‘ম্যা তুলসী ত্যারে অঙ্গনকি, ম্যা তুলসী তেরে অঙ্গন কি…’ লতা মঙ্গেশকরের খুব পরিচিত একটি হিন্দি ছবির গান। এই ছবির নায়িকা নূতন, পঞ্চম বারের মতো এই ছবির জন্যে ফিল্ম ফেয়ার এ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন আজ থেকে প্রায় চুয়াল্লিশ বছর আগে। ১৯৭৮ সালে রিলিজ হওয়া, এই ফিল্মের ‘ম্যা তুলসী ত্যারে অঙ্গনকি, ম্যা তুলসী তেরে অঙ্গন কি…’ এই গানটার এই মুহূর্তে ইউটিউবে দেখেছে ১৯ মিলিয়ন মানুষ। ভাবা যায়! ১৯৭৮ সালে এই হিন্দি ছবিটি রিলিজ হয়। ৪৪ বছর ধরে এই ছবিটি পৃথিবীর মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের হৃদয়ে। মারাঠি লেখক চন্দ্রকান্ত কাকোদকরের মারাঠি উপন্যাস ‘আশি তুঝি প্রীত’ নামে একটা বিখ্যাত উপন্যাস থেকে এই ফিল্মটি তৈরি করেছিলেন দুই পরিচালক, রাজ খোসলা এবং সুদেশ ইশার। তাই তুলসীর তুলনা নেই। এই পৃথিবীতে তুলসী’র অর্থ, যার কোনও ‘তুলনা নেই’। সত্যিই তুলসীর তুলনা নেই। আজকের এই মহামারী সময়েও কিন্তু তুলসীর সত্যিই কোন তুলনা নেই। তুলসীর ইংরেজি নামঃ holy basil, বা তুলসী বৈজ্ঞানিক নামঃ Ocimum Sanctum (একটি ঔষধিগাছ)। ইতিহাস তুলসী গাছ লামিয়াসি পরিবারের অন্তর্গত একটি সুগন্ধী উদ্ভিদ। হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি একটি পবিত্র উদ্ভিদ হিসাবে সমাদৃত। ব্রহ্মকৈবর্তপুরাণে তুলসীকে ‘সীতাস্বরূপা’, স্কন্দপুরাণে ‘লক্ষীস্বরূপা’, চর্কসংহিতায় ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’, ঋকবেদে ‘কল্যাণী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তুলসী পাতার প্রকার তুলসী হল মূলতঃ পুদিনা গাছেরই একটি ধরণ যার আবার নানারকমের ভাগ আছে। যেমন, রাম তুলসী, কৃষ্ণ তুলসী ও বান তুলসী। তবে এই প্রত্যেকটি ধরণের তুলসী গাছই বিভিন্ন রকমের অসুস্থতাকে চিকিৎসা করতে সমানভাবে কার্যকরী। কোথায় পাওয়া যায় প্রায় ৫০০০ বছর ধরে এই তুলসী গাছ ভারতের উত্তর-মধ্য-পূর্ব অঞ্চলে চাষ করা হয়ে আসছে এবং এখন ভারতবর্ষের সমস্ত এলাকায় এটি চাষ করা হয়। এমনকি, এখন বিভিন্ন ইতালীয় ও অন্যান্য খাদ্য প্রণালীতে তুলসী পাতা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আমরা সবাই জানি চিকিৎসা বিজ্ঞান এ ঔষধ এর মূল উৎস বিভিন্ন ধরনের গা। প্রাচীন চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভারতবর্ষের চিকিৎসা ব্যবস্থা খ্যাতির শিখরে পৌঁছেছিল। তার প্রধান কারণ প্রাচীন ভারতবর্ষের ঋষি মুনিরা উদ্ভিদ বিদ্যায় বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেছিল এবং সেই জ্ঞান দিয়ে মানুষের চিকিৎসার কাজে লাগিয়েছিলো। তুলসী চাষ এখন খুব লাভদায়ক। অনেকেই কিন্তু এই সময়ে তুলসী চাষ করে স্বনির্ভর হচ্ছেন। চলুন দেখে নেয়া যাক কিভাবে এই অর্থকরী তুলসী চাষ করতে হয়। এবং কিভাবে বৈজ্ঞানিক ভাবে তুলসী চাষ করে লাভবান হওয়া যায়। প্রসঙ্গত, তুলসী গাছের পাতা, বীজ, বাকল ও শেকড় সবকিছুই অতি প্রয়োজনীয়। ঔষধিগুণ সম্পন্ন এই তুলসী বিভিন্ন রোগশোক সারাতে কাজ করে। ফুসফুসের