হোম / কৃষি / ফসল উৎপাদন / ফসল প্যাকেজিং চর্চা / শস্যদানা ও মকাই / ধান / "শ্রী " ধান চাষের অভিনব প্রযুক্তি
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

"শ্রী " ধান চাষের অভিনব প্রযুক্তি

অভিনব এই প্রযুক্তির বয়স তিন দশকের বেশি। এখানে এই পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

শ্রী চাষ কী

এস, আর, আই -- ইংরেজি বর্ণ তিনটির এক সঙ্গে উচ্চারণ হল ‘শ্রী’। ‘সিস্টেম অফ রাইস ইনটেন্সিফিকেশন’ পদ্ধতিকে সংক্ষেপে ‘শ্রী’ বলা হয়। এই পদ্ধতির জনক হলেন একজন ফরাসি ধর্মযাজক, হেনরি দ্য লাউলিন। পেশায় তিনি ছিলেন মাদাগাসকারের একটি কৃষি স্কুলের শিক্ষক। তিনি বিগত শতাব্দীর আশির দশক থেকে স্বল্প বৃষ্টিপাত ও পরিমিত জল ব্যবহার করে ধানচাষের উপর দীর্ঘ দিন পরীক্ষা করে অভাবনীয় সাফল্য পান। এর পর ১৯৯৭ সাল থেকে এই প্রযুক্তি মাদাগাসকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। প্রথাগত ধান চাষে ধানের বাড়বৃদ্ধির বিভিন্ন দশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একেবারে চারা রোপণ থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত ২.৫ সেমি থেকে ৫ সেমি জল ধরে রাখা হয়। এ ভাবে দেখা যায় ১ কেজি ধান উত্পাদন করতে ১৮০০ লিটার থেকে ২৫০০ লিটার জলের প্রয়োজন। যে সব এলাকায় ধানের চাষ পুরোপুরি ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরশীল সেখানে দেখা যাচ্ছে নানারকম সমস্যা। অতিরিক্ত জল উত্তোলনের জন্য জলস্তর ক্রমশ নীচে নেমে যাচ্ছে। তাই মাটির গভীরতর স্তর থেকে জল উত্তোলনের জন্য বিদ্যুৎ মাশুল বা তেলের খরচ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। আবার পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ জল অতিরিক্ত উত্তোলনের জন্য সেচের জলের মধ্যে আর্সেনিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

‘শ্রী’ পদ্ধতিতে ধান চাষের সুবিধা হল, প্রথাগত চাষের তুলনায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ জল কম লাগে। এ ছাড়াও ৭৫ – ৮০ শতাংশ বীজ ধান ও ২৫ – ৩০ শতাংশ রাসায়নিক সার কম লাগে। এই পদ্ধতিতে জৈব সারের ব্যবহার বেশি হওয়ায় মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হয়। রোগ পোকা কম হয়। ওষুধও কম লাগে। ধান এক সপ্তাহ আগে পাকে। সেই সঙ্গে প্রথাগত চাষের তুলনায় ১৫–২০ শতাংশ ফলন বেশি দেয়। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে ধান জলমগ্ন জমিতে চাষ করা হলেও জলজ উদ্ভিদ নয়, বরং কেবলমাত্র জলে ভেজা মাটিতেই ধানের শিকড় ও পাশকাঠি বেশি ছাড়ে এবং জলমগ্ন জমির চাইতে বেশি ফলন দেয়।

শ্রী ও প্রচলিত পদ্ধতির তুলনা

শ্রী পদ্ধতি

প্রচলিত পদ্ধতি

)

একর প্রতি ৩ – ৪ কেজি বীজধান লাগে।

)

একর প্রতি ২৫ – ৩০ কেজি বীজধান লাগে।

)

২ পাতা যুক্ত ৮ – ১২ দিন (খরিফ) বা ১৫ – ১৮ দিন (বোরো) বয়সি চারা রোয়া হয়।

)

-৫ পাতা যুক্ত ২৫ – ৩০ দিন (খরিফ) বা ৪০ – ৪৫ দিন (বোরো) বয়সি চারা রোয়া হয়।

)

শিকড়ে মাটি থাকা অবস্থায় বীজতলা থেকে তুলে মূল জমিতে নির্দিষ্ট দূরত্বে অল্প গভীরতায় রোয়া হয়।

)

বীজতলা থেকে টেনে তুলে চারা শিকড় মাটিতে ঢুকিয়ে রোয়া হয়।

)

প্রতি গুছিতে ১ টি করে চারা রোয়া হয়।

)

প্রতি গুছিতে ৪-৫ টি করে চারা রোয়া হয়।

)

