দীর্ঘসময় ধরে যারা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল বা ট্যাবলেট ব্যবহার করছেন তাদের শতকরা ৫০-৯০ শতাংশই ড্রাই আই’য়ের সমস্যায় ভোগেন। মিনিটে আমরা সাধারণত আঠারো বার চোখের পাতা খোলা ও বন্ধ হয়। কিন্তু কাজ করার সময় আঠারো বারের জায়গায় মাত্র ছয় থেকে আট বার আমরা চোখের পাতা খোলা বা বন্ধ করি। ফলে কর্নিয়া শুকিয়ে যায়। এবং দেখা দেয় ড্রাই আই’ইয়ের সমস্যা। তাই নিজের চোখের যত্ন নিতে প্রতি ঘণ্টায় একবার ব্রেক নিন। ড্রাই আইয়ের সমস্যা হলে চোখে ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা, মাথা বা চোখ ব্যথা, চোখে অস্বস্তি, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। চোখ দিয়ে জল পড়ে। চোখের জলের মাত্রার পরীক্ষাঃ বি ইউ টি (টিয়ার ফিল্ম ব্রেক-আপ টাইম)। স্কিরমারস টেস্ট রোজ বেঙ্গল দিয়ে স্টেইন করা টিয়ার ওসোমোলারিটি ইত্যাদি ড্রাই আইয়ের সমস্যা হলে যেগুলি জেনে নেওয়া জরুরি কম্পিউটারে কতক্ষণ কজ করতে হয়, ঘরে আলোর উজ্জ্বলতা কতটা থাকে, ঘরের উষ্ণতা, ভেন্টিলেশান, এয়ার কন্ডিশান মেশিনের হিউমিডিটি কতটা ইত্যাদি। মহিলা, রজঃনিবৃত্তি হয়েছে কিনা বা হরমোন ট্রিটমেন্ট নিচ্ছেন কিনা ইত্যাদি। গ্লুকোমার ওষুধ ব্যবহার করেন কিনা (বিশেষ করে ঐ ঔষধে প্রিজারভেটিভ বেঞ্জালকোনিয়াম আছে কিনা)। অ্যান্টি হিস্টামিন, অ্যান্টি ডিপ্রেসেন্ট, ডাই ইউরেটিক, অ্যাংজাইটির ঔষধ খান কিনা, এগুলি থেকেও চোখ শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চোখের অ্যালারর্জি আছে কিনা, বিশেষ করে গরমের সময় ধুল-ধোঁয়া থেকে চোখে জলের অভাবে সমস্যা বাড়ে। যারা কন্ট্যাক্ট লেন্স পরেন, যাদের ল্যাসিক সার্জারি (চোখের পাওয়ার কমানোর অপারেশান) করা হয়েছে বা চোখের ছানি অপারেশান হয়েছে, তাদেরও ড্রাই আইয়ের সমস্যা হতে পারে। ডায়াবেটিস, রিউম্যাটয়েড আর্থাইটিস হেপাটাইটিস, এচ আই ভি বা থাইরয়েডের সমস্যা ইত্যাদি। ধূমপান করেন কিনা মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা কানে কম শোনা, মাথা ব্যথা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, প্রস্রাবের সমস্যা, যোনীদেশ শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদির ইতিহাস দেখতে হবে। বিশেষ কারণে যেখানে ড্রাই আই অত্যাধিক পরিমাণে হয় জোগরেনস ডিজিজঃ এটি একটি ক্রনিক অটো ইমিউন ডিজিজ। শরীরের অনেক অংশই আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে মহিলারা রজঃনিবৃত্তির পরে আক্রান্ত হন। এতে চোখের শুঁকনো ভাব ছাড়াও মুখ শুকিয়ে যায়, সঙ্গে রিউম্যাটয়েড আথ্রারাইটিস থাকতে পারে। ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ডের সঙ্গে সঙ্গে স্যালিভারি গ্ল্যান্ডও (যে গ্ল্যান্ড থতু তৈরি করে) আক্রান্ত হয়। স্টিভেনস জনসন সিনড্রোম ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। চামড়া ও মিউকাস মেম্ব্রেনের সমস্যা জ্বর দিয়ে শুরু হয়। চামড়া ও মিউকাস মেম্ব্রেনে র্যাশ বের হয়। চোখ, মুখ, নাক, চোখের পাতা এবং জননেন্দ্রিয় ইত্যাদি আক্রান্ত হয়। কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম আজকাল একে ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেইন’ বলা হয়। দেখা গেছে দীর্ঘসময় ধরে যারা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল, ট্যাবলেট ইত্যাদি ব্যবহার করেন তাদের শতকরা ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষই