বাল্যবিবাহ আয়োজন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ পণপ্রথা একটি দীর্ঘদিনের কুপ্রথা। এই প্রথার জেরেই মহিলারা স্বামীর গৃহে নির্যাতিতা হন। পণপ্রথা নিষিদ্ধ করতে ১৯৬১ সালে তৈরি হয় পণপ্রথা নিষিদ্ধকরণ আইন। এই আইনে ফাঁকফোকর থাকায় সমাজের বিশেষ উপকার হয়নি, বরং সময়ের সঙ্গে পণের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর এর সঙ্গে বেড়েছে বধূ নির্যাতন, আত্মহত্যা, খুনের মতো ঘটনা। উপযুক্ত বয়সে বিয়ের খরচ জোগাড় করা অসম্ভব, এই ভেবেই অনেক সময় বাবা-মায়েরা বাল্য অবস্থাতেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। অনেকের ধারণা এই সময় পণের পরিমাণ হয়তো কম লাগে। কিন্তু বাল্যবিবাহ অন্যায়। সমস্ত বিষয় বিচার বিবেচনা করে বিভিন্ন দফায় এই আইন সংশোধন করে ১৯৮৬ সালে ‘পণপ্রথা নিষিদ্ধকরণ আইন’ শেষ পর্যন্ত আকার নেয়। পণপ্রথা নিষিদ্ধ করতে হলে সেই সঙ্গে দরকার বাল্যবিবাহ রোধ করা। আন্তজার্তিক আইন অনুযায়ী ‘চাইল্ড’ কথাটির অর্থ শূন্য থেকে ১৮ বছর অনূর্ধ্ব এক জন মানুষ। প্রতিটি শিশুরই জীবনধারণের অধিকার, নিরাপত্তার অধিকার, সামগ্রিক বিকাশের অধিকার, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিয়ে করার অধিকার আছে। আমাদের দেশের আইনে বলা আছে, ছেলেদের ২১ বছরে এবং মেয়েদের ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে দেওয়া যাবে না। এই আইন অর্থাৎ ‘বাল্য বিবাহ রোধ আইন’ ১৯২৯ সালে ভারতে চালু হয়। এর পর ১৯৭৮ সালে তার বেশ কিছু ধারা সংশোধিত হয়। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে শাস্তির ব্যবস্থা আছে। যেমন ১৮ বছরের বেশি কিন্তু ২১ বছরের কম কোনও পুরুষ যদি বাল্যবিবাহ করে সে ক্ষেত্রে তার শাস্তি ১৫ দিন পর্যন্ত জেল অথবা ১ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা জেল বা জরিমানা এক সঙ্গে হতে পারে। আবার ২১ বছরের বেশি কোনও পুরুষ যদি বাল্যবিবাহ করে সে ক্ষেত্রে তিন মাস পর্যন্ত জেল এবং জরিমানা উভয় শাস্তিই ভোগ করতে হতে পারে। যারা বাল্যবিবাহের আয়োজন করবে তাদের শাস্তি দেওয়ার কথাও আইনে বলা আছে। আইনের খুঁটিনাটি বাল্যবিবাহ রোধ আইন মনে করে কম বয়সে বিয়ে করা যেমন অপরাধ তেমনই যারা এই বিয়ে দিচ্ছে সামাজিক ভাবে তাদের অপরাধও কম নয়। অনেক সময় বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজন জেনে বুঝে এই ধরনের বিবাহের আয়োজন করে থাকেন। সেই জন্য তাঁদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। নিরন্তর বাল্যবিবাহ বিরোধী প্রচার চলা সত্ত্বেও সেই সমস্ত দায়িত্বহীন অভিভাবকরা যদি সচেতন না হন তা হলে তাঁরা শাস্তি পাওয়ারই যোগ্য বলে মনে করে রাষ্ট্র। যারা বাল্যবিবাহের আয়োজন করবে তাদের তিন মাস পর্যন্ত জেল বা জরিমানা হতে পারে। তাকে প্রমাণ করতে হবে যে সে মনে করে যে বিবাহটি দেওয়া হয়েছে তা বাল্যবিবাহ নয়। এর জন্য তাকে যথেষ্ট পরিমাণ প্রমাণ জোগাড় করতে হবে। এমনকী শিশু যাঁর হেফাজতে আছে (বাবা-মা বা অভিভাবক) তিনি যদি বাল্যবিবাহ চুক্তিতে আবদ্ধ হন বা সেই বিবাহে ইন্ধন দেন বা তাঁর অবহেলার জন্য ওই বিবাহ অনুষ্ঠিত হয় তা হলে ওই ব্যক্তির তিম মাস পর্যন্ত জেল ও জরিমানা হতে পারে। বাল্যবিবাহের মামলা বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া অন্য কোনও আদালতে হতে পারে না। অপরাধ ঘটার এক বছর পর বাল্যবিবাহের অভিযোগ গ্রাহ্য করার অধিকার আদালতের থাকে না। বাল্যবিবাহ হতে যাচ্ছে বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এমন কোনও খবর যদি আদালতের কাছে অভিযোগ আকারে আসে, তা হলে আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বা ব্যক্তিদের হলফনামা বা নোটিশ জারি করার পর ওই বিয়ে বন্ধ করার জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। আইনে বলা হয়েছে, কোনও মহিলাকে বাল্যবিবাহের অপরাধে জেলে পাঠানো যাবে না। কারণ বিবাহের ক্ষেত্রে এখনও মেয়েদের স্বাধীন মতামত থাকে না বললেই চলে। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অনেক সময় মেয়েদের উপর জোর খাটানো হয়ে থাকে। তাদের বলার কিছুই থাকে না। কাকে পণ বলব বিবাহের সময় উভয় পক্ষের এক পক্ষ অর্থাৎ বরপক্ষ বা কনেপক্ষ বা তার বাবা বা মা অথবা সংশ্লিষ্ট অন্য কেউ যদি অন্য পক্ষ অথবা তার বাবা-মা অথবা সশ্লিষ্ট অন্য কোনও ব্যক্তিকে বিয়ে করার শর্ত হিসেবে বিয়ের আগে বা পরে অথবা অনুষ্ঠানের দিন সোজাসুজি বা ঘুরপথে কোনও সম্পত্তি অথবা মূল্যবান জিনিস (নগদ টাকা, সোনাদানা, আসবাব পত্র) দিতে বা দেওয়ার জন্য রাজি থাকেন, তখন তাকে পণ বলা যাবে। তবে, যাঁরা মুসলিম ব্যক্তিগত আইন বা শরিয়তি আইন অনুযায়ী চলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ‘মেহের’ (যা পাত্রপক্ষ কন্যাকে দেয়) পণের আওতায় আসবে না। পণ দেওয়া নেওয়ার শাস্তি পণ দেওয়া বা নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত উভয় পক্ষেরই শাস্তির বিধান আছে। এই কাজে সরাসরি যুক্ত থাকা বা লেনদেনে সাহায্য করার জন্য কমপক্ষে ৫ বছর জেল এবং জরিমানা আবার কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা অথবা পণের মূল্য, দুইয়ের মধ্যে যেটি বেশি, সেই সাজা হবে। কিন্তু কোনও রকম জোরজবরদস্তি ছাড়া যদি বর/কনেকে উপহার দেওয়া হয় তবে তা হলে কোনও অপরাধের ঘটনা ঘটে না। তবে সব উপহারের লিখিত তালিকা অবশ্যই রাখতে হবে। প্রচলিত রীতি বা আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী উপহার দিলে বা নিলে কোনও শাস্তির বিধান নেই। দাবি করার শাস্তি সোজাসুজি বা ঘুরপথে পণের দাবি করলে সাজা অন্তত ৬ মাস থেকে দু’ বছরের জেল এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। গণমাধ্যমে যদি ছেলে/মেয়ে বা অন্য কোনও আত্মীয়ের বিবাহের জন্য পণ চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় তা হলে ছাপাখানা, প্রচারক, প্রকাশকের সাজা হবে ৬ মাস থেকে ৫ বছর পর্যন্ত জেল অথবা ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা। তবে শাস্তির চেয়েও বেশি কার্যকর হল সচেতনতা বৃদ্ধির কথা। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি সামাজিক ও গোষ্ঠী সংগঠন পণপ্রথার বিরুদ্ধে সচেতনতার কার্যক্রম চালাচ্ছে। মহিলাদের করণীয় বিবাহযোগ্য মহিলারা পণপ্রথা ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন। পণপ্রথা রোধ করার বিরুদ্ধে তাঁরা রাস্তায় নামতে পারেন, আবার ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে পণ না দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ (স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি ওয়েস্ট বেঙ্গল) বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে শহরে বিভিন্ন সময়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করে থাকে। সেই সব আইনি সচেতনতা শিবিরে দেখা গিয়েছে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী থেকে আইন নিয়ে পাশ করা স্নাতক মহিলারা পর্যন্ত অভূতপূর্ব সাড়া দিচ্ছেন। বিয়ের দিনেও অনেক পাত্রী পাত্রপক্ষ পণ নিচ্ছে জেনে বিয়ে আটকে দিচ্ছে। প্রতিবাদ করাটাই বড় কাজ। অভিযোগ কোথায় জানাব পাত্রপক্ষ পণ দাবি করলে, যাঁর কাছে দাবি করেছে, তিনি নিজে বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহায়তায় থানায় এফআইআর করতে পারেন। আর পুলিশ অভিযোগ না নিলে ওই এলাকার মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট বা ওই এলাকার প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ জানানো যায়। রাজ্য সরকারও এই আইন প্রয়োগের জন্য বিশেষ অফিসার নিয়োগ করতে পারে। জেলা সমাজকল্যাণ আধিকারিকের কাছেও অভিযোগ জানানো যায়। মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিজে উদ্যোগ নিয়ে অথবা পুলিশি রিপোর্টের ভিত্তিতে অভিযোগের বিচার করতে পারেন। এ ছাড়াও যাঁর কাছে বা যাঁদের কাছে পণ চাওয়া হয়েছে তিনি বা তাঁরা যে কোনও স্বীকৃত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে নালিশ জানাতে পারেন। এই অভিযোগ জানানোর কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। পণজনিত মৃত্যু বিয়ের অল্প কিছু দিনের মধ্যে অথবা ৭ বছরের মধ্যে বধূ আত্মহত্যা করলে অথবা তার অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে যদি প্রমাণিত হয় যে মৃতার স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের দুর্ব্যবহার, শারীরিক নির্যাতন ইত্যাদি তাঁকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা জুগিয়েছে বা তারা হত্যা করেছে তা হলে ধরে নেওয়া যেতে পারে এর মূলে পণ আদায়ের অভিসন্ধি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অপরাধ যে এলাকায় হয়েছে সেখানকার থানায় অভিযোগ দায়ের করতে হবে। স্ত্রী-ধন উত্তরাধিকারীর প্রাপ্য ভূমিকা অনেক সময় দেখা যায় পণ নেওয়ার পরও মেয়েরা শ্বশুরবাড়িতে নিগৃহিতা হন। তাঁদের স্ত্রী ধন কেড়ে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের নিজস্ব গহনাপত্র শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেড়ে নেয়। এই পরিস্থিতিতে আইনি সাহায্য নেওয়ার আগে সর্বাগ্রে মাথায় রাখতে হবে স্ত্রী ধনের উপর শ্বশুরবাড়ির ন্যায্যত কোনও অধিকার নেই। পণ জনিত মৃত্যু হলে শুধু জিডি বা জেনারেল ডায়েরি করলে হবে না রীতিমতো ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট বা এফআইআর দাখিল করতে হবে। সেই এফআইআরের মাধ্যমে পুলিশ মামলা শুরু করতে বাধ্য। দায়রা আদালতে অথবা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে এই মালার বিচার হবে। এই অপরাধের বিচার হবে জামিন অযোগ্য ধারায়। শাস্তিও জামিন অযোগ্য। কমপক্ষে ৭ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সুযোগ আইনে রয়ে গিয়েছে। আর সেই সঙ্গে পণ দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারে কোনও চুক্তি স্বাক্ষরিত থাকলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। বিয়ের এক বছর আগেও কোনও রকম পণ দেওয়া হলে, তা স্ত্রীরই প্রাপ্য। আবার বিয়ের সময় বা এক বছর পরে দেওয়া হলেও একই নিয়ম। নাবালিকা বধুর ১৮ বছর বয়স হলে, যৌতুক হিসেবে পাওয়া সমস্ত সামগ্রী তাকে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, পণের টাকা বা সামগ্রী স্ত্রী-ধন হিসাবে বধূ বা তার উত্তরাধিকারীরই প্রাপ্য। পশ্চিমবঙ্গ আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ জেলা টেলিফোন নম্বর বাঁকুড়া ০৩২৪২-২৫০৩১৫ বীরভূম ০৩৪৬২-২৫৫২৭১ বর্ধমান ০৩৪২-২৬৬২২০২ কোচবিহার ০৩৫৮২-২২৭৬৮১ দক্ষিণ দিনাজপুর ০৩৫২২-২৫৫২০৭ দার্জিলিং ০৩৫৪-২২৫৪২২৯৭ হুগলি ০৩৩-২৬৮০-২১৯১ হাওড়া ০৩৩-২৬৪০-২১৯৩ জলপাইগুড়ি ০৩৫৬১-২২১৬৬৭ কলকাতা ০৩৩-২২৩০-৪৬২৩ মালদা ০৩৫১২-২৫২৩০১ মুর্শিদাবাদ ০৩৪৮২-২৫৬৬৫০ পশ্চিম মেদিনীপুর ০৩২২২-২৭৫৮১৫ পূর্ব মেদিনীপুর ০৩২২৮-২৬৯৩৮৯ পুরুলিয়া ০৩২৫২-২২৬৬০৩ নদিয়া ০৩৪৭২-২৫২৩৩৮ উত্তর ২৪ পরগনা ০৩৩-২৫৫২-৩০৯০ দক্ষিণ ২৪ পরগনা ০৩৩-২৪৭৯-৭৬৯১ উত্তর দিনাজপুর ০৩৫২৩-২৫২৩০৪ এই আইনি পরিষেবা কেন্দ্রগুলি সব সময় নিখরচায় নির্যাতিতা মহিলাদের অথবা মানসিক ভাবে অত্যাচারিতা মহিলাদের পরিষেবা প্রদান করে থাকে। অসহায় মহিলাদের হয়ে মামলা চালানোর যাবতীয় খরচ পরিষেবা কর্তৃপক্ষই বহন করে থাকে। এ পর্যন্ত বহু মহিলা পরিষেবা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তিলাভে সক্ষম হয়েছেন। সূত্র : পণপ্রথা নিষিদ্ধকরণ আইন, মলয় ঘোষ, যোজনা, অক্টোবর ২০১৪