<h3 style="text-align: justify;">ভালোবাসায়, বিপ্লবে, রেশনে, মুদ্রায় চকলেটঃ চকলেটের ইতিহাস</h3> <p style="text-align: justify;">চকলেট আমাদের সবার প্রিয়। কিন্তু এই সুস্বাদু চকলেট কিন্তু এক সময়ে তেঁতো পানীয় হিসেবেই মানুষ পান করতো। প্রায় চার হাজার বছর ধরে দিনে দিনে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে আজকের এই আধুনিক সুস্বাদু চকলেটের স্বাদে আমরা খুশী হয়ে যাই। কিন্তু চকলেটের এই ইতিহাসের পেছনে আছে, আমেরিকান বিপ্লব, ক্রীতদাসদের হাড় ভাঙা পরিশ্রম আরও অনেক না জানা ইতিহাস। চলুন টাইম মেশিনে ভড় করে ঘুরে দেখে আসি সেই ইতিহাস।</p> <p style="text-align: justify;">প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস চকলেটের। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, ৪০০০ বছর আগেই মেক্সিকোতে প্রথম কোকো গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে অ্যাজটেকরা প্রথম চকোলেটকে পানীয় হিসেবে খেতে শুরু করেন ২৫০০ বছর আগে। সে হিসেবে চকলেটের ইতিহাস আড়াই হাজার বছর পুরোনো। </p> <h3 style="text-align: justify;">মায়া সভ্যতার ইতিহাসে চকলেট</h3> <p style="text-align: justify;">মায়া সভ্যতায় চকলেট কে সম্মান জনক পানীয় হিসেবে গণ্য করা হতো। ওলমেকরাই কোকো’কে সেন্ট্রাল আমেরিকার মায়া সভ্যতায় ছড়িয়ে দিয়েছিল এনিয়ে কোনও দ্বিমত নেই ঐতিহাসিকদের মধ্যে। প্রাচীন মায়া সভ্যতায় মানুষ চকলেট শুধু পানই করতেন না, একে খুব সম্মান জনক পানীয় হিসেবে সমীহ করতেন। প্রাচীন মায়ার লিখিত ইতিহাসে উল্লেখ আছে, বিশেষ কোন লেনদেন চূড়ান্ত করার অনুষ্ঠানে চকলেটের পানীয় দিয়ে তারা উদযাপন করতেন। একেই শুভ বলে মানা হতো। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ভাবেও কোকো বা চকলেট বিশেষ স্থান পেয়েছিল মায়া সভ্যতায়। অবশ্য ইতিহাসে এর প্রচুর প্রমান রয়েছে। মায়া সংস্কৃতিতে চকলেটের বিশেষ গুরুত্ব থাকলেও এই পানীয় কিন্তু সম্পদশালী, ক্ষমতাধর এবং সাধারণ প্রজাদের জন্যেও বিশেষ অনুষ্ঠানে সহজলভ্য ছিল। মায়া সভ্যতায় অনেক পরিবারেই প্রতিবেলার আহারে বরাদ্দ ছিল চকলেটের পানীয়।</p> <h3 style="text-align: justify;">কেমন ছিল মায়া সভ্যতার চকলেট?</h3> <p style="text-align: justify;">মায়া সভ্যতায় চকলেট ছিল ঘন আর ফেনাময়। এমনকি এই চকলেটের সাথে লাল লঙ্কা, মধু এবং জল মিশিয়ে পান করা হতো।</p> <h3 style="text-align: justify;">আজটেক সভ্যতায় চকলেট</h3> <p style="text-align: justify;">১৪২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আজটেক সভ্যতায় মানুষ চকলেটকে আরেকটি স্তরে নিয়ে গেছে। তারা বিশ্বাস করতেন, এই কোকো ফল স্বয়ং ‘ঈশ্বরের উপহার’। মায়া সভ্যতার মানুষদের মতো আজটেক সভ্যতার মানুষেরাও সুসজ্জিত পাত্রে গরম বা ঠাণ্ডা ক্যাফেইন বা স্পাইসি বা মশলা চকলেট পানীয় হিসেবে পান করতেন। আজটেক সভ্যতায় চকলেট ছিল মূলত উচ্চবিত্তদের বিলাসিতা। যদিও বিয়ে বা বিশেষ কোনও অনুষ্ঠান উপলক্ষে নিম্নবিত্তরাও চকলেটের স্বাদ উপভোগ করতেন। তবে চকলেটের দাম কিন্তু মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তদের নাগালের বাইরেই ছিল।</p> <p style="text-align: justify;">আজটেক সভ্যতায় চকলেট খাদক হিসেবে এখনও কুখ্যাত আজটেক শাসক দ্বিতীয় মণ্টেজুমার। ১৪৬৬ সালে জন্ম হয় এই দাপুটে মন্টেজুমার। বেঁচে ছিলেন ১৫২০ সাল পর্যন্ত। তিনি শক্তিমান এবং বীর্যবান হতে প্রতিদিন গ্যালন ভর্তি চকলেট পান করতেন। শুধু তাই নয় নিজের সামরিক বাহিনীর যোদ্ধাদের আরও বেশী শক্তিশালী করে তোলার জন্যেও কোকো বিন সংরক্ষণ করতেন।