কমবেশি এই সমস্যায় আক্রান্ত হন। মিনিটে ১৮ বারের জায়গায় মাত্র ৬-৮ বার চোখের পাতা খোলা বন্ধ হয়। ফলে কর্নিয়া শুকিয়ে যায়। এসি ঘরে কাজ করলে ঘরের আর্দ্রতা কম থাকলে বা কন্ট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার করলে এই সমস্যা আরও বাড়ে। চিকিৎসা পরিষ্কার জল দিয়ে চোখ ধোওয়া দিনে তিন থেকে চারবার। কৃত্রিম চোখের জল ব্যাবহার করা। এই কৃত্রিম জল, ড্রপ জেল বা মলম হিসেবে পাওয়া যায়। কার্বক্সিমিথাইল সেলুলোজ, পলিভিনাইল অ্যালকোহল, পলি ইথিলিন গ্লাইকল, সোডিয়াম হায়াল ইউরোনেট ইত্যাদি। প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়া দরকার। পরিবেশ দূষণের হাত থেকে বিশেষ করে ধুলো, ধোঁয়া ক্ষতিকারক ইউ ভি-রে থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। যেমন রোদ চশমার ব্যবহার করা যেতে পারে রেসট্যাসিস (টপিক্যাল সাইক্লোস্পোরিন এই ধরনের ড্রপে বিশেষ কাজ হয়। প্রথমে স্টেরয়েড ড্রপ দিয়ে চিকিৎসা শুরু হয়। পরে র্যাসট্যাসিস ড্রপ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। ফল পেতে পেতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। দিনে তিন থেকে চারবার দেয়া হয় এই ড্রপ। এই ড্রপ দেয়ার প্র চোখে জ্বালা করতে পারে কিছুক্ষণ। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই ওষুধটি খুবই কার্যকরী ওষুধ। এর ইমিউনোসাপ্রেসিভ অ্যান্ড অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি অ্যাকশান আছে। চোখের নেত্রনালীর ছিদ্র বন্ধ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পাংটাল প্লাগ ব্যবহার করা হয়। সিলিকন বা বিভিন্ন ধরনের পলিমার দিয়ে এই প্লাগ তৈরি হয়। এটি লাগাবার উদ্দেশ্য যেটুকু জল তৈরি হচ্ছে তা ধরে রাখা। ফল পেতে দুই মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সধারনত নীচের দিকের পাংটা বন্ধ করা হয়। এই প্লাগ দরকার মতো খুলেও দেওয়া যায়। পাংটা পুরোপুরি স্থায়ী ভাবে বন্ধ করার জন্য কটাইজেশান করা যেতে পারে। যারা দীর্ঘ সময় ধরে কম্পিউটার ব্যাবহার করেন তাদের জন্য বিশেষ পরামর্শ মনিটরকে মনিটর করুনঃ কম্পিউটারকে চোখ থেকে কুড়ি থেকে বাইশ ইঞ্চি দূরে রাখুন। কম্পিউটার দশ ডিগ্রী হেলে থাকবে। ঘরের উজ্জ্বলতা কম করুন। বসার ভঙ্গী ঠিক করুন। টেক এ ব্রেকঃ প্রতি এক ঘণ্টা কাজ করার প্র পাঁচ থেকে দশ মিনিটের বিরতি দিন। ইচ্ছে করেই চোখের পাতা বেশ কয়েকবার খোলা বন্ধ করুন। প্রচুর জল খাবেন এবং তিন চারবার চোখ ধুয়ে নিন পরিষ্কার জল দিয়ে। কৃত্রিম চোখের জল চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যবহার করুন। কন্ট্যাক্ট লেন্স ব্যাবহার করলে নিয়ম মেনে ব্যবহার করুন। সঠিক পাওয়ারের চশমা পড়ুন। প্রগ্রেসিভ লেন্স ব্যবহার করা যেতে পারে। বছরে অন্তত একবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং চোখের যত্ন করুন। মনে রাখতে হবে চোখ আমাদের সবচেয়ে বেশী স্পর্শকাতর একটি অঙ্গ। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা চোখ নিয়ে খুব বেশী একটা মাথা ঘামাই না। কিন্তু সমস্যা তৈরি হলেই শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে যাই। কিন্তু একটি যত্ন নিলেই চোখ ভালো রাখা যায় এবং সুস্থ রাখা যায়। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ এই লেখাটি চক্ষু বিশেষজ্ঞ উত্তম চক্রবর্তীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা।