তুলসী পাতার ঔষধি উপাদান তুলসী পাতায় রয়েছে Anti Inflammatory ও Anti-Oxidant উপাদান যা ক্যান্সার, ডায়বেটিস বা হৃদরোগের মত নানা মারণাত্মক রোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রূপে লড়াই করতে পারে। তুলসী পাতায় এতখানি ঔষধিক গুণ রয়েছে যে স্বয়ং এই পাতাকেই একটি ওষুধ বলে গণ্য করা হয়। তুলসী কোন কোন রোগের জন্যে কিভাবে উপকারি? মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয়ঃ কোভীড অতিমহামারিতে পড়ে এবং দীর্ঘদিন লকডাউনে থেকে থেকে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য কিন্তু এই মুহূর্তে যথেষ্ট চিন্তার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে মানসিক চাপ মুক্ত রাখার জন্য তুলসীকে একটি অসাধারণ ঔষধি হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া এই পাতায় রয়েছে Anti Inflammatory ও রোগ প্রতিরোধ করার উপাদান যা সারাদিনের ক্লান্তি ও চাপ নিমেষের মধ্যে দূর করতে পারে। তুলসী শরীরের Cortisol মাত্রা কমিয়ে আনতে পারে ও অতিরিক্ত উত্তেজনা ও চাপ থেকে মুক্তি দেয়। স্বাভাবিকভাবেই মানসিক চাপ কমলে আপনি যেকোনো কাজ নিখুঁতভাবে করতে পারবেন। শরীরে নানারকমের রাসায়নিক চাপ থেকেও তুলসী পাতা উপকারিতা প্রদান করে । তুলসী পাতার দ্বারা শরীরের অন্তর্নিহিত শক্তি জেগে ওঠে ও ধীরে ধীরে চাপ কমে আসে, চনমনে হয়ে ওঠে মন। গলা ব্যাথাঃ গলা ব্যথা কমাতে তুলসীর জুড়ি মেলা ভার। শ্বাসকষ্টের সমস্যা কমাতেও তুলসী পাতা বেশ উপকারী। একটি তুলসী পাতা দিয়ে ফুটিয়ে রোজ গার্গেল করলে গলা ব্যথা নিমেষে সেরে যায়। ক্যান্সারঃ ক্যান্সার রোগ প্রতিরোধ করতে তুলসী পাতা দারুণ উপকারী। তুলসী পাতায় রয়েছে Radio Protective উপাদান যা টিউমারের কোষগুলিকে মেরে ফেলে। তুলসী পাতায় থাকা Phytochemicals যেমন রোসমারিনিক এসিড, মাইরেটিনাল, লিউটিউলিন এবং এপিজেনিন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করতে অসামান্যভাবে কার্যকরী। অগ্নাশয়ে যে টিউমার কোষ দেখা দেয় তা দূর করতেও তুলসী পাতা দারুণ উপকারী। Breast Cancer রোধ করতেও তুলসী পাতা দারুণ উপকারী। ডায়বেটিসঃ Type-২ ডায়বেটিসে ভোগা মানুষদের জন্যে তুলসী পাতা ইন্সুলিন উৎপাদনের কাজ করে। রক্তে সুগারের মাত্রা কমাতে প্রতিদিন খাওয়ার আগে তুলসী পাতা খাওয়ার অভ্যেস করুন। তুলসী একটি Anti Diabetes ওষধির কাজ করে। তুলসীতে থাকা স্যাপোনিন, ত্রিতারপিনিন ও Flavonoids ডায়বেটিস রোধ করতে দারুণ কার্যকরী। সর্দি কাশিতে উপকারী তুলসীঃ ঠাণ্ডা লেগে সর্দি ও কাশি হলে তুলসী পাতা একটি ওষুধের কাজ করে। বুকে কফ বসে গেলে সকালবেলায় রোজ এক পাত্র জলে তুলসী পাতা, আদা ও চা পাতা ভালো করে ফুটিয়ে তাতে মধু ও লেবু মিশিয়ে পান করুন। খুব শীঘ্রই আরাম পাবেন। রোগ প্রতিরোধে তুলসীঃ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে তুলসী পাতায় রয়েছে অসাধারণ রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা যেমন Asthma, ফুসফুসের সমস্যা, Bronchitis, ইত্যাদি। ঠাণ্ডা লাগলে বা সর্দি কাশি হলে বুকে কফ বসে গেলে তুলসী পাতার দ্বারা তা তরল করে খুব সহজে শরীর থেকে দূর করা যায়। এমনকি, জ্বরের সময়ও তুলসী পাতা খুব উপকারী। বর্ষাকালে এই তুলসী পাতা ও এলাচ ভালো করে জলে ফুটিয়ে সেই জল পান করলে খুব সহজেই নানারকমের রোগের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। বিভিন্ন সার্জারির পর বা কোনো ক্ষতস্থানে তুলসী পাতা বেটে লাগালে তা বেশ তাড়াতড়ি শুকিয়ে ওঠে। ওজন কমাতে তুলসীঃ তুলসী পাতার দ্বারা রক্তে সুগারের মাত্রা ও কোলেস্টরল দুটোই রোধ করা যায় যার ফলে খুব সহজেই আপনি ওজন বৃদ্ধির হাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন। তার ওপর Cortisol মাত্রা কমার ফলে যখন আপনার মানসিক চাপ দূর হয়, তখন ওজন কমানো আরো সহজ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে তুলসী দিয়ে তৈরী ২৫০ মিলিগ্রামের একটি Capsules প্রতিদিন খাওয়ার ফলে ওবেসিটি ও লিপিড প্রোফাইল মারাত্মক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে তুলসীঃ তুলসী দিয়ে দাঁতের জন্যে নানারকমের Toothpaste ও মাউথ ওয়াশ তৈরী করা যায় কারণ এতে রয়েছে Anti-Bacterial উপাদান। এছাড়াও, এতে রয়েছে Anti-Microbial উপাদান যা দাঁতের যেকোনো সমস্যা, মাড়ির সমস্যা ও মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে। চোখের সমস্যা দূর করতে তুলসী দারুণ উপকারিঃ চোখে খুব সহজেই নানারকমের সমস্যা দেখা দিতে পারে যেমন চুলকানি, লাল হয়ে যাওয়া, আঞ্জনি, জল বা পিচুটি কাটা, ইত্যাদি। তুলসীতে থাকা Anti Inflammatory উপাদানগুলি চোখের এই যাবতীয় সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। এমনকি, ছানির সমস্যা বা দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দূর করতেও তুলসী পাতা খুব কার্যকরী। মাথা যন্ত্রণায় তুলসীঃ মাথা ব্যাথা কমাতে বহু বছর ধরে কার্যকরী ভূমিকা নিয়ে আসছে তুলসী পাতা। নানারকম ভাবে তুলসী পাতার রস বা গুঁড়ো Herbal চায় মিশিয়ে প্রতিদিন দুবার করে পান করলে মাথাব্যথা নিমেষে কমে যায়। হার্টের জন্যেও ভালো তুলসীঃ বর্তমানে হার্টের সমস্যা ভীষণভাবে বেড়ে গেছে যা মৃত্যুরও বড় একটা বড় কারণ। হার্টের রোগ জন্ম দেয় Hypertension, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টরলের। তুলসী পাতার দ্বারা রক্তের জমাট বাধার সমস্যা দূর করা যায় ও Heart Attack রোধ করা যায়। হার্টের অন্যান্য সমস্যাও সহজে রোধ করতে পারে তুলসী পাতা। কোলেস্টরল ও Fat কমাতে তুলসী পাতা খুব উপকারী। কিডনি স্টোন বের করে আনতে তুলসীঃ তুলসীতে থাকা Anti-Oxidant ও Anti-Bacterial উপাদান শরীরের ভেতর থেকে নানারকমের বিষক্রিয়া পদার্থ বের করে আনতে সাহায্য করে। এর ফলে Dehydration কমে যায় ও কিডনির কার্যকারিতা সচল অবস্থায় থাকে। এর ফলে কিডনি Stone রোধ করা যায়। পেটের স্বাস্থ্য এবং আলসারের বিরুদ্ধেও লড়াই করে তুলসীঃ পেটের জন্য তুলসী পাতার মত কোনো ওষুধ নেই। পেট ব্যাথা, অম্বল, গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি সবকিছুর বিরুধ্যে তুলসী পাতা দারুণ কার্যকরী। পেটে আলসারের বিরুধ্যেও তুলসী পাতার নানা ভূমিকা প্রমাণিত হয়েছে। পেটে ব্যথা হলে ২০ মিলিলিটার জলে তুলসী পাতা ভালো করে ফুটিয়ে তা ১০ মিলিলিটার কমিয়ে এনে পান করুন। এতে পেট ব্যথা ও Hyper Acidity খুব সহজে কমে যায়। লিভারের স্বাস্থ্য রক্ষায় তুলসীঃ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে তুলসী পাতায় রয়েছে Hepato Protective উপাদান যা লিভার নষ্ট হওয়াকে খুব কার্যকরী রূপে রোধ করতে পারে। লিভারের বিষক্রিয়াকরণ রোধ করতে তুলসী পাতা বেশ উপকারী কারণ এতে রয়েছে Cytochrome P ৪৫০। তবে লিভারের সমস্যা থাকলে ডাক্তারের সাথে একবার কথা বলে তবেই তুলসী পাতা খাওয়ার অভ্যেস করুন। বাতের ব্যাথায় তুলসীঃ বাতের ব্যথা থেকে শুরু করে হাড় বা জয়েন্টের যন্ত্রনা যেকোনো সমস্যা থেকে মুক্তি দেয় তুলসী পাতা। এছাড়া শরীরে ফোলাভাব দূর করতে তুলসী পাতায় থাকা Eucalyptus বেশ কার্যকরী। পেইন কিলার হিসেবেও তুলসী পাতা দারুণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। রক্ত নালী সচল এবং সুরক্ষিত রাখতে তুলসীঃ তুলসী Anti Inflammatory উপাদান থাকার ফলে মাংস পেশিতে রক্ত নালী খুব সচল ও সুরক্ষিত ভাবে রক্ত বয়ে নিয়ে যেতে পারে। এর ফলে শরীরের মাংস পেশিতে ব্যাথা হয় না। এমনকি রক্তে যাতে কোনো রকম জমাট না বাধে তার জন্যেও তুলসী দারুন কাজ করে। ত্বকের যত্নে তুলসীঃ তুলসী পাতায় রয়েছে Anti-Microbial উপাদান যা ত্বকের নানা রকমের সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) (তথ্য সুত্রঃ আয়ুষ মন্ত্রণালয় (ভারত সরকার), সরকারি আয়ুর্বেদ হাসপাতাল (ত্রিপুরা সরকার), হর্টিকালচার ডিপার্টমেন্ট ত্রিপুরা সরকার)