একটা গান আমাদের সবার শোনা। ‘চোখের জলের হয়না কোন রঙ, তাতে অনেক রঙের ছবি আছে আঁকা…’। কিশোর কুমারের এই গান সবার শোনা। আর এই গানেই আছে চোখের জলের কথা। ড্রাই আই শব্দটি আজকের দিনে প্রায় সবারই পরিচিত। কিন্তু কেন হয় এই ড্রাই আই। কিভাবে এই ড্রাই আইয়ের কবল থেকে বাচা যায় বা কিভাবে এর মোকাবেলা করা যায় এনিয়েই আজ এই প্রতিবেদনে আলোচনা করবো। ড্রাই আই কিন্তু একটা অসুখ শুধু নয়। এটি একটি সিম্পট্ম কমপ্লেক্স যা কিনা ‘টিয়ার ফিল্মের’ নানান সমস্যায় দেখা যায়। প্রথমেই দেখে নেয়া যাক টিয়ার ফিল্ম কি? আমরা কমবেশি প্রতি মিনিটে আঠারো বার চোখের পাতা খলা-বন্ধ করি। চোখের কর্নিয়াকে ভেজা রাখতে এবং চকচকে সুন্দর এবং প্রাণবন্ত রাখতে চোখের পাতা ফেলাটা জরুরী। টিয়ার ফিল্ম কি? আমাদের চোখের সামনের অংশ যাকে বলে কর্নিয়া। এটি ওয়াচ গ্লাস বা ওলটানো কড়াইয়ের মতো দেখতে স্বচ্ছ আবরণ যা শুধু চোখের দেওয়াল তৈরি করে তাই নয়, এটি চোখ নামক অত্যাধুনিক ভিডিও ক্যামেরায় আলোক রশ্মিকে রেটিনাতে কেন্দ্রিভুত হতেও সাহায্য করে এই কর্নিয়াকে সব সময় ভেজা রাখতে হয় নইলে সে তার কর্ম ক্ষমতা হারায়। তাই কর্নিয়ার উপর একটা জলীয় স্তর থাকে যাকে বলে প্রি-কর্নিয়াল ফিল্ম বা টিয়ার ফিল্ম। এই টিয়ার ফিল্মের আবার তিনটি স্তর থাকে- ভেতর থেকে বাইরেঃ ১। মিউসিন লেয়ার ২। অ্যাকোয়াস লেয়ার ৩। লিপিড বা তৈলাক্ত লেয়ার মিউসিন বা মিউকাস লেয়ার চোখের একদম ভেতরের স্তর যা কি না কর্নিয়ার কনজাংটাইভার গবলেট সেল থেকে তৈরি হয়। এই স্তরটি কর্নিয়াতে জলীয় দ্রবণ ঢুকতে সাহায্য করে। অ্যকোয়াস লেয়ার সবচেয়ে মোটা স্তর। টিয়ার অর্থাৎ চোখের জল দিয়ে তৈরি। চোখের জল ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড থেক বের হয়। মূলত জল, তার সাথে সোডিয়াম ক্লোরাইড (নুন), অল্প পরিমাণ চিনি, ইউরিয়া আর প্রোটিন থাকে। তাই এই চোখের জলের স্বাদ নোনতা হয়। এর ভেতর ব্যক্টেরিয়া প্রতিরোধক লাইসো জাইম, বিটা লাইসিন, এবং ল্যাকটোফেরন জাতীয় এনজাইম থাকে। লিপিড বা তৈলাক্ত স্তর এটি সবচেয়ে বাইরের দিকের স্তর। চোখের পাতার ভেতরে থাকা মেবোমিয়ান গ্ল্যান্ড থেকে তৈরি তেল বা জেল জাতীয় জিনিস এই স্তরের উপাদান। এই স্তরটি চোখের জলকে উপচে পড়তে দেয় না। অর্থাৎ চোখের জলকে ওপরে ধরে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও চোখের পাতাকে ভেজা রাখে এবং চোখের জলকে উবে যেতে দেয়না। টিয়ার ফিল্মের কাজ কি? কর্নিয়া এবং কনজাংটাইভাকে ভেজা রাখে। কর্নিয়াকে অক্সিজেন যোগায়। ধুলোময়লার হাত থেকে কর্নিয়াকে পরিষ্কার রাখে। জীবাণু প্রতিরোধ করে। চোখের পাতা যাতে চোখের উপর সুন্দরভাবে নড়াচড়া করতে পারে তার জন্য সাহায্য করে। চোখের জল কোথা থেকে তৈরি হয়? অক্ষিকোটরে ভেতরে ওপর দিকে ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড থাকে যা ছোট সাইজের কাঠ বাদামের মতো দেখতে। এই গ্ল্যান্ড থেকে দশ বারোটি নালী কনজাংটাইভাতে উপনীত হয় এবং সেখান থেকে জল নির্গত হয়। এছাড়াও অ্যাকসেসরি ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড আছে যা থেকেও চোখের জল তৈরি হয়। চোখের জল তার কার্য সম্পাদন করে ল্যাক্রিমাল প্যাসেজ দিয়ে নাকে চলে যায়। আমরা মিনিটে কমবেশি আঠারো বার চোখের পাতা খোলা বা বন্ধ করি। চোখের কর্নিয়াকে ভেজা রাখতে ও চকচকে রাখতে চোখের পাতা ফেলা জরুরি। যেমন আমাদের প্রতিদিন ঘর মুছতে হয় বা অনেকটা গাড়ির ওয়াইপারের মতো। যা চোখের জলকে সুন্দর ভাবে কর্নিয়ার উপর ছড়িয়ে দেয়। ড্রাই আইয়ের কারণ ১) অ্যাকোয়াস টিয়ার ডেফিসিয়েন্সিঃ যাকে বলে কেরাটো কনজাংটিভাইটিস সিক্কা বা জেগরেনস সিনড্রোম। ২) মিউসন ডেফিসিয়েন্সি ড্রাই আইঃ গবলেট সেল যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন এই সমস্যা হয়। যেমন ভিটামিন- এ’র অভাবে, যাকে বলে জেরপথ্যালমিয়া। এছাড়া স্টিভেনস জনসন সিন্ড্রোম, ট্র্যাকোমা, অকুলার পেমফিগয়েড, চোখে অ্যাসিড বা অ্যালকালি ঢুকে যাওয়া ইত্যাদি। ৩) লিপিড ডেফিসিয়েন্সি ড্রাই আইঃ সচরাচর দেখা যায় না। চোখের পাতার প্রদাহ যেমন ব্লেফারাইটিস বা মেবোমাইটিস হলে এই সমস্যা হয়। চোখের পাতা ঠিক মতো বন্ধ না হলে যেমন বেলস পলসি (ফেসিয়াল নার্ভ প্যারালিসিস) , এক্সপোজার ক্যারাটাইটিস, এক্ট্রোপিয়ন ইত্যাদি অসুখ। ৪) এপিথেলিয়ামঃ কর্নিয়ার একদম ওপরের স্তরের (এপিথেলিয়াম) সমস্যা হতে পারে। উপসর্গ চোখে ক্লান্তি ঝাপসা দেখা, বিশেষ করে বই পড়া, টিভি দেখা বা গাড়ি চালাবার সময় এমনটা বেশী হয়। মাথা বা চোখ ব্যথা চোখ শুকিয়ে গেছে এমন মনে হওয়া চোখে কিছু ঢুকে গেছে মনে হওয়া চোখের অস্বস্তি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া সারাদিন একটানা কম্পিউটার বা ল্যাপটপে কাজ করার পর বিকেলে বা সন্ধ্যায় কোন কারন ছাড়াই হঠাৎ করে রেগে যাওয়া ইত্যাদি। রোগের লক্ষণ চোখের মণির এবং কনজাংটাইভার উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া কনজাংটাইভাতে জেরোসিস কর্নিয়াতে পাংটেট এপিফিলিয়াল ইরোসন এবং ফিলামেন্ট ইত্যাদি লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সূত্রঃ বিখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ফণী সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত।