীবন শুরু করে। কারন ছোট থেকেই মেয়েদের ঘর থেকে বেরনো নিষেধ। আর এই খেলনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয় যায় মেয়েদের আগামী জীবনের হাতছানি। ছেলেদের খেলনা অবশ্য একটু অন্যরকম। কাঠের গাড়ী, ঘোড়া, পশু-পাখী, ঘুড়ি লাটাই, ফুটবল, ক্রিকেট তাদের প্রিয়। কিন্তু যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিশুর মনের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। খেলনাতেও এসেছে অনেক আধুনিকতা। আজকাল বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাই ভিডিও গেম খেলতেই বেশী অভ্যস্থ। তবে এই খেলনার কনসেপ্ট নিয়েই কিন্তু বিজ্ঞান পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়েছে অনেক দরকারি জিনিস। তাই খেলনার গুরুত্ব কিন্তু কোন অংশেই কম নয়। খেলনা কি? খেলাধূলায় ব্যবহৃত সামগ্রীই খেলনা। সাধারণতঃ শিশুরা আর ঘরে পোষা জীবজন্তুরাই খেলনা নিয়ে খেলে, যদিও প্রাপ্তবয়স্কদের বা বন্য প্রাণীদের খেলনা নিয়ে খেলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। খেলনা হিসেবে প্রচুর কিছু বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা হয়। আবার খেলার জন্য তৈরি করা হয়নি এমন যে কোন কিছুকেই খেলনা হিসেবে কল্পনা করে তা নিয়ে কেউ খেলতে পারে। ঘরের যে কোন জিনিসকে এরোপ্লেন ভেবে নিয়ে 'উড়িয়ে' নিয়ে যেতে পারে একটি শিশু। আবার একটা পাইন কোনকে থাপড়ে, চাপড়ে, তাড়া করে, শূন্যে ছুঁড়ে খেলতে পারে কোন প্রাণী। কিছু কিছু খেলনা আবার প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র খেলনা সংগ্রহকারীর জন্যই তৈরি করা হয়, খেলার জন্য নয়। খেলনার বিবর্তন যুগে যুগে একটা মাটির পুতুল, খেলনা বন্দুক, মোটর গাড়ি, নিদেনপক্ষে একখানা বাঁশির জন্যে হত্যে দিয়ে কাঁদেনি বড়দের কাছে এমন ছেলেমেয়ে একজনও নেই। আমাদের সবার শৈশবের আমাদের জানের চেয়েও প্রিয় ছিল, হাঁড়িকুড়ি, পুতুল, কাটা কাপড়ের টুকরো, লুডো, কাঠের গাড়ী, ঘোড়া, তীর-ধনুক, পিস্তল আর উড়োজাহাজ। বোকা পুতুলটা কথা বোঝে না, ভাত দিলে খায় না, কাপড় পরালে হাসে না কিন্তু তাকে নিয়েই ঘুমোতে যায় ছোট্ট শিশুটি। কবে তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম খেলনা? কোন মা হয়তো তার ক্রন্দনরত শিশুকে কিছুতেই মানাতে পারছেনা, তাই শিশুটির মন ভোলাবার জন্যে তার সামনে তুলে দিল ঝিনুকের মালা, বা একমুঠো নুড়ি পাথর। সেই থেকে শুরু খেলনার ইতিহাস। কিন্তু শিশুর খেলার জন্যে প্রথম খেলনাটি কবে তৈরি হয়েছিল সেকথা কেউ জানে না। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলেন, খৃস্ট জন্মের তিন হাজার বছরেরও আগে মেসোপটেমিয়ায় খেলনার প্রচলন ছিল। সেই সময়কার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সঙ্গে পাওয়া গেছে পুতুলের আসবাবপত্রের ভাঙাচোরা অবশিষ্ট, গাড়ির চাকা ইত্যাদি। মিশরের প্রাচীন সমাধি গুলোতেও বিভিন্ন উপকরণের সঙ্গে খেলনার ভাঙ্গা অংশ পাওয়া যায়। খেলনাতে রয়েছে সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার প্রভাব দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের খেলনায়। প্রাচীন গ্রিসের ছেলেমেয়েদের কাছে প্রিয় খেলনা ছিল নৌকা আর রথ। তৎকালীন গ্রিসের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ছোটদের এই পছন্দের স্পষ্ট একটা সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যায়। গ্রিসে পোড়ামাটির পুতুল, বল ইত্যাদিও শিশুদের কাছে খুব প্রিয় ছিল। রোমানদের আমলে তৈরি হল যুদ্ধের রথ, কাঠ-খোদাই ঘোড়া, মার্বেল আর অস্ত্রধারী সৈন্য। ইতিহাসের পথ ধরে বিবর্তিত হতে-হতে খেলনা আমাদের সময়ে এসেও যুগের চেহারাটা তুলে ধরছে স্পষ্টভাবে। আধুনিক সময়ে এসে যেকোনো খেলনার