ছোটবেলা থেকেই আমরা আবৃত্তি করে এসেছি ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে পাগলা হাতির মাথা নড়ে…’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম লেখা ছড়া কে না পড়েছে? বৃষ্টি মানেই কবিতা, রোমান্টিসিজম, মেঘলা আকাশ আর খিচুড়ি। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি বৃষ্টি কেন হয়? কি করে আকাশ থেকে এতো জল মাটিতে পড়ে? বৃষ্টি নাহলে কি সাংঘাতিক অবস্থা হতে পারে এই পৃথিবীর তা আমরা সবাই জানি। মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে পৃথিবী। চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যাবে। নদীর জল শুকিয়ে যাবে আরও হাজারো সমস্যা। বিজ্ঞানীরা কি বলছেন, কেন বৃষ্টি হয়? বৃষ্টি কেন হয়? প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের বর্ণনা অনুযায়ী পৃথিবী পৃষ্ঠের জলাধার থেকে সূর্যতাপে জল বাষ্পীভূত হয়ে উপরে ওঠে যায় এবং তা হাল্কা হওয়ার কারনে বাতাসের মাধ্যমে ভেসে বেড়ায়। এই ভেসে বেড়ানোর সময় কোন এলাকার বাতাসের তাপমাত্রা কমে গেলে সেই বাষ্পীভূত জল যা মেঘের আকারে ভেসে বেড়াতো তা ঘনীভূত হয়ে পুনরায় জলে রূপান্তরিত হয়ে বৃষ্টির আকারে পৃথিবীতে নেমে এসে বৃষ্টিপাত ঘটায়। ছোটবেলা থেকে আমরা বৃষ্টির এই ব্যখ্যা সম্পর্কে সবাই জানি। কি পরিমাণ জল বাস্পিভুত হয়? সূর্যতাপে কি পরিমাণ জল বাষ্পীভূত হবে এবং কি পরিমাণ বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জল হয় এবং পুনরায় তার উৎসে ফিরে আসবে তা নিয়ন্ত্রিত হয় কিভাবে! পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রায় তিন চতুর্থাংশ জলভাগ হওয়ার কারনে প্রায় ২৪ ঘন্টাই কোন না কোন জলভাগে সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত হচ্ছে ফলে বাষ্পীভবনের প্রক্রিয়াও সব সময়েই চলছে। এই অপ্রতিরোধ্য বাষ্পীকরণ প্রক্রিয়ার ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠের জলরাশি নিঃশেষ না হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু তাতো কমছেইনা বরং বর্তমানের প্রকৃতি বিজ্ঞানীগণ বলছেন তার বিপরীত কথা। অর্থাৎ, সমুদ্রে জলের বর্তমান উচ্চতা নাকি বেড়ে গিয়ে কোন কোন দেশের উপকূলীয় অংশের এক বিরাট এলাকা এর কারণে তলিয়ে যেতে পারে। এর কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এবং এই বর্ধিত তাপমাত্রায় পর্বত চুড়ায় এবং পৃথিবীর উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরুর জমে থাকা বরফও গলে যাচ্ছে। আজকের সময়ে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা জলবায়ু পরিবর্তন কথা গুলি বহুল আলোচিত। বৃষ্টি কিভাবে হয়? ট্রপোস্ফিয়ারে থাকা মেঘগুলো যত উপরে উঠতে থাকে, তাদের তাপমাত্রাও তত কমতে থাকে, কারণ ট্রপোস্ফিয়ারে উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা কমতে থাকে। যখন মেঘগুলোর তাপমাত্রা ০° সেলসিয়াসের চেয়ে বেশী থাকে, তখন এদেরকে বলা হয় উষ্ণ মেঘ এবং যখন এদের তাপমাত্রা ০° সেলসিয়াসের চেয়ে কম থাকে তখন এদের বলা হয় শীতলতম মেঘ। উষ্ণ মেঘের ক্ষেত্রে ছোট ছোট জলের বিন্দুগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করতে করতে আকৃতিতে কিছুটা বড় হতে থাকে এবং এই বড় আকৃতির জন্য এরা মেঘের প্লবতাকে (প্লবতা ইংরেজিতে Buoyancy বলতে একটি বস্তু জলে নিমজ্জিত করলে বস্তুর উপর জল কর্তৃক যে ঊর্ধ্বমুখী লব্ধি বল ক্রিয়া করে সে বলকে বোঝায়। একে আর্কিমিডিসের সুত্র বলেও অভিহিত করা হয়।) তুড়ি মেরে মাটিতে এসে পড়ে যেটাকে আমরা আসলে বৃষ্টি বলে জানি। শীতল মেঘের ক্ষেত্রেও কিছুটা একই ঘটনা ঘটে। সেখানে ছোট ছোট বরফের ক্রিস্টালগুলো বড় হতে হতে প্লবতাকে আবারও পাত্তা না দিয়েই মাটিতে পড়তে থাকে। যখনই এই ছোট ছোট আইস ক্রিস্টালগুলোর তাপমাত্রা ০° সেলসিয়াসের চেয়ে বেশী হয়, তখন সেগুলো গলে গিয়ে জলের ফোঁটা হিসেবে পড়তে থাকে। বজ্রপাত কি? বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী জল হচ্ছে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন নামক দুইটি গ্যাসের সংমিশ্রণ। যা একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে অর্থাৎ ২ ভাগ হাইড্রোজেন এবং ১ ভাগ অক্সিজেন (H2O) এর সংমিশ্রণে তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় জলের উদ্ভব ঘটাতে গ্যাস দুটির ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়। কিংবা এও বলা হয় যে জলের ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হলে জল বিশ্লেষিত হয়ে আনুপাতিকহারে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাসে রূপান্তরিত হয়। আকাশে যে মেঘ ভেসে বেড়ায় তা পরস্পরের সাথে ঘর্ষণের ফলে হামেশাই বিদ্যুৎ তৈরি হয় যা মানুষ পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছে। যেটাকে আমরা বজ্রপাত বলে থাকি সাধারণত। কিন্তু এই বিদ্যুৎ তৈরির ফলে মেঘের জল বিশ্লেষিত হয়ে গ্যাসে রূপান্তর হয়ে পৃথিবীকে বেষ্টন করে বায়ু মন্ডলে উক্ত দুইটি গ্যাসের যে অনুপাত ছিল তা পরিবর্তিত হয়ে নুতন অনুপাত তৈরি হয়েছে এমন কোন তথ্য বিজ্ঞানীরা দিয়েছে বলে জানা যায়নি। অথচ প্রকৃতিতে এ প্রক্রিয়াগুলো বহুযুগ ধরে সংঘঠিত হয়ে আসছে। আমরা বিজ্ঞানীগণের ধারনা অনুযায়ী বৃষ্টি, ঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছাস ইত্যাদি হওয়ার কারন এবং ক্ষেত্র বিশেষে তার পূর্বাভাষ ও সর্তকতার বিষয়ে জানতে পারি নিয়মিত। কিন্তু তা প্রতিরোধ করার মতো কোন ব্যবস্থা বিজ্ঞানীরা কিন্তু এখনও খুঁজে পায়নি। বৃষ্টির কারনে যে সমস্ত পরিবর্তনগুলি হচ্ছে সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা যে সমস্ত বিষয় উপস্থাপন করছেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঐ সমস্ত এলাকায় বায়ুমন্ডলের তাপ কমে যাওয়া। কৃত্রিম বৃষ্টিপাত কি? মানুষ ধীরে ধীরে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে। বন্যায় হাঁটা যায় না বলেই নৌকা বানিয়েছে মানুষ। বিজ্ঞান প্রকৃতির হাজার হাজার উপাদানকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে গেছে বৃষ্টিকেও। কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত করার বিষয়টি প্রথম মাথায় আসে মার্কিন বিজ্ঞানী ভিনসেন্ট শায়েফার-এর। ১৯৪৬ সালের ১৩ নভেম্বর তিনিই সর্বপ্রথম প্রকৃতির মেঘকে মানুষের হাতে বৃষ্টিতে রূপান্তর করে দেখান। আকাশে ভেসে থাকা বৃষ্টির অনুপোযোগী মেঘগুলোকে কৃত্রিমভাবে জোরপূর্বক বৃষ্টি হিসেবে মাটিতে নামিয়ে আনাই হলো কৃত্রিম বৃষ্টিপাত। মেঘগুলোকে বৃষ্টিতে পরিণত হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রক্রিয়া সেটি হলো ঘনীভবন। আকাশে