এই পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত কত কিছু যে ঘটছে তার কোন হিসেব আমরা রাখিনা। কেউ নিজের স্ত্রীর হাতের ছবি তুলে নোবেল পুরষ্কার পাচ্ছেন, কেউ হয়তো পর্দা দেখে আবিস্কার করছেন নেগেটিভ বা পজিটিভ ফিল্ম। ফটোগ্রাফি আসলে একটা আর্ট। তবে এর সাথে জুড়ে আছে গত প্রায় দুইশ বছর ধরে অনেক বিজ্ঞানী, গবেষক এবং ফটোগ্রাফারদের নিরলস পরিশ্রম। আজকের এই ডিজিটাল ফটোগ্রাফির ভিড়ে এখনও কিন্তু সেই ইতিহাস জ্বলজ্বল করছে স্বমহিমায়। জানেন কি বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরাটি সাড়ে আট পাউন্ড ওজন ছিল, যা চালাতে ১৬টি ব্যাটারি লাগত। ভাবুন এতো বড় ক্যামেরা নিয়ে আমরা বেড়িয়েছি ফটোগ্রাফি করতে! ফটোগ্রাফি নিয়ে এমনই কিছু ইতিহাস জানবো এই প্রতিবেদনে। এক্সরে ছবি তুলে নোবেল প্রথম এক্সরে ছবিটি ধারণ করা হয়েছিল ১৮৯৬ সালে। সদ্য বিবাহিত অ্যানা বার্থা একটি সুন্দর আংটি পরে বসেছিলেন। স্বামী বিশ্বখ্যাত জার্মান বিজ্ঞানী 'উইলহেলম কনরাড রান্টজেন’। হঠাৎ নিজের স্ত্রীর হাতের আংটি’টির দিকে চোখ পড়লো আত্মভোলা সেই মানুষটির। ১৮৯৫ সালের শেষদিকে এই বিজ্ঞানী পরীক্ষাগারে গবেষণা করার সময়েই দেখতে পেয়েছিলেন, ‘ব্যারিয়াম প্লাটিনোসায়ানাইড’ নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ নতুন এক ধরণের রশ্মি বিকিরণ করছে। বিদ্যুৎ খেলে গেল বিজ্ঞানীর মাথায়। তারপর এই রশ্মির সাহায্যেই তিনি বিশ্বের প্রথম এক্সরে ছবিটি তুললেন। নিজের স্ত্রি’র হাতের ছবি তুলে নিজেই হতবাক হয়ে যান। কারন প্রথমবারের মত নিখুঁতভাবে কাটাছেঁড়া ছাড়াই মানবদেহের অভ্যন্তরের দৃশ্য দেখা সম্ভব হল। আজকের সময়ে এক্সরে কতটা জরুরী তা আমরা সবাই জানি। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী আবিস্কার। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তিনি ১৯০১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। পৃথিবীর প্রথম ফটোগ্রাফার ফটোগ্রাফির ইতিহাসে ফরাসি উদ্ভাবক 'জোসেফ নিসেফোর নিপস' (১৭৬৫-১৮৩৩) এক প্রথম ফটোগ্রাফার হিসেবেই পরিচিত সারা বিশ্বে। কারন নিসেফোর নিপস'কেই বলা হয় ফটোগ্রাফির জনক এবং বিশ্বের প্রথম সফল ফটোগ্রাফার। তিনি বিশ্বের প্রথম ফটোগ্রাফটি তৈরি করেন ১৮২২ সালে। এটি ছিল পোপ সপ্তম পিউসের একটি প্রতিকৃতির ফটোগ্রাফ। কিন্তু ছবিটির একটি কপি তৈরি করতে গিয়েই প্রথম ছবিটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই একই পদ্ধতিতে পরে আরেকটি ফটোগ্রাফ তৈরি করা হয়। সেই ফটোগ্রাফটিকেই বিশ্বে ফটোগ্রাফির প্রথম নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়। সতের শতকের একটি খোদাই করা ফ্লেমিশ চিত্রকর্মের উপর ভিত্তি করে নীপস এটি তৈরি করেছিলেন ১৮২৫ সালে। তবে ২০০২ সালে এই ফটোগ্রাফটি আবিষ্কৃত হওয়ার আগে পর্যন্ত নীপসের তোলা অপর আরেকটি ছবিকেই বিশ্বের প্রথম ফটোগ্রাফ বলে ভাবা হত। পৃথিবীর প্রথম প্রকৃতির ফটোগ্রাফ পৃথিবীর প্রথম প্রকৃতির ছবি তোলার রেকর্ডও বিশ্বের প্রথম ফটোগ্রাফার 'জোসেফ নিসেফোর নিপস-এর দখলে। ‘View from the Window at Le Grass’ নামক একটি ছবি 'জোসেফ নিসেফোর নিপস' তুলেছিলেন ১৮২৬ সালে। ফটোগ্রাফির ইতিহাসে বিখ্যাত এই ছবিটিকে বলা হয় প্রাকৃতিক দৃশ্যের প্রথম সফল এবং স্থায়ী ফটোগ্রাফ। ছবিটি ডেভেলপ হতে প্রায় আট ঘন্টা সময় লেগেছিল বলে এটি ঝাপসা এবং এই সময়ের মধ্যে সূর্যের অবস্থান পরিবর্তিত হওয়ায় ছবিটিতে অট্টালিকার উভয় পাশই আলোকিত দেখা যায়। নেগেটিভ থেকে পজেটিভ পদ্ধতির উদ্ভাবন হয় ১৮৩৫ সালে প্রথম দিকের ফটোগ্রাফিতে নেগেটিভের কোন বালাই ছিল না, বরং ছবির সরাসরি