বিখ্যাত জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট ১৯৭৮ সালের ৫ই আগস্ট সম্পাদকীয়তে লিখেছিল, ‘ওআরএস-এর আবিষ্কার চিকিৎসার ক্ষেত্রে শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ওআরএস তীব্র ডায়রিয়া চিকিৎসায় তরল খাওয়ানোর রাস্তা খুলে দিয়েছে’। জীবন রক্ষাকারী নতুন চিকিৎসাপ্রযুক্তি বা পদ্ধতি সাধারণত জটিল হয়। শুরুতে নতুন ওষুধ বা চিকিৎসাযন্ত্র ব্যয়বহুল হয় এবং অনেকের নাগালের বাইরে থাকে। ব্যতিক্রম ওআরএস। ওআরএস বা ওরাল রিহাইড্রেসান সলিউশন এখন বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিটি পরিবারের পরিচিত একটি পণ্য। বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, কোনো পরিবার খাওয়ার স্যালাইন তৈরি করতে জানলে বা কোনো পরিবারে স্যালাইনের প্যাকেট মজুত থাকলে ওই পরিবারের কোনো সদস্য ডায়রিয়ায় মারা যাবে না। ওরস্যালাইন বা খাওয়ার স্যালাইনের আবিষ্কার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ বেঁচে যায় সেই সময়। এখনো এই স্যালাইন খেয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু নতুন জীবন পাচ্ছে। ওরস্যালাইন আবিষ্কারের গল্প ওআরএস নিয়ে গবেষণা, আবিষ্কার, মানুষের কাছে পৌঁছানোর কৌশল, মানুষকে ওআরএস বানাতে শেখানো, এইসব হয়েছে মুলতঃ অবিভক্ত বাংলাদেশে। মূল গবেষণা করেছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীরা। আর সেই আবিষ্কারের নেপথ্যে ছিলেন একজন বাঙালি চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড এ ক্যাস। ওই গবেষণার ফলাফল ১৯৬৮ সালের আগস্টে ল্যানসেট–এ প্রকাশিত হয়। তবে মূল গল্পটা শুরু হয় ১৯৭১ সালে। স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে উত্তাল বাংলাদেশ। পূর্ব পাকিস্থানের (অধুনা বাংলাদেশের) রাজপথ তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখলে। আর সেই যুদ্ধের পরিস্থিতিতে কাতারে কাতারে মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসছেন এপারে। কেউ কেউ কাঁটাতার পেরিয়ে চলে আসছেন ভারতবর্ষে। সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠছে উদ্বাস্তুশিবির। নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কোনোরকমে বেঁচে থাকতে হচ্ছে শরণার্থীদের। স্বাভাবিকভাবেই, যুদ্ধের দোসর হয়ে হাজির মহামারীও। কলেরা আর ডায়রিয়ায় প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। ডায়রিয়ার চিকিৎসা বলতে তখনও শুধু ইন্ট্রাভেনাস স্যালাইন। অথচ মহামারীর প্রাদুর্ভাব যত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, স্যালাইনের জোগান সেই তুলনায় খুবই কম। আর এর মধ্যেই ডা. রফিকুল ইসলাম মুমূর্ষু মানুষদের বাঁচাতে বেছে নিলেন একটি ঘরোয়া পদ্ধতি। একগ্লাস জলে খানিকটা গুড় আর একচিমটে লবণ মিশিয়ে, খাইয়ে দিলেন রোগীদের। শরীর থেকে ক্রমাগত তরল পদার্থ বেরিয়ে যাওয়ায় যাদের অবস্থা প্রায় মরণাপন্ন হয়ে উঠেছিল। এই গুঁড়- লবণ আর জলের মিশ্রণ খেয়েই সেরে উঠতে থাকলেন লাখ লাখ মানুষ। এই সময়েই শরীরী বিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের একটা অমীমাংসিত রহস্য পরিষ্কার হয়ে আসে। পিএসসিআরএল এর পরীক্ষাগারেই তৈরি হয় প্রথম পরিমিত ওরাল স্যালাইন বা ওরস্যালাইন। সারাবিশ্বে কলেরা ও ডাইরিয়ার চিকিৎসায় ব্যাপক ব্যবহৃত হয় এই দ্রবণ। এমনকি ডিহাইড্রেশনের প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে ওরাল স্যালাইনের ব্যবহার সর্বত্র স্বীকৃত। ১৯৮০ সালে এই আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। পাঁচ কোটি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে ওরস্যালাইন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ ডায়রিয়া। প্রতিবছর ৫ লাখ ২৫ হাজার শিশুর এতে মৃত্যু হচ্ছে। কারণ ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে জল দ্রুত বের হয়ে যায়। ওআরএস সেই জলের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। পরিসংখ্যান বলছে এই ওরস্যালাইন এখনও পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কোটি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে। আজ সারা পৃথিবীতেই খাওয়ার স্যালাইনের প্যাকেট পাওয়া যায়। এই স্যালাইন কিনতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র লাগে না। সারা বিশ্বেই এই পদ্ধতি আজ খুবই জনপ্রিয়। এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা লিটার জল, স্যালাইন তৈরিতে এই ফর্মুলার সাফল্য নিয়ে টাইম সাময়িকী ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপে। শিরোনাম ছিল, “A Fistful of sugar+ A pinch of salt + A jug of water…. Is the simplest remedy for a miserable condition” । বাঙালি চিকিৎসক রফিকুল, বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারক ১৯৩৬ সালে কুমিল্লার চৌগ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ডা. রফিকুল ইসলাম। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক স্তরের পড়াশুনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে। ১৯৬৫ সালে ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও হাইজিন বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে চলে যান ব্রিটেনে। দেশে ফেরেন যখন, তখন মুক্তিযুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে। গবেষণার পাশাপাশি চলে স্বাধীনতা আন্দোলনের কাজ। স্বাধীনতার পর বন্ধ হয়ে যায় তার গবেষণার সংস্থা পিএসসিআরএল। কিছুদিনের মধ্যেই নতুন নামে গড়ে ওঠে ইন্টারন্যাশানাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ। ২০০০ সাল পর্যন্ত এই সংস্থাতেই কাজ করে গিয়েছেন তিনি। তার গবেষণার সূত্র ধরেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন অসংখ্য মানুষ। অবশ্য শেষ বয়সে তাকেও কম রোগভোগের শিকার হতে হয়নি। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ‘বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার’-এর পথিকৃৎ। ওআরএস এল কোথা থেকে! ৫০ এবং ৬০-এর দশকে কলেরার মারাত্মক প্রভাব ছিল বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষে। তাই পুরো বাংলাদেশই ছিল ওআরএসের গবেষণাগার। এখন পুরো বিশ্ব এর সুফল পাচ্ছে। বাংলাদেশে গত শতকের ষাটের দশকে কলেরা গবেষণার জন্য কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (বর্তমানে আইসিডিডিআরবি) স্থাপন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের সঙ্গে বাংলাদেশের গবেষকেরা কাজ শুরু করেন। আইসিডিডিআরবি থেকে সংগ্রহ করা কাগজপত্রে দেখা যায়, ১৯৬৪ সালে ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল মেডিকেল রিসার্চ ইউনিট গ্লুকোজ, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও বাই কার্বোনেট ব্যবহার করে কলেরা রোগীর ওপর একটি গবেষণা করে। তার ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। ১৯৬৭ সালে ঢাকা ও কলকাতায় কলেরা রোগীদের গ্লুকোজ খাইয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। একই সময়ে চট্টগ্রামে মাঠপর্যায়ে গবেষণা হয়েছিল, তবে পদ্ধতিগত ত্রুটি থাকায় ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় মতলব ও ঢাকায়। মূল গবেষক ছিলেন বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড এ ক্যাস। অনেকে এ দুজনকে ওআরএসের উদ্ভাবক মনে করেন। তাঁদের সঙ্গে রিসার্চ ফেলো হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশের চিকিৎসক ডঃ রফিকুল ইসলাম ও মজিদ মোল্লা। ওই গবেষণার ফলাফল ১৯৬৮ সালের আগস্টে, ল্যানসেট–এ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, কলেরা রোগীদের গ্লুকোজ, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম বাই কার্বোনেট ও পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবণ খাওয়ানো হয়। ভালো ফল পাওয়া যায়। এরপর থেকে আইসিডিডিআরবির মহাখালীর কলেরা হাসপাতালে ডায়রিয়ায় রোগীদের শরীরে জল শূন্যতা দূর করতে ওআরএস ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ভারতের শরণার্থীশিবিরে ওআরএস ব্যবহার করা হয়েছিল।গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরির আগে অনেকে অনেক কাজ করেছেন। যেমন তরল খাইয়ে কলেরা নিয়ন্ত্রণের গবেষণা কলকাতায় শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালে। ল্যানসেট ১৯৫৩ সালের ২১ নভেম্বর সংখ্যায় গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করে। কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের কলেরা ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক হেমেন্দ্র নাথ চ্যাটার্জির লেখা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৫২ ও ১৯৫৩ সালে কলেরায় আক্রান্ত কিছু রোগীর বমি ও জলশূন্যতা দূর করার জন্য অ্যাভোমিন ট্যাবলেটের সঙ্গে পাথরকুচিপাতার রস খাওয়ানো হয়েছিল এবং তাতে ফলও পাওয়া গিয়েছিল। ছড়াল সবখানে তবে খাওয়ার স্যালাইনের প্যাকেট কিনতে চিকিৎসকের পরামর্শেরও প্রয়োজন হয় না। ডায়রিয়া দেখা দিলে ধনী, মধ্যবিত্ত, গরিব, শিক্ষিত, নিরক্ষর—সবাই ওআরএসের প্যাকেট কিনে জলে মিশিয়ে খেয়ে নিচ্ছে, শিশুকে খাওয়াচ্ছে। কায়িক পরিশ্রমের পরও অনেকেই নিয়মিত ওআরএস খান। অনেক পরিবারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সঙ্গে ওআরএসের প্যাকেট মজুত থাকে। তবে এক দিনে এমন হয়নি। আশির দশকে প্রায় প্রতিটি পরিবারকে স্যালাইন তৈরি করতে ভারত-বাংলাদেশ জুড়ে চলে ব্যাপক প্রচার। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন সহ ভারতের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে এ ব্যাপারে নিয়মিত প্রচার চালে। এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা লিটার জল, স্যালাইন তৈরির এই ফর্মুলার খরচও গরীব মানুষের সাধ্যের মধ্যে। তাই ওরস্যালাইন হয়ে উঠলো সারা পৃথিবীতেই দারুন জনপ্রিয়। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ টাইম ম্যাগাজিন, আইসিডিডিআরবি (বাংলাদেশ সরকার)। ছবি সৌজন্যেঃ টাইম ম্যাগাজিন।