ক্যান্সার কি বাড়ছে ? ক্যান্সার বাড়ছে, তবে পাশাপাশি বাড়ছে এই রোগটি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা। মানুষ বুঝতে পেরেছে ক্যান্সার মানেই মৃত্যু নয়। এতে লড়াইয়ের নানা রকম সুযোগ রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করালে ক্যান্সার সেরেও যেতে পারে বা ক্যান্সারকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। বাড়বাড়ন্ত অবস্থায় ধরা পড়লেও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে রোগীর কষ্ট প্রশমিত করা যেতে পারে। কী কী কারণে ক্যান্সার বাড়ছে ? ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ নেই। তবে নানা কারণে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার হতে পারে। আমাদের বদলে যাওয়া জীবনযাপনের কারণে ক্যান্সার যে বাড়ছে তা অবশ্যই বলা যেতে পারে। অতিরিক্ত উচ্চ ক্যালোরি যুক্ত খাবার, যেমন ফাস্টফুড, খাদ্যতালিকায় ফাইবার জাতীয় খাবারের পরিমাণ কম, ক্যান্সারের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বয়স্ক এবং বাচ্চাদের মধ্যে স্থূলত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে (অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি মিশ্রিত খাবার খাওয়া)। এটাও ক্যান্সারের একটি কারণ। এ ছাড়া ধূমপান, পরিবেশ দূষণও ক্যান্সার বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। কোন ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি হয় ? পুরুষদের ক্ষেত্রে মুখগহ্বর ও ফুসফুসের (এগুলি সাধারণ তামাক সম্পর্কিত ক্যান্সার) ক্যান্সার। মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সার, জরায়ু মুখের ক্যান্সার। তবে পূর্ব ভারতে পিত্তথলির ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ক্যান্সারের কি নির্দিষ্ট লক্ষণ আছে? না, ক্যান্সারের কোনও নির্দিষ্ট লক্ষণ নেই। আর পাঁচটা সাধারণ অসুখের মতোই জ্বর, দুর্বলতা, কাশি, ওজন কমে যাওয়া, ক্ষূধামন্দভাব হতে পারে। তবে এগুলি বেশি দিন ধরে থাকলেই দ্রুত ডাক্তার দেখাতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত ক্যান্সারের সাতটি বিপদ সংকেত হল: লক্ষণ কী নজর রাখতে হবে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ/রস নিঃসরণ প্রস্রাব বা মলের মধ্যে রক্ত শরীরের কোনও অংশ থেকে রস নিঃসরণ, যেমন স্তনবৃন্ত, লিঙ্গ ইত্যাদি ক্ষত, যেটি সারছে না দীর্ঘদিন ধরে সারছে না ক্রমশ সেটি বড় হচ্ছে সেখান থেকে ব্যথ্যা বাড়ছে রক্তপাত হচ্ছে মল এবং মূত্রের পরিবর্তন মলের আকার, পরিমাণ এবং রং পরিবর্তন হলে (ডাইরিয়া অথবা কোষ্ঠকাঠিন্য হলে) মল এবং মূত্রে রক্তের উপস্থিতি স্তন বা শরীরের অন্য অংশে মাংসপিণ্ড দেখা দিলে নিজে পরীক্ষা করে যদি স্তনে কোনও মাংসপিণ্ড পাওয়া যায় অণ্ডকোষে নিজে পরীক্ষার সময় যদি মাংসপিণ্ড পাওয়া যায় শরীরের অন্য কোনও অংশে যদি মাংসপিণ্ড দেখতে পাওয়া যায় খুকখুকে কাশি হলে যদি গলা বা স্বরে কর্কশ ভাব আসে কাশি যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে কফের সঙ্গে যদি রক্ত আসে আঁচিলের মধ্যে যদি কোনও পরিবর্তন আসে আপনি আঁচিলের চারটি পরিবর্তনের উপর নজর রাখুন অসাম্য: আঁচিলটি এবড়ো-খেবড়ো কিনা ধারগুলি: আঁচিলের ধারগুলি ছুঁচালো না ফাটাফাটা রঙ: আঁচিলটির রঙ কী রকম? আকার: আঁচিলটির আকার একটি পেনসিল ইরেজারের থেকে ছোট না বড় গিলতে কষ্ট কোনও খাবার গিলতে গেলে গলায় অথবা বুকে চাপ অনুভব করছে কিনা ? অল্প খাবার খেলে পেট ভার লাগছে কিনা ? উপরোক্ত তালিকায় উল্লিখিত সমস্যাগুলি দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্যান্সার কি সারে ? ক্যান্সার মানে ‘নো অ্যানসার’ এই ধারণাটাই ভুল। কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সার সেরে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে নিয়মিত ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর বেঁচে থাকাকে অর্থপূর্ণ করে তোলা যায়। স্তনের ক্যান্সারের মতো কিছু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু হলে তা সম্পূর্ণ সেরে যায়। কী ভাবে সারে? ক্যান্সার রোগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ চিকিৎসার প্রয়োজন। সাধারণ ভাবে একটা ধারণা আছে অপারেশন হওয়া মানে চিকিৎসা সম্পূর্ণ হওয়া। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। অপারেশন ক্যান্সার চিকিৎসার একটি অংশ। সমগ্র চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে ক্যান্সার নিরাময় অথবা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এই সম্পূর্ণ চিকিৎসার মধ্যে অপারেশন ছাড়া রয়েছে ওষুধ, রেডিয়েশন, কেমোথেরাপি, হরমোন চিকিৎসা ইত্যাদি। রোগীর কী ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন তা কোনও একক ডাক্তার নন, বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের টিম ঠিক করেন। ‘রুল অফ ওয়ান থার্ড’ কী? ভারতে যে সব ক্যান্সার রোগী চিকিৎসকের কাছে আসেন তাঁদের সেরে ওঠার সম্ভাবনাকে চিকিৎসকরা ‘রুল অফ ওয়ান থার্ড’ বলেন। যেমন প্রতি তিন জনের মধ্যে এক জন প্রথম ধাপে আসেন ও তার সম্পূর্ণ সেরে ওঠা সম্ভব। এর পর প্রতি তিন জনের মধ্যে এক জন দ্বিতীয় পর্যায়ে আসেন এবং তার বেঁচে থাকাকে অর্থপূর্ণ ও প্রলম্বিত করা যেতে পারে। এ ছাড়া প্রতি তিন জনের মধ্যে এক জন শেষ ধাপে আসেন ও তাদেরকে প্যালিয়্যাটিভ (Palliative) চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব যাতে ক্যান্সারের কষ্ট সহনশীল হয়। ক্যান্সার হয়েছে কিনা তার পরীক্ষা ? রক্তপরীক্ষা, এফএনএসি, বায়োপসি এবং টিউমার মার্কারের সাহায্যেও ক্যান্সার নির্ণয় করা যায়। একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে বায়োপসি করলে ক্যান্সার বাড়ে। আসলে বায়োপসি করার পরে চুপ বসে থাকলে বা এ ডাক্তার সে ডাক্তার করে ক্যান্সারের চিকিৎসায় দেরি করলেই ছড়িয়ে যাবে। ক্যান্সার কত দূর ছড়িয়েছে তা জানার জন্য সিটি স্ক্যান, এএমআরআই, পেট স্ক্যান ইত্যাদি করার প্রয়োজন রয়েছে। কোথায় ক্যান্সারের চিকিৎসা হবে ? পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল বা বেসরকারি হাসপাতালে সুনির্দিষ্ট বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে ক্যান্সারের ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। এর জন্য ওই হাসপাতালের অঙ্কলজি বিভাগে যেতে হবে। রাজ্যের প্রতিটি সাব ডিভিশন হাসপাতালে অঙ্কলজি বিভাগ খোলার চেষ্টা চলছে। রেডিওথেরাপি কী ? বিকিরণের মাধ্যমে ক্যান্সার বা টিউমার পুড়িয়ে দেওয়াকে রেডিওথেরাপি বলে। কেমোথেরাপি কী ? কেমোথেরাপিতে ওষুধের মাধ্যমে শরীরে ক্যান্সার কোষগুলিকে মেরে ফেলা হয়। এই চিকিৎসায় কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে যেমন, মাথার চুল পড়ে যাওয়া। তবে আধুনিক কেমোথেরাপিতে চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যাটি অনেক কমিয়ে ফেলা গেছে। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বন্ধেরও বেশ কিছু ওষুধ পাওয়া যায়। যেমন, বমি বা রক্তাল্পতা কমানোর প্রতিষেধক ওষুধ। সাধারণ ভাবে একটা ধারণা আছে যে কেমোথেরাপি একেবারে শেষ ধাপে দেওয়া হয়। এই ধারণা একেবারে ভুল। কেমো ক্যান্সারের চিকিৎসার একটি অঙ্গ। তবে কেমোথেরাপির ওষুধ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে ও তত্ত্বাবধানে নেওয়া উচিত। ক্যান্সারে মানসিক সমস্যা ? কিছু কিছু ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং-এর প্রয়োজন রয়েছে। তবে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে ক্যান্সার শুধুমাত্রা রোগীর ব্যাপার নয়। গোটা পরিবার জড়িত। পরিবারের সাহায্য ছাড়া এর বিরুদ্ধে লড়া সম্ভব নয়। কী ভাবে ক্যান্সার এড়ানো সম্ভব ? ধূমপান ও তামাক বর্জন করতে হবে। জীবনযাত্রায় বদল আনতে হবে। কথায় কথায় ফাস্টফুড, সফটড্রিংস, মিষ্টি খাওয়া বন্ধ করতে হবে। ঘরে তৈরি ভাত, রুটি, ডাল সবজির পাশাপাশি প্রচুর ফলও খেতে হবে। সুষম আহার, প্রচুর পরিমাণে দৌড়ঝাঁপ, হাঁটাচলা, স্থূলত্ব এড়ানো, এই সব সহজ জীবন-যাপন পদ্ধতির মাধ্যেমে ক্যান্সার এড়ানো যেতে পারে।