ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

পোনা মাছ

পোনা মাছ চাষ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এখানে।

পশ্চিমবঙ্গ অভ্যন্তরীন জলজসম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নদী, নালা, খাল, বিল, হাওড় এবং বন্যাপ্লাবিত জলাভূমি ইত্যাদি নিয়ে ৪.৩ মিলিয়ন হেক্টর জলরাশিতে মৎস উৎপাদনের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জল। দেশের ৪৮টি জেলায় রয়েছে সেচ প্রকল্পের খাল। কিন্তু উম্মুক্ত জলাশয়ে দিন দিন মাছের উৎপাদন কমে আসছে। ফলে আমিষজনিত পুষ্টির অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে, অথচ সুষ্ঠু পরিকল্পনা, লাগসই প্রযুক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে এই বিরাট জলরাশি থেকে মাছের উৎপাদন বাড়ানোসহ ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর একাংশের কর্মসংস্থান করা সম্ভব। আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে উম্মুক্ত জলাশয়ে নিবিড়/ আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে মাছ চাষ করার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম এবং নতুন। উল্লেখিত জলাশয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাসহ মৎস উৎপাদনের নিমিত্তে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সচেষ্ট হয় এবং সফলতা অর্জন করে। ঘের তৈরী করে উল্লেখিত জলাশয়ে নিবিড়/আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদনের সম্ভাব্যতা প্রমানিত হয়েছে। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরণের খালে, মরা নদীতে, হাওড়, বাওড়, বন্যা প্লাবিত জলাভূমিতে গ্রামীন জনগোষ্ঠিকে সম্পৃক্তকরে মাছের উৎপাদন বাড়ানোসহ বেকারত্ব দূর করা সম্ভব। কোন উম্মুক্ত বা আবদ্ধ জলাশয়ে এক বা একাধিক দিক বাঁশ, বানা, বেড়া, জাল বা অন্য কোন উপকরণ দিয়ে ঘিবে উক্ত ঘেরের মধ্যে মাছ মজুদ করে চাষ করাকে পোনা বা ঘেরে মাছ চাষ বলে। পোনা মাছ চাষের বৈশিষ্ট হলো পোনার ঘের বা বেড়া জলাশয়ের তলায় প্রোথিত থাকে এবং পোনার জলর সাথে বাইরের জলর সংযোগ বা প্রবাহ বিদ্যমান থাকে। পোনার মাছ চাষ প্রযুক্তি বেশী দিনের নয়। এই শতকের মাঝামাঝি প্রথমে জাপানে, পরে এশিয়ার অন্যান্য দেশে এই প্রযুক্তির প্রসার ঘটে। অতি সমপ্রতি বাণিজ্যিক মাছ উৎপাদনের জন্য ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যন্ড, চীন ও মালয়েশিয়া এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ জল সম্পদের যেমন সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তেমনই বেকার যুব সমপ্রদায়ের জন্য নতুন কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

উদ্দেশ্য ও সুবিধা

  • ১. বৎসরে ৬-৮ মাস জল থাকে এমন মৌসুমী জলাশয় যেমন - সেচ প্রকল্পের খাল, সংযোগ খাল, মরা নদ-নদী, নদ-নদীর খাড়ী অঞ্চল মাছ চাষের আওতায় আনা।
  • ২. গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকার সমস্যা দূর করা ও অধিক আমিষ উৎপাদন।
    ৩. যে সমস্ত জলাশয়ে একাধিক মালিকানা আছে সে সমস্থ জলাশয়ে একাধিক মৎস চাষী নিজেদের পছন্দমত মাছ চাষ করতে পারে।
  • ৪. সরকারী মালিকানাধীন যে সমস্ত জলাশয়ে নিবিড়/আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা সম্ভব নয় সে সমস্ত জলাশয়ে পোনা তৈরী করে ছোট ছোট ইউনিটে নিবিড়/আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে মাছের অধিক উৎপাদন সম্ভব।
  • ৫. পোনা সমন্বিত হাস, মুরগি ও মাছের চাষও করা যায়।
  • ৬. প্রয়োজনবোধে অল্প সময়ে পোনা এক স্থান হতে অন্যস্থানে স্থানান্তর ও তৈরী করা যায়।
  • ৭. প্রয়োজনে যে কোন সময়ে সামান্য শ্রম ও কম খরচে পোনার মাছ ধরা সম্ভব।
  • ৮. জলাশয়ে বহুবিধ ব্যবহার যেমন কৃষি, সেচ ইত্যাদির কোন অসুবিধা না করেই মাছ চাষ সম্ভব।

স্থান নির্বাচন

পোনা লাভজনকভাবে মাছ চাষের জন্য স্থান নির্বাচন অত্যন্ত দুরুত্বপূর্ণ। যেসব বৃহৎ জলাশয়ে সাধারনভাবে নিবিড় চাষের আওতায় আনা সম্ভব নয় সে সব জলাশয় পোনা মাছ চাষের জন্য নির্বাচন করা যেতে পারে। তবে যে সমস্ত জলাশয়ের তলদেশ অত্যন্ত অসমান, বালি বা পাথর দ্বারা আবৃত, প্রবল স্রোত বিদ্যমান, জল দূষণসহ ঝড়ো হাওয়ায় আক্রান্ত হ্ওয়ার সম্ভাবনা আছে, সে সমস্ত স্থান বাদ দিয়ে উম্মুক্ত জলাশয়ের যে কোন স্থানে পোনা তৈরী করা যেতে পারে।

জল ও মাটির প্রয়োজনীয় ভৌত ও রাসায়নিক গুণাগুণ

ক্র. নং

মাপদণ্ড

অনুকূল মাত্রা

মন্তব্য

জল

তাপমাত্রা

২৫ – ৩২ সেন্টিগ্রেড

তাপ মাত্রা ২০ সেন্ট্রিগ্রেডের নীচে নামলে মাছের বৃদ্ধি ভালো হয় না। তাই শীতকালে মাছ ভালো বাড়ে না। আবার তাপমাত্রা ৩৫ সেন্ট্রিগ্রেডের উপর হলে মাছ অস্বস্তি বোধ করে।

জলের গভীরতা

আঁতুড় পুকুর

.- ০ ১.৫ মিটার

পালন পুকুর ১.২ – ২.০ মিটার

মজুত পুকুর ১.৫ – ২.৫ মিটার

মজুত পুকুরে গরম কালে জলের গভীরতা যেন ১ মিটারের কম না হয়।

স্বচ্ছতা

৩০ – ৪০ সেমি

জলের স্বচ্ছতা ২০ সেমি বা তার নীচে নেমে গেলে ভোরের দিকে অক্সিজেনের পরিমাণ খুব কম হবে। আবার স্বচ্ছতা ৬০ সেমির উপর হলে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের ঘাটতি হয়।

দ্রবীভূত অক্সিজেন

প্রতি লিটার জলে ৫ – ৮ মিলিগ্রাম

প্রতি লিটার জলে ৩ মিলিগ্রামের কম বাঞ্ছনীয় নয়।

দ্রবীভূত কার্বন ডাই-অক্সাইড

প্রতি লিটার জলে ৫ – ১৫ মিলিগ্রাম

প্রতি লিটার জলে ১৫ মিলিগ্রামের বেশি হলে মাছের শ্বাসকার্যের অসুবিধা হয়।

পিএইচ

.৫ – ৮.

পিএইচ ৬.-এর নীচে বা ৯.-এর উপর হলে মাছের বৃদ্ধি ব্যহত হয়।

মোট অ্যালকালিনিটি

প্রতি লিটার জলে ৮০ - ১৫০ মিলিগ্রাম

প্রতি লিটার জলে ২০ মিলিগ্রামের কম বা প্রতি লিটার জলে ২০০ মিলিগ্রামের বেশি অ্যালকালিনিটি হলে মাছ চাষে ক্ষতি হয়।

মাটি

মাটির পিএইচ

.৫ – ৭.