পজিটিভ তৈরি করা হত। ফলে একই ফটোগ্রাফ থেকে বারবার কপি তৈরি করা যেত না। কিংবা কপি তৈরি করার চেষ্টা করলে আগের মূল ফটোগ্রাফটি নষ্ট হয়ে যেত। তবে ১৮৩৫ সালে 'হেনরি ফক্স ট্যালবট' নামের একজন ব্রিটিশ উদ্ভাবক সর্বপ্রথম নেগেটিভ থেকে পজিটিভ করে ছবি তোলার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই ছবিটিতে নেটের পর্দা লাগানো একটি জানালার নেগেটিভ ও পজিটিভ ছবি দৃশ্যমান ছিল। বিশ্বের প্রথম মানুষের ছবি ‘লুই দাগ্যায়ার' নামের একজন ফরাসি উদ্ভাবক ১৮৩৮ সালে প্যারিসের একটি রাস্তার ছবি তোলেন। যাতে প্রথমবারের মত একজন সত্যিকারের মানুষকে বসে থাকতে দেখা যায়। এই ছবিটিতে একটি ব্যস্ততম রাস্তার ছবি হলেও রাস্তায় কোন রকম যানবাহন না থাকার কারনে ছবিটি ডেভেলপ হতে প্রায় দশ মিনিট সময় লেগেছিল যার কারনে রাস্তার অন্যান্য চলমান লোকজন ও গাড়িঘোড়া দৃশ্যটি থেকে মুছে যায়। তবে ছবিটিতে রয়ে গেছে শুধু রাস্তার মোড়ে সেই দশ মিনিট ধরে স্থিরভাবে দাঁড়ানো একটি মানুষ। নাম না জানা সেই মানুষটি সম্ভবত জুতা পালিশ করাচ্ছিলেন। এবং এই নাম না জানা মানুষটিই শেষপর্যন্ত ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন। তবে পৃথিবীর প্রথম ছবি মানুষটির পরিচয় আজও কিন্তু অজানাই রয়ে গেল। ১৯৭৫ সাল; ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা প্রথম ছবি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের কোডাক ল্যাবরেটরিতে ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা হয় বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল ছবি ১৯৭৫ সালে। এর এক বছর আগে, ১৯৭৪ সালে কোডাকের অ্যাপ্লাইড ইলেকট্রনিক্স রিসার্চ সেন্টারের প্রকৌশলী 'স্টিভেন স্যাসন'কে একটি ইলেক্ট্রনিক স্টিল ক্যামেরা উদ্ভাবনের দায়িত্ব দেয়া হয়। পরের বছর তিনি সাড়ে আট পাউন্ড ওজনের বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরাটি তৈরি করেন। যা চালাতে ১৬টি ব্যাটারি লাগত। মজার ব্যাপার হল, এই ক্যামেরাটি ক্যাসেটের ফিতায় ছবি ধারণ করত। আর তখনও আবিষ্কৃত হয়নি কমপ্যাক্ট ডিস্ক, পার্সোনাল কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেট। পৃথিবীর প্রথম ছবি পৃথিবীর প্রথম ছবি কোন মানুষের ধারন করেন নি। ১৯৬৬ সালের ২৩ শে আগস্ট তারিখে চাঁদ থেকে তোলা পৃথিবীর প্রথম ছবিটি তুলেছিল 'লুনার অরবিটার-১' নামের নভোযান। ২ লক্ষ ৩৬ হাজার মাইল দূর থেকে তোলা এই ছবিতে নাকি রাতের আঁধারে ঢাকা তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনের পূর্বাংশে অবস্থিত অর্ধেক পৃথিবী দৃশ্যমান হয়েছিল। এখন ফটোগ্রাফির গুণগত মান ও অনেক বেড়েছে। বাজারে এসেছে নানান ধরনের, ডিজিটাল ক্যামেরা, ডিএস এল আর, তাছাড়া বিভিন্ন মোবাইল ফোনেও এখন উন্নত মানের ফটো তোলা যায়। ফটোগ্রাফি একটি সৃজনশীল কাজ । এই শিল্পকে প্রতিষ্টিত করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে ফটোগ্রাফি সোসাইটি । তাছাড়া বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে এই ফটোগ্রাফির অনেকটাই চাহিদা রয়েছে। সময়ের সাথে হারিয়ে যায় সময়ের অনেক কিছু স্মৃতি। যখন ক্যামেরা ছিলোনা, বা কাগজ ও তৈরি হয়নি, তখন থেকেই মানুষ কোনো স্মৃতি কে ধরে রাখার জন্য পাথর, কাঠে বিভিন্ন ধরনের ছবি এঁকে রাখতো। সময়ের সাথে সাথে সব কিছু পরিবর্তন হয়েছে। এখন মানুষ ক্যামেরার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ছবি তুলছে। শুধু মাত্র এক ক্লিকেই ফ্রেম বন্ধি হচ্ছে অসংখ্য ছবি। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ সমসাময়িক সংবাদপত্র এবং উইকিপিডিয়া