<div id="MiddleColumn_internal"> <p style="text-align: justify;">নিউক্লিয়ার ফিশন বা নিউক্লীয় বিদারণ হল নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্য‌ার একটি প্রক্রিয়া যেখানে পরমাণুর মধ্য‌ে অবস্থিত নিউক্লিয়াসকে ভেঙে দু’টি বা তার বেশি ছোট ছোট নিউক্লিয়াস তৈরি করা হয় এবং তার সঙ্গে উপজাতক হিসাবে কিছু কণা নির্গত হয়। সুতরাং বিদারণ হল এক রকমের প্রাথমিক রূপান্তরণ বা ট্রান্সমিউটেশন। এর থেকে উপজাতক হিসাবে যা পাওয়া যায় তার মধ্য‌ে রয়েছে মুক্ত নিউট্রন, সাধারণত গামা রশ্মির আকারে ফোটন। তা ছাড়াও বিটা কণা, আলফা কণার মতো অন্য‌ নিউক্লীয় অংশ।</p> <h3>বিন্যাস</h3> <p style="text-align: justify;">নিউক্লীয় বিদারণের সময় নিউক্লিয়াস নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বিদারণ থেকে প্রাপ্ত কণাগুলির ভর নিউক্লিয়াসের মূল ভরের তুলনায় কম। এর মধ্য‌ে দু’টি বা তিনটি নিউট্রনও পাওয়া যায়।</p> <p style="text-align: justify;">‘হারিয়ে যাওয়া’ ভর</p> <p style="text-align: justify;">সুতরাং প্রাপ্ত কণাগুলির মোট ভর গোড়ার নিউক্লিয়াসটির ভরের তুলনায় কম অর্থাৎ কিছুটা ভর হারিয়ে গিয়েছে বলা যায়। যে ভর ‘হারিয়ে গিয়েছে’ সেটি (মূল ভরের ০.১ শতাংশ) আইনস্টাইনের সমীকরণ অনুযায়ী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।</p> <p style="text-align: justify;">বিদারণ প্রক্রিয়া তখনই হয় যখন একটি ভারী অণুর নিউক্লিয়াস একটি নিউট্রনকে দখল করে। কিংবা আপনা থেকেও বিদারণ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। ভারী মৌলিক পদার্থের বিদারণ এমন একটি বিক্রিয়া যেখানে তাপ উৎপন্ন হয়। গামা রশ্মি এবং উৎপাদিত কণাগুলির গতিশক্তি (কাইনেটিক এনার্জি) হিসাবে এই বিক্রিয়ায় প্রচুর কার্যকর শক্তি উৎপাদিত হয়।</p> <p style="text-align: justify;">নিউক্লীয় বিদারণ থেকে পরমাণু বিদ্য‌ুতের জন্য‌ এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্ফোরণের জন্য‌ প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপন্ন হয়।</p> <p style="text-align: justify;">বিদারণ প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভূত নিউট্রন কমপক্ষে আরও একটি নিউক্লিয়াসে বিদারণ প্রক্রিয়া ঘটায়। সেই নিউক্লিয়াসটি আরও নিউট্রন তৈরি করে। এ ভাবে প্রক্রিয়াটি চলতেই থাকে। তাই এই প্রক্রিয়াকে নিউক্লীয় শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা নিউক্লয়ার চেইন রিঅ্য‌াকশন বলে। এই প্রক্রিয়াটি পরমাণু বিদ্য‌ুৎ উৎপাদনের সময় নিয়ন্ত্রণ করা হয়, কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না।</p> <p style="text-align: justify;">বিদারণ শৃঙ্খল বিক্রিয়া ঘটে নিউট্রন ও বিদারণযোগ্য আইসোটোপের (যেমন 235U) মধ্য‌ে পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে। শৃঙ্খল বিক্রিয়ার জন্য‌ বিদারণযোগ্য আইসোটোপ থেকে ক্রমাগত নির্গত হওয়া নিউট্রন যেমন প্রয়োজন, তেমনই দরকার সেই নিউট্রনের কিছুটা পরিমাণ আইসোটোপের মধ্য‌ে আত্মীকরণ। যখন একটি পরমাণু নিউক্লীয় বিদারণে অংশ নেয় তখন বিক্রিয়ার ফলে কিছু নিউট্রন নির্গত হয়। কতটা নিউট্রন নির্গত হবে তা অনেকগুলো কারণের উপর নির্ভর করে। এই মুক্ত নিউট্রনগুলি তখন আশপাশের মাধ্যমে ক্রিয়া শুরু করে। যদি সেখানে আরও বিদারণযোগ্য জ্বালানি থাকে তা হলে ওই নিউট্রনগুলি আরও বিদারণ প্রক্রিয়ার জন্ম দেয়। ফলে এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া একটা চক্র তৈরি করে এবং অবিচ্ছিন্ন ভাবে চলতেই থাকে।