মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে। অর্থাৎ সিঁদুরে মেঘ। এমনি আরও অনেক কবিতা, সাহিত্য গল্প আছে মেঘকে নিয়ে। শরতের মেঘ দেখলেই মনে হয় পুজা চলে এসেছে। কাশ আর শিউলি ফুলের মেলা। তেমনি আবার সিঁদুরে মেঘ, পেঁজা তুলোর মতো মেঘ বা মেঘলা আকাশ দেখেই আমরা অনুমান করে নেই আবহাওয়া কেমন হবে। দিগন্ত বিস্তৃত এই আকাশ আর তাতে মেঘেদের ভেসে বেড়ানো নিয়ে আছে আমাদের অনেক কৌতূহল। কিন্তু কি এই মেঘ? কিভাবেই বা ভেসে বেড়ায় মেঘ? এমনই অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো এই প্রতিবেদনে। মেঘ কি? বাষ্পীভুত জল একত্রিত হয়ে যখন ভাসমান অবস্থায় আকাশে থাকে তখন তাকে মেঘ বলে। সূর্যের তাপে নদী বা সাগরের জল বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ে যায়। এই বাষ্পগুলি একত্রিত হয়ে যখন আকাশে উড়ে বেড়ায় তখনই মেঘের সৃষ্টি হয়। মেঘ বলতে পৃথিবী অথবা অন্য কোনো গ্রহ, উপগ্রহ ইত্যাদির আবহমণ্ডলে ভাসমান দৃশ্যমান স্ফটিক অথবা জলকণার সমষ্টিকে বোঝায়। আকাশে মেঘের সৃষ্টি, তারপর সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি জল হয়ে আমাদের কাছে আসা ইত্যাদি যাই প্রতিনিয়ত দেখছি এগুলোর সবকিছুই ‘Water Cycle’ এর অন্তর্ভূক্ত। সূর্যের তাপে যখন নদী আর সমুদ্রের জল উত্তপ্ত অর্থাৎ গরম হয় তখন জল আস্তে আস্তে বাষ্পে পরিণত হয় এবং সেই বাষ্প আকাশে উড়ে যায়। সূর্যের তাপে এভাবে জল পৃথিবী থেকে বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়া কে বিজ্ঞানের ভাষায় বাষ্পীভবন (Evaporation) বলে। এই বাষ্পীভবন হচ্ছে জল চক্রের প্রথম ধাপ। যখন জল বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ে যায় তখন তা বিন্দু বিন্দু জলের ফোটায় পরিনত হয়। একে জলীয় কণা নামেও লেখা হয়। এখন আকাশে এই জলীয় কণাগুলো যখন নানারকম গ্যাস আর ধুলাবালির সংমিশ্রনে আসে তখনই মেঘের সৃষ্টি হয়। আকাশে মেঘ সৃষ্টির এই প্রক্রিয়াকে বলে ঘণীভবন (Condensation)। এটি জলের চক্রের (Water Cycle) দ্বিতীয় ধাপ। আকাশে এই মেঘ যখন অনেক অনেক পরিমাণে ভারি হয়ে যায় তখন তার জন্য ভেতরে আর মেঘ অর্থাৎ জল ধারন করা সম্ভব হয় না। আর তখনই বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। তারপর কখনো হয় বৃষ্টি, কখনো হয় শিল বা শিলাবৃষ্টি আবার কখনো তুষারে পরিণত হয়ে যায়। মেঘ থেকে এভাবে জল পুনরায় শিলা, শিলাবৃষ্টি, তুষার, বৃষ্টি ইত্যাদি বিভিন্ন রুপে পৃথিবীতে ফিরে আসার প্রক্রিয়াকে বলে অধক্ষেপন (Precipitation)। বৃষ্টির জল গিয়ে জমা হয় সমুদ্র, হাওড় কিংবা নদী-নালা বা এরকম কোন জলাশয়ে। আর মাটিতে যে বৃষ্টি ফোঁটা বা জল গুলো পরে সেগুলো মাটি চুয়ে চুয়ে একেবারে মাটির অনেক গভীরে যেখানে জল থাকে, সেখানে গিয়ে জমা হয়। এভাবেই মেঘ সৃষ্টির সাথে জলচক্র বিষয়টিও সম্পন্ন হয়। মেঘের শ্রেণীবিভাগ মেঘকে ভাগ করা হয়েছে উচ্চতা দিয়ে। কোন মেঘ কত উচ্চতায় থাকে তার উপর নির্ভর করে মেঘের শ্রেণীবিভাগ। মেঘকে তার পাদদেশের উচ্চতা দিয়ে শ্রেণীবিভক্ত করা হয়, চূড়ার উচ্চতা দিয়ে নয়। ১৮০৩ সালে ফরাসী নৈসর্গবিদ জিন লেমারক (Jean Lamarck) প্রথম মেঘের শ্রেণি বিভাগ করেন। পরে ইংরেজ বিজ্ঞানী লুকে হাওয়ার্ড (Luke Howard) মেঘের যে শ্রেণীবিভাগ করেন তা ১৯২৯ সালে, ইন্টারন্যাশানাল ম্যাটেরোলজিকেল কমিশন (International Meteorological Commission) কর্তৃক গৃহীত হয়। মেঘদের চারটি বড় শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলি হল- ১) উঁচু মেঘ স্তর ২) মধ্য উচ্চতার মেঘ স্তর ৩) নিচু মেঘ স্তর ৪) খাড়া মেঘপুঞ্জ ১. উঁচু মেঘ স্তরঃ উঁচু মেঘ সাধারনত ২০,০০০ থেকে ৪০,০০০ ফিট বা ৬,১০০ মিটার থেকে ১২,২০০ মিটার উচ্চতায় থাকে। উঁচু মেঘের মধ্যেই থাকে এক ধরনের মেঘ যার নাম শাইরাস (Cirrus)। এই মেঘ সাধারণত সাদা বিচ্ছিন্ন পেঁজা তুলার মতো দেখতে হয়। অনেক উচ্চতায় নিম্ন তাপমাত্রা এবং নিম্ন জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি থাকার কারনে এই মেঘগুলি জলের ফোঁটার চেয়ে ছোট বরফের স্ফটিক দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে। এই মেঘগুলো চরিত্রের দিক দিয়ে খুবই শান্ত এবং মনোরম আবহাওয়ায় দেখা যায়। এর সাথে আরো অনেক ধরনের এবং আকারের মেঘ থাকে যেমনঃ সাইরওকিউমুলাস (Cirrocumulus) যা ছোট ছোট দানার মতো একসাথে দলবেঁধে বা সারিবদ্ধ ভাবে বা ঢেউয়ের মতো থাকে। অনেক উচ্চতায় থাকার ফলে এগুলো বরফের স্ফটিক দিয়ে তৈরি হয়। এই মেঘগুলো “ক্লাউডলেটস” নামেও পরিচিত। Cirrocumulus মেঘগুলি অনেকটাই বিরল এবং তুলনামূলকভাবে ক্ষণস্থায়ী হয়, এগুলো সাধারণত শীতকালে দেখতে পাওয়া যায়। Cirrostratus ধরনের মেঘগুলো অনেকটা ভেসে বেড়ানো সাদা পাতলা পর্দা বা চাদরের মতো দেখতে হয়। এই মেঘগুলি স্বচ্ছ, সাদা রঙের হয়ে থাকে যা প্রায় পুরো আকাশ জুড়ে আবৃত থাকে। Cirrostratus কে আলাদা করার একটি উপায় হ’ল সূর্য বা চাঁদের চারপাশে একটি “হলো” বা আলোর একটি আংটি বা বৃত্ত আকৃতি ধারন করে থাকে। মেঘের বরফের স্ফটিকগুলিতে আলোর প্রতিসরণ দ্বারা এটি তৈরি হয়। উপরের বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে আর্দ্রতা উপস্থিত থাকলে এ মেঘগুলোর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ২. মধ্য উচ্চতার মেঘ স্তরঃ মধ্য উচ্চতার মেঘ সাধারনতঃ ৬,৫০০ ফিট থেকে ২০,০০০ ফিট (১,৯৮০-৬,১০০ মিটার) উচ্চতায় থাকে। মধ্য উচ্চতার মেঘের মধ্যেই থাকে এক ধরনের মেঘ যার নাম ‘অল্টোকিউমুলাস’ (Altocumulus) যা