প্রকৃতি নারী ও শিশুদের পাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত অবস্থার রিপোর্ট এবং তাঁদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা (আন্তর্রাজ্য ও আন্তর্দেশীয়) --- নারী ও শিশু পাচার এখন অন্যতম মুনাফা অর্জনকারী ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে, যে কারণে নারী ও শিশু পাচারের সংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত হারে বাড়ছে। এটি শুধু রাজ্যের সমস্যা নয়, বরং গোটা বিশ্বে এই সমস্যা ছড়িয়ে পড়েছে। এর কারণ বহুমুখী ও জটিল। ধনী বা গরিব দেশ নির্বিশেষে এই সমস্যার শিকার হচ্ছে। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। পাচার হচ্ছে মূলত শোষিত বঞ্চিত এলাকা, অঞ্চল এবং দেশগুলি থেকে এবং সচরাচর পাচার হয়ে যাওয়ার জায়গা হচ্ছে শহুরে অঞ্চল --- সেটা এ দেশের ভিতরেই হোক বা বাইরে। যদি পাচার হওয়ার ঘটনাকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় তা হলে বোঝা যায়, পাচার হওয়ার সূত্র এবং পাচার হয়ে যাওয়ার জায়গার মধ্যে একটি অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাপার রয়েছে। অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত গরিব অঞ্চল থেকে ধনীদের জায়গায় পাচার হয়ে যাওয়ার সংখ্যাটাই বেশি। কিন্তু এ ঘটনা সর্বাংশে সত্য নয়। গোটা বিশ্ব জুড়ে গবেষণা ও সমীক্ষার রিপোর্টে এটাও দেখা গিয়েছে, অনেক সময় গরিব এলাকার থেকে অন্য একটি গরিব এলাকার মধ্যেও মানব পাচার হচ্ছে। এ রকম কেন হয় সেটি পাচারকারীরাই হয়তো ভালো বলতে পারবে। আসলে পাচার করার ব্যাপারটি পুরোপুরি পাচারকারীদের নিজস্ব সুবিধার উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে। এর জন্য পাচারকারীরা সর্বশক্তি নিয়োগ করে থাকে। সুতরাং অনুন্নত জায়গা থেকে উন্নত জায়গাতেই যে সব সময় পাচার হয়ে থাকে তা বলা যায় না। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে স্থানীয় চাহিদার হিসাবনিকাশের উপর। যেটি সব চেয়ে ভালো বোঝে পাচারকারীরা কারণ তাদের সঙ্গে পাচারের বাজারের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। অনেক সময় তারা পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েও এই কাজ করে থাকে। এর জন্য তাদের নিজেদের মধ্যে গোপন বোঝাপড়া থাকে। পাচার নিয়ে ইউনিসেফের বক্তব্য ইউনিসেফের বক্তব্য, এক জন পাচার হয়ে যাওয়া শিশু তাকেই বলা হবে যার বয়স ১৮ বছরের কম এবং যাকে ভর্তি করা হয়েছে, পাচার, বদলি বা দেশান্তরিত করা হয়েছে বা শোষণ করার জন্য দেশের ভিতরে বা বাইরে গ্রহণ করা হয়েছে। পাচার করার ব্যাপারটির তদন্ত করা এবং তা খুঁজে বের করার বিষয়টি খুবই কষ্টসাধ্য যে কারণে এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়াও খুব কঠিন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর ১০ লক্ষ ২০ হাজার শিশু গোটা বিশ্ব জুড়ে পাচার হয়ে যায়। (সূত্র : চাইল্ডলাইন ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন) পাচার হয়ে যাওয়া শিশুদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বেশ্যাবৃত্তির কাজে লাগানো হয়। উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্য এবং গোটা ভারতের মধ্যে সংযোগের কাজ করে থাকে পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যের ১৯টি জেলা রয়েছে এবং ২৩টি শহর রয়েছে যার জনসংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি। সব চেয়ে বড় শহরগুলি হল, কলকাতা, আসানসোল, শিলিগুড়ি ও হাওড়া — এই শহরগুলি পাচার হয়ে যাওয়ার বড় কেন্দ্র। এই শহরগুলিতে বেশ কয়েকটি পরিচিত ‘লালবাতি’ এলাকা