ক্রিকেট ব্যাট ব্যবহারের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৬২৪ সালে। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো বলে স্বীকৃত ব্যাটটি আছে লন্ডনের ওভালের সংগ্রহশালায়। ১৮০০ শতকের আগেও ব্যাটের আকার ছিল সরু বা অনেকটা হকি স্টিকের মতো। ১৮৩০ সাল পর্যন্ত ব্যাটগুলি উইলো কাঠ দিয়ে তৈরি হতো। কিন্তু ব্যাট ভাঙ্গার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় এবং বলের গতি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাটে আলাদা ভাবে হাতল লাগানো হয়। ১৮৫৩ সালে টমাস নিক্সন নার্টিংহামশেয়ারের এক ক্রিকেটার সর্বপ্রথম ব্যাটের হাতলে বেতের ব্যাবহার শুরু করেন। ব্যাটের হাতলে রাবারের গ্রিপ ব্যাবহার করা হয় যার কারনে ব্যাট ধরতে সুবিধা হয়। এখন আর হাতে নয়, পেশাদার ক্রিকেট ব্যাট তৈরি হয় মূলত আধুনিক যন্ত্রে। তবে খুব অল্প সংখ্যক কারিগর এখনও হাতেই তৈরি করেন ক্রিকেট ব্যাট। ক্রিকেটের টুকরো ইতিহাস প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ খেলা হয়েছিল ১৮৪৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার মধ্যে। প্রথম ১৯৭৫ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল। ১৯৮৩ সালে ভারত প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী হয়েছিল। আধুনিক ব্যাট আধুনিক ক্রিকেটে ব্যাটের এই বড় আকৃতির পিছনে অনেকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকেই দায়ী করেন। তবে ব্যাটের আকার-আকৃতি কিন্তু ফুলেফেঁপে ওঠা শুরু করেছে ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টি যুগ আসারও অনেক আগে থেকে। ভারতীয় ক্রিকেট সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক সান্সপ্যারেইল গ্রিনল্যান্ড- এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও মার্কেটিং ডিরেক্টর পরশ আনন্দ মনে করেন,"নব্বই দশক অব্দি ক্রিকেটাররা ব্যাটের আকৃতি নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। আর এরপর নব্বই দশকের শেষের দিকে শচীন যখন প্রায় ১,৩৫০ গ্রামের এক ব্যাট নিয়ে ব্যাটিং করতে নামলেন, তখনই ব্যাটের আকার-আকৃতি নিয়ে হইচই শুরু হল। শচীন যেখানে তখন ১,৩৫০ গ্রামের এক ব্যাট নিয়ে ক্রিজে নেমে গেলেন, সে সময় অন্যরা কেবল ১,১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১,২০০ গ্রামের ব্যাট নিয়ে নেমে যাচ্ছে। আর সাধারণত ১,৩৫০ গ্রামের একটা ব্যাটের আবেদন ১,১৫০ গ্রামের একটা ব্যাটের চাইতে অনেক আলাদা হবে, এটাই স্বাভাবিক।" শচীন টেন্ডুলকার যে ব্যাটটা নিয়ে নেমে পড়েছিলেন, সেটা ছিল অন্য সব ব্যাটের চাইতে আলাদা। ব্যাটের কোণার দিকটা ছিল একটু চওড়া, ব্যাট ছিল একটু বেশিই ভারী। আর শচীনের এই ব্যাট ব্যবহারের সময়ই ২০০১ সালে ভারত সফরে আসে অস্ট্রেলিয়া। সেই সফরের সময়ই অস্ট্রেলিয়ানরা শচীনের ব্যাট দেখে অনুপ্রাণিত হন। পরশ আনন্দ বলেন, সেই সময়ই অস্ট্রেলিয়ার সেরা ক্রিকেটারদের কাছ থেকে তিনি শচীনের মতো ব্যাট তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ পেয়েছিলেন। আর দ্রুতই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার এই বড় ব্যাট ব্যবহারের ধারণাটা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্রিকেট দুনিয়াতে। দ্রুতই বড় আর ভারী ব্যাট ব্যবহার একটা ট্রেন্ডে পরিণত হতে শুরু করে। ভারতীয়দের মধ্যেই রাহুল দ্রাবিড়, ভিভিএস লক্ষ্মণ আর বীরেন্দর শেবাগ শচীনের পদানুসরণ করেন। আর এটাই ছিল ব্যাটের বিবর্তন। ব্যাটগুলি আস্তে আস্তে ভারী আর মোটা হতে শুরু করে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ক্রিকেটের