ধর্মে ঐতিহ্যে খেজুরঃ খেজুরের উপকারিতা কোন কোন সংস্কৃতি এবং ধর্মে এই উপকারি ফলটি সম্পর্কে অনেক তথ্য দেয়া আছে। খেজুর মানুষের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির অঙ্গ। ইসলামে অন্যান্য ফলের তুলনায় খেজুরের মর্যাদা বেশি। মুসলিমদের পবিত্র কোরআন শরীফে কুড়ি বার খেজুরের বর্ণনা রয়েছে। পবিত্র কোরআন শরীফ নাকি প্রথম লেখা হয়েছিল খেজুর পাতায়। মহানবীর প্রিয় ফলও ছিল খেজুর। মহানবী প্রতিদিন সকালে খেজুর দিয়ে ব্রেকফাস্ট করতেন বলে জানা যায়। পবিত্র কোরআন শরীফ থেকে খেজুরের গুণের কথা জানা যায়। ১৯৭৩ সালে খেজুর গুড়কে কেন্দ্র করে অমিতাভ বচ্চন এবং নূতনের হিন্দি ছবি ‘সৌদাগর’ কে এখনও মনে রেখেছে মানুষ। খেজুর মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়। সবচেয়ে বেশি খেজুর উৎপন্ন হয় মিসর, ইরান, আলজেরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, পাকিস্তান, সুদান, ওমান ও তিউনিসিয়ায়। বাংলাদেশ ও প্রচুর খেজুর উৎপন্ন হয়। খেজুর অতি পরিচিত ফল। খেজুরের উপকারিতা কি কি আমাদের অনেকেরই জানা নাই। খেজুর খেলে আমরা অনেক রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারি। তাই আমাদের প্রতিনিয়ত পরিমিত খেজুর খাওয়া দরকার। খেজুর গাছ, ফুল এবং ফল খেজুর গাছ স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ই হয়। শতকরা ৫০ ভাগ স্ত্রী গাছ হয়। ৪ থেকে ৮ বছরের মধ্যে গাছে ফল আসে। স্ত্রী গাছে ফুল ও ফল হয়। ফল প্রথমে সবুজ রঙের হয়। পাকলে খয়েরি লাল রঙের হয়। শীতের শেষে ফুল ধরে ও গ্রীষ্মে ফল পরিপক্ব হয়। একটি গাছে ৭০ থেকে ১৪০ কেজি ফল পাওয়া যায়। এ দেশের খেজুর স্বাদের দিক থেকে একটু বিস্বাদ হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর যেমন মিষ্টি তেমনি সুস্বাদু। এ দেশের খেজুরের স্বাদ না থাকায় রস ও গুড়ের ব্যবহারই বেশি। শীতকালে বিশেষ করে পৌষ সংক্রান্তি বাংলার একটি বিখ্যাত পার্বণ। আর শীত পড়লেই সারাদশে শীতের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে। শীতের শুরু হতে শেষ অবধি খেজুর রস সংগ্রহ করা হয়। এজন্য গাছের উপরের দিকে কেটে ফেলতে হয়। কাটা অংশের নিচে বাঁশ বা গাছের খিল লাগানো হয় যার মাধ্যমে ফোঁটা ফোঁটা রস নিচে লাগানো হাড়িতে জমে। সারারাতে হাড়ি রসে ভর্তি হয়। খুব সকালে হাড়ি নামানো হয় গাছ থেকে। আর শীতের সকালে বাংলার গ্রামে গঞ্জে এখনও মানুষ মাটির হাড়ি থেকে সদ্য নামিয়ে আনা খেজুরের গরম গরম রস খেতে অভ্যস্থ। খেজুরের রস মানেই শীতের সকাল রস সংগ্রহ ও খাওয়ার জন্য সাবধানতা জরুরি। কেননা রাতে বাদুড় রস খাওয়ার জন্য হাড়িতে মুখ লাগায়। এতে বাদুড়ের লালা রসের সাথে মিশে যায়। যা খুব বিষাক্ত হয়। এজন্য রস জ্বাল দিয়ে পান করলে বিষাক্ত বস্তু নষ্ট হয় আর কোন ক্ষতিও হয় না। রসের হাড়ি জ্বাল দিয়ে ঢাকতে হবে যাতে বাদুড় মুখ লাগাতে না পারে। গাছ কাটা ও রস আহরণকারীকে বলা হয় ‘গাছি’। গাছিরা কাঠ দা ও গাছি দা এই দুই ধরনের দা ব্যবহার করে। শীতকালে গাছিদের কদর বাড়ে। খেজুর শক্তিবর্ধক ফল। খেজুরের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা খেজুরের রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা। প্রতি ১০০ গ্রাম খেজুরে আছে ১৪৪ কিলো ক্যালরি খাদ্যশক্তি, ৩৩.