মাটির পিএইচ ৫.-এর কম বা ৮.-এর উপরে হলে মাছ চাষ ভালো হয় না। অধিক অম্লযুক্ত মাটিতে উপযুক্ত পরিমাণে চুন প্রয়োগ করে তবে মাছ চাষ করতে হয়।

ব্যবহারযোগ্য ফসফরাস

প্রতি ১০০ গ্রাম মাটিতে ৬ মিলিগ্রাম

প্রতি ১০০ গ্রাম মাটিতে ৩ মিলিগ্রামের কম ব্যবহারযোগ্য ফসফরাস থাকা উচিত নয়।

ব্যবহারযোগ্য নাইট্রোজেন

প্রতি ১০০ গ্রাম মাটিতে ৫০ – ৭৫ মিলিগ্রাম

প্রতি ১০০ গ্রাম মাটিতে ২৫ মিলিগ্রামের কম ব্যবহারযোগ্য নাইট্রোজেন থাকলে পুকুরে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য উদ্ভিদকণার বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়।

পোনা তৈরী

বাঁশ, গাছের ডাল, নানা উপকরণ দিয়ে তৈরী বেড়া কিংবা জাল দিয়ে পোনা তৈরী করা যায়। সাধারণঃ জলাশয়ের প্রস্থ কম হলে খালের এক পাশ থেকে আরেক পাশ পর্যন্ত আড়াআড়ি ভাবে খুটি পুঁতে বেড়া দিয়ে পোনা তৈরী করা হয়। জাল দিয়ে বেড়া দেয়ার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জালের ফাঁস ১০ মিঃমিঃ এর চেয়ে বেশি না হয়। টায়ারকার্ড জাল বা নটলেস জাল ব্যবহার করা প্রয়োজন। জলাশয়ের ধরনের উপর পোনার আকার নির্ভর করে। জলাশয়ের মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে ১.০ হেক্টর হতে ১০.০ হেক্টর আয়তনের যে কোন আকৃতির পোনা নির্মাণ করা যেতে পারে। পোনার আয়তন খুব বেশী বড় হলে কখনও কখনও ব্যবস্থাপনার অসুবিধা দেখা দেয় এবং অনেক সময় নিবিড়/আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা যায় না। আবার আয়তন অত্যন্ত ছোট হলে তুলনামূলকভাবে বড় পোনার চেয়ে নির্মাণ ব্যয় বেশী পড়ে। সাধারণত ০.৫-৫ হেক্টর আয়তনের পোনা মাছ চাষ ও ব্যবস্থাপনার দিক থেকে সবচেয়ে ভাল। যে সমস্ত এলাকায় জল প্রবাহ বেশি সে সব এলাকার তলদেশে বাঁশ দ্বারা ৩ মিটার উঁচু বানা তৈরী করে তলদেশের মাটির মধ্যে অর্ধেক বানা পুঁতে দিতে হবে যাতে চাপে তলদেশের বালি বা নরম মাটি সরে না যায়। মহাল, বন বা বরাক বাঁশের বেড়া/বানা সাধারণত ১-২ বৎসর ব্যবহার করা যায়। আবার টায়ারকর্ড জালের আয়ুষ্কাল ২-৩ বৎসর। বানা তৈরীর জন্য ব্যবহৃত নারকেলের কয়ের ও সিনথেটিক রশি ১-২ বৎসর টিকে থাকে। এ ছাড়া বেড়া বাধাঁর জন্য ব্যবহৃত জিআই তারের আয়ুষ্কাল ১-২ বৎসর।

উপযুক্ত স্থান-কাল-পাত্র

মানুষ থেকে শুরু করে সমস্ত গৃহপালিত বন্য পশু-পাখি-জীব, কীটপতঙ্গ ও জীবাণুদের বংশবিস্তার হয়। প্রজনন হয়। মাছেরও প্রজনন হয় তাদের বংশবিস্তারের জন্য। সবারই প্রজননক্রিয়ার জন্য উপযুক্ত স্থান, কাল, পাত্র, পরিবেশ প্রয়োজন। মাছেদেরও তাদের প্রজননক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট বয়স, সময়, স্থান, পরিবেশ, পরিস্থিতি দরকার।

মাছের বসবাস জলে -- এই জল খুব স্বচ্ছ, ঘোলা, খুব ঘোলা ও কাদায় পূর্ণ হতে পারে। জলেই এদের প্রজননক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিন্তু ওই জল একেবারে কাদাযুক্ত বা খুব ঘোলা হলে এই ক্রিয়া সম্ভব নয়। তেমনি খুব স্বচ্ছ জলও প্রজননক্রিয়ার উপযুক্ত নয়।

মাছ অন্যদের মতোই পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পরই এই ক্রিয়ায় প্রবৃত্ত হয়। সম্পূর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী স্ত্রী ও পুরুষ মাছই ভালো নিষিক্ত পুষ্ট স্বাস্থ্যবান ডিম প্রসব করতে পারে। মাছের প্রজননক্রিয়া কখনওই অতিরিক্ত অস্বাভাবিক জলবায়ুতে হয় না অর্থাৎ অতি গরম অথবা অতি শীতে এই ক্রিয়া যথেষ্ট ভাবেই বিঘ্নিত হয় বা বন্ধ থাকে। বর্ষাকালে বৃষ্টি, স্রোতযুক্ত জল এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।

অন্য জীবজন্তু প্রাণীদের মতোই অসুস্থ বা বিরক্তিকর অবস্থায় এদের এই রতিক্রিয়া যথেষ্ট বিঘ্নিত হয়ে থাকে। তাই আমরা যখন আমাদের খামারে এবং আমাদের তত্ত্বাবধানে প্রজননের ব্যবস্থা করব তখন এই দিকগুলির কথা মনে রাখতে হবে। অসুস্থ মাছ এক দিকে যেমন অপুষ্ট অসুস্থ ডিম বা প্রজাত-বংশধর তৈরি করতে পারে, তেমনই এই প্রজননক্রিয়ায় অনীহাও থাকতে পারে। যানবাহন চলাচল, বিশেষ করে যন্ত্রচালিত জলযান বা জল দূষণ এদের এই ক্রিয়ার পরিপন্থী।

সাধারণ ভাবে প্রাকৃতিক কারণে মাছ চাষের জলাশয়ে জলের অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি থাকায় মাছেরা বেশি সতেজ থাকে। সারা দিনে তুলনামূলক ভাবে বিকেলের পড়ন্তবেলায় এই প্রজননক্রিয়া বেশি ঘটে থাকে।

কেন কৃত্রিম বা প্রণোদিত প্রজনন

বর্ষাকালে নদী ও বাঁধ থেকে যে ডিমপোনা সংগ্রহ করা হয় তাতে নানা রকম সমস্যা থাকে। যেমন —

  • ১) পোনা মাছের ডিমপোনার সঙ্গে অন্যান্য ক্ষতিকারক রাক্ষুসে মাছ যেমন শাল, শোল, বোয়াল, চিতল প্রভৃতি মিশে থাকে যা মাছ চাষের পক্ষে ক্ষতিকারক। ফলে খাঁটি ডিমপোনা পাওয়া যায় না।
  • ২) মাছ চাষিরা নিজেদের পছন্দমতো ডিমপোনা কিনতে পারে না।
  • ৩) ডিম ও ডিমপোনা সংগ্রহের পরিমাণ খুবই সীমিত।
  • ৪) দূর-দূরান্ত থেকে ডিমপোনা পরিবহন অসুবিধাজনক এবং ব্যয়সাপেক্ষ এবং এতে ডিমপোনার মৃত্যুর হারও খুব বেশি হয়।
  • ৫) অপুষ্ট বা অসুস্থ ডিমপোনা বা ধানিপোনা পাওয়া যায়।

এ সমস্ত সমস্যা সমাধানের জন্য কৃত্রিম উপায়ে পোনা মাছের প্রজননের জন্য দীর্ঘ দিন ধরে বৈজ্ঞানিকগণ চেষ্টা চালিয়ে যান। ভারতেও এই ধরনের গবেষণা চলতে থাকে। অবশেষে মৎস্যবিজ্ঞানী ড. হীরালাল চৌধুরী ও তাঁর সহকর্মীগণ ১৯৫৭ সালে পোনা মাছের কৃত্রিম প্রজনন সফল ভাবে প্রদর্শিত করেন। এই প্রকার প্রজনন পদ্ধতি প্রণোদিত প্রজনন (ইনডিউসড ব্রিডিং) নামে পরিচিত। রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছ বদ্ধ জলাশয়ে ডিম পাড়ে না। কিন্তু বর্ষাকালে স্ত্রী মাছের উদর ডিমপূর্ণ থাকে। পুরুষ মাছের পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস প্রজনন উপযুক্ত স্ত্রী ও পুরুষ মাছকে ইনজেকশন দেওয়ার পরে স্ত্রী মাছ ডিম ছাড়ে ও পুরুষ মাছ শুক্রাণু নিক্ষেপ করে ডিমগুলোকে নিষিক্ত করে। এই ভাবে পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস প্রয়োগে যে প্রজনন হয় তাকে বলা হয় প্রণোদিত প্রজনন। একে হাইপো ফাইশেসানও বলে। তিনটি বিদেশি কার্পের মধ্যে সাইপ্রিনাস কার্প বদ্ধ জলাশয়ে বংশ বিস্তার করে। কিন্তু সিলভার কার্প ও গ্রাস কার্পের বংশবিস্তারও সম্পূর্ণ ভাবে প্রণোদিত প্রজননের উপর নির্ভরশীল। এমনকী বর্তমানে জিওল মাছের চারাও প্রণোদিত প্রজননের মাধ্যমে উৎপাদন করা হচ্ছে।

প্রণোদিত প্রজননের উদ্দেশ্যে প্রজনন উপযোগী বড় বড় মাছকে যে পুকুরে পালন করা হয় তাকে প্রজনন পুকুর (ব্রুডারস পন্ড) বলে। এই সমস্ত পুকুরের আয়তন ০.৩ হেক্টর থেকে ১.০ হেক্টর হওয়া দরকার। চার কোণা আয়তকার হলে ভালো। পুকুরে জলের গভীরতা ১.৫ থেকে ৩.০ মিটার হওয়া উচিত। এই পুকুরে যেন কোনও অবাঞ্ছিত মাছ না থাকে। কোনও রকম জলজ পোকা যেন না থাকে। তাই পুকুরে ২৫০ পিপিএম মহুয়া অয়েল কেক (মহুয়ার খোল) প্রয়োগ করে পুকুর প্রস্তুত করতে হয়। জলজ আগাছা থাকলে তা কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে তুলে ফেলতে হয়। পুকুরে হেক্টর প্রতি ২০০ কেজি চুন প্রয়োগ করা দরকার। মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য জৈব ও অজৈব সার প্রয়োগ করে বর্ষার কয়েক মাস আগে থেকে পুকুর তৈরি করে নিতে হয়। জানুয়ারি – ফেব্রুয়ারি মাসে প্রজননক্ষম, সুস্থ, সবল পরিণত মাছ সংগ্রহ করে এই প্রজনন পুকুরে ছাড়তে হয়। ২ থেকে ৪ বছর বয়সের মাছ এবং ওজনে ২ থেকে ৫ কেজি মাছ কৃত্রিম প্রজননের পক্ষে খুবই ভালো। হেক্টর প্রতি ১৫০০ কেজি থেকে ২৫০০ কেজি মাছ পুকুরে মজুত করা হয়ে থাকে। প্রজনন পুকুরে পালিত মাছকে পরিপূরক খাদ্য দিতে হয়। মজুত করা মাছের দেহ ওজনের ১ – ২ শতাংশ হারে রোজ মাছকে খেতে দিতে হবে। সাধারণত চালের কুঁড়ো ও সরষের খোল সমান পরিমাণে মিশিয়ে মাছকে খেতে দিতে হয়। পুকুরে গ্রাস কার্প থাকলে নরম জলজ উদ্ভিদ খাদ্য হিসাবে দিতে হয়। এই ভাবে বর্ষার আগে মাছগুলিকে প্রজনন উপযোগী করে তুলতে হয়।

সুবিধা
  • ১) প্রাকৃতিক নিয়মের ডিম বা ডিমপোনা সাধারণত নদী নালা থেকে সংগ্রহ করা হয়। অনেক সাবধানতা সত্ত্বেও মিশ্রণ থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। কৃত্রিম বা প্রণোদিত প্রজননে উৎপাদিত ডিমপোনায় মিশ্রণের সম্ভাবনা থাকে না। অর্থাৎ নিষিক্ত ডিম সব সময়ই খাঁটি ও মিশ্রণবিহীন। এক কথায় অবাঞ্ছিত কোনও মাছের ডিমপোনা থাকে না।
  • ২) ইচ্ছানুসারে কই, কাতলা, মৃগেল, গ্রাস কার্প ও সিলভার কার্পের ডিমপোনা উৎপাদন করা যায়। ইচ্ছেমতো নিজের পরিচিত সুস্থ, সবল ও সম্পূর্ণ বয়স্ক স্ত্রী পুরুষের মিলন ঘটানো হয়। এই প্রক্রিয়া সবটাই নিজের তত্ত্বাধানে সম্ভব।
  • ৩) প্রয়োজনমতো এবং সময়মতো সুস্থ ও সবল চারা পাওয়া যায়।
  • ৪) প্রণোদিত প্রজননের দ্বারা পোনা জাতীয় মাছেদের ডিম বদ্ধ জলাশয়েই সংগ্রহ করা যায়। এই জল রোগমুক্ত ও জীবাণুমুক্ত রাখা সম্ভব।
  • ৫) এই প্রক্রিয়ায় চাষযোগ্য পুকুরের কাছেই প্রজনন ঘটিয়ে ডিমপোনা সংগ্রহ করা হয়, ফলে ডিমের অপচয় হয় না। ডিমের অধিকাংশ নিষিক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। তা থেকে বাচ্চাও বেশি হয়।
  • ৬) প্রণোদিত প্রজননের সাহায্যে বছরে দু’ বার ব্রিডিং করানো সম্ভব।
  • ৭) উন্নত জাতের মাছের সঙ্গে মিশ্রণ ঘটিয়ে দ্রুত বৃদ্ধিশীল সংকর জাতের বা পছন্দর গুণযুক্ত মাছের সৃষ্টি সম্ভব।
  • ৮) প্রণোদিত প্রজননের ক্ষেত্রে ডিমপোনার পরিবহন খরচ খুবই কম।
  • ৯) নিজের খামারেও প্রণোদিত প্রজনন সম্ভব।

পিটুইটারি গ্রন্থির সাহায্যে হাপাতে মাছের কৃত্রিম প্রণোদিত প্রজননের জন্য করণীয় কাজ —

  • প্রজনন পুকুরে উপযোগী মাছ পালন। অথবা সুস্থ সবল পূর্ণবয়স্ক মাছের প্রাপ্তিস্থান নিশ্চিত করা।
  • প্রণোদিত প্রজননের জন্য উপযোগী মাছ নির্বাচন। নিজের মজুত পুকুর বা যে কোনও স্থানেই হোক মাছগুলি সর্বতো ভাবে উপযুক্ত হওয়া দরকার।
  • মাছের পিটুইটারি গ্রন্থি সংগ্রহ। এই গ্রন্থিরস প্রণোদিত প্রজননে একান্ত প্রয়োজনীয়। খুব পটু সংগ্রহকারীর সাহায্যে এই কাজ করতে হবে।
  • পিটুইটারি গ্রন্থি সংরক্ষণ সুকৌশলে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সংরক্ষণ প্রয়োজন।
  • পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস তৈরি।
  • মাছের দেহে ইনজেকশনের জন্য পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস বা হরমোনের মাত্রা নির্ণয়।
  • নির্বাচিত মাছের দেহে প্রয়োজনমতো হরমোন ইনজেকশন।
  • প্রজনন ও ডিম ফোটানোর জন্য স্ত্রী ও পুরুষ মাছকে হাপাতে স্থানান্তর করা।
উপযোগী মাছ নির্বাচন

প্রণোদিত প্রজননের জন্য মাছের নিম্মলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি থাকা দরকার —

প্রণোদিত প্রজননের জন্য মাছের বয়স অন্তত ২ বছর হওয়া দরকার। যে হেতু মাছের ডিম্বাণু ধারনের ক্ষমতা মাছের দেহের ওজনের উপর নির্ভরশীল, তাই বেশি ওজনের মাছ প্রজননের কাজে বেশি সাফল্য আনে। সাধারণত ১ কেজি থেকে ৫.০ কেজি দেহওজন বিশিষ্ট ভারতীয় কার্প প্রজননের জন্য ব্যবহৃত হয়।

প্রণোদিত প্রজননের আগে পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে চিহ্নিত করে নিতে হয়। নিম্নলিখিত ভাবে পুরুষ ও স্ত্রী মাছ সনাক্ত করা যায় —

পুরুষ মাছ

স্ত্রী মাছ

)

পুরুষ মাছের বক্ষ পাখনা আঙুল দিয়ে ঘষলে খসখসে লাগবে।

)

স্ত্রী মাছের বক্ষ পাখনা আঙুল দিয়ে ঘষলে মসৃণ লাগবে।

 

পুরুষ মাছের উদর প্রায় চ্যাপ্টা। উদরে চাপ দিলে দুধের ন্যায় সাদা শুক্ররস (মিল্ট) নির্গত হয়।

)

স্ত্রী মাছের উদর স্ফীত ও কোমল, উদরে চাপ দিলে মাঝে মাঝে ডিম নির্গত হয়।

)

পুরুষ মাছের জননছিদ্র লম্বা, সরু, ভেতরের দিকে ঢোকা এবং সাদা রঙের হয়।

)

স্ত্রী মাছের জননছিদ্র গোলাকার, ঈষৎ স্ফীত হয়ে বাইরের দিকে বেরিয়ে আসে এবং লাল আভাযুক্ত হয়।

প্রণোদিত প্রজননের জন্য সংখ্যা অনুসারে প্রতিটি স্ত্রী মাছের জন্য দু’টি করে পুরুষ মাছ নিতে হবে অথবা ওজন অনুসারে ১ : ১ হবে। এই ভাবে পুরুষ ও স্ত্রী মাছ নির্বাচনের পর পুকুরের মধ্যে হাপা খাটিয়ে এদের পৃথক ভাবে রাখতে হয়।

পিটুইটারি গ্রন্থির

অবস্থান ও কার্য

প্রণোদিত প্রজননের জন্য পিটুইটারি গ্রন্থি একান্তই দরকার। এই গ্রন্থিটি মাছের মাথার খুলির ভিতর মাছের ঘিলু বা ব্রেনের অপটিক স্নায়ুদু’টোর সংযোগস্থলের একটি ছোট কোটরে বা গহ্বরে নরম পর্দা দিয়ে আবৃত থাকে। ঢেঁড়স বীজের মতো দেখতে এই গ্রন্থিটি লালাভ শ্বেতবর্ণের। এটি একটি নালিবিহীন গ্রন্থি। এই গ্রন্থি থেকে নি:সৃত বিভিন্ন প্রকার হরমোন রক্তের মাধ্যমে দেহের অন্যান্য গ্রন্থিতে গিয়ে তাদের কার্যকারিতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এই পিটুইটারি গ্রন্থিকে মাস্টার গ্রন্থি বলা হয়। এই গ্রন্থি থেকে ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন ও লিউটিনাইজিং হরমোন নি:সৃত হয়ে যথাক্রমে স্ত্রী মাছের ডিম্বাশয় ও পুরুষ মাছের শুক্রাশয়কে উদ্দীপিত করে। ফলস্বরূপ স্ত্রী মাছ ডিম্বাণু নি:সরণ করে এবং পুরুষ মাছ শুক্রাণু নি:সরণ করে। এই শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনের মাধ্যমে মাছের প্রজনন সম্পন্ন হয়।

সংগ্রহ

যে হেতু পরিণত মাছের পিটুইটারি গ্রন্থির কার্যক্ষমতা খুবই বেশি তাই পরিণত ও তাজা অথবা ৫ – ৭ দিন বরফে রাখা মাছ থেকে পিটুইটারি গ্রন্থি সংগ্রহ করা হয়। পরিণত স্ত্রী ও পুরুষ উভয় মাছ থেকে পিটুইটারি গ্রন্থি সংগ্রহ করা যাবে। সাধারণত বর্ষার সময় প্রজননকালে (মার্চ – আগস্ট ) দেশি ও বিদেশি পোনা মাছের মাথা থেকে গ্রন্থি সংগ্রহ করতে হয়। তবে সাইপ্রিনাস কার্প থেকে সারা বছর এই গ্রন্থি সংগ্রহ করা যেতে পারে, যে হেতু এদের প্রায় সারা বছর ধরে প্রজনন চলে। সাধারণত দু’টো পদ্ধতির মাধ্যমে মাছের মাথা থেকে পিটুইটারি গ্রন্থি সংগ্রহ করা যায় —

  • ১) মাছের মাথার খুলির উপরিভাগ ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে ব্রেন উন্মোচন করা হয়। তার পর চিমটের (ফরসেপ) সাহায্যে ব্রেন তুলে ধরলে অপটিক নার্ভদু’টোর সংযোগস্থালের নীচে একটি কোটরের মধ্যে পাতলা পর্দা দিয়ে ঢাকা ছোট দানার মতো এই গ্রন্থি দেখা যাবে। রুই, মৃগেলের পিটুইটারি গ্রন্থি পাতলা পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকে কিন্তু সাইপ্রিনাস কার্প, কাতলা, শিঙি, মাগুর প্রভৃতি মাছের ক্ষেত্রে এই গ্রন্থি পাতলা পর্দা দ্বারা ঢাকা থাকে না। এই গ্রন্থিটিকে সূক্ষ্ম টুইজার দিয়ে সতর্ক ভাবে তুলে আনতে হয়। গ্রন্থিটি সংগ্রহের সময় কোনও প্রকার ক্ষত হলে এর কার্যক্ষমতা হ্রাস পায় এবং প্রণোদিত প্রজননের সঠিক মাত্রা নির্ণয় করা সম্ভব হয় না।
  • ২) মাছের পেছনের দিকে একটি ছিদ্র থাকে। একে ফোরামেন ম্যাগনাম বলা হয়। এই ছিদ্রের মাধ্যমে মাছের ব্রেন ও স্পাইনাল কর্ড যুক্ত থাকে। এই ফোরামেন ম্যাগনাম ছিদ্র পথেও পিটুইটারি গ্রন্থি সংগ্রহ করা যায়। এই পদ্ধতিতে মাথার খুলি না কেটে ফোরামেন ম্যাগনাম ছিদ্রটিকে ধারালো ছুরি দিয়ে একটু বড় করে নিতে হয়। এর পর এর মধ্য দিয়ে একটি ফরসেপ বা চিমটে ঢুকিয়ে ফ্যাটজাতীয় পদার্থ সমেত ব্রেনটিকে এক দিকে সরিয়ে বাঁকানো চিমটের সাহায্যে গ্রন্থিটিকে সামনের দিকে নিয়ে আসা হয় ও পরে তা সংগ্রহ করা হয়।
সংরক্ষণ

প্রজনন কাজের জন্য যদি টাটকা অবস্থায় পিটুইটারি গ্রন্থি ব্যবহার করতে হয় তা হলে মাথা থেকে গ্রন্থি বের করে টিস্যু হোমোজেনাইজারে ভালো ভাবে পেষণ করে পরিমাণমতো বিশুদ্ধ পাতিত জল (ডিস্টিলড ওয়াটার) মিশিয়ে হরমোন দ্রবণ তৈরি করে মাছকে ইনজেকশন করলেই চলে। কিন্তু সাধারণত এই পদ্ধতি প্রয়োগ না করে পিটুইটারি গ্রন্থিকে সংরক্ষণ করে প্রয়োজন অনুসারে মাছকে ইনজেকশন করা হয়ে থাকে। উপযুক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থায় পিটুইটারি গ্রন্থির কার্যক্ষমতা ২ বছর থেকে ১০ বছর পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে। সাধারণত অ্যাবসলিউট অ্যালকোহলের মধ্যে গ্রন্থিগুলিকে সংরক্ষণ করা হয়।

পিটুইটারই গ্রন্থি মাছের মাথা থেকে বার করার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাবসলিউট অ্যালকোহলপূর্ণ কাচের শিশিতে ডুবিয়ে রাখতে হয়। এর ফলে গ্রন্থিটির জল নিরুদন (ডিহাইড্রেশন) ঘটে। এই গ্রন্থির হরমোনগুলো জলে দ্রবণীয় কিন্তু অ্যালকোহলে অদ্রবণীয়। ২৪ ঘণ্টা পর শিশির পুরাতন অ্যালকোহল ফেলে পুনরায় নতুন অ্যাবসলিউট অ্যালকোহল দিতে হয়। এই ভাবে গ্রন্থিটির ফ্যাট অংশ পরিত্যক্ত হয়ে জল নিরুদন (ডিহাইড্রেশন) সম্পূর্ণ হয়। এই বার গ্রন্থি সমেত শিশিটির মুখ ছিপি দিয়ে এমন ভাবে বন্ধ রাখতে হবে যাতে কোনও বাতাস না ঢুকতে পারে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য গ্রন্থিগুলিকে অ্যালকোহলপূর্ণ কালো কাচের শিশিতে রেফ্রিজারেটারে রাখা হয়। পিটুইটারি গ্রন্থির ওজন সামান্য, সেই জন্য এদের ওজন মিলিগ্রামে নির্ধারণ করা হয়।

নির্যাস তৈরির পদ্ধতি

হরমোন নির্যাস তৈরির জন্য যতটা গ্রন্থি লাগবে তা শিশির অ্যালকোহল থেকে বের করে একটা ফিলটার কাগজের উপর রাখতে হয়। যাতে অ্যালকোহল উড়ে গিয়ে গ্রন্থিটি শুষ্ক হয়। এরপর প্রয়োজনীয় ওজনের গ্রন্থি একটি টিস্যু হোমোজেনাইজার যন্ত্রে রাখা হয়। এই যন্ত্রিটি একটি কাচের টিউব এবং একটি কাচের পেষণদণ্ড নিয়ে গঠিত। টিউবের সামনের মুখ খোলা এবং চওড়া কিন্তু তলার দিকে টিউবটি বন্ধ এবং অপেক্ষাকৃত সরু। কাচের দণ্ডটিকে টিউবের নীচের দিকে নলের ভেতরের অংশে ভালো ভাবে ঘোরানো যায়। পিটুইটারি গ্রন্থিসমেত টিস্যু হোমোজেনাইজারে একটু পরিমাণমতো পাতিত জল দিয়ে কাচের দণ্ডের সাহায্যে ভালো ভাবে পেষাই করতে হয়। সাধারণত ১০ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ১ মিলিলিটার পাতিত জল দিয়ে গ্রন্থির ঘোলা জলীয় দ্রবণ তৈরি করে নিয়ে সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রের নলে ঢালা হয়। এই যন্ত্রটিকে হাতের সাহায্যে কিংবা বিদ্যুতের সাহায্যে মিনিটে ১৫০০ – ২০০০ বার গতিতে ৫ -৮ মিনিট ঘুরিয়ে সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রের নলে ঢালা হয়। ফলে ঘোলা দ্রবণটি পরিষ্কার হয়। গ্রন্থিটির অদ্রাব্য অংশ নলের তলায় থিতিয়ে পড়ে এবং উপরের দিকে স্বচ্ছ তরল থাকে। এই তরল দ্রবণেই হরমোন থাকে। একে হরমোন গোলা দ্রবণ বা পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস বলে এবং এই দ্রবণকেই প্রণোদিত প্রজননের জন্য ব্যবহার করা হয়।