দুর্বলতা, কাশি, কুষ্ঠ, শ্বাসকষ্ট, সর্দিজ্বর, চর্মরোগ, বুকব্যাথা, হাঁপানি, হাম, বসন্ত, কৃমি, ঘামাচি, রক্তে চিনির পরিমাণ হ্রাস, কীটের দংশন, কানব্যথা, ব্রংকাইটিস, আমাশয় ও অজীর্ণে তুলসী দিয়ে তৈরি ওষুধ বিশেষভাবে কার্যকর। এছাড়া মশার কামড়ে আমরা আজকাল সবাই অতিষ্ঠ। কিন্তু মশা থেকে বাঁচতে হলে মশারি টানানো, অ্যারোসল স্প্রে করা অথবা তীব্র ধোঁয়াযুক্ত কয়েল জ্বালানোর প্রয়োজন কিন্তু নেই, যদি তুলসী থাকে ঘরে। তুলসী গাছের বর্ণনা তুলসী ৭০-৭৫ সেমি পর্যন্ত দৈর্ঘ্য এবং রোমশ শাখা -প্রশাখা পূর্ণ গাছ। পাতা বিপরীতমুখী এবং ৪.৫-৫ সেমি লম্বা। পাতার কিনারা দন্তল এবং উপর ও নীচ দুই দিকেই রোমযুক্ত। পাতা দেখতে অনেকটা ডিম্বাকৃতি। পুস্প মঞ্জরীতে গোলাপি বা হালকা বেগুনি ফুল ফোটে। ফুল সুগন্ধিত। ফল ছোট, বীজ হলুদ বর্ণের বা লালচে। ঔষধি গুন তুলসী গাছের পাতা এবং বীজ ঔষধের কাজে ব্যাবহার করা হয়। পাতা থেকে তৈরি তেল জিবাণু এবং কীটনাশক হিসেবেও ব্যাবহার করা হয়। তাছাড়া পাতার রস ব্রংকাইটিস, সর্দি, কাশী এবং অজীর্ণতা উপশমকারী। তাছাড়া হাজা, দাদ এবং অন্যান্য চর্মরোগে তুলসী পাতা থেকে তৈরি মলম লাগালে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। তুলসী পাতার রসের ফোঁটা কানে দিলে ব্যাথার উপশম হয়। প্রস্রাবজনিত রোগে তুলসীর বীজ দারুণ উপকারী। চাষ পদ্ধতি মাটি ও আবহাওয়া তুলসী মুলতঃ উষ্ণ এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে চাষ করা যায়। ভারতবর্ষের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিম এবং উত্ত-পূর্ব অঞ্চলের প্রতিটি রাজ্যের আবহাওয়ায় তুলসীর চাষ ভালোভাবে করা যেতে পারে। মাঝারি, উঁচু জমি কিন্তু উর্বর এবং জমি থেকে জল নিকাশের সুবিধাযুক্ত, বেলে দোআঁশ মাটি এই চাষের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু এঁটেল মাটিতে তুলসী চাষ খুব একটা ভালো হয় না। বংশবিস্তার বীজ থেকেই বংশ বিস্তার হয়। বীজতলায় চারা তৈরি করে অথবা সরাসরি মূল জমিতে বীজ বপন করে চাষ করা হয়। কিন্তু সরাসরি মূল জমিতে বীজ বপন করে চাষ করলে ফলন ভালো হয়না। সাধারণত বীজতলায় চারা তৈরি করে চাষ করলে ফলন ভালো হয়। বীজতলা তৈরি আগাছা এবং ইট পাথর বাছাই করে মাটি লম্বালম্বি এবং আড়াআড়ি ভাবে চাষ এবং মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে রাখতে হয়। পরবর্তী সময়ে এক মিটার চওড়া এবং সুবিধামতো দৈর্ঘ্য রেখে দশ পনেরো সেন্টিমিটার পর্যন্ত উঁচু বীজতলা তৈরি করতে হয়। যাতে বীজতলায় সহজে পরিদর্শন, জলসেচ এবং জল নিষ্কাশন করা যায়। মাটি পরীক্ষা করে বীজতলায় নির্ধারিত জায়গায় জৈব সার এবং রাসায়নিক সার দেয়া দরকার। এক একর জমির চারার জন্য বীজতলায় প্রথম চাষের সময় চল্লিশ-পঞ্চাশ কেজি পচা গোবর অথবা আবর্জনা সার এবং শেষ চাষের সময় ১.৫ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট এবং পাঁচশ গ্রাম মিউরেট অব পটাশ সার বীজতলার জমিতে দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে নিলে ভালো ফসল পাওয়া যায়। বীজের পরিমাণ এবং বোনার সময়ঃ এক একর জমির জন্যে তিনশ থেকে চারশ গ্রাম বীজের দরকার। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বীজতলায় বীজ বপন করা উচিত। বীজ খুব ছোট তাই লক্ষ্য রাখতে হবে বীজ যেন গভীরে বোনা না হয়। বীজতলায় ছিটিয়ে অথবা আট থেকে দশ সেন্টিমিটার দূরে দূরে লাইন করে বীজ বোনা ভালো। বীজ বপন করার পর হালকা মাটি দিয়ে বীজ ঢেকে, খড় দিয়ে চাপা দেওয়া দরকার। পরিমাণমতো মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্যে। প্রয়োজনে দিনে দুবার ঝারি দিয়ে জল দেওয়া দরকার। এক দেড় মাস পরেই কিন্তু চারা মূল জমিতে লাগানোর জন্যে উপযুক্ত হয়। মূল জমি তৈরি জমি থেকে আবর্জনা বাছাই করে লাঙ্গল দিয়ে জমি লম্বালম্বি এবং আড়াআড়ি ভাবে চাষ এবং মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে রাখতে হয়। জমিতে জলসেচ এবং জল নিকাশের জন্যে নালা করে রাখতে হবে। মূল জমিতে চারা রোপণ মৌসুমি বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে জ্যৈষ্ঠের শেষ পক্ষকাল থেকে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের বিকেলের দিকে চারা লাগানোই উপযুক্ত। চারা লাগানোর পরে হালকা সেচও দেয়া দরকার যদি জমিতে প্রয়োজন অনুসারে আর্দ্রতা না থাকে। চারা রোপণ করতে হবে ষাট সেন্টিমিটার সারি থেকে সারি এবং ত্রিশ সেন্টিমিটার গাছ থেকে গাছের দূরত্বে। এক একর জমির জন্য চারা লাগবে প্রায় বাইশ হাজার। সার প্রয়োগ মূল জমির প্রথম চাষের সময় আট টন পচা গোবর অথবা আবর্জনা সার এবং শেষ চাষের সময় বারো কেজি ইউরিয়া, পচাত্তর কেজি সিঙ্গেল সুপার ফুসফেট, পচিশ কেজি মিউরেট অব পটাশ সার মাটিতে বেশী করে মিশিয়ে দিতে হবে। চাপান হিসেবে ১২ কেজি ইউরিয়া চারা লাগাবার ত্রিশ দিনের সময় এবং ষাট দিনের সময় আরও একবার ১২ কেজি ইউরিয়া দিতে হয় যা জমিতে আগাছা দমন করে। অন্তর্বর্তী পরিচর্যা আগাছা দমনের জন্যে প্রথম নিড়ানি ত্রিশ দিনের মাথায় এবং দ্বিতীয় নিড়ানি ষাট দিনের সময়ে চাপান সার প্রয়োগের আগে দেওয়া আবশ্যক। নিড়ানির সময়ে মাটি আলগা করে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে। সেচ বর্ষাকালে সেচ লাগেনা। তারপরেও প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়া দরকার। ফসল তোলা চারা রোপণের ষাট দিন পর থেকেই গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করা হয়। পৌষ-মাঘ মাসে বীজ এবং শেকড় সংগ্রহ করা যেতে পারে। তেলের জন্য সমস্ত গাছটাই দরকার পড়ে, ফসল কাটার পর মাঠেই চার-পাচ ঘণ্টা ধরে শুকোতে হয়। ফলন পাতা একর প্রতি ১৫০ কেজি প্রতি বছর সংগ্রহ করা যায়। এবং বীজ চল্লিশ-পঞ্চাশ কেজি একর প্রতি পাওয়া যেতে পারে। এবং শেকড় ৮০০-১০০০ কেজি প্রতি একরে পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে দারুণ অর্থকরী এই ফসল। কোভিড অতিমহামারির পরে কিন্তু তুলসীর চাহিদা আরও বেড়ে গেছে বিশ্বব্যাপী। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ আয়ুষ মন্ত্রণালয় (ভারত সরকার), সরকারি আয়ুর্বেদ হাসপাতাল (ত্রিপুরা সরকার), হর্টিকালচার ডিপার্টমেন্ট ত্রিপুরা সরকার) ছবি সৌজন্যে: The Hindu