৮০ ভাগ শর্করা, ১.২০ গ্রাম আমিষ, ০.৪০ গ্রাম চর্বি, ২২ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৫১.২০ গ্রাম জলীয় অংশ ও ৭.৫ ভাগ আঁশ। ফল শর্করা, চিনি, আঁশ, চর্বি, আমিষ, সকল প্রকার খাদ্যপ্রাণ, বিটাক্যারোটিন, বিভিন্ন খনিজ উপাদান, ম্যাঙ্গানিজ, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, দস্তা ও লৌহ সমৃদ্ধ। মিষ্টি খেজুরে শতকরা ৮০ ভাগ চিনি ও ২০ ভাগ জল আছে। খেজুর ফল পুষ্টিকরই নয়, ভেষজ গুণ সম্পন্নও। বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে খেজুরের কার্যকারিতা রয়েছে। এই ফল খুব সুস্বাদু ও ক্ষুধা নিবারক। হৃদরোগ, বিষক্রিয়া, জ্বর, পেটের পীড়া, পাতলা পায়খানা, গলাব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথাব্যথা. ঠান্ডা, কফ, নারীদের শ্বেতপ্রদর, শিশুর রিকেট নিরাময়ে এই ফল খুব কার্যকর। খেজুর শারীরিক ও মানসিক শক্তি বাড়ায়, হজমশক্তি বৃদ্ধি করে, রোগ প্রতিরোধ ও যৌন দুর্বলতাও দূর করে। গরম জলে খেজুর সিদ্ধ করা জল পান করলে গলার ক্ষত ও ঠান্ডা সারে। ফল পেশি সংকোচন ও শক্তিশালী করে বৃহদান্ত্র ও ক্ষুদ্রান্ত্রের পীড়া উপশম ও বীজের গুড়া কালাজ্বর নিরাময় করে। খেজুরের রস খেলে কৃমি দূর হয়। খেজুরের ব্যাবহার খেজুরের পাতা, কান্ড, বীজ ও আঠার নানা উপকারিতা রয়েছে। পুরাতন গাছের চিলেপাতা নামক পরগাছা ভেষজ গুণ সম্পন্ন। কান্ডের আঠা পাতলা পায়খানা ও প্রস্রাবের সমস্যায় উপকারী। শিকড় হতে ওষুধ হয়। গাছের কান্ড ঘরের খুঁটি, তক্তা, বাটাম, রোয়া তৈরি সহ জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পাতা দিয়ে পাটি, চাটাই ও মাদুর হয়। কান্ড ও পাতা জ্বালানীর কাজেও ব্যবহৃত হয়। রস দিয়ে তৈরি হয় পিঠা, পায়েস, ক্ষীর, চিনি, মিছরি, ভিনেগার ও গুড়। রস হতে নলেন গুড়, চিটা গুড়, দানা গুড়, ঝোলা গুড়, মৌঝোলা গুড় ও পাটালি গুড় তৈরি হয়। যশোর ও ফরিদপুর এবং পশ্চিমবঙ্গের খেজুর গুড়ের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। খেজুর গাছ পরিবেশ সুরক্ষা, মাটির ক্ষয়রোধ করে। পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও নানা রোগের ওষুধ হিসেবে এর জুরি নেই। খেজুর চাষ বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষের বেশ কিছু অঞ্চলে সৌদি আরবের খেজুর চাষ করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে বাগান করে, ক্ষেতের আইলে, রাস্তার পাশে খেজুর গাছ লাগিয়ে অনেক আয় করার পাশাপাশি পুষ্টি চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব। খেজুর চাষ, পরিচর্যা, রোগবালাই দমন বিষয়ে চাষিদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় কৃষি দপ্তর থেকে। খেজুরকে কেন্দ্র করে কুটির শিল্প গড়ে তুললে বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে দেশে। রোগ প্রতিরোধে খেজুর ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এই ফল দৃষ্টিশক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খনিজ পদার্থ দৈহিক পুষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁতের অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করে। খেজুর