বড় নামগুলি যখন এই ভারী ব্যাট তৈরির অনুরোধ জানাতে শুরু করে, ব্যাট প্রস্তুতকারকেরাও আস্তে আস্তে নড়েচড়ে বসেন। আসলে ওদের নড়েচড়ে বসতেই হতো। যদিও এই ট্রেন্ডে কোনো ব্যাটই সেসময় ১২০০ গ্রামের বেশি ভারী করে বানানো হয়নি। আর ২০০২-০৩ সালের এই ট্রেন্ডের ফলাফলই শেষ অব্দি ওয়ার্নারের ঐ গদা আকৃতির ব্যাট। বিশ্বের আরেক ব্যাট প্রস্তত কারক সংস্থা, ‘কোকাবুরা' কিন্তু ঠিক এইসময়েই এমন ব্যাট বানানো শুরু করল, যেগুলির কোণার দিকটা ৫০ মিলিমিটার চওড়া। সাধারণত ‘Gray Nicolls-XP80’ ব্যাট ব্যবহার শুরু করেন, সেটিই ছিল নিচের কোণার দিকে প্রায় ৮০ মিলিমিটার চওড়া। তবে আপনি যদি ভেবে থাকেন, ব্যাটের এই বড় আর ভারী হওয়ার ব্যাপারটা বিগ হিটিং-এর জন্যে সুবিধাজনক, তাহলে কিন্তু ভুল ভাববেন। একটা পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এমসিসির ২০১৭ সালের ব্যাটের আকারের ওপর এই কড়াকড়ি আরোপের পরই বরং ক্রিকেটে ছয়ের হার বেড়ে গেছে। অন্তত নিচের এই পরিসংখ্যান সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে ২০১২ সাল অব্দি প্রতি বছর সব ফরম্যাট মিলিয়ে গড়ে ইনিংস প্রতি ছয়ের সংখ্যা ছিল ২.৫ থেকে ৩.১। ২০১৩ সালে এসে সেটা উঠে যায় ৩.২তে। ২০১৪ সালে সেটা ৩.৭-এর নিচে নেমেছে। আধুনিক ব্যাট আধুনিক ব্যাটগুলিতে যেটা হচ্ছে, ব্যাটগুলির মেয়াদকাল কমে যাচ্ছে। ব্যাটগুলি টিকছে আগের চাইতে অনেক কম সময়। এসজির একটা ব্যাট দিয়ে এখন টেস্টে গড়ে ৮০০ থেকে ১০০০ রান করা যায়। তবে টি-টোয়েন্টির ক্ষেত্রে কিন্তু এখানে একটা বড় পরিবর্তন আছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ক্ষেত্রে কিন্তু একটা ব্যাট দিয়ে গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ রানের বেশি করা যায় না। কারণ এই ফরম্যাটে একটা ইয়র্কার মারার চেষ্টা করে ক্রিকেটাররা। কিন্তু আপনি যদি ২০ বছর আগে ফেরত যান, যখন কোনো টি-টোয়েন্টি ছিল না, তখন যদি বোলার একটা ইয়র্কার দেয়, ব্যাটসম্যান নিশ্চিতভাবেই ডিফেন্ড করবে। আর এ কারণেই ব্যাটের মেয়াদকালও টি-টোয়েন্টির কারণে কমে যাচ্ছে। তবে ব্যাট প্রস্তুতকারকেরা আধুনিক ক্রিকেটে আরো যে পরিবর্তনটা দেখতে পাচ্ছেন সেটা হল, এখনকার ক্রিকেটাররা আলাদা আলাদা কন্ডিশনের জন্যে আলাদা আলাদা ব্যাট ব্যাবহার করতে আগ্রহী নন। সব কন্ডিশনের জন্যেই তারা একই রকম ব্যাট ব্যাবহার করছেন, যেগুলির বেশিরভাগেই কোণার দিকটা একটু চওড়াই রাখা হয়। আর এ কারণেই ২০০১ সালে রাহুল দ্রাবিড় যে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের জন্যে আলাদা ব্যাট নিয়ে সফল হয়েছিলেন এমন উদাহরণ খুব একটা দেখা যায়না। ক্রিকেটে এখন আগের চাইতে ফরম্যাট যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দৌরাত্ম্য। এভাবে আলাদা আলদা টুর্নামেন্টে যদি আলাদা আলাদা ব্যাট ব্যাবহার করতে হয় তাহলে সেটা ক্রিকেটারদের জন্যে বেশ ঝক্কিই হয়ে যায়। ১৯৮০ সালের একজন ক্রিকেটারের সাথে আধুনিক ক্রিকেটের একজন ক্রিকেটারের বেশ পার্থক্যই রয়েছে। সে সময় ব্যাটসমেনের 'ফলস শট' যেমন বেশি হতো, টেকনিকেও বেশিরভাগ ব্যাটাসম্যান ছিল এখনকার ব্যাটস ম্যানের চাইতে দুর্বল। আর তাই 'বড় ব্যাট মানেই ভাল ব্যাট' কি না, এই প্রশ্নের আসলে কোনো উত্তর নেই। বরং ক্রিকেটারের ভুলের সংখ্যা কমানো আর ব্যাট টেকনোলজির সুইট স্পটের দিকে নজর দিলেই একজন ব্যাটসম্যান পারবেন তার রানের সংখ্যা বাড়াতে, বেশি বেশি বাউন্ডারি হাঁকাতে। আর তাই ভালো ব্যাটের বেশি রানের একটাই উত্তর ‘সুইট স্পট’। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ ক্রিকেটের ইতিহাস, বর্তমান।