ভাইরাল হেপাটাইটিস বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। ভাইরাল হেপাটাইটিসের মধ্যে হেপাটাইটিস বি অন্যতম। কারো কারো ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হয় যা থেকে যকৃতের কার্যক্ষমতা হ্রাস,যকৃতের ক্যান্সার অথবা সিরোসিসও হতে পারে। হেপাটাইটিস বি কি? হেপাটাইটিস বি একটি সংক্রামক রোগ। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সংক্রমণের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি দেখা দেয় যা যকৃতে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। রক্ত, বীর্য অথবা শরীরের অন্যান্য তরল পদার্থের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। বড়দের ক্ষেত্রে এর সংক্রমণ ভালো হয়ে গেলেও শিশুদের ক্ষেত্রে এর সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হয়। বর্তমান বিশ্বে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকারক ভাইরাস "হেপাটাইটিস"এর যত দ্রুত সংক্রমণ ঘটছে তার ভয়াবহতা এইডসের চেয়েও ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ নিয়ে গোটা মানবজাতির জন্য হুমকি স্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হেপাটাইটিস বা লিভারের একিউট এবং ক্রনিক সংক্রমণের জন্য দায়ী লিভার ভাইরাসগুলো হচ্ছে হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, হেপাটাইটিস-ডি এবং হেপাটাইটিস-ই। হেপাটাইটিস বা লিভারের একিউট এবং ক্রনিক সংক্রমণের জন্য দায়ী লিভার ভাইরাসগুলো হচ্ছে হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, হেপাটাইটিস-ডি এবং হেপাটাইটিস-ই। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের কারণে লিভারে প্রদাহের সৃষ্টি হয়ে থাকে। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে এই রোগ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ব্যপকতা এদেশের প্রায় শতকরা ৭ ভাগ মানুষ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের বাহক। তাদের বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ জটিল লিভারের রোগ হয়ে থাকে। এ দেশের প্রায় ৩.৫% গর্ভবর্তী মায়েরা হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। এই ভাইরাস তাদের নবজাতকের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস, এইডস রোগের চেয়ে ১০০ ভাগ বেশী সংক্রামক। দিনকে দিন হেপাটাইটিস-বি আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোগের বিস্তার ঘটে? অনিরাপদ যৌনতা/অবাধ যৌনতা, একই সিরিঞ্জ, সুঁই বারবার ব্যবহার করা, শরীরে উল্কি আঁকা, স্যালুনে ব্যবহৃত ক্ষুর, রেজর, ব্লেড, কাঁচি হতে হাসপাতালে হেপাটাইটিস বি আক্রান্তদের পরিচর্যার কারণে, ডেন্টিষ্টের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহৃত(অনিরাপদ) যন্ত্রপাতি, সিরিঞ্জ এ মাদক নেয়া, হেপাটাইটিস ‘বি’ বাহকের সিগারেট, লালা, তার সংস্পর্শে থাকা, আক্রান্তের রক্ত নেয়া, নবজাতকের আক্রান্ত হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে মায়ের বুকের বুকের দুধ থেকে,যদি মা হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমিত থাকেন। (বাবা মায়ের যেকোনো একজন আক্রান্ত থাকলে তাদের নবজাতক আক্রান্ত হতে পারে) মূলত দুইভাবে হেপাটাইটিস-বি মানব শরীরে বিস্তার ঘটে ১। উলম্ব ভাবে ২। আনুভূমিক ভাবে উলম্ব ভাবে বিস্তার রোগাক্রান্ত মা এর কাছে থেকে শিশুতে। প্লাসেন্টা জরায়ু থেকে পৃথক হওয়ার সময়। অ্যামনিওসেনটেসিস করা হলে। জন্মের পরে ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের সাথে শিশুর ঘনিষ্ঠতা থেকে। আনুভূমিক ভাবে বিস্তার নিরীক্ষাবিহীন রক্ত এবং রক্তের উপাদান পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে। ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশার দ্রব্যাদি গ্রহণের সময়। মেডিকেল ও ডেন্টাল চিকিৎসা গ্রহণ কালে দূষিত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে। ব্যক্তিগত জিনিস একাধিক ব্যক্তির ব্যবহারের ফলে, যেমন- টুথ ব্রাশ, রেজার। সমকামী ও উভয়কামী। শরীরের অন্যান্য তরল যেমন- লালা রস এবং ভ্যাজাইন্যাল তরল পদার্থ যখন রক্তের সংস্পর্শে আসলে। হেপাটাইটিস-সি রোগীর সামাজিক মেলামেশায় এই রোগ ছড়াতে পারে সামাজিক মেলামেশায় (হ্যান্ড শেক, কোলাকুলি) এই রোগ ছড়ায় না। এমনকি রোগীর ব্যবহার্য দ্রব্যাদি যেমন- গ্লাস, চামচ, জামা কাপড়ের মাধ্যমেও এই রোগ ছড়ায় না।। শুধুমাত্র যে সমস্ত দ্রব্য রোগীর রক্তের সংস্পর্শে আসে যেমন: ক্ষুর, ব্লেড, রেজার, টুথব্রাশ, সূচ) সেগুলোর মাধ্যমেই এই রোগ ছড়াতে পারে। উপসর্গ আক্রান্ত রোগীর কোন উপসর্গ নাও থাকতে পারে। এই রোগের সুপ্তবস্থা (ভাইরাস সংক্রমন থেকে রোগের লক্ষণ পর্যন্ত) প্রায় ৪ সপ্তাহ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। এক্ষেত্রে ফ্লু-এর মত জ্বর, ক্লান্তিবোধ, শরীর টনটন করা, ব্যাথা, বমি ভাব এবং ক্ষুধামন্দা-এই রোগের লক্ষণ। রোগ হওয়ার ঝুঁকি রোগাক্রান্ত মায়ের নবজাতকেরা। ইনজেকশন দিয়ে যারা নেশা গ্রহণ করেন। আক্রান্তের পরিবারের ঘনিষ্ঠ জনেরা এবং তার সঙ্গী বা সঙ্গীনী। স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত কর্মীরা যারা রক্তের সংস্পর্শে প্রায়শই আসেন, যেমন- শল্য চিকিৎসক, ডায়ালাইসিস ইউনিট ও রক্ত সঞ্চালন বিভাগের কর্মীরা, দাঁতের ডাক্তার, সেবিকা এবং ধাত্রীগণ। রোগের প্রতিরোধ করা যৌন সম্ভোগের সময় কনডম ব্যবহার করুন। কাচা সালাদ, ফল-মূল বেশি খাবেন। তেল-চর্বি যুক্ত খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। লাল মাংস খাবেন না। লবণ বা সোডিয়াম সল্ট একেবারেই খাবেন না। ভিটামিন বি, এন্টি-অক্সিডেন্ট যথা বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই যুক্ত খাবার বেশি খাবেন। প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট হাঁটবেন। ব্যায়ামের অভ্যাস করবেন। দিনে একবেলার বেশি ভাত খাবেন না, দুই বেলা রুটি খাবেন। ধূমপান, মদ্যপান নিষিদ্ধ। অযথা কোন Multivitamin খাবেন না। প্রচুর বিশ্রাম নিন। শৃঙ্খলিত জীবন যাপন করুন। পাঠকের উদ্দেশ্যে বলি, "আপনি আজ-ই HBsAG পরীক্ষা করে নিন। নিজের এবং পরিবারের সবার। যদি এখনও সংক্রমিত না হয়ে থাকেন তবে অতি দ্রুত হেপাটাইটিস-বি এর প্রতিষেধক টীকা নিন।হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণ থেকে রেহাই পেতে প্রতিরোধ-ই একমাত্র উপায়। ১। ব্যক্তিগত পদক্ষেপ ব্যক্তিগত দ্রব্যাদির সহব্যবহার্য বর্জন করা একবার ব্যবহার্য সিরিঞ্জ ও সূচ ব্যবহার করা নিরাপদ রক্তসঞ্চালন নিরাপদ যৌন চর্চা ২। টিকা গ্রহণের মাধ্যমে টিকা গ্রহণের মাধ্যমে হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধ করা সম্ভব। টিকা গ্রহণের আগে অবশ্যই হেপাটাইটিস-বি স্ক্রিনিং করে নেওয়া উচিত। টিকার নিয়ম- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এর পরামর্শ অনুযায়ী এই টিকা দিতে হবে- ০,১,৬, অথবা ০,১,২, ও ১২ মাসে। যদি কাক্ষিত টাইটার অর্জিত না হয়, তবে ৩য় ডোজের পর অতিরিক্ত আর একটি ডোজ (বুস্টার ডোজ) নিতে হয়। টিকার কার্যকারিতা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ৮৫ থেকে ১০০ ভাগ এন্টিবডি প্রস্তুত করার ক্ষমতা (এন্টিবডি রেসপন্স) দেখা যায়। টিকা দেওয়ার ১ থেকে ৩ মাসের মধ্যে এন্টিবডি টেস্ট করে টাইটার দেখতে হয়। এন্টি এইচবিএস ১০০ ইউনিট হলে ভাল, ১০-১০০ ইউনিট হলে মোটামুটি এবং ১০ ইউনিট এর কম হলে অতিরিক্ত আরেকটি ডোজ (বুস্টার ডোজ) নিতে হবে। সংক্রমণ নির্ণয় প্রাথমিক ভাবে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস সংক্রমণ সনাক্তকরণের জন্য রক্তে এইচবিএসএজি স্ক্রিনিং টেস্ট করতে হয়। এজন্য রোগীর শরীর থেকে সামান্য রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করলে হয়। হেপাটাইটিস-বি পেজটিভ রোগীদের করণীয় হেপাটাইটিস বি পজেটিভ রোগীদের অহেতুক ঘাবড়ানোর কারণ নেই। তবে জেনে নিতে হবে