দেহে ক্যালসিয়াম সরবরাহ করে। খেজুর লাংস ও ক্যাভিটি ক্যান্সার থেকে শরীরকে দূরে রাখে। আজওয়া খেজুর বিষের মহৌষধ। খাদ্যশক্তি থাকায় দুর্বলতা দূর হয়। স্নায়ুবিক শক্তি বৃদ্ধি করে। অনেকক্ষন খালি পেটে থাকলে দেহের প্রচুর গ্লুকোজের দরকার হয় খেজুর এই ঘাটতি মেটায় হজমশক্তি বর্ধক, যকৃৎ ও পাকস্থলীর শক্তিবর্ধক। রুচি বাড়ায়। ত্বক ভালো রাখে। এর চুর্ণ মাজন হিসেবে ব্যবহার করলে দাঁত পরিষ্কার হয়। দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়াও খেজুরের আরও বেশ কিছু উপকারিতা ক) দুর্বলতা কাটাতে অনেক সাহায্য করে খেজুর এবং ডেলিভারীর পর মায়েদের অতিরিক্ত রক্তপাত বন্ধ করতেও খেজুর সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এবং ডেলিভারীর পরবর্তী সময়ে শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টির জন্য মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধিতে খেজুর কার্যকর ভূমিকা পালন করে। খ) পক্ষঘাত এবং সব ধরনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশকারী রোগের জন্য উপকারী। গ) ফুসফুসের সুরক্ষার পাশাপাশি মুখগহ্বরের ক্যান্সার রোধ করে। ঘ) অন্তঃসত্ত্বা নারীর সন্তান জন্মের সময় খেজুর খেলে জরায়ুর মাংসপেশির দ্রুত সংকোচন-প্রসারণ ঘটিয়ে, প্রসব হতে সাহায্য করে। ৭/৮ মাস সময় থেকে গর্ভবতী মায়েদের জন্য খেজুর একটি উৎকৃষ্ট খাদ্য। এসময় গর্ভবতী মায়েদের শরীরে অনেক দুর্বলতা কাজ করে। তখন খেজুর মায়েদের শরীরের এই দুর্বলতা গুলি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। ঙ) প্রতি ১০০ গ্রাম খেজুরে ৩২৪ মিলিগ্রাম ক্যালরি থাকে। ক্যালরির পরিমাণ বেশি থাকে, তাই খেজুর শিশুদের জন্যও অনেক উপকারী একটি ফল। চ) প্রসব-পরবর্তী কোষ্ঠকাঠিন্য ও রক্তক্ষরণ কমিয়ে দেয়। ছ) মুখের অর্ধাঙ্গ রোগ, পক্ষঘাত এবং সব ধরনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশকারী রোগের জন্য উপকারী। খেজুরের বিচিও রোগ নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে। জ) পাতলা পায়খানা বন্ধ করে। ঝ) খেজুর পেটের গ্যাস, শ্লেষ্মা, কফ দূর করে, শুষ্ক কাশি এবং এজমায় উপকারী। উচ্চমাত্রার শর্করা, ক্যালরি ও ফ্যাট সম্পন্ন খেজুর জ্বর, মূত্রথলির ইনফেকশন, যৌনরোগ, গনোরিয়া, কণ্ঠনালির ব্যথা বা ঠান্ডাজনিত সমস্যা, শ্বাসকষ্ট প্রতিরোধে বেশ কার্যকরী। ঞ) নেশাগ্রস্তদের অঙ্গক্ষয় প্রতিরোধ করে খেজুর। স্বাস্থ্য ভালো করতে বাড়িতে তৈরী ঘিয়ে ভাজা খেজুর ভাতের সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন। খেজুর মস্তিষ্ককে প্রাণবন্ত রাখে খেজুর। ক্লান্ত শরীরে যথেষ্ট পরিমাণ শক্তির যোগান দেয় খেজুর। সুস্থ হৃদপিন্ডে দেহযন্ত্রে স্বাচ্ছন্দ এবং সতেজ বিধান করে এমন শক্তিদায়ক বা বলবর্ধক ঔষধ হিসেবে খেজুরের জুড়ি নেই। যাদের হার্টের সমস্যা আছে তাদের জন্য খেজুর খুবই উপকারী। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে খেজুর ব্লেন্ড করা জুস খেলে হার্টের সমস্যায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি ভাল সমাধান পাবেন। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্যঃ সুস্বাস্থ্য, আনন্দবাজার পত্রিকা।