</p> <h3 style="text-align: justify;">মুদ্রা হিসেবে চকলেট</h3> <p style="text-align: justify;">উল্লেখ্য, আজটেক সভ্যতায় মানুষ, খাদ্যপণ্য বা অন্য কোন সামগ্রী কেনাবেচা করতে মূদ্রা হিসেবে কোকো বিন ব্যাবহার করে। আজটেক সভ্যতায় কোকো বিন স্বর্ণ বা<br />রৌপ্যর থেকেও দামী হিসেবে গণ্য করা হতো।</p> <h3 style="text-align: justify;">ইউরোপে চকলেটঃ</h3> <p style="text-align: justify;">স্পানিশ হট চকলেট; এই চকলেটের সাথে প্রায় সব চকলেট প্রেমীরাই কিন্তু পরিচিত। ইউরোপে চকলেটের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, স্পেনের বাসিন্দারাই প্রথম চকলেটের<br />স্বাদ উপভোগ করেছিলেন। প্রায় সমস্ত ঐতিহাসিকরাই কিন্তু এব্যাপারে সহমত প্রকাশ করেন। একদল ঐতিহাসিক মনে করেন, ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা পাড়ি দেয়ার পথেই কোকো বিন আবিস্কার করেন এবং স্পেনে ফেরার সময় এই কোকো বিন সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। সময়টা ১৫০২ সাল। কোন কোন ঐতিহাসিকের দাবী, আজটেক সভ্যতায় মণ্টেজুমার দরবারেই স্প্যানিশ বীর হারনান কার্টেজ প্রথম চকলেটের খোঁজ পেয়েছিলেন। তিনিই দেশে ফেরার সময় সঙ্গে করে কোকো বিন নিয়ে এসেছিলেন। শুধু তাই নয় ঈশ্বরের এই উপহার কোকো ফল পাওয়ার সমস্ত ঘটনাই তিনি গোপন রেখেছিলেন সবার কাছেই।</p> <p style="text-align: justify;">আরেক দল ঐতিহাসিক মনে করেন, ১৫৪৪ সালে স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ গুয়াতেমালান, মায়া ভিক্ষুদের কাছ থেকে কোকো বিন পেয়েছিলেন উপহার হিসেবে।<br />স্পেনে চকলেট কিভাবে এলো এনিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকলেও ১৫০০-এর দশকের শেষভাগে স্প্যানিশ দরবারে চকলেট বেশ সমাদৃত। অন্যদিকে স্পেন চকলেট আমদানি শুরু করে ১৫৮৫ সালে। ইতালি ও ফ্রান্সসহ অন্য যেসব ইউরোপীয় দেশের অভিযাত্রীরা সেন্ট্রাল আমেরিকায় ভ্রমণ করতে যেতেন, তারাও সেখানে চকলেটের খোঁজ পেয়েছিলেন এবং সেই চকলেট নিয়ে আসতেন নিজ নিজ দেশে। আর কিছুদিনের মধ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চকলেট ম্যানিয়া ছড়িয়ে পড়ে। চাহিদা বাড়তে থাকায় কোকোর চাষাবাদ এবং চকলেট উৎপাদনে শ্রমিক হিসেবে হাজার হাজার ক্রীতদাসকে খাটাতে শুরু করে মালিকপক্ষ।</p> <p style="text-align: justify;">কেমন ছিল ইউরোপীয় চকলেটের স্বাদ! আজটেকের চকলেট তৃপ্ত করতে পারেনি ইউরোপিয়ান দের। তাই এই চকলেটের সঙ্গে আখের রস, দারুচিনি, জল এবং অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে নিজেদের পছন্দমতো হট চকলেট বানাতে শুরু করেন ইউরোপিয়ানরা। খুব কম সময়ের মধ্যেই লন্ডন, আমস্টারডম সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় শহরে চকলেটের দোকান গড়ে উঠতে থাকে।</p> <h3 style="text-align: justify;">আমেরিকান উপনিবেশে চকলেট</h3> <p style="text-align: justify;">১৬৪১ সালে একটি স্প্যানিশ জাহাজে করে চকলেট নিয়ে আসা হয় ফ্লোরিডায়। ধারনা, ১৬৮২ সালে বোস্টনে প্রথমে ‘আমেরিকান চকলেট হাউস’ চালু হয়। ১৭৭৩ সালের দিকে একটি বড় আমেরিকান উপনিবেশে কোকো বিন আমদানি করা হয়। এরপর থেকেই সমস্ত অংশের মানুষের জন্যই চকলেট ছিল লোভনীয়।</p> <h3 style="text-align: justify;">আমেরিকান বিপ্লবেও চকলেট</h3> <p style="text-align: justify;">১৭৭৫ সাল থেকে ১৭৮৩ সাল আমেরিকান বিপ্লবের সময়। এই বিপ্লবের দিনগুলিতেও সামরিক বাহিনীর রেশন তালিকায় যুক্ত হয় চকলেট। কখনও কখনও সৈনিকদের বেতন হিসেবেও টাকার পরিবর্তে কোকো বা চকলেট দেয়া হতো। প্রসঙ্গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও আমেরিকান সৈনিকদের রেশন হিসেবে চকলেট দেয়া হয়েছে।