নুন ছাড়া কোন খাওয়ারই ঠিক স্বাদ পাওয়া যায়না। আবার পরিমাণের বেশী খাবারে নুন হলেই খাওয়ার বিস্বাদ হয়ে যায়। আমরা সবাই এই নুনের সাথে পরিচিত। কিন্তু এই নুনের অনেক ইতিহাস আছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধীজীর লবণ সত্যাগ্রহ সম্পর্কে আমরা সবাই পরিচিত। নুন মিশরীয়দের পবিত্র একটি পদার্থ। আবার নুনের সাথেই জুড়ে আছে সৈনিকদের বেতনের ইতিহাস। প্রতিদিন আমাদের পাতে নুন চাই। কিন্তু নুনের এই শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে আমরা কতটা ওয়াকিবহাল! তবে পাতে নুন বর্জনীয়। চিকিৎসকরা কিন্তু এই নিদানই দিচ্ছেন। তাই পাতে নুন না খাওয়াই ভালো। নুন নিয়ে আছে মজার মজার গল্প আর প্রবাদ। নুন খেলে গুণ গাইতে হয়। এই প্রবাদ বাক্যটি ঠিক কখন ব্যবহার হয়েছিল তা জানা না গেলেও নুন নিয়ে আছে হাজারো গল্প আর প্রবাদ। আরব্য রজনী ‘আলি বাবা আর চল্লিশ চোরে’ও লবণ নিয়ে আছে এক গল্প। চল্লিশ ডাকাতের সর্দার যখন কারও বাড়িতে ডাকাতি করতে যেত, তখন সে নাকি ঐ বাড়ির বাড়তি নুন খেতে অস্বীকার করত। কারণ নুন খেলে নাকি সে আর বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবে না। এই দেখেই আলিবাবার পরিচারিকা মর্জিনা ধরে ফেলেছিল যে সে আসলে অতিথি বেশে ডাকাত। সাথে আছে এক রাজার সেই তিন মেয়ের গল্প। যে গল্পে রাজার ছোট মেয়ে রাজাকে ‘নুনের’ মত ভালবাসে শুনে রাজা নিজ রাজ্য থেকে নিজের মেয়েকেই বিতাড়িত করে দেন। রাজকন্যা এক বনের মধ্যে গিয়ে অনেক কষ্টে জীবন কাটাচ্ছিল। পরবর্তীতে একদিন সেই রাজা হাজির হন সেই বনে। বনের মধ্যে ক্ষুধার্ত রাজা নিজের মেয়ের হাতের বানানো খাবার খেয়ে পুনরায় পুত্রিকে বুকে জড়িয়ে নেয়। কোথা থেকে এলো লবণ? হাজার হাজার বছর আগে থেকে মানুষ খাওয়ারে লবণের ব্যবহার শুরু করে। তবে তখনকার এই লবণ আজকের যুগের সাগরের জল পরিশুদ্ধ করে প্রক্রিয়াজতকৃত লবণ নয়। তখন লবণ সংগ্রহ করা হতো খনি থেকে। সেই সময়ের লোকেরা নিজস্ব উপায়ে খনি থেকে লবণ উত্তোলনের প্রক্রিয়া শিখে নিয়েছিল। চীনের সানশি প্রদেশের ইয়নচুনে এরকম এক খনির কথা জানা যায়। এটাই এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন নুনের খনি যেখান থেকে মানুষ মাটি খুঁড়ে লবণ বের করতে পারতো। সম্প্রতি তুরস্কে ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৩০০ ফুট নীচে ৫ হাজার বছর আগেকার এক লবণের খনির খোঁজ পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে বানানো হয়েছিলো এই লবণ খনি যা আজও ব্যবহারযোগ্য। খনির আসল মালিক ছিলো হিটিসরা, যারা প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, এবং তারা নিজেদের হাতকেই খনি থেকে লবণ তোলার কাজে ব্যবহার করতো। ধারণা করা হচ্ছে এখানে এখনও ১ বিলিয়ন টন লবণ মজুত রয়েছে। এখনও এই খনি থেকে প্রতিদিন ৫০০ টন লবণ সংগ্রহ করা হয়। ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে সিসিলিতে অপরূপ ডোরাকাটা লবণের একটি খনি দেখতে পাওয়া যায়। খনিটি প্রায় ২০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে আছে। আজ থেকে প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে ভূমধ্যসাগর আংশিক বা সম্পুর্ণ শুকিয়ে যাওয়ার সময় এই অসাধারণ আকারের খনিটি তৈরি হয়। লবণের ব্যবহার এবং ইতিহাস খাওয়ার পাশাপাশি আরও বিভিন্ন কাজে লবণের ব্যবহার শুরু হয়ে আসছে অনেক বছর আগে থেকেই। অনেক ধর্মে লবণ খুব পবিত্র ব্যাপার। জাপানের শিন্টোরায় যে কোন মানুষ বা স্থানকে পরিশুদ্ধ করতে লবণ ছিটিয়ে দেয়া হয়। এ জন্য সুমো কুস্তীগিরদের উপর লবণ ছিটিয়ে দেয়া হয়। হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরীয়রা লবণকে পবিত্র বলে মনে করত। তাই তারা কবরে লবণ রাখত। মৃতদেহ লবণ দিয়ে মাখালে তা টিকে থাকে অনেকদিন। তাই তারা মৃত মানুষের কবর দেবার সময় লবণ রেখে দিত। লবণের অন্য ধরনের ব্যবহারও তখন থেকে চালু হয়ে আসছে। লবণ মেখে খাবার সংরক্ষণ করার উপায় বের করেছিলেন মিশরীয়রাই। মিশরীয়রা মাছে লবণ মাখিয়ে বিক্রি করতো ফিনিশিয়দের কাছে। লবণের নানান ধরনের ব্যবহারের ফলে লবণের ব্যবসা অনেক জমজমাট হয়ে ওঠে। লবণ বিক্রির জন্য আফ্রিকায় একটি আলাদা রাস্তা তৈরি হয়েছিল। সেই রাস্তা আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির মধ্যে দিয়ে গেছে। এই রাস্তা দিয়ে টুয়ারেগ নামের এক জাতি বছরে প্রায় ১৫০০০ টন লবণ নিয়ে যেত। লবণের ইতিহাস কিন্তু শুধু খাওয়ায় লবণের ব্যবহার বা লবণ নিয়ে বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রাচীন রোমে সৈন্যদের বেতন দেয়া হতো এই লবণ দিয়ে। ইংরেজিতে ‘সোলজার’ মানে হলো সৈন্য আর সেলারি মানে বেতন। এই দুটি শব্দ এসেছে ‘সল্ট’ থেকে। আজ আমরা যে সালাদ খায় সে শব্দটিও এসেছে সল্ট থেকে সল্টেড হয়ে। লবণ নিয়ে রীতিমত একটা আন্দোলন হয়েছিল যেটিকে লবণ আইন অভিযান বা লবণ সত্যাগ্রহ বলা হয়। ইংরেজিতে একে সল্ট মার্চ বলে অবিহিত করা হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই আন্দোলনের বিশেষ মর্যাদা ছিল। আর এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। লবণের উপর ব্রিটিশ সরকার যে কর আরোপ করে তারই প্রতিবাদে এই অভিযান হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই দিন গান্ধীজির যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই আন্দোলন যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া এবং সমসাময়িক সংবাদপত্র