<p style="text-align: justify;">ভালোবাসায়, উৎসবে চকলেটের জুরি নেই সবাই জানি। আশৈশব চকলেট খেয়েছি সবাই। বড় হয়েও কিন্তু সুযোগ পেলেই সবাই চকলেট দেখলেই ফিদা। কিন্তু রেশনে আর সেনাকে চাঙ্গা রাখতে চকলেট! বিপ্লবেও চকলেট ভাবা যায়?</p> <p style="text-align: justify;">ভালোবাসায় চকলেট, রেশনে চকলেট, সেনাবাহিনীকে চাঙ্গা রাখতে চকলেট, মুদ্রায় চকলেট, বিশেষ লেনদেন চূড়ান্ত করার অনুষ্ঠানে, শক্তি বাড়াতে চকলেট। আমেরিকার বিপ্লবেও চকলেট। এমনকি হার্ট আর ব্রেইন ভালো রাখতে, ক্যান্সার থেকে বাচতেও চকলেট। আনন্দে থাকতেও চকলেট। নিশ্চই ভাবছেন এটাও সম্ভব? হ্যাঁ একসময়ে আমেরিকান সেনাদের, রেশনে নিয়মিত চকলেট দেয়া হতো। </p> <p style="text-align: justify;">ভ্যালেন্টাইন উইক চলছে বিশ্বব্যাপী। এর মধ্যে চকলেট ডে একটি অন্যতম দিন। এই চকলেট ডে পালন ঠিক কবে থেকে শুরু হয় বিশ্বব্যাপী যদিও তার কোন ঐতিহাসিক ব্যাখা পাওয়া যায়নি, তবে চকলেট মানেই ফ্যান্টাসি। চকলেট মানেই মন ভালো হয়ে যাওয়া, চকলেট মানেই ফুরফুরে রোমান্স।</p> <p style="text-align: justify;">কিন্তু বিজ্ঞানীরা দৈববাণী করেছেন, এই চকলেট ফুরিয়ে যাচ্ছে আগামী ২০৫০ সাল অর্থাৎ আর মাত্র ত্রিশ বছরের মধ্যেই। তাই চকলেট ডেইজ’টা উদযাপন করেই ফেলুন এবার ডার্ক চকলেটের সঙ্গে। প্রতিবছর চকলেট প্রেমিরা বিশ্বজুড়ে ৭ই জুলাই ‘বিশ্ব চকলেট দিবস’ পালন করে। এছাড়া আজকের প্রজন্ম ভ্যালেন্টাইন উইকের তৃতীয় দিনটি অর্থাৎ রোজ ডে, প্রপোজ ডে-এর পরের দিনটিই উদযাপন করে চকলেট দিবস হিসেবে (এবছর ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২) ।</p> <p style="text-align: justify;">তাই মন আর হৃদয় ভালো রাখতে, প্রেমিকাকে মিষ্টি প্রেমে ভরিয়ে দিতে চকলেটের জুরি মেলা ভার। তাই একটি ডার্ক চকলেটের আনন্দ নিতে নিতে চলুন, টাইম মেসিনে ট্র্যাভেল করে চলে যাই আড়াই হাজার বছর আগেকার চকলেটের মিষ্টি ইতিহাসের খোঁজে।</p> <p style="text-align: justify;">প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস চকলেটের। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, ৪০০০ বছর আগেই মেক্সিকোতে প্রথম কোকো গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে অ্যাজটেকরা প্রথম চকোলেট কে পানীয় হিসেবে খেতে শুরু করেন ২৫০০ বছর আগে। সে হিসেবে চকলেটের ইতিহাস আড়াই হাজার বছর পুরোনো। </p> <p style="text-align: justify;">‘চকলেটের সত্য ইতিহাস’ বা ‘The True History of Chocolate’ (থেমস এবং হাডসন, ২০১৩) বইয়ের লেখক ইতিহাসবিদ সোফি এবং মাইকেল কো এর মতে, চকলেট শব্দটি এসেছে অ্যাজটেক শব্দ ‘জোকোয়াটল’ থেকে। আর এই চকলেটের সাথে মিলে মিশে আছে আমেরিকার প্রাচীনতম সভ্যতার ইতিহাস। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে চকলেটের স্বাদ প্রথম পেয়েছিল মায়া সভ্যতায় লাতিন আমেরিকার মানুষ। আর নামটিও এসেছে তাদের ভাষা ‘স্কোকোলেট’ থেকে। যার অর্থ ‘অম্লতিতা’। এককথায় তেঁতো। প্রথমে চকলেট পানীয় হিসেবেই মানুষ পান করতো। আস্তে আস্তে সময়ের সাথে সাথে এই তেঁতো পানীয় হয়ে উঠল মানুষের প্রিয় মিষ্টি। আজ পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষেরই পছন্দ এই চকলেট বার। স্বাদ, গন্ধ, রুপ রঙ পাল্টে আজ পৃথিবীর অর্থনীতিরও একটা অঙ্গ চকলেট বা কোকো।</p> <h3 style="text-align: justify;">ইতিহাসে বুঁদ হয়ে যাওয়ার আগে চলুন জেনে নেই কিভাবে এলো চকলেট</h3> <p style="text-align: justify;">কোকো গাছের ফল থেকেই তৈরি হয় চকলেট। সেন্ট্রাল এবং দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া যায় এই কোকো গাছ। গুটি গুটি ফলগুলোর একেকটিতে ৪০টির মতো বিন বা শুটি থাকে। শুটিগুলিকে প্রথমে শুকিয়ে নেওয়া হয় এরপর তা পুড়িয়ে বানানো হয় কোকো বিন। কে কখন কিভাবে চকলেট তৈরির এই উপায় আবিস্কার করেছিলেন তা এখনও জানা যায়নি। </p> <p style="text-align: justify;">তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ার ন্যাশানেল মিউজিয়ামের, কালচারেল আর্ট কিউরেটর হায়েস লেভিস জানান, প্রাচীন ‘ওলমেক’ সভ্যতার মানুষেরা, ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকেই নৌকোয় ভর্তি করে কোকো ফল নিয়ে আসতেন। ধারণা করা হয়, ওলমেকরা বিশেষ কোন উৎসব বা অনুষ্ঠানের উদযাপনের জন্য প্রথম কোকো দিয়ে বিশেষ পানীয় তৈরি করেছিলেন। তবে ইতিহাস এই গল্পকে বিশ্বাস করেনা, ফলে এই সম্পর্কে দ্বিমত রয়েছে। কোন কোন ইতিহাসবিদ মনে করেন, ওলমেকরা তরল পানীয় হিসেবে এই বিনগুলি ব্যবহার করতেন বা গুটিগুলি সাজিয়ে রাখতেন।</p> <h3 style="text-align: justify;">চকলেটের বিবর্তন</h3> <p style="text-align: justify;">ইউরোপে যখন প্রথম চকলেট এলো, তখন এই চকলেট এতোটাই দামী এবং বিলাসী খাদ্য ছিল যে শুধু উচ্চবিত্তিয়রাই চকলেটের স্বাদ পেতো। তবে ১৮৮২ সালে ডাচ রাসায়নবিদ, কোয়েরাড জোহানেস ভয়ান হাউটেন, লবণের ক্ষারের সঙ্গে কোকো বিন মিশিয়ে এক ধরনের পাউডার চকলেট উদ্ভাবন করেন। এই কোকো পাউডারটি খুব সহজেই জলের সঙ্গে মিশিয়ে পান করা যেত। এই প্রক্রিয়াটি ‘ডাচ প্রসেসিং’ নামে খ্যাতি পায়। এই পদ্ধতিতে তৈরি চকলেটকে ‘কোকো পাউডার’ বা ‘ডাচ কোকো’ বলা হতো। এরপর আসে ‘কোকো প্রেস যন্ত্র’। এই যন্ত্রের মাধ্যমে কোকো বিন গুলিকে রোস্ট করে বা ভেজে নিয়ে কোকো বিনগুলি থেকে কোকো বাটার আলাদা করা হতো। এর ফলে কোকো পাউডার বানানো আরও সহজ হয়ে উঠলো। আর এভাবেই নানা স্বাদের, নানা ধরনের চকলেট তৈরি হতে থাকে। ডাচ প্রসেসিং এবং চকলেট প্রেস এই দুই পদ্ধতির কারনে চকলেট পৌঁছে গেলো সব অংশের মানুষের মধ্যে। দামও চলে এলো সব শ্রেণির মানুষের সাধ্যের মধ্যেই। এর সাথে সাথে চকলেটের উৎপাদনেও দারুণ গতি এলো। </p> <p style="text-align: justify;">উল্লেখ্য, ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে মধ্য আমেরিকায় কোকো গাছ ও এই গাছের বীজ অত্যন্ত মূল্যবান বস্তু হিসেবে বিবেচিত হয়। সে সময় তারা কোকো গাছের বীজ থেকে গাজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘ্রাণ উৎপন্ন করতো। তারপর তা শুকিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রোস্টের মতো তৈরি করে তাপ দিয়ে বীজের খোসা ছাড়িয়ে ফেলে দিতো। খোসা ছড়ানোর পর যা অবশিষ্ট থাকতো তাকে বলা হতো নিব। আর এই নিবের সঙ্গেই বিভিন্ন মসলার সংমিশ্রণে তৈরি করা হত চকলেট।। এই পানীয় তেঁতো প্রকৃতির হলেও তখনকার সময়ে এটি অভিজাত শ্রেণীর মানুষদের কাছে জনপ্রিয় ছিল এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবে এই পানীয় পান করা হতো। এই পানীয় অত্যন্ত মূল্যবান হওয়ায় তা সাধারণ মানুষের পক্ষে ক্রয় করে খাওয়া সম্ভব ছিল না। এই গাছ এতটাই মূল্যবান ছিল যে, এই কোকো গাছের বীজ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হতো।</p> <h3 style="text-align: justify;">ঈশ্বরের উপহার কোকো ফল</h3> <p style="text-align: justify;">মায়ানস এবং অ্যাজটেকস’রা বিশ্বাস করতো, কোকো বীজের রহস্যময় বৈশিষ্ট্য আছে। এ কারণে ধর্মীয় বিভিন্ন রীতি-নীতিতে তারা এর ব্যবহার করতো। এরপর স্প্যানিশরা প্রথম চকলেটের মধ্যে মিষ্টি যোগ করে। জনশ্রুতি আছে, অ্যাজটেকের রাজা মন্টেজুমা স্প্যানিশ বিজয়ী রাজা হার্নান কর্টসকে তিক্ত চকলেট পানীয় পান করান। এই স্বাদ খুবই জঘন্য লেগেছিল রাজা হার্নানের কাছে। এরপর তার লোকেরা এতে বেত ফলের নির্যাস, চিনি এবং মধু যুক্ত করে বিশেষ পানীয় তৈরি করে স্পেনে ফিরে আসে। এরপর স্পেনে এই পানীয়র জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়ে যায়। চকলেট ১৮তম শতাব্দীতে ইউরোপীয়দের কাছে একটি ফ্যাশনেবল পানীয় ছিল।</p> <p style="text-align: justify;">কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীরা কিন্তু শোনাচ্ছে এক দৈববাণী। এখনই সংরক্ষণ না করা গেলে আগামী ৩০ বছরের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে এই কোকো গাছ। তাই বিজ্ঞানীরা আপ্রাণ চেষ্টা করছে, এই কোকো গাছের ডিএনএ-তে পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রকৃতির সাথে কোকো গাছ কে বাঁচিয়ে রাখার। তাই চকলেট ডেইসে আমাদের উদ্যোগী হয়ে ওঠা দরকার, কমানো দরকার পরিবেশ দূষণ। অন্যথায় আরও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া আরও অনেক গাছ পালা-জীব জন্তুর মতো একদিন এই চকলেটও হয়ে যাবে রেয়ার স্পিসিস।</p> <p style="text-align: justify;"> </p> <p style="text-align: justify;"><strong>লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)</strong></p> <p style="text-align: justify;"><strong>তথ্য সুত্রঃ</strong></p> <ul> <li style="text-align: justify;"><em>The True History of Chocolate’ by Sophie D. Coe</em></li> <li style="text-align: justify;"><em>দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’</em></li> <li style="text-align: justify;"><em>অ্যাড্রিয়েনা মরগানেলি দ্বারা প্রকাশিত ‘দ্য বায়োগ্রাফি অব চকোলেট’ (২০০৫) </em> </li> </ul>