রয়েছে যেখানে দেহ ব্যবসার কথা সুবিদিত। অন্য দিকে রাজ্যের গ্রামের বিস্তৃত অঞ্চলে দারিদ্র, শোষণ ও বঞ্চনা এখনও রয়ে গিয়েছে। সেখানে লিঙ্গ বৈষম্য রয়েছে, রয়েছে গার্হস্থ্য হিংসার বাতাবরণও। এই দারিদ্রপীড়িত সামাজিক ক্ষেত্র, যেখানে জীবনধারনের জন্য স্থায়ী রোজগারের ব্যবস্থা নেই, তা পাচারকারীদের শিকার ধরার আদর্শ জায়গা। এই রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের আন্তজার্তিক সীমানা রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ও ভঙ্গুর অবস্থানের জন্য এ রাজ্য শুধু আন্তর্রাজ্য পাচার নয় বরং আন্তর্জাতিক পাচারের উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত। এক দিনে এই পরিস্থিতি গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘদিন ধরে পাচারকারীরা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে অঞ্চল চিহ্নিত করে তাদের কাজ চালিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তাদের পাল্টা নেটওয়ার্কের মোকাবিলা করা খুবই দুষ্কর। পাচারের বিস্তৃতি ২২১৬ কিলোমিটারব্যাপী বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত ৫০-৬০ কিলোমিটার নেপালের সঙ্গে আন্তজার্তিক সীমা ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক পাচারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাচারের জায়গা বর্ধমান, শিলিগুড়ি, হাওড়া, জলপাইগুড়ি, মুর্শিদাবাদ এবং খড়গপুর। পাচার হয়ে যেখানে যাচ্ছে -- কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চল। এর আগে কিছু অনুসন্ধানের ফলে জানা গিয়েছে --- পশ্চিমবঙ্গে পাচার হওয়া দুই তৃতীয়াংশ শিশুই হল বালিকা। এদের মধ্যে ৯০ শতাংশই হয় প্রাথমিক স্কুল থেকে ড্রপ আউট হয়েছে বা কখনও স্কুলে যাওয়ার সুযোগই পায়নি। এতে বোঝা যায় পাচার হওয়ার সঙ্গে শিক্ষার একটি সুদৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, দুই ২৪ পরগনা পাচারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সব চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলা একক পাচারের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই জেলা থেকে কাজের সন্ধানে নারী ও শিশুকে পাচার করে কলকাতা ও অন্যান্য মেট্রোপলিটান শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। কলকাতাকে পাচার হয়ে আসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসাবে গণ্য করা হয়। বেশ্যালয়ে দেহব্যবসার দিক দিয়ে মুম্বই ও দিল্লির পাশাপাশি এই শহরের বিশিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এই সব শহরে চা-বাগান অঞ্চল থেকে পাচার হয়ে আসাটা খুবই প্রচলিত। ভুটান এবং অসম থেকে নারী পাচার হয়ে আসার ক্ষেত্রে জলপাইগুড়ি পাচারের একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র হিসাবে কাজ করে। জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিঙে বাইরের রাজ্য থেকে এবং সন্নিহিত বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ শিশু আমদানি করা হয়। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা পাচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উঠে এসেছে। পাচারের অন্যতম কারণ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, এক ফসলি জমি, অন্যান্য জীবিকার অভাব ইত্যাদি। ২০০৩ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মধুসূদনপুর গ্রামে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে, গ্রামের প্রতি দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় বাড়ির খরচ চলে পাচার হয়ে যাওয়া ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সি কিশোরীর রোজগার থেকে। পাচার রোধে গৃহীত ব্যবস্থা মানবপাচার রোধী ইউনিট ২০১১ সালে এমএইচএ গাইডলাইন মেনে রাজ্যে মানবপাচার রোধী ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত রাজ্যের ১৯টি জেলাতেই এই ইউনিটের অস্তিত্ব রয়েছে। কার্যকর অবস্থায় রয়েছে চারটি জেলায়। সেগুলি হল, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, জলপাইগুড়ি, মুর্শিদাবাদ এবং কলকাতা। জেলার ইউনিটগুলির নেতৃত্ব দেন এক জন ডিএসপি স্তরের পুলিশ অফিসার। সিআইডির স্পেশাল আইজি এবং ডিআইজি পাচারবিরোধী ইউনিটের নোডাল অফিসার। এঁরা কলকাতার ভবানী ভবন থেকে কাজ করেন। এখানে ১৫ সদস্যের একটি নিবেদিতপ্রাণ টিম রয়েছে। তাঁরা পাচার হয়ে যাওয়া নারী বা শিশুকে উদ্ধার করা, এ ব্যাপারে তদন্ত করা, সচেতনতা শিবিরগুলির দেখভাল করা এবং সতীর্থ পুলিশ অফিসারদের মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়িয়ে তোলার কাজ করেন। তাঁরা হাইকোর্ট বা অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকে সংবেদনশীল মামলাগুলি গ্রহণ করেন এবং তার ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালান। অ্যান্টি ট্রাফিকিং ইউনিটের এমআইএস পোর্টাল তৈরি ও তা দেখভাল করার জন্য ইউনিসেফ সিআইডিকে সহায়তা করে। এই পোর্টালের ডিজাইন তৈরি করেছে ন্যাশানাল ইনফরমেটিক্স সেন্টার। পশ্চিমবঙ্গের টাস্ক ফোর্স ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে আসা ব্যক্তিদের অযথা সংশোধনাগারে আটকে না রেখে দ্রুত তাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা। তারা জুভেনাইল জাস্টিস (কেয়ার প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন) অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৬ অনুসারে কাজ করে। ইতিমধ্যেই ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে দু’টি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছে। দ্বিতীয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেই স্থির হয় দুই সরকারই একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করবে ও এবং মূল পরিলক্ষনীয় বিষয়গুলি চিহ্নিত করবে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভারত সরকারের নির্দেশিকা মেনে বিভিন্ন দফতরের সমন্বয়ে পশ্চিমবঙ্গের টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের টাস্ক ফোর্সে অনেকগুলি এজেন্সির প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এদের কাজ হল পাচারের শিকারদের চিহ্নিত করা, উদ্ধার করা এবং অভিযুক্তদের বিচারের ব্যবস্থা করা। পাচারের শিকার হওয়া নারী ও শিশুদের শ্রমের ও যৌনতার দিক দিয়ে শোষণের হাত থেকে রক্ষা করে। এই কাজ করার ক্ষেত্রে টাস্ক ফোর্স বিভিন্ন দফতর ও এজেন্সির মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরি করে থাকে। গঠন পশ্চিমবঙ্গের টাস্ক ফোর্সে যে সব এজেন্সি এবং কর্তৃপক্ষ জড়িত রয়েছে --- নারী, শিশু উন্নয়ন ও সমাজ কল্যাণ দফতরের সচিব নারী, শিশু উন্নয়ন ও সমাজ্য কল্যাণ দফতরের যুগ্ম সচিব ডিরেক্টর, ডিরেক্টরেট অফ সোশাল ওয়েলফেয়ার হোম, এফএন অ্যান্ড এনআরআই ডিপার্টমেন্ট বিদেশ মন্ত্রক আইজি পুলিশ, সীমান্ত কলকাতা পুলিশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স চাইল্ডলাইন চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ড ইউনিসেফ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হয়ে আসা নারী ও শিশুদের উদ্ধার করা, পুনর্বাসন দেওয়া এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা সম্পর্কিত রাজ্যের কার্যকর নির্দেশিকা --- বাংলাদেশি শিশুদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জাতীয় স্তরে একটি আন্তজার্তিক স্তরের মান্যতা প্রাপ্ত পদ্ধতি পশ্চিমবঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতি বছরই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে আসা শিশু সীমান্ত রক্ষী বাহিনী, পুলিশ ও চাইল্ডলাইনের হাতে ধরা পড়ে। অনেক সময় তারা বাবা-মার সঙ্গেও সীমান্ত পার হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে একা একাই আন্তজার্তিক সীমানা পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করে থাকে। এই নিয়ে অনেক আইনি ঝঞ্ঝাট থাকায় পশ্চিমবঙ্গে আরআরআরআই সম্পর্কিত জাতীয় কার্যকর কর্মসূচি মেনে একটি কার্যকর নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কী ভাবে পাচার হয়ে যাওয়া শিশুদের ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই নির্দেশিকা রাজ্যের হোমগুলির সুপারিটেন্ডেন্ড, চাইল্ডলাইন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি, বিএসএফ, জেজেএসকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারা সেই সব নির্দেশিকা মেনে সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে পাচার হয়ে আসা শিশুদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। গত শতাব্দী থেকেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া শিশুদের বিষয়টিকে আন্তজার্তিক সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমস্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে অবহিত করা এবং সেইমতো আন্তজার্তিক নির্দেশিকা মেনে কাজ করার কথা প্রত্যেককেই জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে একাধিক সচেতনতা শিবিরেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিও নিজেদের উদ্যোগে এ ধরনের প্রচুর সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করেছে। কোথা থেকে পাচার বেশি এক জায়গা থেকে এক জায়গায় চলে যাওয়া প্রায় সব জেলাতেই পরিলক্ষিত হয়, তবে নিম্নোক্ত জেলাগুলি তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। উত্তর ২৪ পরগনা দক্ষিণ ২৪ পরগনা মালদা নদিয়া দুই ২৪ পরগনা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। বিশেষত যে সব এলাকায় আয়লা হয়েছে, সেখানে জীবন-জীবিকা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার ফলে গরিব মানুষ বাসস্থল পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। নিম্নলিখিত জেলাগুলিতে শিশুদের স্থানান্তর হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি --- দক্ষিণ ২৪ পরগনা জলপাইগুড়ি দার্জিলিঙ মুর্শিদাবাদ নদিয়া দার্জিলিঙ পাচার করার ক্ষেত্রে একটি মুখ্য এলাকা হিসাবে বিবেচ্য। এখানে বহু নেপালি নারীকে বাড়ির কাজের লোক হিসাবে চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে স্থানান্তর বা পাচার করা হয়। নেপালের বহু সহজ সরল মহিলাকে ভুয়ো পাশপোর্ট করিয়ে দিল্লি বা কাঠমান্ডুতে কাজ দেওয়ার নাম করে পাচার করা হয়। তাদের আদৌ ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না এবং শেষ পর্যন্ত তাদের দিয়ে দেহব্যবসা করানো হয়। বহু ক্ষেত্রেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে তাদের দেহব্যবসায় নামানো হয়ে থাকে। অনেক সময় পাচারকারীরা রীতিমতো তাদের ভয় দেখায়। তাদের ও তাদের পরিবারকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে অল্প টাকার বিনিময়ে দেহব্যবসায় প্রবৃত্ত হতে বাধ্য করে। উদ্ধার হওয়া নেপালি মহিলাদের বয়ানে এই ভয়াবহ তথ্য শোনা গিয়েছে। জানা গিয়েছে, নেপালের গ্রামে গ্রামে এ ধরনের আড়কাঠিরা ঘুরে বেড়ায়। অবস্থা বিপন্ন এমন পরিবারকে তারা টার্গেট করে ধীরে ধীরে জাল বিস্তার করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়। এই মহিলাদের অনেককেই দার্জিলিঙ ও শিলিগুড়ি হয়ে বড় মেট্রোপলিটান শহরে নিয়ে আসা হয়। এ ধরনের বহু নেপালি মহিলা কলকাতার বেশ্যালয়েও কাজ করছে। পাচার রোধে জনসচেতনতা নিয়ত বাড়ছে এটা আশার কথা। পাচার রোধে মহারাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা যে দু’টি রাজ্য পাচার করার ক্ষেত্রে সব চেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে তারা হল পশ্চিমবঙ্গ ও মহারাষ্ট্র। পশ্চিমবঙ্গ পাচারের সূত্র, উদ্দিষ্ট স্থল ও পাচারের অন্যতম পথ (আন্তর্রাজ্য পাচারের ক্ষেত্রেও)। মহারাষ্ট্র পাচার করে নিয়ে যাওয়া স্থল হিসেবেই মূলত পরিচিত যদিও এখানেও আন্তর্রাজ্য পাচারের ঘটনা রয়েছে। এই দু’টি রাজ্যই বাংলাদেশি শিশু পাচারের মূল কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের রিপোর্টে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের নারীকে মুম্বই এবং পুনেতে যথেষ্ট সংখ্যায় পাচার করা হয়। মহারাষ্ট্র ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে পাচার হওয়া শিশুর পরিমাণ যথেষ্টই বেশি। সুতরাং সীমান্তপার পাচার প্রতিরোধের পাশাপাশি আন্তর্রাজ্য সহযোগিতা বাড়ানোও প্রয়োজন যাতে নারী ও শিশু প্রতিরোধে উদ্ধার, নিরাপত্তা প্রদান ও ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাকে মজবুত করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশি হোক বা ভারতীয় শিশুই হোক, তাদের উদ্ধার করা ও পুনর্বাসন দেওয়ার ব্যাপারে দেশ জুড়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে মহারাষ্ট্র ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার একমত হয়ে একটি মউ সই করেছে। আইটিপিএ অনুসারে শাস্তিদানের ব্যবস্থা (সূত্র : এনসিইআরবি, ২০০৭, ২০০৯, ২০১০, ২০১২) বছর ২০০৭ ২০০৯ ২০১০ ২০১২ শাস্তি হওয়া কেসের সংখ্যা ৬২ ৬৩ ৫৬ ১৮ শাস্তি প্রদানের সংখ্যা প্রমাণ করছে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে নারী ও শিশু পাচার কিছুটা হলেও কমেছে। কিন্তু অনেক কেসই থানায় নথিভুক্ত হয় না। বা নথিভুক্ত হলেও গুরুত্ব অনুযায়ী সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। সে কারণে প্রকৃত অপরাধীরা বহু ক্ষেত্রেই অধরা থেকে যায়। এই সব অপরাধচক্রকে খুঁজে বের করা ও তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা এখন টাস্ক ফোর্সের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় সব পক্ষকে মিলিত ভাবে কাজ করতে হবে। এই লক্ষ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা তৈরি করেছে। রাজ্য সরকারও সেই নির্দেশিকা মেনে টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। উজ্জ্বলা প্রকল্পের রূপায়ণ দুরবস্থায় থাকা বা অসহায় পরিবেশের মধ্যে থাকা মহিলাদের সাহায্য করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রক ২০০২ সালে এই প্রকল্পটি তৈরি করে। প্রাপ্ত সুবিধার মধ্যে রয়েছে খাদ্য, আশ্রয়, জামাকাপড়, যত্ন, মানসিক সহায়তা, শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার সুযোগ, শিক্ষাপ্রদানের মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ, প্রশিক্ষণের সুযোগ ইত্যাদি। নিম্নলিখিত বর্গের মহিলারা এর সুবিধা পেয়ে থাকেন। ১) বিধবা। ২) নিরাশ্রয় ও পরিত্যক্ত মহিলা। ৩) সংশোধনাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত মহিলা। যৌননিগ্রহের শিকার মহিলা, এমনকী বেশ্যালয় থেকে উদ্ধার হওয়া মহিলারাও এই প্রকল্পের সুবিধা পান। ৪) ভূমিকম্প, সাইক্লোন, বন্যা বা এই ধরনের অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে গৃহচ্যুত, স্থানচ্যুত মহিলারা। মানুষের দ্বারা সৃষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হওয়া মহিলাদেরও এর মধ্যে গণ্য করা হয়। ৫) মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ মহিলা। ৬) সন্ত্রাসবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত মহিলা প্রভৃতি। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে এই কাজের সঙ্গে ১৮টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা জড়িত আছে। উজ্জ্বলা প্রকল্পটি পাচার হয়ে যাওয়া মহিলাদের উদ্ধার, তাদের পুনর্বাসন ও ফের সমাজের স্রোতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার মতো কাজ করে। যৌন ব্যবসায় নামতে বাধ্য হওয়া পাচার হয়ে যাওয়া মহিলারা এই প্রকল্পের সুবিধা পান। যে সব শিশু ও মহিলা যৌন ব্যবসায় ব্যবহার হওয়ার কারণে পাচার হয়ে যেতে পারেন এবং যে সব মহিলা ও শিশু ইতিমধ্যেই পাচার হয়ে গিয়েছেন তাঁরা এই প্রকল্পের উদ্দিষ্ট উপভোক্তা। প্রকল্পের পাঁচটি দিক নিম্নে বিবৃত হল --- ক) প্রতিরোধ খ) উদ্ধার গ) পুনর্বাসন ঘ) পুনর্বার সামাজিক স্রোতে ফিরিয়ে আনা ঙ) ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। ২০১০-১১ সাল থেকে ৯টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এই প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে আসছে। মূলত জোর দেওয়া হয়েছিল প্রতিরোধ করার বিষয়টির উপর। বর্তমানে দু’টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, উওম্যান ইন্টারলিঙ্ক ফাউন্ডেশন এবং হরিপুর আমরা সবাই উন্নয়নী সমিতি সীমান্তবর্তী জেলা জলপাইগুড়ি ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এ ব্যাপারে কাজ করছে। প্রথম পর্বে সাতটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রতিরোধ কর্মসূচি পালনের জন্য তহবিল পেয়েছিল। কিন্তু তারা কাজের ধারা অব্যাহত রাখতে পারেনি। কেন তারা কাজের ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়নি তা নিয়েও আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বাবলম্বন প্রকল্পের রূপায়ণ হাতেকলমে কাজ শেখার একটি প্রকল্প ‘নোরাড’ ১৯৮২-৮৩ সালে ভারত সরকার শুরু করে। এর লক্ষ্য ছিল মহিলাদের হাতের কাজ ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত করে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা। এই প্রকল্পে নরওয়ের সংস্থা ‘নোরাড’ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। সংস্থাটির পুরো নাম নরেওজিয়ান ইনিস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট। পরে সরকার প্রকল্পটির নাম পরিবর্তন করে স্বাবলম্বন নাম রাখে। ১ এপ্রিল ২০০৬ থেকে কেন্দ্রীয় সরকার এটিকে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আওতা থেকে মুক্ত করে পুরোপুরি রাজ্যের প্রকল্প হিসাবে মান্যতা দেয়। ১. পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই প্রকল্পটি চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয় যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বৃত্তিগত প্রশিক্ষণ দিয়ে মহিলাদের সক্ষম করে তোলা, বিশেষত সেই সব মহিলাকে যারা সামাজিক দিক দিয়ে প্রান্তিক ও সহজেই পাচার হয়ে ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হতে পারে। ২. নারী, শিশু উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণ দফতরের অধীনস্থ নারী উন্নয়ন সংস্থা এ ব্যাপারে রাজ্য স্তরের নোডাল এজেন্সি হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০০৬-৭ সাল থেকেই তারা রাজ্য পোষিত স্বাবলম্বন প্রকল্প রূপায়ণ করার দায়িত্বে রয়েছে। এই প্রকল্পটি যাতে নামী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি রূপায়ণ করতে পারে সেই দিকে তাকিয়েই পরিকল্পনা করা হয়েছে। ৩. নানা ধরনের জীবিকামূলক কাজের শিক্ষা এই প্রকল্প মারফত দেওয়া হয়। যেমন জরির কাজ, তাঁত বোনার কাজ, বিউটিসিয়ান ট্রেনিং কোর্স, গোষ্ঠী স্বাস্থ্য রক্ষার প্রশিক্ষণ, রেডিমেড জামা কাপড় তৈরি, কাঠ খোদাই, বাঁশের কাজ, ব্যাগ তৈরি করা প্রভৃতি। মহিলাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও জীবিকা সহায়তার কর্মসূচি (স্টেপ) বেশি সংখ্যায় মহিলাদের কর্মসংস্থান হয় এমন কিছু কার্যকর প্রকল্পে মহিলাদের যাতে দক্ষ করে তোলা যায় এবং তাদের যাতে স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় সেই দিকে তাকিয়ে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলিতে কাজ হয়--- কৃষি ক্ষুদ্র পশুপালন ডেয়ারি ও মৎস্যচাষ হ্যান্ডলুম হাতের কাজ খাদি এবং গ্রামনির্ভর শিল্প রেশম চাষ সামাজিক বনসৃজন পতিত জমির উন্নয়ন এই প্রকল্পটি বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, জেলা গ্রামোন্নয়ন এজেন্সি, সমবায়, ফেডারেশন ও গ্রামীণ এলাকায় কর্মরত অসরকারি সংস্থা (১৮৬০ সালের সংস্থা নিবন্ধীকরণ আইন অনুযায়ী যারা নিবন্ধীকৃত) দ্বারা রূপায়িত হয়। এখনও পর্যন্ত এই কর্মসূচির তিনটি প্রকল্প রূপায়িত হচ্ছে ১. মল্লিকপুকুর সমাজ উন্নয়ন সমিতি, হাওড়া --- ৫০০ জনকে জরির কাজ শেখাচ্ছে। ২. বীরকোটা গ্রামীণ উন্নয়ন সমিতি, পশ্চিম মেদিনীপুর --- ৫০০ জনকে হাতের কাজ শেখাচ্ছে। ৩. কাটোয়া শিল্প সমবায় সমিতি লিমিটেড, বর্ধমান --- ৫০০ জনকে হ্যান্ডলুমের শিক্ষা দিচ্ছে। ট্র্যাক দি মিসিং চাইল্ড পোর্টাল দেশ জুড়ে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করার জন্য এই পোর্টালটি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই পোর্টালটি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে নিয়মিত আপডেট করা হয়। ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টার এ ব্যাপারে নারী ও শিশু কল্যাণ ও সামজকল্যাণ দফতরকে সহযোগিতা করে থাকে। এটি সমস্ত থানা, কলকাতা পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ, সিআইডি এবং হোমগুলির মধ্যে স্থাপন করা সার্ভার নেটওয়ার্ক। নিয়মিত ভাবে তথ্যগুলি আপলোড করে শিশু কল্যাণ সংস্থাগুলি, সিডাবলুসি, জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ড, ডিস্ট্রিক্ট চাইল্ড প্রোটেকশন সোসাইটিজ, নারী উন্নয়ন মূলক ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি। পোর্টালটির সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হয় যাতে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করার কাজ ১০০ শতাংশ সফল হয়। নারী ও শিশু পাচারে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য রাজ্য সরকার উদ্ধার আশ্রম বা হোম চালায়। বর্তমানে এ রকম ৪৬টি হোম রয়েছে। এর মধ্যে সরকার চালায় ১৮টি এবং ২৮টি বেসরকারি সংস্থার পরিচালনাধীন। এই হোমগুলিতে যত্ন নেওয়া, শিক্ষার ব্যবস্থা করা, হাতে কলমে শিক্ষাদান এবং পুনর্বাসনের কাজ হয়। বহু ক্ষেত্রে আবাসিকদের বিবাহ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। জেজে অ্যাক্ট অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় শিশু কল্যাণ কমিটি ও জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ড যে সব শিশুর সত্যিই প্রয়োজন রয়েছে তাদের