</p> <h3 style="text-align: justify;">শিল্প বিপ্লব এবং চকলেট</h3> <p style="text-align: justify;">শিল্প বিপ্লবের সময় চকলেটের উৎপাদন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে কোকো গাছের উৎপাদনও বেড়ে যেতে শুরু করে। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভালো জন্মায় কোকো গাছ।<br />আর সেখানেই দাসত্বপ্রাপ্ত মানুষদেরকে দিয়ে কোকো বাগান চাষ করানো হতো। অ্যাড্রিয়েনা মরগানেলি দ্বারা প্রকাশিত ‘দ্য বায়োগ্রাফি অব চকোলেট’ (২০০৫) অনুসারে, প্রাথমিকভাবে স্পেনীয় উপনিবেশকারীরা মেসো আমেরিকানদেরকে কোকো বাগান চাষ করতে বাধ্য করেছিল। আদিবাসীরা যখন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে<br />শুরু করে, তখন দাসত্বপ্রাপ্ত আফ্রিকানদের শ্রম সংকট মেটাতে নিয়ে আসে ইউরোপিয়ানরা। আখ, নীল এবং অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি, দাসত্বপ্রাপ্ত আফ্রিকানরা<br />ক্যারিবীয়, মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে চকলেট শিল্পে যোগদান করে। তারা নতুন ইউরোপীয় স্বাদযুক্ত চকলেট তৈরির জন্য বেশি বেশি কোকো গাছ রোপণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ফলনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিল।</p> <h3 style="text-align: justify;">আধুনিক চকলেট</h3> <p style="text-align: justify;">উনবিংশ শতকের বেশির ভাগ সময় পর্যন্ত চকলেটকে পানীয় হিসেবেই উপভোগ করা হতো। কখনো কখনো তাতে জলের বদলে মেশানো হতো দুধ। ১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ চকলেট কোম্পানি জে. এস. ফ্রাই অ্যান্ড সনস প্রথমবার চিনি, তরল চকলেট ও কোকো বাটার মিশিয়ে চকলেট বার উৎপাদন করেন।</p> <p style="text-align: justify;">১৮৭৬ সালে সুইস চকলেট ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল পিটার প্রথম চকলেটের সঙ্গে দুধের গুড়ো মিশিয়ে মিল্ক চকলেট উৎপাদন করেন। এর কয়েক বছর পরই বন্ধু হেনরি নেসলের<br />সঙ্গে তিনি নেসলে কোম্পানি গড়ে তোলেন এবং মিল্ক চকলেটকে বড় পরিসরে বাজারে ছড়িয়ে দেন।</p> <p style="text-align: justify;">উনবিংশ শতক ধরেই বাজারে চকলেট বেশ দাপট দেখালেও তখনো সেটি ছিল শক্ত, এবং চুষে খাওয়ার অনুপযুক্ত। ১৮৭৯ সালে, আরেক সুইস চকলেট ব্যবসায়ী রুডলফ লিন্ড এমন এক মেশিন উদ্ভাবন করেন, যেটি এমনভাবে মিশ্রণ ঘটাতে সক্ষম, যার ফলে চকলেট হয়ে ওঠে মসৃণ ও কোমল।</p> <p style="text-align: justify;">উনবিংশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতকের প্রথমভাগে ক্যাডব্যারি, মার্স, নেসলে ও হার্সলের মতো কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ মিষ্টি চকলেট উৎপাদন ও বাজারজাত করতে থাকে।</p> <p style="text-align: justify;">আজকের দুনিয়ায় বা আধুনিক সময়ে চকলেট খুবই সুস্বাদু এবং খেতে দারুণ। এখনও পানীয় হিসেবে চকলেট পাওয়া যায়, কিন্তু চকলেট বারের চাহিদাই সবচেয়ে বেশী।</p> <p style="text-align: justify;"> </p> <p style="text-align: justify;"><strong>লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)</strong></p> <p style="text-align: justify;"><strong>তথ্যসুত্রঃ</strong></p> <ul> <li style="text-align: justify;"><em>The True History of Chocolate’ by Sophie D. Coe</em></li> <li style="text-align: justify;"><em>দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’</em></li> <li style="text-align: justify;"><em>অ্যাড্রিয়েনা মরগানেলি দ্বারা প্রকাশিত ‘দ্য বায়োগ্রাফি অব চকোলেট’ (২০০৫) </em></li> </ul>