‘স্ট্রোক’ আর ‘হার্ট অ্যাটাক’ কিন্তু এক নয়। আমরা প্রায়ই স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাককে গুলিয়ে ফেলি। স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কের রোগ। যদি কোনো কারণে মস্তিষ্কের কোনো অংশের রক্ত চলাচল বিঘ্নিত হয় এবং তা ২৪ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয় অথবা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রোগী মৃত্যুবরণ করে, তাহলে এ অবস্থার নাম স্ট্রোক। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই ইসকেমিক স্ট্রোক মস্তিষ্কে ও রক্তনালির রক্তে জমাট বেঁধে অথবা শরীরের অন্য কোনো স্থান থেকে বিশেষ করে হৃৎপিন্ড থেকে জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্কে নিয়ে রক্তনালির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। বাকি ২০ শতাংশ স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত। স্ট্রোক বা পক্ষাঘাত কি? মস্তিষ্কে অক্সিজেন ও পুষ্টি পরিবহনকারী রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা ফেটে গেলে স্ট্রোক হয়। সাধারণত শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে গেলে আমরা বলি স্ট্রোক বা পক্ষাঘাত হয়েছে। কিন্তু সব সময় যে এমনটাই হবে, তা নয়। স্ট্রোকের আরও উপসর্গ আছে। এসব উপসর্গ নির্ভর করে মস্তিষ্কের ঠিক কোন জায়গায় স্ট্রোক হয়েছে, তার ওপর। স্ট্রোক বা পক্ষাঘাতে কারা আক্রান্ত হতে পারে! বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বয়স্করা স্ট্রোকে আক্রান্ত হলেও অল্প বয়সীদেরও এই সমস্যা হতে পারে। তাই যেকোনো বয়সে স্ট্রোকের কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই অবহেলা করা চলবে না। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, স্ট্রোকের রোগীর জন্য সময় মহামূল্যবান। সময় পেরিয়ে গেলে মূল চিকিৎসার সুযোগ কমে যায়। তখন কেবল সহায়ক চিকিৎসা চলে। এতে পরবর্তী জীবনের জটিলতাগুলো এড়ানো সম্ভব হয় না। কাজেই ছোট-বড় সব লক্ষণের দিকেই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। স্ট্রোক বা পক্ষাঘাতের লক্ষণ হঠাৎ প্রচণ্ড মাথাব্যথা, যা কোনো কিছুতেই কমছে না—স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। বমি বা মাথা ঘোরানো, খিঁচুনি হতে পারে। স্ট্রোকের কারণে হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বলতে কিংবা বুঝতে অসুবিধা হওয়া, খেতে অসুবিধা, ঠোঁটের কোণ দিয়ে খাবার গড়িয়ে পড়া, কিংবা মুখ একদিকে বাঁকা হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। রোগীর চোখ বুজতে সমস্যা হতে পারে, আবার চোখের পাতা ঝুলে থাকতে পারে। দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে। ঝাপসা দেখা, একটি জিনিস দুটি দেখা কিংবা কানে শুনতে সমস্যা হতে পারে। মুখের কোনো অংশ অবশ হয়ে পড়তে পারে, এক হাত বা এক পায়ে বোধশক্তি কমে যাওয়া কিংবা এক হাত বা এক পা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অসংলগ্ন কথা ও আচরণ, এমনকি চেতনা হারালেও স্ট্রোকের কথা ভাবতে হবে। হঠাৎ করে কেউ লিখতে পারছেন না, ডান-বাঁ বুঝতে পারছেন না, হঠাৎ সাধারণ গণনার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলে সাবধান হতে হবে। স্ট্রোকের কারণ বার্ধক্য, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, ডায়াবেটিস, রক্তে বেশি কোলেস্টেরল এবং হার্টের ভাল্বের রোগ, অনিয়মিত হার্টবিট, হার্ট অ্যাটাক ইত্যাদি। উপসর্গ ও লক্ষণ স্ট্রোকের উপসর্গের মধ্যে রয়েছে হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, বমি। কোনো