ফলেরও আছে লাখ লাখ বছরের ইতিহাস। একটা সময় পৃথিবীতে মিষ্টি সুস্বাদু ফল পাওয়া যেতো না বললেই চলে। তাই সামান্য যে কয়টি ফল পাওয়া যেতো সেগুলি ছিল রাজাদের জন্য। রাজ প্রাসাদেই সেইসব ফল গুলির জায়গা হতো। ফল খেলে শরীর ভালো থাকে, ফলে অনেক ভিটামিন, অসুস্থ হলে ফল খেতে হয় এই কথা গুলি আমরা ছোট থেকেই জানি। উৎসবে, সাধারণ সময়ে, পূজায়, বিয়ে এমনকি দুই রাষ্ট্রের কূটনীতিতেও কিন্তু আজকাল ফলের উপস্থিতি থাকবেই। ফলে ভিটামিন আছে, খনিজ আছে, আরো কত কী পুষ্টি গুণ। তবে খুব পরিচিত ফলগুলোর যে কিছু মজার মজার ইতিহাসও রয়েছে সেটাই আজ জেনে নেবো এই প্রতিবেদনে। আমের বৈজ্ঞানিক নাম বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা, সংস্কৃতে আম্র, বাংলায় আম, ইংরেজিতে ম্যাংগো, মালয় ও জাভা ভাষায় ম্যাঙ্গা, তামিল ভাষায় ম্যাংকে এবং চীনা ভাষায় ম্যাংকাও। আম অর্থ সাধারণ। সাধারণের ফল আম। রসাল বা মধু ফলও বলা হয় আমকে। রামায়ণ ও মহাভারতে আম্রকানন এবং আম্রকুঞ্জ শব্দের দেখা মেলে। আমের জন্ম ইতিহাস ধারণা করা হয়, আম প্রায় সাড়ে ৬০০ বছরের পুরনো। জন্মস্থান নিয়ে রয়েছে নানা তর্ক-বিতর্ক। বৈজ্ঞানিক ‘ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা’ নামের এ ফল ভারতীয় অঞ্চলের কোথায় প্রথম দেখা গেছে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আমাদের এ জনপদেই যে আমের আদিবাস— এ সম্পর্কে আমবিজ্ঞানীরা একমত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭-এ আলেকজান্ডার সিন্ধু উপত্যকায় আম দেখে ও খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এ সময়ই আম ছড়িয়ে পড়ে মালয় উপদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ ও মাদাগাস্কারে। চীন পর্যটক হিউয়েন সাং ৬৩২ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এ অঞ্চলে ভ্রমণে এসে বাংলাদেশের আমকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করেন। ১৩৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে আফ্রিকায় আম চাষ শুরু হয়। এরপর ১৬ শতাব্দীতে পারস্য উপসাগরে, ১৬৯০ সালে ইংল্যান্ডের কাচের ঘরে, ১৭ শতাব্দীতে ইয়েমেনে, উনবিংশ শতাব্দীতে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে, ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে আম চাষের খবর জানা যায়। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মাটিতে প্রথম আমের আঁটি থেকে গাছ হয়। এভাবেই আম ফলটি বিশ্ববাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। মোগল সম্রাট আকবর ভারতের শাহবাগের দাঁড়ভাঙায় এক লাখ আমের চারা রোপণ করে উপমহাদেশে প্রথম একটি উন্নত জাতের আম বাগান সৃষ্টি করেন। আম ভারতের জাতীয় ফল আমরা জানি ভারতের জাতীয় ফল আম হল ‘ড্রুপ’। খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি আমের পাতা, ছাল, সবেরই প্রাচীন ভারতের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে নানান ওষুধি হিসেবে ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের কাছে খননের ফলে ফসিলি কৃত অবস্থায় আমের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই আমের ফসিল আজ থেকে প্রায় আড়াই-তিন কোটি বছর আগেকার। উত্তর-পূর্ব ভারত আর মায়ানমার অঞ্চলে চার হাজার বছর আগেকার আমের কথা জানা যায়। তবে এখনকার মতো আম তখন এতো নরম আর বড় আকারের ছিলনা। তখনকার আম ছিল আকারে আরও ছোট এবং শক্ত। বৃহদারণ্যক, উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারত, সব জায়গাতেই পাওয়া যায় আমের কথা। চরক সংহিতায় পাওয়া যায় ‘সহকার সুরার’ কথা, যা আসলে আম থেকে তৈরি একধরনের মদ। আমকে সেই সময় থেকেই বলা হতো ঈশ্বরের ফল। দিনে দিনে প্রাচীন ছোট্ট আমকে নানা সময়ে নানা মানুষ নানা পরীক্ষানিরীক্ষা এবং গ্রাফটিং এর মাধ্যমে দিয়েছে এই আধুনিক রুপ এবং স্বাদ। আজ পৃথিবীর সবার কাছেই প্রিয় ফল আম। আমের বাহারি নাম আমের আছে বাহারি নাম বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদ। ফজলি, আশ্বিনা, ল্যাংড়া, ক্ষীরশাপাতি, গোপালভোগ, মোহনভোগ, জিলাপিভোগ, লক্ষণভোগ, মিছরিভোগ, বোম্বাই ক্ষীরভোগ, বৃন্দাবনী, চন্দনী, হাজিডাঙ্গ, সিঁদুরা, গিরিয়াধারী, বউভুলানী, জামাইপছন্দ, বাদশভোগ, রানীভোগ, দুধসর, মিছরিকান্ত, বাতাসা, মধুচুসকি, রাজভোগ, মেহেরসাগর, কালীভোগ, সুন্দরী, গোলাপবাস, পানবোঁটা, দেলসাদ, কালপাহাড়সহ চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাওয়া যায় প্রায় ৩০০ জাতের আম। তবে অনেকগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়। আমের উপকারিতা ১) আম খাওয়ার উপকারিতা ব্যাপক বিশাল ক্ষেত্র নিয়ে বিদ্যমান। ক্যান্সার থেকে শুরু করে শরীরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রোগের বিরুদ্ধে আম লড়াই করে বীর যোদ্ধার মত। কাঁচা আম আর পাকা আম খাবার ফলে আমাদের যে যে উপকার হবে সেগুলো দেখে আসি- ২) আমে থাকে ফাইসেটিন, আইসোকোয়েরসেটিন, কোয়েরসেটিন, গ্যালিক অ্যাসিড ও আরো কিছু দাঁত ভাঙা নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো। কঠিন কঠিন নাম গুলো যেমন দাঁত ভাঙতে উস্তাদ তেমন শরীরের বিষাক্ত ক্যান্সার সেল ভাঙতেও পারদর্শী। পাকা আমের উপকারিতার মধ্যে একটি বিশেষ গুণ হল, এটি কোলন ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, লিউকেমিয়ার ও স্তন ক্যান্সারের গঠনের বিরুদ্ধে এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। ৩) আমে পর্যাপ্ত পরিমাণে ‘ভিটামিন সি’ পাওয়া যায়। যা কিনা লোমকূপের অভ্যন্তরে থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর সমস্যার পাশাপাশি ব্রণের বিনাশ ঘটায়। শরীরের কলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য আম ব্যাপক অবদান রাখে। ৪) যারা ডায়েট করেন এবং ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন তাদের জন্য পাকা আম উপকারী। কারন আমে প্রচুর পরিমাণে সকল ধরনের পুষ্টি ও শক্তি থাকে, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজন। যারা ওজনে কমাতে তৎপর তারা ভাত, তরকারি ও অতিরিক্ত জাঙ্গ ফুডের বিকল্প হিসেবে আম গ্রহন করতে পারে। ৫) আমাদের শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান হল অ্যালকালি। এই অ্যালকালির অসামঞ্জস্য ও কম বেশি শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। আম, এই অ্যালকালির ভারসাম্য ঠিক রাখতে বড় একটা অবদান রাখে। ৬) চোখ সুস্থ রাখতে ও চোখের সমস্যা দূরীকরণে আম ব্যাপক ভুমিকা রাখে। আমে থাকা ‘ভিটামিন-এ’ ড্রাই আই ভুক্তভোগীদের জন্য খুবই উপকারী। চোখের পাশাপাশি হজম করতে ও পরিপাক যন্ত্রকে ঠিক রাখতেও আম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। ৭) কাঁচা আম খাওয়ার একটি বিষেশ সুফল হল, এটি হার্টের বিভিন্ন সমস্যার মোকাবিলা করতে সক্ষম। বিশেষত, কাঁচা আমে থাকা ভিটামিন-সি শরীরকে ঠান্ডা রাখে স্ট্রোকের সম্ভাবনা হ্রাস করে। ৮) ত্বককে মসরিন ও উজ্জ্বল রাখতে আম হতে পারি খুবই কার্যকরী। এক্ষেত্রে সাধারণত ব্যবহার করা হয়- বডি স্ক্রাব, আমের পেস্ট ইত্যাদি। ৯) এসব ছাড়াও আমের আরো অনেক গুরুত্ব, উপকারিতা আছে। আম সব থেকে বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে। এজন্য সুস্থ সবল থাকার জন্য, মৌসুমে আমের বিকল্প কোনো ফল নেই। আমের অপকারিতা আমের অপকারিতা নিয়ে আলোচনার পূর্বে এটা স্পষ্টত জেনে রাখা ভাল যে, আমের কোনো অপকারিতা নেয়। তবুও কি আম খেলে কি সমস্যা হতে পারে? হ্যাঁ, সমস্যা হতে পারে। তবে সেটা আমের দোষের জন্য না, আমাদের শারীরিক সমস্যার জন্য। যেমনঃ যদি কারো ডায়াবেটিস থেকে থাকে তাহলে অতিরিক্ত আম খাওয়াটা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমের ৯০% ক্যালরি আসে সুগার থেকে, এজন্য বেশি আম খেলে ডায়াবেটিস রোগীদের সুগার বেড়ে যেতে পারে। এধরনের ভুক্তভোগীদের জন্য পরিমাণ মত, ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে আম খাওয়া শ্রেয়। বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ হিসেবে আম গাছকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে দামি ও জনপ্রিয় আমের নাম আলফানসো। ভারতে উৎপাদিত এ জাতের এক কেজি আমের দাম ১০০০ টাকাও হয়। মিয়ানমারের জনপ্রিয় আম রাঙ্গু দেখতে আকর্ষণীয়, খেতেও সুস্বাদু। ভারতের গবেষকরা ১৯৭৮ সালে দশহরি ও নিলাম এই দুটি আমের মধ্যে সংকরায়ণের মাধ্যমে পৃথিবীর বিস্ময়কর জাতের আম উদ্ভাবন করেন, যার নাম ‘আম্রপালি’। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া এবং সমসাময়িক পত্রপত্রিকা।