যে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের কারণে লিভার কোন ক্ষতি হয়েছে কিনা অথবা হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা। এর জন্য HBeAg, AST (SGOT), ALT (SGPT), HBV-DNA, পেটের আলট্রাসাইন্ড (Ultrasound) এবং এন্ডোসকপি (Endoscopy of upper GIT) পরীক্ষা করে নেওয়া দরকার। এই সমস্ত পরীক্ষার ফলাফল এবং রোগীর শারীরিক উপসর্গ বিবেচনা করে সঠিক চিকিৎসা নির্ধারণ করতে হয়। ক্ষেত্র বিশেষে তাৎক্ষনিক চিকিৎসা আরম্ভ করতে হয়। হেপাটাইটিস-বি জনিত লিভার সিরোসিস এর চিকিৎসা লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন (Liver Transplantation) লিভার সিরোসিস এ আক্রান্ত রোগীর জীবন রক্ষাকারী পদক্ষেপ। অপারেশন এর মাধ্যমে রোগাক্রান্ত লিভার অপসারন করে সেই স্থানে দাতা ব্যক্তির সম্পূর্ণ বা আংশিক সুস্থ লিভার প্রতিস্থাপন করে লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন করা যায়। সচরাচর জিজ্ঞাসা প্রশ্ন. ১ . হেপাটাইটিস বি কেন হয় ? উত্তর. হেপাটাইটিস বি ভাইরাস দ্বারা যকৃতে সংক্রমণের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি হয়ে থাকে। প্রশ্ন .২ .কাদের হেপাটাইটিস বি হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে ? উত্তর. যাদের হেপাটাইটিস বি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি রয়েছে তারা হলেন- একের অধিক ব্যক্তির সাথে অনিরাপদ শারীরিক সর্ম্পকে লিপ্ত হলে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক হয়ে থাকলে শারীরিক মিলনের মাধ্যমে ছড়ায় এমন কোন রোগ থাকলে কোন পুরুষ অন্য পুরুষের সাথে শারীরিক সম্পর্ক লিপ্ত হলে কারো ব্যবহৃত সুচের মাধ্যমে মাদক নিলে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে একই বাড়িতে বসবাস করলে মানুষের রক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সংক্রান্ত কাজ করে যারা তাদের কিডনীর অসুখের জন্য যারা হেমোডায়ালাইসিস করেন হেপাটাইটিস বি ভাইরাস প্রবণ এলাকায় বেড়াতে গেলে প্রশ্ন .৩ . হেপাটাইটিস বি হলে কি ধরণের জটিলতা দেখা দিতে পারে ? উত্তর. হেপাটাইটিস বি’র ফলে কখনো কখনো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন : যকৃত কলায় ক্ষত বা সিরোসিস (Cirrhosis)যকৃতের ক্যানসারযকৃত কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়াহেপাটাইটিস ডিব’র সংক্রমণকিডনীর বিভিন্ন সমস্যারক্তের ধমনীতে প্রদাহ প্রশ্ন. ৪. যকৃতের কার্যকারিতা কেন পরীক্ষা করা হয় ? উত্তর. নানা কারণে যকৃতের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। যেমন: পরীক্ষার মাধ্যমে- যকৃতে যদি কোন রোগ জীবাণুর সংক্রমণ হয়ে থাকে সেটা বুঝা যায়রোগের মাত্রা বুঝা যায়চিকিৎসা কার্যকর হচ্ছে কিনা সেটা বুঝা যায় প্রশ্ন.৫. হেপাটাইটিস বি টিকা নেয়া কাদের জন্য জরুরী? উত্তর. প্রতিটি নবজাতক শিশুদেরপ্রতিটি শিশু এবং কিশোরদের যাদের জন্মের পর হেপাটাইটিস বি টিকা দেয়া হয়নিযাদের যৌনবাহিত কোন রোগ আছেশারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যারা কোন প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ থাকেনস্বাস্থ্যকর্মী যারা চাকুরী সূত্রে রক্ত সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করেনএইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তিপুরুষ যারা অন্য পুরুষের সাথে শারীরিক সর্ম্পকে লিপ্ত হনযারা ৬ মাসের মধ্যে শারীরিক সর্ম্পকের ক্ষেত্রে সঙ্গী পরিবর্তন করেনযাদের দীর্ঘস্থায়ী যকৃতের সমস্যা রয়েছেযারা সিরিঞ্জের সাহয্যে অবৈধভাবে মাদক গ্রহণ করেনযিনি হেপাটাইটিস বি তে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে বসবাস করেনযাদের কিডনির সমস্যা চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছেশারীরিক সর্ম্পকের ক্ষেত্রে সঙ্গী হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হলেহেপাটাইটিস বি প্রবণ এলাকায় ভ্রমণের পরিকল্পনাকারীর সূত্র: বিকাশ পিডিয়া টীম (বাংলা)