মাত্রা নির্ণয়ের উদাহরণ

ধরা যাক ৩ কেজি ওজনের একটি স্ত্রী রুই মাছ এবং ১ কেজি ৮০০ গ্রাম ওজনের একটি পুরুষ ও ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের আর একটি পুরুষ রুই মাছকে নিয়ে একটি ব্রিডিং সেট তৈরি করা হল। এদের মধ্যে পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস দিয়ে প্রণোদিত প্রজনন করতে হলে ইনজেকশনের মাত্রা নিম্নলিখিত ভাবে নির্ধারণ করা যায় —

এখানে মোট মাছের ওজন (১টি স্ত্রী + ২টি পুরুষ)

= ৩ কে জি + ১.৮ কে জি + ১.২ কে জি

= ৬ কে জি

আমরা জানি স্ত্রী মাছকে দু’ বার এবং পুরুষ মাছকে এক বার পিটুইটারি নির্যাস দিয়ে ইনজেকশন দিতে হয়।

এখন প্রতি কেজি স্ত্রী রুই মাছের ক্ষেত্রে প্রথম ইনজেকশনের মাত্রা যদি ২ মিলিগ্রাম হয় তবে ৩ কেজি ওজনবিশিষ্ট স্ত্রী রুই মাছের প্রথম ইনজেকশনের জন্য পিটুইটারি গ্রন্থি লাগবে —

৩ x ২ = ৬ মিলিগ্রাম।

স্ত্রী মাছকে দ্বিতীয় বার ইনজেকশনের মাত্রা যদি প্রতি কেজি মাছের জন্য ৬ মিলিগ্রাম হয় তবে ৩ কেজি ওজনবিশিষ্ট স্ত্রী রুই মাছটির জন্য পিটুইটারি গ্রন্থি লাগবে —

৩ x ৬ = ১৮ মিলিগ্রাম।

অর্থাৎ স্ত্রী মাছের ইনজেকশনের জন্য মোট পিটুইটারি গ্রন্থি লাগবে — ৬ মিলিগ্রাম + ১৮ মিলিগ্রাম = ২৪ মিলিগ্রাম পিটুইটারি গ্রন্থি লাগবে।

পুরুষ মাছের ইনজেকশনের মাত্রা যদি প্রতি কেজি ওজনের জন্য ৩ মিলিগ্রাম হয় তবে ১.৮ কেজি ওজনবিশিষ্ট পুরুষ রুই মাছের জন্য পিটুইটারি গ্রন্থি লাগবে --

১.৮ x ৪ = ৫.৪ মিলিগ্রাম

এবং ১.২ কেজি ওজনবিশিষ্ট আর একটি পুরুষ রুই মাছের জন্য পিটুইটারি গ্রন্থি লাগবে —

১.২ x ৩ = ৩.৬ মিলিগ্রাম

অর্থাৎ দু’টি পুরুষ মাছের জন্য মোট পিটুইটারি গ্রন্থি লাগবে —

৫.৪ + ৩.৬ = ৯ মিলিগ্রাম

সুতরাং ব্রিডিং সেটটির জন্য মোট পিটুইটারি গ্রন্থি লাগবে —

স্ত্রী মাছের দু’ বার ইনজেকশনের জন্য মোট গ্রন্থির ওজন + দু’টি পুরুষ মাছের ইনজেকশনের জন্য মোট গ্রন্থির ওজন --

অর্থাৎ ২৪ মিলিগ্রাম + ৯ মিলিগ্রাম = ৩৩ মিলিগ্রাম

এই ভাবে পিটুইটারি গ্রন্থির ওজন নির্ধারণের পর ৩৩ মিলিগ্রাম গ্রন্থিকে অ্যালকোহলপূর্ণ শিশি থেকে বের করে ভালো করে শুকিয়ে নিয়ে টিস্যু হোমোজেনাইজারে গ্রন্থির নির্যাস তৈরি করতে হবে এবং পরিমাণমতো বিশুদ্ধ জল এর সঙ্গে মেশাতে হবে।

যদি প্রতি ১০ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ১ মিলিলিটার জল মেশানো হয় তবে ৩৩ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য বিশুদ্ধ জলের পরিমাণ হবে —

১০ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য বিশুদ্ধ জলের পরিমাণ ১ মিলিলিটার

১ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য বিশুদ্ধ জলের পরিমাণ ১/১০ মিলিলিটার

৩৩ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য বিশুদ্ধ জলের পরিমাণ (১/১০) x ৩৩ মিলিলিটার

= ৩.৩ মিলিলিটার

এই ভাবে ৩৩ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ৩.৩ মিলিলিটার পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস তৈরি করে নিতে হয়।

এখন প্রথম বার স্ত্রী মাছকে ৬ মিলিগ্রাম ইনজেকশন দেওয়ার জন্য এই নির্যাসের পরিমাণ হবে —

১০ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ১ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

১ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ১/১০ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

৬ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য (১/১০) x ৬ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

= ০.৬ মিলি লিটার

অর্থাৎ ০.৬ মিলিলিটার পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাসের দ্রবণ লাগবে।

দ্বিতীয় বার স্ত্রী মাছকে ১৮ মিলিগ্রাম ইনজেকশন দেওয়ার জন্য পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাসের পরিমাণ হবে —

১০ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ১ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

১ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ১/১০ মিলি লিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

১৮ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য (১/১০) x ১৮ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

= ১.৮ মিলিলিটার

অর্থাৎ ১.৮ মিলিলিটার পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাসের দ্রবণ লাগবে।

১.৮ কেজি ওজনবিশিষ্ট পুরুষ মাছকে ৫.৪ মিলিগ্রাম ইনজেকশন দেওয়ার জন্য এই পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাসের পরিমাণ হবে —

১০ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ১ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

১ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ১/১০ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

৫.৪ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য (১/১০) x ৫.৪ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

= ০.৫৪ মিলিলিটার

অর্থাৎ ০.৫৪ মিলিলিটার পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাসের দ্রবণ লাগবে।

১.২ কেজি ওজনবিশিষ্ট আর একটি পুরুষ মাছকে ৩.৬ মিলিগ্রাম ইনজেকশন দেওয়ার জন্য পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাসের পরিমাণ হবে —

১০ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ১ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

১ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য ১/১০ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

৩.৬ মিলিগ্রাম গ্রন্থির জন্য (১/১০) x ৩.৬ মিলিলিটার গ্রন্থির নির্যাস দ্রবণ

= ০.৩৬ মিলিলিটার

অর্থাৎ ০.৩৬ মিলিলিটার পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাসের দ্রবণ লাগবে।

এক নজরে রুই মাছের ব্রিডিং সেটটির ইনজেকশেনর মাত্রা ছকের সাহায্যে দেখানো হল —

মাছের

ওজন

১ম ইনজেকশেনর মাত্রা

দু’ বার ইনজেকশন দেওয়ার মধ্যবর্তী সময়

স্ত্রী মাছের ২য় ইনজেকশনের মাত্রা ও পুরুষ মাছের ১ম ইনজেকশনের মাত্রা

গ্রন্থির ওজন

গ্রন্থির দ্রবণের মাত্রা

গ্রন্থির ওজন

গ্রন্থির দ্রবণের মাত্রা

৩ কেজি স্ত্রী মাছ

৬মিলিগ্রাম

.৬ মিলিলিটার

৬ – ৮ ঘণ্টা

১৮ মিলিগ্রাম

১৮ মিলিলিটার

.৮ কেজি পুরুষ মাছ

.৪ মিলিগ্রাম

.৫৪ মিলিলিটার

.২ কেজি পুরুষ মাছ

.৬ মিলিগ্রাম

.৩৬ মিলিলিটার

কৃত্রিম বা সিন্থেটিক হরমোন

প্রণোদিত প্রজননের জন্য যে হরমোনটি মূলত দরকারি তা হল গোনাডোট্রিপন। এই গোনাডোট্রপিন ছাড়াও পিটুইটারি গ্রন্থিতে আরও কিছু হরমোন যেমন সোমাটোট্রপিক হরমোন, অ্যাড্রিনোকর্টিকো ট্রপিক হরমোন, থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন, প্রোল্যাকটিন প্রভৃতি হরমোন থাকে যারা প্রজননে কোনও অংশ নেয় না। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে যে নির্যাস তৈরি করে মাছকে ইনজেকশন দেওয়া হয় তাতে গোনাডোট্রপিন ছাড়াও এই সমস্ত হরমোনও মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। অর্থাৎ এই ধরনের নির্যাস পুরোপুরি বিশুদ্ধ নয়, এতে অন্য হরমোনের মিশ্রণ থাকে।

বর্তমানে বাজারে অনেক রকম কৃত্রিম বা সিন্থেটিক হরমোন পাওয়া যায় যার মধ্যে শুধুমাত্র গোনাডোট্রপিন হরমোন থাকে। অন্যান্য হরমোন এর মধ্যে থাকে না। এই কৃত্রিম হরমোনের সঙ্গে থাকে ‘ডোপামিন অ্যান্টাগোনিস্ট’ যারা ডোপামিনকে কাজ করতে বাধা দেয় কারণ ডোপামিন গোনাডোট্রপিনকে কাজে বাধা দেয়। তাই কৃত্রিম হরমোনে শুধুমাত্র প্রজনন সহায়ক হরমোন থাকে। এটা অনেক বেশি শুদ্ধ। এই সিন্থেটিক হরমোনগুলোর ব্যবহারের সুবিধাগুলি হল —

  • ১) এদের মধ্যে শুধু মাত্র প্রজনন সহায়ক হরমোন থাকে, অন্যান্য অদরকারি হরমোন থাকে না।
  • ২) পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে এক বার মাত্র ইনজেকশন দিতে হয়। অর্থাৎ সিঙ্গল ডোজ।
  • ৩) এই ইনজেকশন প্রয়োগে মাছের শারীরিক অসুবিধা কম হয়।
  • ৪) এই হরমোন তরল দ্রবণ অবস্থায় পাওয়া যায়। তাই ব্যবহারের কোনও অসুবিধা হয় না।
  • ৫) সাধারণ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়।
  • ৬) ডিমের উৎপাদন ভালো হয়।

কয়েকটি বাণিজ্যিক সিন্থেটিক হরমোন হল —

  • ১) ওভা এফ এইচ (OVA –FH) ওখার্ডট প্রাইভেট লিমিটেড, মুম্বই।
  • ২) ওভাপ্রিম (OVAPRIM) সিয়াডেন ল্যাবরেটরি, কানাডা।
  • ৩) ওভাটাইড (OVATIDE) হিমোফার্মা ল্যাবরেটরি, মুম্বই।

হ্যাচারি

হ্যাচারি হল এক ধরনের উন্নত মানের ব্যবস্থা যার মধ্যে ডিম উৎপাদন থেকে শুরু করে ডিমের পরিচর্যার জন্য কৃত্রিম ভাবে প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় এবং সর্বাধিক সংখ্যক ডিমপোনা উৎপন্ন করা যায়। হ্যাচারিতে সর্বদা নিরবচ্ছিন্ন জলপ্রবাহ দ্বারা জলের নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও উপযুক্ত পরিমাণে অক্সিজেন রক্ষা করা হয়। এতে জলপ্রবাহের গতি নিয়ন্ত্রণ ও জল নিঃসরণের ব্যবস্থা থাকে। সদ্যোজাত ডিমপোনা সংগ্রহের জন্য বিশেষ ধরনের আধার ও ডিমপোনা ফোটার পর ডিমের বর্জ্য পদার্থ নি:সরণেরও ব্যবস্থা থাকে। হ্যাচারি বিভিন্ন মডেলের হয়। তার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হ্যাচারি হল —

  • ১) চাইনিজ হ্যাচারি : এটি সিমেন্টের তৈরি একটা বৃত্তাকার জলাধার যার মধ্যে জল নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে বৃত্তপথে প্রবাহিত হতে থাকে।
  • ২) গ্লাস জার হ্যাচারি : এটি একটি সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা যার মধ্যে অনেক কাচের তৈরি জার থাকে। প্রতি জারে প্রায় ৫০ হাজার মতো ডিম রাখা হয় এবং নলের সাহায্যে জলপ্রবাহের মাধ্যমে ডিম ফোটানো হয়।
  • ৩) সিমেন্টর তৈরি জলাধার হ্যাচারি : এই ধরনের হ্যাচারিতে সিমেন্টের তৈরি প্রায় ৫ বর্গমিটার ও ১ মিটার গভীরতা যুক্ত চতুষ্কোণ চৌবাচ্চা থাকে। প্রতিটি চৌবাচ্চাতে ২০টি করে হ্যাচিং জাল জলের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়। জালের মধ্যে নিষিক্ত ডিমগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হয়। ডিম এখানে জলের আন্দোলনের প্রস্ফুটিত হয় এবং ডিমপোনাগুলো চৌবাচ্চার মধ্যে সঞ্চিত হয়।

এ ছাড়া হ্যাচারি ও দ্বিবেদী নামক হ্যাচারির মাধ্যমেও ডিম ফোটানো হয়।

ইনজেকশনের প্রয়োজন কখন

ইনজেকশনের জন্য পিটুইটারি হরমোনের মাত্রা নির্ণয়

ইনজেকশনের মাত্রা প্রধানত নির্ভর করে —

  • ১) গ্রহীতা মাছের প্রজনন অঙ্গের পরিপক্কতার উপর
  • ২) গ্রহীতা মাছের ওজনের উপর
  • ৩) যে দিন ইনজেকশন করা হবে সেই দিনের পরিবেশের আবহাওয়া বিশেষ করে তাপমাত্রার উপর।

সাধারণত স্ত্রী মাছকে দু’বার ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। প্রথম বার ইনজেকশন দেওয়ার ৬ – ৮ ঘণ্টা পরে দ্বিতীয় বার ইনজেকশন করতে হয়। কিন্তু পুরুষ মাছকে এক বার ইনজেকশন দিতে হয়। স্ত্রী মাছকে যখন দ্বিতীয় বার ইনজেকশন দেওয়া হয় সেই সময় পুরুষ মাছকে এই ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হয়। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির মাছের ক্ষেত্রে ইনজেকশনের মাত্রাও ভিন্ন হয়। সাধারণত নিম্নলিখিত হারে দেশি ও বিদেশি পোনা মাছের দেহের হরমোন প্রয়োগ করা হয় —

দেশি ও বিদেশি পোনা মাছের প্রজাতি

স্ত্রী মাছ

পুরুষ মাছ

প্রতি কেজি মাছের ক্ষেত্রে প্রথম ইনজেকশনের মাত্রা

প্রথম ও দ্বিতীয় ইনজেকশন দেওয়ার মধ্যবর্তী সময় (ঘণ্টা)

প্রতি কেজি মাছের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ইনজেকশনের মাত্রা

প্রতি কেজি মাছের ক্ষেত্রে ইনজেকশনের মাত্রা

)

কাতলা

(কাতলা কাতলা)

৩ – ৪ মিগ্রা

৮ – ১০ মিগ্রা

৪ – ৫ মিগ্রা

)

রুই (লেবিও রোহিতা)

২ – ৩ মিগ্রা

৬ – ৮ মিগ্রা

৩ – ৪ মিগ্রা

)

মৃগেল (সিরহিনাস মৃগালা)

১ – ২ মিগ্রা

৪ – ৬ মিগ্রা

২ – ৩ মিগ্রা

)

সিলভার কার্প (হাইপোথ্যালকিকমাস মলিট্রিক্স)

 

৪ – ৬ মিগ্রা

১২ – ১৬ মি গ্রাম

৫ – ৬ মিগ্রা

)

গ্রাস কার্প (টিনোফ্যারিংগোডন উডেলা)

৩ – ৪ মিগ্রা

১০ – ১৪ মি গ্রা

৪ – ৫ মিগ্রা
ইনজেকশন দেওয়ার পদ্ধতি

পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস সাধারণত মাছের দেহ পেশিতে ইনজেকশন করা হয়। হরমোন দ্রবণ সিরিজের মধ্যে নিয়ে মাছের পিছনের দিকে পৃষ্ঠ পাখনা ও পুচ্ছ পাখনার মাঝামাঝি জায়গায় স্পর্শেন্দ্রিয় রেখার (ল্যাটারাল লাইন) উপরিভাগে ইনজেকশন করতে হয়। ইনজেকশন দেওয়ার সময় মাছটিকে একটি নরম পাতলা গদিতে শোয়ানো অবস্থায় হাত দিয়ে চেপে রাখতে হয়। এখন ওজন অনুসারে প্রয়োজনীয় পিটুইটারি নির্যাস ইনজেকশন সিরিঞ্জের মধ্যে নিয়ে মাছের ইনজেকশন প্রয়োগের স্থানে একটা আঁশ উঁচু করে ধরে নিয়ে সিরিঞ্জের নিডল বা সূঁচটি সমান্তরাল ভাবে রেখে মাছের পেশির মধ্যে অল্প প্রবেশ করাতে হয়। তার পর সূঁচটিকে ৩০ ডিগ্রি বা ৪৫ ডিগ্রি কোণ করে পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাসটি ধীরে ধীরে মাছের শরীরে প্রবেশ করাতে হয়। ইনজেকশন দেওয়ার সিরিঞ্জটি হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ নামে পরিচিত। সাধারণত ২ মিলিলিটার আয়তনের ০.১ মিলিলিটার দাগ-সহ সিরিঞ্জ ব্যবহার করা হয়। বি ডি নিডল ১০ নং ৩ কেজি বা তার বেশি ওজনের মাছের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় এবং ২২ নং নিডল ছোট মাছের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া মাছের বক্ষ পাখনার গোড়ায় অবস্থিত একটি নরম স্থানেও ইনজেকশন প্রয়োগ করে পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাস প্রবেশ করানো হয়।

