লবণ যে শুধু মানুষের জীবনে কল্যাণ বয়ে এনেছে তা কিন্তু নয়। অনেক যুদ্ধও কিন্তু এই লবণের কারণে হয়েছিল। ইতালির ভেনিস শহরের সাথে জেনোয়া নামের আরেকটি শহরের লড়াই ঘটেছিল শুধুমাত্র লবণকে কেন্দ্র করে। এই লবণ নিয়ে আরও একটি মজার ঘটনা আছে। ১৮০০ সালের দিকে ইংল্যান্ডের এক জায়গায় লবণ পাওয়া যায়। এই লবণ সরবরাহ করতে গিয়েই লিভারপুল নামে এক বিশাল বন্দর গড়ে ওঠে। শহরের নাম লবণের নামে বর্তমানে তুরস্ক, পোল্যান্ড, বলিভিয়াসহ আরও বেশ কিছু দেশে এখনও লবণের খনির দেখা মেলে। আস্ট্রিয়ার একটি এলাকার নাম সালজবুর্গ। যার মানে হলো ‘লবণের শহর’। এই এলাকাটিতে সতেরো কিলোমিটার জায়গা জুড়ে রয়েছে একটি লবণের খনি। তেমনি সেল্টিক বা স্কটল্যান্ড, গ্রীক এবং মিশরের বিভিন্ন এলাকার নাম হয়েছে এই লবণের কারণে। কবে থেকেই বা মানুষ শিখল এই লবণের ব্যবহার? খিস্টের জন্মের ৬০০০ হাজার বছর আগেও মানুষ খনি থেকে লবণ তুলতে পারত। আমরা খাওয়ার জন্য যে লবণ ব্যবহার করি তার বেশির ভাগই আসে সমুদ্র থেকে। সাধারণ লবণ দেখতে সাদা হলেও খনি থেকে তোলা লবণ বিভিন্ন রঙের হতে পারে। সাদা লবণ মূলত সমুদ্রের পরিশোধিত লবণ। পৃথিবীর অনেক জায়গায় কালো লবণও পাওয়া যায়। এর বেশির ভাগ পাওয়া যায় ভারতে। ওখানে এই লবণকে ‘কালা নাম্মক’ বলা হয়। বাংলার বিট নুনও কিন্তু বিখ্যাত। এটি মূলত খনির লবণ। এর মধ্যে রয়েছে সোডিয়াম ক্লোরাইড, আয়রন, সালফার কম্পাউন্ড। রান্নার স্বাদ বাড়াতে অনেক সময় এই ‘ব্ল্যাক সল্ট’ বা ‘কালো লবণ’ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সমুদ্র থেকে কীভাবে লবণ সংগ্রহ করা হয়? সমুদ্র থেকে যে লবণ আনা হয় তা একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধন করা হয়। জোয়ারের সময় সমুদ্রের জল জমা করে রাখা হয় বড় বড় জমিতে। তারপর সেই জমির চারপাশ বাঁধ দিয়ে জল আটকে ফেলা হয়। তারপর সুর্যের আলোতে সেই জল বাষ্প হয়ে গেলে তার নিচে লবণের আস্তরণ পড়ে থাকে। পড়ে আবার সেই লবণ পরিষ্কার করে এবং পরিশোধিত করে বাজারে বিক্রয় করা হয়। ইংরেজিতে একে ‘টেবিল সল্ট’ ও বলা হয়। আর এই লবনের সাথে আয়োডিন মিশিয়ে তৈরি করা হয় আয়োডাইজ সল্ট বা আয়োডিন লবণ। যা স্বাস্থ্যের পক্ষে যথেষ্ট দরকারি। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ইলেক্ট্রোলাইট, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ক্যালসিয়াম অপরিশোধিত লবনে পাওয়া যায়। শরীরে লবণ বেড়ে যাওয়া বা লবণের পরিমাণ কমে যাওয়া দুটিই দেহের জন্য বিপদজনক। লবণের উপকারিতা ওজন কমায়ঃ ওজন হ্রাস করতে দারুন উপকারি লবণ। ওজন অতিরিক্ত হলে রোগ ব্যাধি বেশি হওয়ার সম্ভবনা থাকে। ওজন হ্রাস করা লবণের উপকারিতা এর মধ্যে অন্যতম। লো ব্লাড প্রেসার বাড়াতে লবণঃ ব্লাড প্রেসার হাই করতে লবণের গুনাগুন উপযোগী। তাই যাদের ব্লাড প্রেসার যাদের কম, তারা খাবার পাতে এক চিমটে লবণ খেতে পারেন। বডির স্ক্রাবঃ ত্বকের মরা কোষ দূর করে ত্বককে কোমল ও মসৃণ করে তুলতে লবণের উপকারিতা ভূমিকা অপরিহার্য। লবণ বডি স্ক্রাব হিসাবে খুব ভালো একটি উপাদান। মুখের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে এবং মাড়ির ব্যথা উপশমঃ লবণ মুখের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া সঙ্গে লড়াই করে নিয়ত। নিয়মিত লবণ জলের গার্গল করলে মুখের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয় এবং মাড়ির ব্যাথা এবং দাঁতের ব্যাথা কমাতে সাহায্য করে। মস্তিষ্ক সক্রিয় এবং সতেজ রাখেঃ লবণে রয়েছে সোডিয়াম যা মস্তিষ্ক সক্রিয় এবং সতেজ রাখতে সাহায্য করে। সোডিয়াম শরীরের জল প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে, যা স্নায়ুতন্ত্রকে সঠিকভাবে কাজ করতে সহায়তা করে। সোডিয়াম আমাদের দেহের গুরুত্বপূর্ণ ইলেক্ট্রোলাইট। শরীরে সোডিয়ামের অভাবেই মানুষ ভুল বলতে থাকে। লবণ খাবার হজম করতে সহায়তা করেঃ খাবার হজম করতে সাধারণত হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড প্রয়োজন হয়। আর এই অ্যাসিড ক্লোরিন এবং হাইড্রোজেন উপাদানের সমন্বয়ে উৎপন্ন হয়। তাই কিছুটা লবণ খাওয়া জরুরী। পায়ের ব্যাথা বা গাঁটের ব্যাথা দূর করেঃ বয়স্কদের, অ্যাথলেটদের, ব্যায়াম করার ফলে পায়ে খিচুনি সৃষ্টি হয় । অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে লবণের পরিমান হ্রাস হতে পারে, প্রাকৃতিক উৎসযুক্ত লবণের খাবারগুলি খিচুনির তীব্রতা হ্রাস করে । এই ক্ষেত্রে সোডিয়াম শরীরে বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। গলার সমস্যা দূর করেঃ উষ্ণ নুন জলের গার্গল গলা ব্যাথা কমানোর প্রাথমিক চিকিৎসা। এমনকি শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের চিকিৎসায় সাহায্য করে লবণ। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া, সমসাময়িক সংবাদপত্র