ক্ষেত্রে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা, শরীরের এক বা একাধিক অংশ অবশ হয়ে যাওয়া এবং অনেক সময় কথা বলা বন্ধসহ প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। স্ট্রোকের প্রধান উপসর্গ প্যারালাইসিস এ রোগের প্রধান উপসর্গ। সাধারণত একদিকের হাত-পা, কখনো কখনো মুখমন্ডলের একাংশ প্যারালাইসিস হয়ে থাকে। স্ট্রোকের ধরন ও পরিমাপ অনুযায়ী প্যারালাইসিসের ধরন ও পরিমাপ নির্ভর করে। কারও আংশিক প্যারালাইসিস হয় আবার কেউ হাত বা পা একেবারই নাড়াতে পারেন না। কারও হাত-পায়ের অনুভূতি ঠিক থাকে। কারও থাকে না যাদের ডানদিকের প্যারালাইসিস হয়, তাদের কথা বলতে কষ্ট হয় অথবা তারা কথা বলতেই পারেন না কিংবা বুঝতে পারেন না। এ ধরনের রোগীর ভালো হতে সময় লাগে বেশি। যাদের ইনফ্রাকশন ধরনের স্ট্রোক হয়, তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা কম থাকলেও ভালো হতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং অনেক রোগী স্থায়ী পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে রোগী অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। রক্তচাপ বেশি থাকে। রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। যারা প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেন, দ্বিতীয়বার রক্তক্ষরণের ঝুঁকি কম থাকে, তাদের প্যারালাইসিস অপেক্ষাকৃত কম সময়ে ভালো হয়। চিকিৎসা ও প্রতিকার চিকিৎসার জন্য রোগীর দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন। কারণ এ রোগের চিকিৎসার অন্যতম অংশ হলো নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও পরিমিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। স্ট্রোক থেকে পরিত্রাণ পেতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ধূমপান বর্জন, কোলেস্টেরলমুক্ত খাবার, পরিমিত ব্যায়াম, হার্টের অসুখের চিকিৎসাসহ দুশ্চিন্তাহীন জীবনযাপন করতে হবে। বড় রক্তনালি আক্রান্ত হয়ে মস্তিষ্কেও বৃহত্তর অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে রোগী দীর্ঘদিন অজ্ঞান বা কোমায় থাকতে পারেন এবং বিভিন্ন অংশে প্যারালাইসিস থাকতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্ট্রোক হলে শরীরের যেকোনো একদিকে হাত-পা ও মুখমন্ডল প্যারালাইসিস হয়ে থাকে। ব্রেইনের ভেতর স্ট্রোকটা যদি বাঁদিকে হয়, তাহলে ডানদিকের হাত-পা এবং ডানদিকে স্ট্রোক হলে বাঁদিকের হাত-পা প্যারালাইসিস হয়ে থাকবে। মোটকথা, ব্রেইনের যে যে অংশ শরীরের যে যে অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, সেই সেই অংশ স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে শরীরের ওই স্থানগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ছোটখাটো লক্ষণকে পাত্তা না দেওয়ার কারণে স্ট্রোক হয়েছে বুঝতে বুঝতেই অনেকটা মূল্যবান সময় চলে যায়। স্ট্রোক হয়েছে বুঝতে পারলেই কাছের যেসব হাসপাতালে সর্বাধুনিক চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে, বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে রোগীকে তেমন কোনো হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। মস্তিষ্কের জমাট বাঁধা রক্ত গলিয়ে ফেলার ওষুধ শিরাপথে বা ধমনিপথে প্রয়োগ করে, বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে রক্তনালির মধ্যে জমাট রক্ত সরিয়ে এবং রক্তনালি থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত (রক্তক্ষরণ) অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা সম্ভব। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত।