ত্রিশ বছরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে চকলেট; চকলেট খাওয়ার উপকারিতা প্রায় চার হাজার বছর ধরে চকলেট মানুষের অত্যন্ত প্রিয় একটি সুস্বাদু মিষ্টি। তবে প্রাচীন মায়া সভ্যতায় চকলেট অম্লতেঁতো পানীয় হিসেবেই পরিচিত ছিল।বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চকলেটের স্বাদও পাল্টেছে। মায়া সভ্যতায় চকলেট পানীয় কে শক্তি বর্ধক পানীয় হিসেবে রাজা বাদশারা পান করতেন। এমনকি নিজের সেনা বাহিনীকেও চকলেট সরবরাহ করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও আমেরিকান সেনা বাহিনীর রেশনে চকলেট দেয়া হতো। তাই প্রাচীন মানুষের ধারনা চকলেট বা কোকো ফল ‘ঈশ্বরের উপহার’। তাই এই কোকো পানীয় শক্তিবর্ধক এবং আনন্দদায়ক। তাই চকলেট খেলেই মন ভালো হয়ে যায়। চকলেট বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় এক সুস্বাদু খাদ্য। বিশ্ব কোকোয়া ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ইউরোপ-আমেরিকাতেই বছরে প্রায় ৩ মিলিয়ন টনেরওবেশি কোকোয়া বীজ কেনা-বেচা হয়ে থাকে। চকলেট খেলে আপনি শুধু আনন্দিতই হবেন না বরং ভালো থাকবে আপনার হার্ট এবং ব্রেইনও। চকলেটের উপকারিতা চকলেটকে প্রধানত আমরা ব্রাউন চকলেট আর মিল্ক চকলেট হিসেবেই পাই। তবে স্বাস্থ্যের পক্ষে ব্রাউন চকলেট সবচেয়ে ভাল। ভাল মানের ব্রাউন চকলেটে থাকেভিটামিন ই (vitamin E), ভিটামিন বি-১২ ( Vitamin B-12), মিনারেল ( Minerals), পটাসিয়াম (Potassium), আরও অনেক কিছু পাওয়া যায়। কোকো বিচিতে এন্টিঅক্সিডেন্ট(Anti-oxidants) থাকে যেটা আমাদের জন্য উপকারী। এটা দুই ধরণের হয়, ফ্লেবোনয়েড(Flavonoids) এবং পলিফেনল(Polyphenol)। ব্রাউন চকলেটের কিছু উপকারিতা দেখে নিন কোকো বিচির মধ্যে ভাল পরিমাণে ফ্লেবোনয়েড থাকে যেটা আমাদের রক্তসঞ্চালন ভালকরে, রক্তচাপ কমায় এবং হার্ট ভাল রাখতে সাহায্য করে। কোকো ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কম করে এবং রক্ত জমাট (blood clotting) বাঁধা আটকায়। চকলেট মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে। ফ্লেবোনয়েড ও তার সাথে ভিটামিন সি (vitamin C) সর্দি কাশি সারাতে পারে। পলিফেনল(polyphenol) কোলেস্টেরল (cholesterol) ঠিক রাখতে সাহায্য করে। শরীরে গুড কোলেস্টেরল বাড়ায় এবং ব্যাড কোলেস্টেরল কমায়। চকলেটে কিছুটা ক্যাফেন (caffeine) থাকে যেটা মানসিক চাপ কমায়। তবে চকলেটে খুব বেশি ক্যাফেন না থাকায় তা খুব সহজে ঘুমের অসুবিধা ঘটায় না। চকোলেট মস্তিষ্ক ও রেটিনায় (retina) রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে দৃষ্টি শক্তি ভাল রাখে। ফ্লেবোনয়েড আমাদের ত্বককে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি (ultraviolet ray) থেকে বাঁচায়। অপরদিকে, আরও একরকম চকলেট হল মিল্ক চকলেট (Milk Chocolate), যেটাতে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে এবং সেখানে থাকা প্রোটিন এন্টিঅক্সিডেন্টের উপকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই মিল্ক চকলেট থেকে ব্রাউন চকোলেট খাওয়াই স্বাস্থ্যের পক্ষে বেশি ভাল। তবে কোনও কিছু মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া ভাল নয়। তাই চকলেট ঠিকঠাক পরিমাণে খেতে হবে। চকলেটের সুফল পেতে রোজ এক টুকরো করেই ব্রাউন চকলেট খাওয়া যেতে পারে। বেশি চকলেট খেলে তা দাতের ক্ষতি করে, ওজন বৃদ্ধি করে, মাথা ব্যাথা হতে পারে ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তবে খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে চকলেট বার খুব একটাস্বাস্থ্যকর নয়। তাই দিন দিন সেটির জায়গা দখল করে নিচ্ছে ‘ডার্ক চকলেট’। এটি হৃদপিণ্ডের জন্য ভালো এবং উদ্বেগ কাটাতেও সাহায্য করে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু চকলেট প্রেমীদের জন্যে একটা খারাপ খবরও আছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে আগামী ত্রিশ বছরের মধ্যেই ফুরিয়ে যেতে পারে চকলেটের ভাণ্ডার। কেন? ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাড মিনিস্ট্রেশন (NOAA) এর বিজ্ঞানীরদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে কোকো গাছগুলি সম্ভবত বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কোকো Cacao (Theobroma cacao) শুধুমাত্র সেইসব অঞ্চলেই জন্মাতে পারে যেখানে সারা বছর তীব্র তাপ থাকে এবং রেইন ফরেস্টের মতো পরিবেশ থাকে। শুধুমাত্র নিরক্ষরেখার ২০ ডিগ্রি উত্তর এবং দক্ষিণে অবস্থিত অঞ্চল গুলিই একমাত্র কোকো ফলনের জন্যে উপযুক্ত। পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় চকলেট উৎপাদনকারী দেশ, ডি’আইভরি, ঘানা, ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অর্ধেক চকলেট উৎপাদনকারী দেশ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে, দেখা যাচ্ছে এই দেশ গুলির তাপমাত্রা ২০৫০ সালের মধ্যে গড়ে৩.৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট বৃদ্ধি পাবে। তাপমাত্রা যত বেশী হবে, তত বেশী পরিমাণে তরল মাটি এবং গাছপালা থেকে বেরিয়ে যাবে। তাই ফসল উৎপাদন হবে নিম্নমানের।উৎপাদন ও পৌঁছে যাবে ১০ শতাংশের কাছাকাছি। ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’ রিপোর্ট করেছে, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে’র বিজ্ঞানীরা কোকো গাছের ডি এন এ পরিবর্তন করার জন্য CRISPR (একটি জিনপরিবর্তনকারী টুল) প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছেন। যদি গাছের ডি এন এ বদল করে উচ্চ-তাপমাত্রা এবং নিম্ন আর্দ্রতা সহ্য করার জন্য গাছের স্বভাবে জিনগতপরিবর্তন করতে পারে, তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো আবার চকলেটের স্বাদ পেতে পারে। অন্যথায় চারহাজার বছরের ইতিহাস রেয়ার স্পিসিস হয়ে যাবে, নিশ্চিহ্ন হয়েযাবে পৃথিবী থেকে। বিপ্লবে, বিদ্রোহে, ভালোবাসায়, মন খারাপে হয়তো আর চকলেট থাকবেনা। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ The True History of Chocolate’ by Sophie D. Coe দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’ অ্যাড্রিয়েনা মরগানেলি দ্বারা প্রকাশিত ‘দ্য বায়োগ্রাফি অব চকোলেট’ (২০০৫)