অনেকটা চেপ্টা দানার মতো দেখতে। এরা একসাথে দলবেঁধে বা সারিবদ্ধ হয়ে বা ঢেউয়ের আকারে থাকে। মধ্য বায়ুমণ্ডলের মেঘগুলির মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত এবং সাধারণ মেঘ। এ মেঘগুলিকে সহজেই সাদা বা ধূসর রঙের প্যাচ হিসাবে চিনতে পারা যায়। এগুলি দেখতে ভেড়ার পশমের মতো বা ম্যাকরল ফিসের আঁশগুলির মতো, তাই এদের ডাক নাম “ম্যাক্রেল আকাশ”। এদের এই বিন্যাসের কারনে এই সময় আকাশকে অনেক বৃহৎ, বৃত্তাকার এবং সমান্তরাল মনে হয়। এই স্তরে আরেক ধরনের মেঘ দেখা যায় যার নাম ‘অল্টোস্ট্র্যাটাস’ (Altostratus)। এগুলো লাল বা ধূসর ভারী পর্দা বা চাদরের মতো দেখতে। চাঁদ বা সূর্যের আলো এ মেঘ ভেদ করে আসতে পারে না। এই মেঘ দেখেই আমরা বলি সিঁদুরে মেঘ। ৩. নিচু মেঘ স্তরঃ নীচু উচ্চতার মেঘ সাধারনতঃ উঁচু ভূমি থেকে ৬,৫০০ ফিট (১,৯৮০ মিটার) উচ্চতায় থাকে। এ স্তরের এক ধরনের মেঘের নাম ‘স্ট্র্যাটোকিউমুলাস’ (Stratocumulus)। এরা দেখতে বড় বড় সুন্দর দানাদার, এরা একসাথে দলবেঁধে বা সারিবদ্ধভাবে বা ঢেউয়ের আকারে থাকে। এই স্তরে অনেক আকারের মেঘের মধ্যে একটি মেঘ। নাম ‘স্ট্র্যাটাস’ (Stratus), যা সুন্দর কুয়াশার চাদর বা পর্দার মতো দেখতে হয়। দেখলে মনে হয় যেন মেঘগুলি দিগন্তকে আলিঙ্গন করে রয়েছে। এই মেঘগুলো অনেকটাই ধূসর এবং পাতলা ধরণের হয়ে থাকে। মেঘলা দিনে এই মেঘ দেখতে পাওয়া যায়। আর ‘নিম্বস্ট্র্যাটাস’ (Nimbostratus) নামের মেঘ সাধারণত গাঢ় ধূসর বা কালো বর্ণের ঘণ হয়। এই মেঘই অবিরত বৃষ্টি আর তুষার পাতের জন্য দায়ী। তবে এই মেঘ দ্বারা কোন বজ্রপাত সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা থাকে না। ৪. খাড়া মেঘপুঞ্জঃ এ মেঘ ১,৬০০ ফুট থেকে ২০,০০০ ফুটের বেশী উচ্চতায় থাকে। এর মধ্যে ছোটগুলোকে ‘কিউমুলাস’ (Cumulus) বলে। এরা দেখতে সাদা, ভারী, আলাদা আলাদা গম্বুজ আকৃতির হয়। পরিষ্কার ও রৌদ্রোজ্জ্বল দিনগুলিতে এই মেঘকে খুব ভাল ভাবে দেখা যায়। মেঘগুলি সাধারণত গভীর রাতে আকাশে উপস্থিত হয়, আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে এবং সারাদিন আকাশে ঘুরে বেড়ায়, সন্ধ্যার দিকে অদৃশ্য হয়ে যায়। এসব মেঘের শীর্ষ কেন্দ্রগুলি অনেকটা বৃত্তাকার এবং সূর্যোদয়ের সময় উজ্জ্বল সাদা দেখায়। এই মেঘের নীচের অংশে সমতল এবং তুলনামূলকভাবে অন্ধকার থাকে। আর Cumulonimbus লাল আভা সহ গাঢ় ধূসর বর্ণের হয় এবং ঘণ, ভারী হয়। ভারী বৃষ্টি বা শিলা-বৃষ্টির বা বজ্রবৃষ্টির বা বজ্রপাতের জন্য দায়ী এই মেঘ। এগুলি দেখতে উঁচু পাহাড়ের মতো হয়। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্যসূত্রঃ মেটারলোজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট, উইকিপিডিয়া।