যত্ন নেওয়ার এবং নিরাপদে রক্ষা করার ব্যবস্থা করে। মহিলাদের সাহায্য করার জন্য পাঁচটি টোল ফ্রি লাইন কার্যকর রয়েছে। এগুলি হল, ১০৯২১ থেকে ১০৯২৫। এ ছাড়া শিশুদের সাহায্য করার জন্য ১০৯৮ নম্বরে একটি টোল ফ্রি লাইনও কাজ করে। সাতটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এ রাজ্যে উজ্জ্বলা প্রকল্পর সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ৫টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কাজ করে এবং দু’টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পাচার হয়ে যাওয়া নারী ও শিশুদের রাখার জন্য হোম চালায়। সবচেয়ে বেশি পাচারের ঘটনা ঘটে এমন ছ’টি জেলায় যে সব মহিলা বাইরে যাচ্ছেন পঞ্চায়েতের মাধ্যমে তাঁদের বিস্তারিত নথি রেকর্ড করে রাখার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রতিটি এ ধরনের মহিলাকে ‘সেফ মাইগ্রেশন কার্ড’ দেওয়া হয়। তাতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও পঞ্চায়েতর ফোন নম্বর দেওয়া থাকে। গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি হলে ফোন নম্বরগুলি খুবই কাজে লাগে এবং ফোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিত ভাবে ওই মহিলাকে উদ্ধার করার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি রাজ্য সরকারের আলাদা আলাদা কিছু নীতি ও পদ্ধতি রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরও এ ব্যাপারে আইন তৈরি করেছে। যেমন রেল মন্ত্রকের এ ব্যাপারে একটি আলাদা পদ্ধতিপ্রকরণ ও আইন রয়েছে। আবার কিছু রাজ সরকার নিজেদের রাজ্যের পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। ১. যথার্থ বিচারের লক্ষ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫৭ ধারার পরিবর্তন করা হয়েছে। ৩৫৭ এ নামে একটি নতুন ধারা সেখানে যুক্ত করা হয়েছে। এটিকে ক্রিমিনাল কোড অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৯ হিসাবে গণ্য করা হয়। পরে ২০১৩ সালে কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিওর আবার পাল্টে ৩৫৭বি ও ৩৫৭সি ধারা যুক্ত করা হয়। ২. ২০১২-তে প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সচুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট চালু করা হয়। ২০১৩ সালে ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টে ৩২৬ এ ও ৩২৬ বি ধারা ঢুকিয়ে অ্যাসিড আক্রমণের ব্যাপারে শাস্তির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আইপিসির ৩৭০ ধারাকেও সংশোধন করে মানবপাচারের ক্ষেত্রে নারী ও শিশু পাচারের বিষয়টির উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ৩. ২০১২ সালে রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতর একটি আদেশনামা বলে বিভিন্ন অপরাধের বলি যাঁরা তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। যেমন ধর্ষিতা মহিলা, অপ্রাপ্তবয়স্ক ধর্ষণের শিকার, পাচারের ফলে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত তাঁদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জুয়াচুরি করে বা অপহরণ করে পাচার করা সংক্রান্ত তথ্য ২০০১ ২০০২ ২০০৩ ২০০৪ ২০০৫ ২০০৬ ২০০৭ ২০০৮ ২০০৯ ২০১০ ২০১১ ২০১২ পশ্চিমবঙ্গ ৮৭৫ ৮৩১ ৯০২ ১২০০ ১২০৭ ১৩৫৫ ১৮০০ ২৩৩২ ২৭৫০ ৩৩৪৫ ৪২৮৫ ৫১১৭ ভারত ২০৭৮৯ ২০৪৪৯ ১৮৭৭৬ ২২০৩৭ ২১১৬৩ ২২৪৪০ ২৫৭৭৯ ২৮৫৮৮ ৩১২৩৮ ৩৫১৪৭ ৪০৮০০ ৪৩৪৯২ দেশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের শতকরা হার ৪ ৪ ৫ ৫ ৬ ৬ ৭ ৮ ৯ ১০ ১১ ১২ সূত্র : নারী ও সমাজকল্যাণ দফতরের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৩-১৪, পশ্চিমবঙ্গ সরকার