ইনজেকশন দেওয়ার সময় সতর্কতা
  • ১) মাছের উদর অংশে যেন কোনও ভাবেই চাপ প্রয়োগ করা না হয়।
  • ২) স্পর্শেন্দ্রিয় রেখায় যেন সূঁচ ফোটানো না হয়।
  • ৩) সূঁচ ফোটানোর সময় আঁশ সরিয়ে ইনজেকশন দিতে হয়। আঁশে যেন সূঁচ ফোটানো না হয়।
  • ৪) ইনজেকশন প্রয়োগের পর জায়গাটিতে সাবধানে ম্যাসাজ করে দিতে হয়। যাতে গ্রন্থির নির্যাস বাইরে বেরিয়ে না আসতে পারে অর্থাৎ ব্ল্যাক ফ্লো বন্ধ করতে হয়।
  • ৫) বক্ষ পাখনার গোড়ায় ইনজেকশন দেওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হয় যাতে সূঁচ হৃদপিণ্ডে বিদ্ধ না হয়।
  • ৬) যে হেতু স্ত্রী মাছকে দু’ বার ইনজেকশন দিতে হয় তাই প্রথম বার মাছের যে দিকে ইনজেকশন দেওয়া হয়, দ্বিতীয় বার ইনজেকশন তার ঠিক উল্টো দিকে দিতে পারলে ভালো।
  • ৭) ইনজেকশন দেওয়ার পর মাছকে পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণে ডুবিয়ে হাপাতে ছেড়ে দিতে হয়।
ইনজেকশন প্রয়োগের সময়

মৎস্য খামারে কৃত্রিম ভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। বাদলা বা মেঘলা দিনে মাছকে প্রণোদিত প্রজননে ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়। সাধারণত স্ত্রী মাছকে প্রথম বার ইনজেকশন প্রয়োগের সময় বিকেল ৪টে থেকে ৫টা, যখন জলের তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম হয়। বর্ষাকালে নদীর জলের তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম থাকে। এই সময় নদীর জলের তাপমাত্রা ২৪ – ৩১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থাকে। সেই জন্য বর্ষাকাল প্রজননে অনুকূল হয়। স্ত্রী মাছকে দ্বিতীয় ইনজেকশন এবং পুরুষ মাছকে প্রথম ইনজেকশন রাত্রি ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে দিতে হয়। তবে সময়সূচি এমন ভাবে নির্ণয় করা দরকার যাতে ডিম নি:সরণ ভোরের দিকে বা খুব সকালের দিকে হয়। অন্যথায় সকালের সূর্যের আলো দ্বারা ব্রিডিং ও হ্যাচিং ট্যাঙ্কের জল গরম হয়ে সমস্ত ডিম নষ্ট হতে পারে।

হাপা

প্রজনন বা ব্রিডিং হাপা

মাছের প্রজনন ও ডিম ফোটানোর জন্য পাতলা কাপড় কিংবা নাইলনের সূক্ষ্ম জাল কেটে নির্দিষ্ট মাপের উল্টোনো মশারির মতো যে আধার তৈরি করা হয় তাকে হাপা বলে। হাপা দু’ ধরনের হয়। যে হাপাতে মাছের প্রজনন হয় তাকে প্রজনন হাপা বা ব্রিডিং বলে এবং যে হাপায় ডিম ফোটানো হয় তাকে হ্যাচিং হাপা বা ডাবল হাপা বলে।

প্রজনন বা ব্রিডিং হাপা সাধারণত মার্কিন পাতলা কাপড় কিংবা নাইলনের সূক্ষ্ম জাল কেটে তৈরি করা হয়। হাপার আয়তন মাছের দেহের ওজনের উপর নির্ভর করে। মোটামুটি ভাবে প্রজনন হাপা ২ মিটার দৈর্ঘ্য, ১ মিটার প্রস্থ এবং ১ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট রেখে কাপড়কে এক রকম চতুষ্কোণ আকার দিয়ে ভালো করে ফিতে দিয়ে সেলাই করা হয়। হাপার উপরে একটি কাপড়ের ঢাকনা এমন ভাবে সেলাই করা থাকে যাতে মাছ লাফিয়ে বাইরে না চলে যায়। তবে ঢাকনার এক পাশে মাছ ঢোকানোর ও বাইরে আনার ব্যবস্থা থাকে। হাপাটিকে পুকুরের জলে চার দিকে টান টান করে চারটি বাঁশের খুঁটির সাহায্যে খাটানো হয়। হাপাটির অর্ধেক জলের ভিতরে থাকবে। হাপাটির নীচের অংশ যেন পুকুরের তলাকার মাটিতে না লেগে যায়, সেটা লক্ষ রাখতে হবে। হাপাটি যেখানে খাটানো হবে সেখানকার জল ভালো হওয়া দরকার।

স্ত্রী মাছকে দ্বিতীয় ইনজেকশন এবং পুরুষ মাছকে প্রথম ইনজেকশন দেওয়ার পর স্ত্রী ও পুরুষ মাছকে একত্রে প্রজনন হাপার মধ্যে ছেড়ে দিতে হয়। একটি হাপাতে দু’টি পুরুষ ও একটি স্ত্রী মাছ রাখতে হয় যেখানে পুরুষ মাছ দু’টির সামগ্রিক ওজন স্ত্রী মাছটির ওজনের সমান হয়। এই ভাবে দু’টি পুরুষ মাছ ও একটি স্ত্রী মাছকে নিয়ে এক একটি ব্রিডিং সেট তৈরি করা হয়। ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে মাছগুলি উত্তেজিত হয়ে ছোটাছুটি করে ও জল তোলপাড় করে। একে স্পোর্টিং ক্রিয়া বলে। ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে স্ত্রী মাছ শরীরের ঝাঁকুনি দিয়ে ডিম ছাড়তে শুরু করে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরুষ মাছ ওই ডিমগুলোর উপর শুক্রাণু বা মিল্ট ক্ষরণ করে ডিমগুলোকে নিষিক্ত করে। ডিম ছাড়ার পরে মাছগুলোকে হাপা থেকে সরিয়ে নিতে হয়। স্ত্রী মাছের সমস্ত ডিম নিষিক্ত হয় না। নিষিক্ত ডিমগুলো দেখতে পরিষ্কার ও স্বচ্ছ হয় এবং অনিষিক্ত ডিমগুলো সাদা ও অস্বচ্ছ হয়। নিষিক্ত ডিমগুলোকে হাপায় ৪ – ৫ ঘণ্টা রেখে ডিমের বাইরের আস্তরণ শক্ত করে নিতে হয়। এর পর ডিমগুলোকে হাপার এক প্রান্তে জড়ো করে এক লিটার মগের সাহায্যে মেপে তুলে নিয়ে ডিম ফোটানোর হাপায় নির্দিষ্ট পরিমাণে স্থানান্তরিত করতে হয়।

হ্যাচিং হাপা

একটি বড় হাপা এবং একটি ছোট পাহা নিয়ে হ্যাচিং হাপা গঠিত। বড় হাপাটির মধ্যে ছোট হাপাটি বসানো থাকে। তাই একে ডাবল হাপাও বলে। বাইরের বড় হাপাটি মার্কিন কাপড়ের তৈরি এবং এর সাইজ দৈর্ঘ্যে ২ মিটার, প্রস্থে ১ মিটার ও উচ্চতায় ১ মিটার হয়। অপর পক্ষে ভেতরের হাপাটি গোল গোল ছিদ্রযুক্ত মশারির কাপড় দিয়ে তৈরি এবং এর সাইজ দৈর্ঘ্যে ১.৫ মিটার, প্রস্থে ৭৫ সেন্টিমিটার ও উচ্চতায় ৫০ সেন্টিমিটার হয়। প্রজনন হাপার মতো এদের ওপরে কাপড়ের ঢাকনা থাকে না। এই হাপাকে পুকুরের পরিষ্কার জলে চারটি বাঁশের খুঁটির সাহায্যে খাটানো হয়। বাইরের হাপাটি খাটানোর পর এর মধ্যে ভেতরের হাপাটি প্রায় জলের মধ্যে ডুবিয়ে হাপার চার কোণ ফিতের সাহায্যে খুঁটির সঙ্গে টান টান করে বেঁধে দিতে হয়।

প্রজনন হাপার ডিমগুলোকে হাপার এক দিকে জড়ো করে একটি মাপযুক্ত লিটার মগের সাহায্যে মেপে তুলে নিয়ে হ্যাচিং হাপার ভেতরের হাপাতে সম ভাবে ছড়িয়ে দিতে হয়। সাধারণত ১ লিটার মগে প্রায় ২৫০০০ ডিম ধরে। এই রকম ২ – ৩ লিটার বা আনুমানিক ৫০০০০ – ৭৫০০০ ডিম ভেতরের হাপাতে রাখা হয়। ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা পরে ডিম ফুটে ডিমপোনা বের হয়। খুব সরু সুতোর মতো ডিম পোনাগুলো ভেতরের হাপার গোলাকার ছিদ্র দিয়ে বাইরে বড় হাপাতে চলে আসে, কিন্তু ডিমের খোলা ও অনিষিক্ত ডিম ভিতরের হাপাতে থাকে। জল যাতে দূষিত না হয় তার জন্য ভেতরের হাপা খুলে সরিয়ে রাখা হয়। ডিম পোনাগুলো তিন দিন বাইরের হাপাতে থাকে। এই সময় এদের কোনও খাবার দিতে হয় না কারণ ডিম পোনাগুলো এই সময় তাদের কুসুমথলিতে সঞ্চিত খাদ্য গ্রহণ করে। তিন দিন পর এদের নার্সারি বা আঁতুড় পুকুরে স্থানান্তরিত করতে হয়। যে পুকুরে হাপা খাটানো হবে সে পুকুরের জলের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা আবশ্যক —

  • ১) হাপা যে পুকুরের জলে বসানো হবে, সেই পুকুরের জলের তাপমাত্রা ২৭ – ৩১ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড বা তার কাছাকাছি থাকলে ভালো।
  • ২) পুকুরের জলের যথেষ্ট পরিমাণে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকা দরকার। দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ৫ পিপিএম বা তার উপরে থাকলে সুবিধা হয়।
  • ৩) পুকুরের জলে প্লাঙ্কটনের মাত্রা বেশি থাকা উচিত নয়। অ্যালগাল ব্লুম বা শৈবাল আধিক্য থাকা পুকুরে হাপা খাটানো উচিত নয়। এ ছাড়া প্রচুর ঘোলা জলযুক্ত স্থানে হাপা রাখা উচিত নয়।
  • ৪) হাপাতে যেন অন্যান্য ক্ষতিকারক মাছ, কাঁকড়া না প্রবেশ করতে পারে সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে।

রাক্ষুসে ও অবাঞ্চিত মাছ দমন

পোনা তৈরীর পর জাল টেনে যতদূর সম্ভব রাক্ষুসে মাছ (শোল, গজার, আইড়, টাকি, ফলি ইত্যাদি) এবং অবাঞ্চিত মাছ ( বেলে, পুঁটি, দাড়কিনা, মলা, চাপিলা, চান্দা ইত্যাদি) সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া জলজ আগাছা সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে ফেলতে হবে। জলর প্রবাহসহ বাহিরের জলর সাথে সংযোগ থাকার দরুন বিষ প্রয়োগে অবাঞ্চিত মাছ দমন খুব বেশি কার্যকর হয়না বিধায় জাল টেনে অবাঞ্চিত মাছ ও আগাছা দমন করতে হয়।

প্রজাতি নির্বাচন

পোনা চাষের জন্য মাছের প্রজাতি নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন প্রজাতির এমন সব মাছ ছাড়তে হবে যারা জলর সকল স্তরের খাবার খায়, যাদের খাদ্য শিকল সংক্ষিপ্ত, যাদের পোনা সহজে সংগ্রহ যায় এবং অল্প সময়ে চাষ করে বাজারে বিক্রয় উপযোগী হয়। এসব দিক বিবেচনা করে রুই, কাতল, মৃগেল, সিলভার কার্প, বিগহেড কার্প, গ্রাসকার্প, রাজপুঁটি, তেলাপিয়া, থাই পাঙ্গাস প্রজাতির মাছ পোনা চাষ করার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তাছাড়া পোনা গলদা চিংড়ি চাষ করা সম্ভব।

পোনা মজুদের হার

অধিক ফলনের জন্য সুস্থ ও সবল পোনা নির্দিষ্ট হারে মজুদ করা প্রয়োজন। পোনা মজুদের সময় পোনার আকার কোনক্রমেই ৪ ইঞ্চির কম যেন না হয়। কারন ছোট পোনা পোনার বেড়া দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়াও পোনা থেকে অবাঞ্চিত ও রাক্ষুসে মাছ সম্পুর্ণরুপে সরিয়ে ফেলা অনেক সময় সম্ভব হয়না। তাই ৪ ইঞ্চির চেয়ে ছোট পোনা খেয়ে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। প্রতি একরে ৬-৮ হাজার পোনা মজুদ করা যেতে পারে।

প্রতি একরে ৮ হজার পোনা মজুদ করে ভাল ফল পাওয়া গেছে। রুই, মৃগেল, কাতলা, সিলভার কার্প ও কার্পিও যথাক্রমে ৩০, ২০, ১০, ১০, ৩০ হারে মজুদ করতে হবে।

পোনা খাদ্য সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা

মোট মজুদকৃত মাছের ওজনের ১% হারে সহজলভ্য খাদ্য যথাঃ খৈল, কুঁড়া, ভূষি, আটা, চিটাগুড় ইত্যাদি মিশ্রিত করে ভেজা অবস্থায় দৈনিক প্রয়োগ করতে হবে। সম্পূরক খাদ্যের অনুপাত যথাক্রমে খৈল ৫০%, কুঁড়া ৩০%, গমের ভূষি ১৫%, আটা ৩% এবং চিটাগুর ২% হলে ভাল হয়। পোনা জাল টেনে মাসে কমপক্ষে একবার মাছের বৃদ্ধি ও রোগ বালাই পর্যবেক্ষন করা আবশ্যক।

মাছের কোন প্রকার রোগ বা দৈহিক বৃদ্ধির সমস্যা দেখা দিলে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিমাসে কমপক্ষে একবার মাছের নমুনা সংগ্রহ করে মাছের বৃদ্ধি অনুযায়ী সম্পূরক খাদ্যের পরিমাণ সমন্বয় করে বৃদ্ধি অনুযায়ী সম্পূরক খাদ্যের পরিমাণ সমন্বয় করে বর্ধিত হারে খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া পোনার বেড়া বা জালে কোন রূপ ক্ষতি হয়েছে কিনা সে বিষয়ে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। অনেক সময় পোনার বেড়া ও জালে ময়লা, আবর্জনা জমে জলর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হলে বেড়া ও জাল পরিষ্কার করা না হলে জলর চাপে জাল ছিড়ে যেতে পারে ও বেড়া ভেঙ্গে যেতে পারে। মাছ সংরক্ষণ, সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ ও পোনা পরিচর্যার জন্য সার্বক্ষণিকভাবে পোনা সংলগ্ন এলাকায় লোক পাহারা থাকা আবশ্যক।

আহরন ও উৎপাদন

মাছ চাষের উদ্দেশ্য হলো অল্প সময়ের মধ্যে বিক্রয়যোগ্য মাছ উৎপাদন করা। পোনা ৬-৭ মাসের মধ্যে বাজারের চাহিদামত বিক্রয়যোগ্য মাছ উৎপদিত হয়। পোনা ৬-৭ মাস পরেই টানা জাল ব্যবহার করে মাছ ধরা যেতে পারে।

রোগ-বালাই ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়

মুক্ত জলাশয়ে সাধারণ মাছের কোন রোগ-বালাই দেখা যায় না। তবে শীতকালে খালের জলর গভীরতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসলে মাছে রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। পোনা মাছ চাষ সাধারণত ৬ থেকে ৮ মাসব্যাপী হয়ে থাকে এবং শীতকালে অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সমুদয় মাছ আহরন করা হয়। তাই রোগ-বলাই এর আক্রমন সেখানে পরিলক্ষিত হয় না। ঝড় এবং অতি বৃষ্টির দরুণ পোনার ক্ষতি হতে পারে। ঝড়ে পোনা ভেঙ্গে যাওয়া সহ বন্যায় মাছ বের হয়ে যেতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির ফলে শুধুমাত্র পুকুরের মাছ ও উম্মুক্ত জলাশয় হতে আহরিত মাছ দ্বারা দেশে মাছের চাহিদা পূরণ ও পুষ্টি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। একইভাবে শুধুমাত্র কৃষিজ ও শিল্পের উন্নতি সাধন করে দেশের কার্যক্ষম সমস্ত লোকের কর্মসংস্থান করা সম্ভব হবেনা। এক্ষেত্রে পোনা মাছ চাষের মাধ্যমে জলজ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। এ দেশে প্রায় ৪০, ৪৭, ৩১৬ হেক্টর মুক্ত জলাশয় (নদী ও খাড়ি অঞ্চল, বিল, কাপ্তাই হ্রদ, প্লাবন ভূমি), ২৬,২২৫ কিঃমিঃ সেচ প্রকল্পের খাল, ৫,৪৮৮ হেক্টর বাওর ও মৃত নদী (বদ্ধ জলাশয়), ৪৮০ কিঃমিঃ সমুদ্র প্রভৃতি জলাশয়ে নিবিড় বা আধানিবিড় পদ্ধতিতে পোনা মাছ চাষ করা হলে একদিকে যেমন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে অন্য দিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান এর মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। তাই পোনা মাছ চাষ প্রযুক্তির ব্যাপক সমপ্রসারণের উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে।

সুত্রঃপোর্টাল কনটেন্ট টিম

2.98484848485
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top