যদি বই, সংবাদপত্র, জার্নাল, বা ছাপাখানা না থাকতো তাহলে কি হতো! এর উত্তর আমরা কমপক্ষে সাতশ বছর বা তারও বেশী বছর পিছিয়ে থাকতাম। আজকের এই ঝকঝকে ছাপার অক্ষরের ইতিহাস মাত্র সাতশ বছর পুরনো। বলাই যেতে পারে সাধারণ মানুষ মাত্র সাতশ বছর ধরে পড়তে শুরু করেছে, বই ছাপতে শুরু করেছে। মাত্র সাতশ বছর আগে শুরু হয়েছিল আধুনিক সভ্যতা। ছাপা খানার আবিস্কার ১৭ শতকের শেষভাগে এসে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার এবং এর কিছুকাল পরে জেমস ওয়াটের আরও উন্নত বাষ্পীয় ইঞ্জিন নির্মাণ, শিল্প বিপ্লবের সূচনা ঘটিয়েছিল। কিন্তু পৃথিবীতে আধুনিক সভ্যতার প্রকৃত বিপ্লব ঘটেছিল এরও দুইশ বছর আগেই। ১৫ শতকের মধ্যভাগে জোহানস গুটেনবার্গ ছাপাখানার আবিষ্কার করে শুধু মুদ্রণ ব্যবস্থায় নয় পৃথিবীতে বিপ্লব আনে। আর এই বিপ্লব পৃথিবীতে রেনেসাঁর সূত্রপাত করে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচার প্রসার সেখান থেকেই শুরু। মুদ্রণযন্ত্র সহজলভ্য হওয়ায় বই ছাপাও অনেক সস্তা এবং সহজ হয়ে ওঠে। আর তখন থেকেই শুরু বইয়ের ধারনা ছাপার অক্ষরে। পৃথিবীর ইতিহাস আরো সহজে ছাপার অক্ষরে বইয়ের পাতায় স্থান পেতে শুরু করে। জোহানস গুটেনবার্গ ছাপাখানার জনক ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুন, যে তারিখটিকে বইয়ের পাতায় গুটেনবার্গের জন্মসাল হিসেবে লেখা হয়, তা কিন্তু তার প্রকৃত জন্মসাল নয়। জার্মানির মাইনজ শহরে ১৩৯৪ থেকে ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনো এক সময় জন্মগ্রহণ করেছেন এই মহান উদ্ভাবক। ১৮৯০ সালের দিকে মাইনজ শহর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ঘেঁটে, তার একটি প্রতীকী জন্মসাল নির্ধারণ করে দেন, যা বিশ্বব্যাপী প্রচলিত হয়। যদিও এনিয়ে এখনও তর্ক বিতর্ক চলে। গুটেনবার্গের বাবা ফ্রায়েল জেনসফ্লেইখ খুব সম্ভবত একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি স্বর্ণালংকার এবং কাপড়ের ব্যবসা করতেন। পাশাপাশি তিনি এবং রাজকীয় টাকশালে কাজ করতেন। বাবার কাছে বংশপরম্পরায় স্বর্ণকারের কাজ শিখেছিলেন গুটেনবার্গ। ১৪৩৪ সালে জোহানস গুটেনবার্গ লেখা একটি চিঠি থেকে জানা যায় যে, তার স্ট্র্যাসবুর্গ শহরে কয়েকবছর স্বর্ণকারের কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে । মূল্যবান পাথর কাঁটা এবং সেগুলো পালিশ করার কাজও করেন কিছুকাল। গুটেনবার্গ-এর মা এলসে উইরিখ সম্ভবত ফ্রায়েলের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন। জোহানেস গুটেনবার্গের নামের সাথে ‘গুটেনবার্গ’ শব্দটি সম্ভবত তার বাড়ির নাম থেকেই যুক্ত হয়। তখন জার্মানিতে বংশগত ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বাড়ির নামই হতো বাড়ির পুরুষের পদবি। গুটেনবার্গদের বাড়ির নাম ছিল ‘জু গুটেনবার্গ’। গুটেনবার্গের শৈশব সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। খুব সম্ভবত আরফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এরপর স্ট্র্যাসবুর্গ শহরে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। আভেন্টুর উন্ড খুনস্ট ‘আভেন্টুর উন্ড খুনস্ট’ (জার্মান) যার অর্থ ‘উদ্যম এবং শিল্প’। ছাপাখানা আবিষ্কার নিয়ে নিজের গবেষণার এই নামই দিয়েছিলেন গুটেনবার্গ, যা যথেষ্ট রহস্যের সৃষ্টি করে। তবে এর পেছনে একটা গল্প তো আছেই। ১৪৩৯ খ্রিস্টাব্দে গুটেনবার্গ গিয়েছিলেন স্ট্র্যাসবুর্গের আচেন শহরে। এখানে প্রতিবছর হাজারো মানুষ তীর্থযাত্রায় যেতেন। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে একটা বিশ্বাস ছিল যে, আয়নায় তীর্থস্থানের পবিত্র বস্তুসমূহের আলো প্রতিফলিত করে কোনো বাক্স সদৃশ কিছুর মধ্যে ফেলে তা পবিত্র ঈশ্বরের শক্তিতে পরিপূর্ণ করা যায় এবং বহন করে বাড়ি নিয়ে আসা যায়। এই বিশ্বাস থেকে তারা কপালে আয়না লাগিয়ে রাখতো। তাই তীর্থযাত্রার সময় হলেই প্রতিবছর আচেনে আয়নার চাহিদা বেড়ে যেত ব্যাপকভাবে। তাই আয়না বিক্রয় করে কিছু মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে আচেনে চলে আসেন গুটেনবার্গ। এক ধনী বিনিয়োগকারীর অর্থে ব্যাপক পরিমাণে আয়না প্রস্তুত করেন তিনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই বছর আচেনে এক নজিরবিহীন বন্যা হয় এবং প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। পোপ আগামী এক বছরের জন্য আচেনে সকল ধরনের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেন। ফলে গুটেনবার্গের তৈরি আয়না থেকে যায় অবিক্রিত। এই আয়নার উপর যে বিশাল অঙ্কের অর্থলগ্নি করা হয়েছে তা কীভাবে শোধ করবেন সেই চিন্তায় বিভোর গুটেনবার্গ বই ছেপে আয় করার ফন্দি আঁটেন। কীভাবে সহজে বই ছেপে অধিক মুনাফা অর্জন করা যাবে, এই ভাবনা থেকেই ‘আভেন্টুর উন্ড খুনস্ট’ নামক রহস্যময় গবেষণা নিয়ে হাজির হন তিনি, যা মুদ্রণব্যবস্থাকে করে তুলে একেবারে সহজ এবং সুলভ। প্রথম ছাপাখানা এবং গুটেনবার্গ বাইবেল ১৪৪০ সালেই তিনি তার সক্রিয় ছাপা অক্ষরের ধারণা দিয়েছিলেন এটা নিশ্চিত। ১৪৪৮ সালে অনেক ধারদেনা করে কাজ শুরু করেন তামার হ্রফ প্রস্তুতি নিয়ে। সম্ভবত ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে তার সক্রিয় ছাপাখানা কাজ করতে শুরু করে, যেখানে প্রথম ছাপা হয়েছিল একটি জার্মান কবিতা। তবে তার এ সকল কাজ পুরোটাই ছিল ধার-দেনার উপর ভিত্তি করে। নিজের ছাপাখানাকে জনপ্রিয় করতে তিনি আরো বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন এবং ল্যাটিন গ্রামার ও বাইবেল ছাপার কাজ হাতে নেন। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে বাইবেলের একটি ছোট্ট সংস্করণের ১৮০ কপি ছাপান গুটেনবার্গ। যা ইতিহাসে ‘গুটেনবার্গ বাইবেল’ হিসেবে পরিচিত। এই বাইবেল প্রকাশ তার জন্য দুর্ভাগ্য এবং সৌভাগ্য দুটোই এনে দেয়। সৌভাগ্য হচ্ছে তার ছাপাখানার দেশব্যাপী সুনাম এবং পরিচিতি ছড়িয়ে পরে। কিন্তু অর্থ তখনও আসতে শুরু করেনি। গুটেনবার্গ তার ছাপাখানার জন্য বড় অংকের অর্থ ধার নিয়েছিলেন শহরের সবচেয়ে ধনী ঋণদাতা ফাস্ট শফারের কাছ থেকে। ফাস্টকে নিজের ছাপাখানার অংশীদারও করেছিলেন। কিন্তু নিঃস্বার্থ গুটেনবার্গ কখনো ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেননি যে, ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য ‘নিজের ঢোল নিজে পেটানো’র প্রয়োজন আছে। বইয়ের উপর নিজের নাম এবং নিজের ছাপাখানার নাম উল্লেখ না করা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত। ১৪৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে যান তিনি। তার ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার গিল্ডার ছাড়িয়ে যায়। ঋণের টাকা ব্যবসায়ে না বিনিয়োগ করে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যয় করার অভিযোগে ফাস্ট শফার তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। আদালত স্ট্র্যাসবুর্গে গুটেনবার্গের ছাপাখানাটির পুরো মালিকানাই ফাস্টকে দিয়ে দেয় এবং সাথে দেয়া হয় তখনো পর্যন্ত ছাপা হওয়া সকল বাইবেলের কপির অর্ধেক। এই রায়ের পরদিনই ছাপাখানা নিজ নামে চালাতে শুরু করেন ফাস্ট এবং ছাপা বইয়ে সদম্ভে নিজের নাম প্রচার করতে থাকেন, যেখানে গুটেনবার্গের অবদানের কোনো উল্লেখই ছিল না। বিষণ্ণ, বিধ্বস্ত, হতাশ গুটেনবার্গ নিজের তৈরি প্রথম ছাপাখানা ছেড়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছোট করে আরেকটি ছাপাখানা চালু করেন। তার দ্বিতীয় ছাপাখানাটি মেইনজ শহরের এক ভয়াবহ দাঙ্গায় ধ্বংস হয়ে যায়। ভাগ্যের সহায়তা না পেয়ে, নিজ শহর ছেড়ে এটভিল শহরে চলে যান প্রৌঢ় গুটেনবার্গ। ছাপাখানার প্রতি ভালোবাসা আর ছাপা বইয়ের কালির গন্ধ সর্বদা তার মনকে আচ্ছন্ন করে রাখতো। তাই এটভিলেও স্বল্প পরিসরে আরেকটি ছাপাখানা চালু করেন তিনি। মেইনজ শহরের আর্চবিশপ ভন নাসাউ গুটেনবার্গ সম্বন্ধে একদিন জানতে পারেন। ছাপাখানার প্রকৃত আবিষ্কারকের এমন দুর্ভাগা পরিণতিতে ব্যথিত হন নাসাউ। নাসাউ-এর চেষ্টায় গুটেনবার্গকে প্রাপ্য সম্মান এবং স্বীকৃতি প্রদান করে মেইনজ শহর কর্তৃপক্ষ। আদালত থেকে তাকে ‘হফম্যান’ বা ‘জেন্টেলম্যান অব দ্য কোর্ট’ উপাধি দেয়া হয়। তার জন্য মাসিক ভাতা চালু করা হয়। তার খাদ্যসামগ্রী এবং পানীয়ের উপর করমুক্তি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এই সুখ বেশিদিন ভোগ করতে পারেননি গুটেনবার্গ। ১৪৬৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাকে মেইনজ শহরের ফ্রানসিস্কান চার্চে সমাহিত করা হয়। প্রথম এই ছাপাখানা ছিল জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। প্রথম প্রথম এই ছাপাখানায় ২৫ জন কর্মচারী ৩০ মিনিট কাজ করে কেবল এক পৃষ্ঠা ছাপাতে পারতো। এই কারণে বইয়ের দাম ছিল অত্যন্ত বেশি। অবশ্য খুব কম সময়ের মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই ছাপাখানার ইতিহাস ছড়িয়ে পরে। এবং মুদ্রণে আসে নিত্য নতুন যন্ত্র এবং আবিস্কার। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্যসূত্রঃ ‘গুটেনবার্গ গ্যালাক্সি: দ্য মেকিং অব আ টাইপোগ্রাফিক ম্যান’ লেখক মার্শাল ম্যাকলুহান। Image Source: themuseumofhistory.weebly.com