</p> <h3>পরমাণু বিদ্য‌ুৎকেন্দ্রের কাজ</h3> <p style="text-align: justify;">পরমাণু বিদ্য‌ুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে নিউক্লীয় বিক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রণ করে কাজ করা হয়। বিভিন্ন ধরনের স্তরে নিরাপত্তামূলক ব্য‌বস্থার মাধ্য‌মে বিক্রিয়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মনে রাখতে হবে নিউক্লিয়ার রিঅ্য‌াক্টরের ভিতরের ব্য‌বস্থাপন এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ব্য‌বহার পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটতে দেয় না। যদি সব ধরনের নিরাপত্তা ব্য‌বস্থা অকার্যকর হয়ে যায় তবুও বিস্ফোরণের সম্ভাবনা নেই। অন্য‌ দিকে পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে বিক্রিয়া এত দ্রুত ও ব্য‌াপক হয় যাতে এক বার বিক্রিয়া শুরু হয়ে গেলে তাকে থামানোর উপায় থাকে না। যথাযথ নকশার নিউক্লিয় রিঅ্য‌াক্টরে এই অনিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া প্রচুর পরিমাণে শক্তি নির্গত করে।</p> <h3>নিউট্রন আত্মীকরণে রড</h3> <p style="text-align: justify;">স্থায়ী ও নিয়ন্ত্রিত পরমাণু বিক্রিয়া বজায় রাখতে হলে নির্গত প্রতি দু’টি বা তিনটি নিউট্রনের মধ্য‌ে যাতে কেবল মাত্র একটি নিউট্রন অন্য‌ একটি ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াসে আঘাত করতে পারে সেই ব্য‌বস্থা করতে হবে। অনুপাত যদি একের কম হয় তা হলে বিক্রিয়া ধীরে ধীরে থেমে যাবে। অনুপাত একের বেশি হলে বিদারণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। (পারমাণবিক বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে যা হয়)। সুতরাং একটি নিউট্রন আত্মীকরণ পদার্থ থাকা দরকার যা বিক্রিয়ার জায়গায় মুক্ত নিউট্রনের পরিমাণকে নিয়ন্ত্রণ করবে। বেশির ভাগ পরমাণু রিঅ্য‌াক্টরে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক রড ব্য‌বহৃত হয় যা নিউট্রন আত্মীকরণের উপযোগী। সাধারণত বোরোন বা ক্য‌াডমিয়ামের তৈরি রড ব্যবহার করা হয়।</p> <h3>গতিশক্তি নিয়ন্ত্রণ</h3> <p style="text-align: justify;">এ ছাড়াও নিউট্রনের মধ্য‌ে প্রচুর গতিশক্তি থাকে। এ ক্ষেত্রে ভারী জল বা সাধারণ জলের মতো মডারেটর ব্য‌বহার করে নিউট্রনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিছু কিছু রিঅ্য‌াক্টরে মডারেটর হিসাবে গ্রাফাইটও ব্য‌বহার করা হয়। কিন্তু এতে কিছু সমস্য‌া দেখা দিচ্ছে। নিউট্রনগুলির গতি ধীর হয়ে গেলে তারা হয় আরও শৃঙ্খল বিক্রিয়ায় অংশ নেয় অথবা নিয়ন্ত্রক রড তাদের শুষে নেয়।</p> <h3>কেন ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম</h3> <p style="text-align: justify;">বিজ্ঞানীরা জানেন ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে পরিচিত আইসোটোপ ইউরেনিয়াম ২৩৮ পারমাণবিক অস্ত্রের উপযোগী নয়। এখানে নিউট্রন আত্মসাৎ করে ইউরেনিয়াম ২৩৯ উৎপাদিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। সে ক্ষেত্রে আর বিদারণ হয় না। কিন্তু ইউরেনিয়াম ২৩৫-এর বিদারণের সম্ভাবনা অনেক বেশি।</p> <p style="text-align: justify;">প্রকৃতিতে যে ইউরেনিয়াম পাওয়া যায় তার মধ্য‌ে মাত্র ০.৭ শতাংশ ইউরেনিয়াম ২৩৫। ফলে ইউরেনিয়াম পেতে গেলে বিশাল ইউরেনিয়াম ভাণ্ডারের খোঁজ দরকার। মনে রাখা দরকার, ইউরেনিয়াম ২৩৮ থেকে রাসায়নিক ভাবে ইউরেনিয়াম ২৩৫ আলাদা করা যায় না। তার কারণ দু’টি আইসোটোপ রাসায়নিক ভাবে সমধর্মের।</p> <p style="text-align: justify;">আইসোটোপ আলাদা করার জন্য‌ বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। প্রথম পারমাণবিক বোমা বানানোর আগে ম্য‌ানহাটান প্রকল্পের বিজ্ঞানীদের কাছে এটা একটা বড় সমস্য‌া হয়ে দেখা দিয়েছিল। গবেষণা করে দেখা গিয়েছিল প্লুটোনিয়াম ২৩৯-এর মধ্য‌েও বিদারণের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতিতে প্লুটোনিয়াম ২৩৯ পাওয়া যায় না। এটি বানাতে হয়।</p> <p style="text-align: justify;">তথ্য সংকলন: বাংলা বিকাসপিডিয়া</p> </div>