ভেসে থাকা মেঘগুলো যতক্ষন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে না যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তা বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পরবে না। আর এই ঘনীভবন সংঘটিত হতে সাহায্য করে পৃথিবীর বায়ুমন্ডল। বায়ুমন্ডলে থাকা ধুলিকণা, লবণ এবং অন্যান্য ‘ডাস্ট’ জাতীয় উপাদান গুলো। এগুলোর সংস্পর্শে এসে মেঘের জলীয় বাষ্পের কণা গুলো যখন ভারী হয়ে ওঠে তখনই তা বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পরে পৃথিবীতে। ঘনীভবনের ব্যাপারটি সম্পূর্ণই প্রাকৃতিক বলে তা যেমন স্বল্প সময়েও ঘটতে পারে তেমনি আবার অনেকদিন পর পরও ঘটতে পারে। ঘনীভবনের এই প্রক্রিয়া কৃত্রিম ভাবে ঘটিয়েই কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো হয়। কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানোর এই প্রক্রিয়াটিকেই ‘ক্লাউড সীডিং’ বলে। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, কৃত্রিম ভাবে কিভাবে ঘনীভবন ঘটানো সম্ভব! ভূমি থেকে কামানের মাধ্যমে কিংবা বিমান দিয়ে ট্রপোস্ফিয়ারে মেঘের স্তরের উপরে উঠে কৃত্রিম ঘনীভবন সৃষ্টির জন্য ড্রাই আইস বা সলভার আয়োডাইড ছড়িয়ে দেয়া হয়। তবে ড্রাই আইস ও সিলভার আয়োডাইডের কার্যপ্রক্রিয়া কিছুটা ভিন্ন। মাইনাস ৭৮ ডিগ্রী তাপমাত্রায় থাকা ড্রাই আইস আশেপাশের জলের অনুগুলোকে কেলাসে পরিণত করে। হাইগ্রোস্কোপিক পদার্থ হিসেবে খ্যাত সিলভার আয়োডাইড নিজেই কেলাসে পরিণত হয়। তবে এ প্রক্রিয়াদুটি অসম্ভব ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে গবেষণা করছেন স্বল্প ব্যায়ে লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানোর। কৃত্রিম বৃষ্টিপাত কীভাবে ঘটানো হয়? বিমানের মাধ্যমে মেঘে হাইগ্রোস্কোপিক পাউডার বা জল স্প্রে করে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো হয়। কিন্ত সবচেয়ে সাধারণ উপায়টি হচ্ছে ড্রাই আইস (কঠিন কার্বন ডাইঅক্সাইড) বা সিলভার আয়োডাইড ব্যবহার করা। এভাবে রাসায়নিক ছিটিয়ে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানোর পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ক্লাউড সিডিং’। ছবিঃ বিমান থেকে ক্লাউড সিডিং চলছে। ক্লাউড সিডিং কত রকমের হয়? সাধারণত তিন রকমের ক্লাউড সিডিং হয়ঃ ১) স্ট্যাটিক ক্লাউড সিডিংঃ এখানে সিলভার আয়োডাইড মেঘে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে মেঘে থাকা জলের অণুগুলোকে ঘনীভূত করা হয় যার ফলে বৃষ্টিপাত হয়। ২) ডায়নামিক ক্লাউড সিডিংঃ এ পদ্ধতিতে বাতাসের বেগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মেঘের মধ্য দিয়ে সাধারণের চাইতে বেশী পরিমাণ জলের অণুর প্রবাহ ঘটানো হয়। বেশ কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয় বলে এই পদ্ধতিটি স্ট্যাটিক ক্লাউড সিডিং এর চেয়ে বেশ জটিল বলে মনে করা হয়। ৩) হাইগ্রোস্কোপিক ক্লাউড সিডিংঃ এ পদ্ধতিতে মেঘের নিচের অংশে সোডিয়াম ক্লোরাইড ছিটিয়ে দেয়া হয়। জলের অণুগুলো সোডিয়াম ক্লোরাইডের সাথে মিশে গেলে আস্তে আস্তে বড় এবং ভারী হতে থাকে, ফলে বৃষ্টিপাত হয়। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ প্রকৃতি বিজ্ঞান এবং সমসাময়িক পত্র পত্রিকা। ছবিঃ https://youthincmag.com