১০ ইঞ্চি x ১০ ইঞ্চি দূরত্বে রোয়া হয়।

)

৮ ইঞ্চি x ৬ ইঞ্চি দূরত্বে রোয়া হয়।

)

প্রতি বর্গমিটারে ১৬টি গুছি থাকে।

)

প্রতিবর্গ মিটারে ৩৩টি গুছি থাকে।

)

রাসায়নিক সার কম লাগে।

)

রাসায়নিক সার বেশি লাগে।

)

ক্রমান্তরে মাটি জলে ভেজানো ও শুকোনো হয়।

)

সব সময় দাঁড়ানো জল রাখতে হয়।

)

রোগ-পোকা অপেক্ষাকৃত কম লাগে।

)

রোগ-পোকা অপেক্ষাকৃত বেশি লাগে।

শ্রী চাষে চারা তৈরি ও রোয়া

বীজতলায় চারা তৈরি

প্রচলিত পদ্ধতির মতো কম্পোস্ট সার দিয়ে উঁচু করে সমতল বীজতলা তৈরি করা হয়। বীজতলায় কোনও দাঁড়ানো জল থাকবে না। বীজতলা এক মিটার চওড়া ও সুবিধামতো লম্বা করা হয়। বীজতলার চার ধারে বাঁশ শুইয়ে দিয়ে লাঠি গুঁজে বীজতলার আলগা মাটি এক জায়গায় ধরে রাখা যেতে পারে। বীজ ফেলার আগে ও পরে বীজতলার ওপর হাল্কা করে কম্পোস্ট ছড়িয়ে দিলে চারা তুলতে সুবিধা হয়। অল্প কলযুক্ত ধান বীজতলায় ছড়ানো হয়। ২-২.৫ কেজি বীজ ১ শতক বা ৪০ বর্গ মিটার বীজতলায় ফেলা হয়। এক একর জমির রোয়া করার জন্য ৩ – ৪ কেজি বীজ লাগে। রোদ, বৃষ্টি ও পাখি থেকে রক্ষা পেতে প্রথম কয়েক দিন বীজতলার ওপর খড় চাপা দেওয়া যেতে পারে। সকালে ও বিকালে বীজতলায় জল ছিটিয়ে দেওয়া হয়। খরিফে ৮ – ১২ দিনের মধ্যে চারা রোয়ার উপযোগী হয়ে ওঠে। বোরো মরসুমে চারার বয়স ১৫ – ১৮ দিন পর্যন্ত হলেও অসুবিধা নেই।

মোটা পলিথিনের ওপর মাটি ও জৈব সার মিশিয়ে ছড়িয়ে দিয়ে বীজতলা তৈরি করা সহজ। এ ক্ষেত্রে বীজতলা বয়ে নিয়ে মূল রোয়ার জমিতে যাওয়া যায় এবং বীজতলা থেকে চারা তোলার সময় শিকড় আঘাত প্রাপ্ত হয় না।

মূল জমি তৈরি ও চারা রোয়া

বেশি করে জৈবসার প্রয়োগ করে জমি পচানি দিয়ে মূলজমি তৈরি করা দরকার। শেষ চাষের সময় রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হয়। জল বার করে দিতে ২০ ফুট অন্তর জমিতে এবং জমির ধার বরাবর হাত নালা কাটা প্রয়োজন। জমি তৈরির পর জমিতে কোনও দাঁড়ানো জল থাকবে না। এবার ২ পাতা বিশিষ্ট ৮ – ১২ দিন বয়সি চারা সন্তপর্ণে বীজতলা থেকে তুলে ২৫ সেমি বা ১০ ইঞ্চি দূরে দূরে বসানো হয়। প্রতিটি গুছিতে একটি করে চারা বসানো হয়। রোয়া করার সময় প্রচলিত পদ্ধতির মতো চারার শিকড় মাটির মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় না। একটা করে চারা শিকড়ে মাটিসমেত ১০ ইঞ্চি দূরত্বে কাদামাটির ওপর কোনও রকমে আলতো করে বসিয়ে দেওয়া হয়। বীজতলা থেকে চারা তোলার সময় লক্ষ রাখতে হয় যাতে শিকড় আঘাতপ্রাপ্ত না হয় এবং শিকড়ে কিছু বীজতলার মাটি লেগে থাকে। এ জন্য বীজতলা থেকে চারা তোলার সময় টিনের পাত ব্যবহার করলে সুবিধা হয় এবং মূল জমির কাছাকাছি জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হয়। পলিথিনের ওপর বীজতলা করলে এ কাজ সহজ হয়।

শ্রী চাষে পরিচর্যা

সার প্রয়োগ

জমিতে বেশি জৈব সার প্রয়োগ করা দরকার। একর প্রতি ৪০ কুইন্টাল জৈব সার (গোবর বা পাতা পচা সার ) প্রয়োগ করলে ভালো। পর্যাপ্ত জৈব সার প্রয়োগ করলে প্রচলিত পদ্ধতির জন্য সুপারিশকৃত এনপিকে-এর ২৫ শতাংশ এই পদ্ধতিতে কমানো যায়।

ফসল

একর প্রতি এনপিকে সারের মাত্রা কেজিতে

প্রচলিত পদ্ধতি

শ্রী পদ্ধতি

উঁচু জমির রোয়া আউশ ও আমন ধান

২৪ : ১২ : ১২

১৮ : :

) বোরো ধান

৫২ : ২৬ : ২৬

৪০ : ২০ : ২০

শ্রীপদ্ধতিতে মূল সার হিসাবে সুপারিশ মাত্রার ১/৪ অংশ নাই্ট্রোজেন, সব ফসফেট এবং ৩/৪ অংশ পটাশ শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করা হয়। রোয়ার ১৫ দিন পর ১ম চাপান সার হিসাবে ১/২ অংশ নাইট্রোজেন এবং থোড়মুখে শেষ চাপান হিসাবে ১/৪ অংশ নাইট্রোজেন ও ১/৪ অংশ পটাশ প্রয়োগ করা হয়। একই সঙ্গে বেশি সার প্রয়োগ না করে নাইট্রোজেন সার খেপে খেপে অর্থাৎ প্রাথমিক এবং আরও ৩টি চাপানে (মেয়াদকাল ও মরশুম অনুযায়ী রোয়ার দিন থেকে ১০ – ১৫ দিন অন্তর ) ১/৪ অংশ হিসাবে প্রয়োগ করলে বেশি উপকার পাওয়া যায়। শেষ চাপান সার যেন কাঁচথোড় আসার আগে প্রয়োগ হয় সেটা খেয়াল রাখতে হবে। চাপান সার দেওয়ার পর সেচের জলে মাটি ভিজিয়ে দিতে হয়।

জলসেচ প্রয়োগ

প্রচলিত পদ্ধতিতে জমির জল দাঁড়ানোর মতো সেচ দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রী পদ্ধতিতে সেচ দিয়ে ৩ – ৫ দিন অন্তর কেবল জমি ভিজিয়ে দেওয়া হয়। ক্রমান্বয়ে মাটি ভেজানো ও শুকোনোর ফলে মাটিতে অক্সিজেনের হ্রাস–বৃদ্ধি ঘটে। মাটিতে জীবাণুর ক্রিয়াও বৃদ্ধি পায়। গাছ পর্যাপ্ত ভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। গাছের শিকড়ের বৃদ্ধি বেশি হয় এবং গাছের বৃদ্ধি জননপর্ব পর্যন্ত ওই শিকড় জীবন্ত থাকে। অন্য দিকে প্রচলিত পদ্ধতির সেচে সব সময় জল দাঁড়িয়ে থাকায় ফুল আসার সময় গাছের ৩/৪ অংশ শিকড় অকেজো হয়ে যায়।

আগাছা নিয়ন্ত্রণ

শ্রী পদ্ধতিতে ভিজিয়ে সেচ দেওয়া ও বেশি দূরত্বে রোয়া করার জন্য আগাছার উত্পাত বেশি দেখা যায়। এ জন্য ২ – ৪ বার আগাছা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। রোয়ার ১০ – ১২ দিন পর প্রথম বার আগাছা তোলা হয়। তার পর ১০ দিন অন্তর প্রয়োজন অনুসারে আগাছা তোলা হয়। আগাছা তুলে মাটির মধ্যে পচিয়ে দিতে হয়। চাকাযুক্ত প্যাডি উইডার যন্ত্র ব্যবহার করলে আগাছা মাটির মধ্যে ঢুকে যায়। ধান গাছের শিকড় বৃদ্ধি পায়, শিকড় বেশি বাতাস পায়। এ ভাবে প্রতিবার আগাছা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একর প্রতি ৪ কুইন্টাল সবুজ জৈব পদার্থ যোগ হয়ে যায়। উইডার চালানোর আগের দিন জমি জলে ভিজিয়ে দিলে কাজের সুবিধা হয়। কোনও প্রকার আগাছা নাশক প্রয়োগ করা হয় না।

সূত্র

  1. আই এ এস, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
  2. কৃষি দফতর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার
2.91666666667
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top