দোকানে গেলেই এখন আমরা দেখি ব্যাটারি চালিত উড়োজাহাজ, রকেট, ট্যাঙ্ক, মেশিনগান, ক্যামেরা মোবাইল আরও কত কি! কিন্তু এখন থেকে মাত্র কুড়ি-ত্রিশ বছর আগেও ছোটদের একটি বন্দুক অথবা বিশ্রী মডেলের গাড়ি নিয়েই খুশি থাকতে হত শিশুদের। বর্তমান সময়ের খেলনাগুলোর রূপ প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে এই সময়ের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সম্পর্কে সুন্দর একটা ধারণা পাওয়া যাবে। কিন্তু এমন কিছু খেলনাও আছে যা নাকি চিরন্তন। যেমন, পুতুল, ঘুড়ি, বল ইত্যাদি ইত্যাদি। মিশরের প্রাচীন সমাধিতে পাওয়া মাটির পুতুলের সঙ্গে আধুনিক যুগের পুতুলের তফাৎ অনেক, তবুও পুতুল ঠিক পুতুলই কিন্তু আছে। যদিও আজকের পুতুল কথা বলে, হাত-পা নাড়ে, কাঁদে কিন্তু তবুও পোড়ামাটির পুতুলের জনপ্রিয়তা এখনও কিন্তু ছোটদের কাছে একটুও কমে যায়নি। এমনি ধরনের আরও খেলনা হচ্ছে ঘুড়ি, লাটিম ইত্যাদি। ঘুড়ি আর যুদ্ধ-বিজ্ঞান আজ থেকে প্রায় ২২০০ বছর আগে প্রথম ঘুড়ি আবিষ্কার করেন চীনের এক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ‘জেনারেল হা-সিন’। ঘুড়ি আবিস্কারের পেছনে এই সেনা আধিকারিকের উদ্দেশ্য ছিল, নিজের শিবির থেকে শত্রুর শিবিরের দুরত্ব মাপা। ওটাই শেষপর্যন্ত খেলনার রূপ নেয়। কিন্তু এই খেলনা-ঘুড়িই মানুষকে এক আশ্চর্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে সহায়তা করেছে। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন একদিন ঘুড়ির মাধ্যমেই প্রমাণ করেছিলেন যে বজ্রপাতের সঙ্গে বিদ্যুতের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। এর পরও ঘুড়ি মানুষকে উড়োজাহাজ তৈরি করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে বলে মনে করা হয়। বনবন করে ঘোরা লাটিমও আবর্তন, পরিক্রমণের সূত্র ভালোভাবে বুঝতে মানুষকে সাহায্য করেছে। কাজেই খেলনা শুধুমাত্র খেলনা নয়। শিশুদের অজান্তেই খেলনাগুলো শিক্ষা এবং বিজ্ঞানে দারুন ভূমিকা পালন করে। আজকাল প্লে-স্কুলের কথাতো আমরা সবাই জানি। আধুনিক শিক্ষায় প্লে-স্কুলের ভুমিকা অনস্বীকার্য। ভারতে খেলনা শিল্প খেলনার ক্ষেত্রে ভারতের কাছে ঐতিহ্য যেমন আছে, প্রযুক্তিও আছে। নানারকম ধারনা যেমন আছে, তেমনই দক্ষতাও আছে। আমরা বিশ্বকে পরিবেশ-বান্ধব খেলনার দিকে ফিরিয়ে আনতে পারি। আমাদের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা কম্পিউটার গেমগুলির মাধ্যমে ভারতের প্রাচীণ কথাগুলি, যেগুলি ভারতের মৌলিক সম্পদ, সেই কথাগুলিকে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১০০ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক খেলনা বাজারে আজ ভারতের অংশীদারিত্ব খুব কম। দেশের ৮৫ শতাংশ খেলনা বাইরে থেকে আসে এবং বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমাদের খেলা ও খেলনার ক্ষেত্রেও দেশকে আত্মনির্ভর করে তুলতে ভারত সরকার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি আমাদের খেলনাগুলির মধ্যে শিশুদের জন্য আমাদের মূল্যবোধ, শিষ্টাচার এবং শিক্ষার প্রভাব যাতে থাকে সেদিকে বিশেষ নজর দিয়েছে সরকার। ২০২০ সাল থেকে খেলনাগুলির কোয়ালিটি টেস্ট অনিবার্য করা হয়েছে ভারতে। আমদানিকৃত খেলনাগুলির প্রত্যেক পর্যায়ে স্যাম্পেল টেস্টিং-এর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এখন দেশ খেলনা শিল্পকে ২৪টি প্রধান শিল্পের মধ্যে মর্যাদা দিয়েছে। ন্যাশনাল টয় অ্যাকশন প্ল্যানও রচনা করা হয়েছে। এতে ১৫টি মন্ত্রক এবং বিভাগকে সামিল করা হয়েছে যাতে দেশ খেলনার ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর হয়ে ওঠে। আর ভারতের খেলনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ পি আই বি, ভারত সরকার